somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

হুমায়ূন আহমেদের সিলেটের দিনগুলো

১৩ ই নভেম্বর, ২০১২ বিকাল ৩:২৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :





বাড়ির পাশের ডোবায় ভেসে উঠলো শংকরের লাশ। ক’দিন থেকেই তাকে খুজে পাওয়া যাচ্ছিলো না। সবাই ভেবেছিলো কোথাও গিয়েছে, ফিরে আসবে। শেষমেষ পাওয়া গেলো লাশ। পত্রিকায় খবরটি দেখলাম, বিস্তারিত আর কিছু লেখা নেই। এই শংকর ছিলো হুমায়ুন আহমেদের বন্ধু। হুমায়ূন আহমদের শৈশব কেটেছে সিলেট শহরে। তখন শংকরের সাথে ছিলো তার বন্ধুত্ব। হুমায়ুন তখন ছোট্রটি। বাবা ফয়জুর রহমান পুলিশের চাকরী করেন। পরিবার পরিজন নিয়ে থাকেন শহরের মীরাবাজারের ভাড়া বাসায়। শহরটা আজকের মতো গিঞ্জি ছিল না। ছিমছাম শান্ত শহর। বেশ পরিস্কার পরিচ্ছন্ন। শহরে অনেকগুলো দীঘি-লালদীঘি, মাছুদীঘি, কাজীদীঘি, ধোপাদীঘি। দীঘিগুলোতে টলটলে পানি। কচুরীপানাও আছে। কোথাও কোথাও কচুরীপানায় বকের বাসা। একদিন রাতের বেলা হুমায়ূন আহমদের বাবা আর মা শহরের রংমহল সিনেমা হলে ছবি দেখে বাসায় ফিরছিলেন রিকসা করে। ধোপাদীঘির পারে আসতেই দীঘির স্বচ্ছ টলমলে জল দেখে হুমায়ূন আহমেদের মা বললেন, আহা দেখ কি সুন্দর দীঘি। টলটল করছে পানি। ইচ্ছে করছে পানিতে গোসল করি। আর যায় কোথা। হুমায়ুন আহমদের বাবা রিকশা থামিয়ে তার মাকে নিয়ে তরতর করে নেমে গেলেন দীঘির জলে। শহরটা নির্ঝঞ্জাট ছিলো। হুমায়ূন একা একা ঘুরে বেড়াতেন শহরময়। হাটতে হাটতে পথ হারিয়ে ফেলতেন। একে ওকে জিগ্যেশ করে খোঁজে পেতেন মীরাবাজারের রাস্তা। সিলেট শহরে তার কতো স্মৃতি। এক আইসক্রীমওলা তাকে বিনে পয়সায় আইসক্রীম খাওয়াতো। তিনি লঙ্গরখানার দরিদ্র লোকদের সাথে বসে খিচুড়ী খেয়েছেন। পরম উপাদেয় খিচুড়ী খেতে একদিন নিয়ে আসেন ছোট বোন শেফুকেও। ধরা পড়ে যান, লঙ্গরখানা লোকদের কাছে। এদের জন্যে তো লঙ্গরখানার খাবার কথা না। ভাই বোনকে বের করে দেয়া হয় লঙ্গরখানার লাইন থেকে। সেই সুস্বাদু খিচুড়ী তাদের আর খাওয়া হয়নি। হুমায়ূন আহমেদের বড়ো মামাও তাদের সাথে থাকতেন। ইন্টারমিডিয়েট পড়তেন। কিন্তু নানা অজুহাতে তিনি ফাইনাল পরীক্ষায় অংশ নিতেন না। সেই বড়ো মামা একটি মেয়ের সাথে প্রেম করছেন। প্রতিদিন মেয়েটিকে নিয়ে কবিতা লেখেন। আর কবিতাগুলো প্রেমিকার হাতে পৌছে দেয়ার দায়িত্ব পালন করেছেন হুমায়ূন। বাবা সারাদিন অফিস করে বিকেলে চলে যেতেন শহরের দরগাহ গেইটের কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদে। ফিরতে ফিরতে রাত ন’টা হয়ে যেতো। বাবা একদিন হুমায়ূনকেও ভর্তি করে দেন সাহিত্য সংসদে। হুমায়ুন সাহিত্য সংসদের লাইব্রেরী থেকে বই নিয়ে যান। পাগলের মতো পড়েন। শুধূ তাই নয় হুমায়ুন ছোট ভাই ইকবাল আর ছোট বোন শেফুকেও মীরাবাজার থেকে দরগা গেইটের মানে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরের সাহিত্য সংসদের লাইব্রেরীতে নিয়ে যান। যেতে আসতে ৬/৭ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হতো। সেই মীরা বাজারের কিশোরী মোহন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ক্লাস ওয়ানে বাবা হুমায়ুন আহমদকে ভর্তি করে দিলেন। ক্লাসের প্রথম দিনই শাস্তি খেয়ে শুরু হলো তার পাঠশালা জীবন। প্রথম দিনই বেঞ্চের উপর টানা দু‘ঘন্টা দাড়িয়ে কাটাতে হলো তাকে। প্রায়ই এভাবে বেঞ্চে দাঁড়াতে হতো। হুমায়ুনের অবশ্য অসুবিধে হয়নি। বেঞ্চে দাড়িয়ে দেখা যেতো স্কুলের পাশের আনসার অফিসের মাঠে আনসাররা মার্চপাষ্ট করছে। হুমায়ুন বেঞ্চে দাড়িয়ে সেই চমৎকার মার্চপাষ্ট উপভোগ করতেন। মুগ্ধ হবার মতো বিষয়। হুমায়ুন সিদ্ধান্ত নিলেন বড়ো হলে আনসার হবেন। তার আর আনসার হওয়া হয়নি। হুমায়ূন আহমেদের প্রথম শ্রেণীর ক্লাসের পুরো সময়টাই কান ধরে বেঞ্চে দাড়িয়ে দাড়িয়ে কেটে যায়। তবে তিনি শুধু একা দাড়াতেন না। তার সাথে প্রায়ই আরেকজনকে দাড়িয়ে থাকতে দেখা যেতো। তার নাম ছিলো শংকর। তাদের ক্লাসে দু’জন শংকর ছিলো। বেঞ্চে দাড়িয়ে থাকা শংকরের মাথাটা তার শরীরের তুলনায় ছিলো অনেক বড়ো। এজন্যে তাকে বলা হতো মাথা মোটা শংকর। হুমায়ূন আহমেদ বলেছেন ‘ক্লাসে শংকর ছাড়া আমার আর কোন বন্ধু জুটলো না। সে আমার সংগে ছায়ার মতো লেগে রইলো। আমি যেখানেই যাই সে আমার সঙ্গে আছে। মারামারিতে সে আমার মত দক্ষ নয়, তবে মারামারির সময় দাঁত মুখ খিচিয়ে আঁ আঁ ধরনের গরিলার মতো শব্দ করে প্রতিপক্ষের দিকে ছুটে যেত। এতেই অনেকের পিলে চমকে যেত। শংকরকে নিয়ে শিশু মহলে আমি বেশ ত্রাসের সঞ্চার করে ফেলি।’ শংকরকে নিয়ে সেই শৈশবেই হুমায়ূন আহমেদ একটি সংগঠন করেছিলেন নাম দিয়েছিলেন ‘গ্রীণ বয়েজ ক্লাব’। তখন হুমায়ূন আর শংকর ক্লাস থ্রিতে পড়েন। একদিন শংকর তার কাছে সাহায্যের জন্যে হাজির। শংকরের মা বলেছেন,শংকর যদি ক্লাস ফোরে উঠতে পারে তাহলে তাকে একটি চামড়া বল কেনে দেবেন। সেই সময়ে একটি চামড়ার বল কতো লোভনীয় ব্যাপার, চিন্তাই করা যায় না। শংকর পরীক্ষা পাস করতে হুমায়ূনের সাহায্যের জন্যে এসেছে। দু’জন একই ক্লাসে পড়লেও হুমায়ূন শংকরকে পাশ করাবার জন্যে তার শিক্ষকতার দায়িত্ব নিলেন। ছাত্র শংকরকে পড়াবার জন্যে শিক্ষক হুমায়ূনকে আরো পড়া শিখতে হয়। হুমায়ূন পড়া শিখে ছাত্রকে পড়ান। কিন্তু ছাত্রের মাথায় কিছুই ঢুকে না। তবে হুমায়ূন প্রাণপন চেষ্টা চালিয়ে যেতে লাগলেন। পরীক্ষার ফল বেরোলো স্কুলের শিক্ষকদেরকে তিনি চমকে দিলেন, ক্লাসের সবচে দুষ্টু ফাকিবাজ ছেলে হুমায়ূন ক্লাসে ফার্স্ট হয়ে গেলেন। কিন্তু ফাস্ট হয়েও আনন্দ নেই। কারন শংকর ফেল করেছে। ফুটবল পাওয়া যাবে না, সেই দুঃখে রিপোর্ট কার্ড হাতে কাঁদতে কাঁদতে বাসায় ফিরলেন হুমায়ুন। তারপর একদিন ‘বিশেষ বিবেচনায়’ মাথা মোটা শংকরকে প্রমোশন দিয়ে দেয়া হলো। তার মা সেই খুশীতে তাকে একটা এক নম্বরী ফুটবল এবং পাম্পার কিনে দিলেন। গ্রীণ বয়েজ ফুটবল ক্লাবের প্রতিষ্ঠা হল। আমি ক্লাবের প্রধান এবং শংকর আমার এ্যাসিসটেন্ট। আমাদের বাসার কাজের ছেলে রফিক আমাদের ফুলব্যাক। অসাধারণ খেলোয়াড়।’ ‘আমার ছেলেবেলা’ নামের একটি বইয়ে হুমায়ূন আহমদ এইসব কথা লিখেছেন। তিনি লিখেছিলেন সিলেট ছেড়ে যাবার পর শংকরের সাথে তার আর দেখা হয়নি। একটি ফুটনোট দিয়েছিলেন। ‘এই শংকর বর্তমানে বাংলাদেশের ছবিতে ভাঁড়ের চরিত্রে অভিনয় করে শুনেছি’। বইটি পড়ে খুব ইচ্ছে করে শংকরকে খোঁজে বের করতে। তবে তার ফুটনোটটিকে প্রধান অবলম্বন করে শংকরকে খুঁজতে শুরু করি। আমাকে খুব বেগ পেতে হয় না। আমাদের শহরের প্রায় সকল সংবাদপত্র হকারকেই চিনি। কয়েকজনকে তো খুব ভালোভাবেই চিনি। এরমধ্যে একজন শংকর। বামুন সাইজের মানুষ চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে খবরের কাগজ বেঁচে। জানতাম সে কয়েকটি ছবিতেও অভিনয় করেছে। হুমায়ূন আহমেদের ‘আমার ছেলেবেলা’ পড়েই চলে যাই সেই শংকরের কাছে। সে খুব ব্যস্ত। কথা বলার ফুরসত নেই। আমি ক’দিন তার পেছন ঘুরি। শংকর জানতো না হুমায়ূন আহমদ তাকে নিয়ে লিখেছেন। বইয়ের কথাগুলো বলতেই তারও স্মৃতির বাক্স খুলে যায়। ফুটবল কেনা, পরীক্ষা দেবার কথা বলে। তার কাছ থেকে জানি ‘শৈশবের দিনগুলোতে পরীক্ষা পাশের পুরষ্কার হিসেবে চামড়ার ফুটবল আর পাম্পার পেলেও শংকরদের সেই অবস্থা বেশী দিন ছিলো না। তার বাবার অদূরদর্শীতার জন্যে তাদের মীরাবাজারের বাসাটি বেঁচতে হয়েছিলো। শংকরের পড়াশোনাও এগোয়নি, পঞ্চম শ্রেণীতেই পড়াশোনা ক্ষান্ত দিতে হয়েছিলো। শংকর সিলেটের একজন প্রবীণ সংবাদপত্র হকার। পুরো নাম নবেন্দু কুমার দাশ, সবাই শংকর নামেই চেনে। ’৭৩ সালে শংকর সংবাদপত্র হকারীতে নামে। সংবাদপত্র বেচে বেচে বাবার পুরনো ভিটে হারিয়ে সুরমা নদীর দক্ষিণ তীরে গোটাটিকরে নিজে একটি বাড়ি কিনেছে। বিয়েও করেছে (বউয়ের নাম এখন মনে পড়ছে না)। তবে বউ তার চেয়ে লম্বা।’ শংকর সংবাদপত্রে আসার আগে চলচ্চিত্র পরিচালক মাসুদ চৌধুরীর সহায়তায় পিরিত না জানে রীত ও সোনার কাজল ছবিতে ভাঁড়ের ভূমিকায় অভিনয় করে। এ ছাড়া সিরাজুদ্দৌলা, ইনসান কা হক, জবাবদিহি, গায়ের মেয়ে নাটকেও অভিনয় করে প্রশংসা কুড়িয়েছে। হুমায়ূন আহমদের শংকরকে আবিষ্কার, আমার কাছে একটি ছোটো খাটো এভারেস্ট বিজয়ের মতো মনে হচ্ছিলো। শংকরকে নিয়ে একটি ফিচার লেখার চিন্তা করি। কিন্তু সিলেটের পত্রিকায় লিখলে তো হুমায়ূন আহমেদের চোখে পড়বে না। যাই হোক ছাপা হলে তাকে পাঠিয়ে দেবো। এর মধ্যে শুনি হুমায়ূন আহমেদ সিলেট আসছেন। সিলেট স্টেডিয়ামের মোহাম্মদ আলী জিমনেসিয়ামে একটি বইমেলায় অংশ নিতে। আমি তাড়াহুড়ো করে শংকরকে নিয়ে একটি ফিচার লিখি। তারপর বন্দরবাজারের হাসান মার্কেটে সার বাধা স্টুডিওর একটিতে নিয়ে যাই। একগাদা পত্রিকা হাতে তার একটি ফটো তুলি। তখন আমি সিলেটের ডাকে কাজ করি না। ছবি আর ফিচার দেবার পর, ডাকের লোকজন খুব গুরুত্ব দিয়ে শেষ পৃষ্ঠায় লেখাটি ছাপেন। হিসেব নিকেশ করে হুমায়ূন আহমদ যে দিনটিতে বইমেলা উদ্বোধন করবেন, সেই দিন মানে ৩১ শে অক্টোবর ১৯৯১ লেখাটি প্রকাশ হয়। শুধু তাই নয়, বই মেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ডাকের মাহবুব নিজের উদ্যোগে হুমায়ুন আহমদকে তো একটি কপি দেয়, অনুষ্ঠানেও অনেকগুলো ডাক বিতরণ করে। লেখাটি দারুন সাড়া জাগায়, সবাই অবাক হয়ে যায়, চিরচেনা এই শংকর হুমায়ুন আহমেদের সেই শংকর। বিষয়টি এখানেই থেমে থাকলো না। হুমায়ুন আহমেদের আরেক ভক্ত মানে পাগলাটে ভক্ত হারান ( রম্যলেখক হারান কান্তি সেন)। হুমায়ুন আহমদের বই বাজারে আসার সাথে সাথে কিনে ফেলে। শংকর নিয়ে লেখা ডাকে ছাপা হবার আগেই শংকর আবিস্কারের কথা তাকে বললাম। দারুন উত্তেজনা তার মাঝে। আমাদের একটি সংগঠন তখন দারুন একটিভ। নাম সাইক্লোন গ্রুপ্। আমরা প্রতি সপ্তাহে সাহিত্য আসর করি। আমাদের ১০৮তম আসরটি একটু বড়ো আকারে সোলেমান হলে করলে কেমন হয়। আর সেই আসরে হুমায়ুন আহমদকে এনে শংকরের সাথে যদি মিলন ঘটানো যায়। প্রস্তাবটি হারান শুধু লুফে নিলো না, রীতিমতো ঝাপিয়ে পড়লো কাজে। বইমেলা হচ্ছিলো বই ব্যবসায়ীদের সহযোগিতায়। সিলেটের বই ব্যবসায়ীদের একজন নেতা ছিলেন তপন ভাই। হারানের সাথে খুব ঘনিষ্ট সম্পর্ক। হারানই তপন ভাইয়ের সাথে যোগাযোগ করে হুমায়ুন আহমদকে অনুষ্ঠানে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করে। সাইক্লোনের ১০৮তম সাহিত্য আসর শহীদ সোলেমান হলে হলো। হুমায়ুন আহমেদ আসলেন তার স্ত্রী গুলতেকিন আহমদকে নিয়ে। অনেক প্রকাশকও আসলেন। আমাদের হলের সবগুলো চেয়ার পূর্ণ হয়ে গেছে। আমরা অনুষ্ঠানটি একটু অন্যরকমের করে শুরু করলাম। উপস্থিত সবার হাতে ছোট ছোট স্লিপ দিয়ে দিলাম। যাদের ইচ্ছে লিখে হুমায়ুন আহমেদকে প্রশ্ন করবেন। প্রশ্ন শুরু হলো। হুমায়ুন আহমেদ মেদবিহীন জবাব দিতে লাগলেন। একজন জিগ্যেস করলেন এতো বছর পর সাহিত্য সংসদে এসে কেমন লাগছে। তার সোজা সাপটা জবাব আমি নাটকের মতো বলবো না, আমি আবেগাপ্লুত হয়ে গেছি, আমার কান্না আসছে ইত্যাদি। তবে হ্যা ভালো লাগছে। এইভাবে অনেক প্রশ্ন। হুমায়ুন আহমদ একটি পায়ের উপর দাড়িয়ে আরেক পা ভাজ করে হাটুর উপর রেখে একটির পর একটি প্রশ্নের জবাব দিচ্ছিলেন। আমরা মাথা মোটা শংকরকে অনুষ্ঠান শুরু হবার আগেই নিয়ে এসেছি। তাকে সাহিত্য সংসদের লাইব্রেরীতে বসিয়ে রেখেছিলাম। অনুষ্ঠান যখন শেষ হবে, তখন একটু ভুমিকা রেখে আমরা শংকরের উপস্থিতির কথা বললাম। শংকরকে মঞ্চের দিকে আনা হচ্ছিলো। পুরো হল জুড়ে উত্তেজনা। শংকরকে কাছে পেলে হুমায়ুন কি করবেন- জড়িয়ে ধরবেন, হাউমাউ করে কেঁদে ফেলবেন। কিন্তু হুমায়ুন আহমদ তার সেই স্বভাব সুলভ ভাব নিয়ে ক্যামন নিস্পৃহভাবে শংকরের সাথে হাত মেলালেন। ছোট করে বললেন, কেমন আছো। তারপর ফটো তোলার পালা। ফটো সেশন হচ্ছে আমার ছোট্র ইয়াশিকা ক্যামেরায় । ফটো সেশনের পর শংকর বললো, দোস্ত আমারে তোমার একটা নাটকো অভিনয়ের চান্স দিওরেবা। হুমায়ুন ছোট করে হাসলেন ঢাকায় গেলে যোগাযোগ করো। শংকর হুমায়ুন মিলনের মাধ্যমে আমাদের আসর শেষ হলো। তিনি দেখতে গেলেন কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদের লাইব্রেরী। সেই শেশবে ছোট ভাই ছোট বোনকে মীরাবাজার থেকে দরগাহ গেইটের সাহিত্য সংসদ নিয়ে আসতেন। আসা যাওয়ায় সাত কিলোমিটার, বিষয়টি ভাবতে কেমন রোমাঞ্চ জাগে। তিনটি শিশু হেটে হেটে যাচ্ছে। এরমধ্যে একজনের হাতে দুটো বই। সে সবার বড়ো ক্লাস ফোরে পড়ে। আর বাকী দু’জন তারচে অনেক অনেক ছোট এবং এর মধ্যে একজন ফ্রক পরা কন্যা শিশু। কন্যাশিশু ক্লাস ওয়ানে পড়ে অথবা স্কুলে যাওয়া শুরু হয়নি। আমার ফিচার ছাপা হবার পর আরো অনেকে লেখেন শংকরকে নিয়ে ঢাকায় পত্রিকায়। তবে শংকরের আর অভিনয় করা হয়নি হুমায়ুন আহমদের কোন নাটক বা ছবিতে। হুমায়ুন আহমদ এরপর অনেকবার সিলেট এসেছেন। একবার তামাবিল বর্ডার দিয়ে শাওনসহ হুমায়ুন ভারত থেকে সিলেট আসলেন। তখনো শাওনের সাথে বিয়ে হয়নি। আরেক দিন হুমায়ুন আহমেদ শহর ঘুরলেন রিকশা করে। সামনের রিকশায় হুমায়ুন আর পেছনের রিকশায় শাওন, তখনো তাদের বিয়ে হয়নি। আরেকবার আসেন শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের নামকরণ বিরোধী আন্দোলনের সময়। শহর জুড়ে চরম উত্তেজনা। কড়া পুলিশ প্রহরায় রেলস্টেশন থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের গেইটে গিয়ে তিনি মা ভাইবোনদেরকে নিয়ে অনশন করেছিলেন। শংকর মারা যাবার বছর দুয়েক আগে থেকে সারাদিন পত্রিকা টত্রিকা বেচে প্রায়ই চলে আসতো সিলেটের ডাক-এর অফিসে। মধুবনের চারতলায় সিলেটের ডাক এর অফিস। কোন কাজ নেই রাত বারোটা একটা পর্যন্ত বসে থাকতো। বলা যায় প্রতিদিনই আসতো। তারপর একসময় শুনি মৃত্যুর সংবাদ। হুমায়ুন আহমেদ এ খবর পেয়েছিলেন কি না জানিনে। শংকরের মতো এইভাবে পানিতে ডুবে হুমায়ুন আহমদের আরো একজন ভালোলাগার মানুষের মৃত্যু হয়েছিলো। তিনি নিশানাথ ভট্টাচার্য্য। হুমায়ুন আহমেদরা তখন থাকতেন বান্দরবনে। নিশানাথের বাবাও ছিলেন পুলিশ। মেট্রিকে অনেকবার ফেল করলেও নিশানাথ স্বাস্থ্যের ব্যাপারে ©র্ছলেন খুব যত্নশীল। একদিন ঘোর বর্ষা বৃষ্টি হচ্ছে অবিশ্রাম। নিশাদাদা হুমায়ুন আহমেদকে নিয়ে শঙ্খনদীতে মাছ শিকার করতে গেলেন। বর্ষায় পাহাড়ী শঙ্খনদী ফুলে উঠছে। প্রচন্ড স্রোত। বড়ো গাছ প্রচন্ড স্রোতে ভেসে যাচ্ছে। হুমায়ুন তীরে দাড়িয়ে। নিশাদাদা জাল ফেললেন। কি থেকে কী ঘটে গেলো, নিশাদাদা শঙ্খ নদীতে ডুবে গেলেন। একবারের জন্যেও তার মাথা ভেসে উঠলো না। নিশাদাদার লাশ পাওয়া গেলো সন্ধ্যায় । সাত মাইল ভাটিতে। শংকর, নিশানাথদের মতো সবাইকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। হুমায়ুন আহমেদও গ্রহণ করেছেন মৃত্যুর স্বাদ। ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে ২০১২ খ্রিস্টাব্দের ১৯ জুলাই তিনি আমেরিকায় ইন্তেকাল করেন। একজন লেখকের মৃত্যু একটি দেশকে আলোড়িত করতে পারে বাংলাদেশের মানুষ দ্বিতীয়বার দেখলেন। একবার দেখেছিলো জাতীয় কবি কাজী নজরুল এর মৃত্যুর পর আর দেখলো হুমায়ুন আহমেদের মৃত্যুর পর। হুমায়ুন আহমেদ ছিলেন বাংলা সাহিত্যের বেস্ট সেলার। হুমায়ুন আহমেদকে নিয়ে কবি সাযযাদ কাদিরের একটি মন্তব্য আমার কাছে এযাবত কাল পাওয়া একটি যথার্থ মূল্যায়ন। তার মন্তব্য দিয়েই লেখাটি শেষ করছি-হুমায়ুন আহমেদের তিনটি বড় সাফল্য প্রথমত, বাংলা বেস্টসেলার কলকাতার প্রাধান্যকে ছাড়িয়ে তিনি ঢাকার প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা করেন প্রথম। এর আগে নজিবর রহমান সাহিত্যরত্ন থেকে আকবর হোসেন পর্যন্ত বিচ্ছিন্ন কিছু উদাহরণ থাকলেও বিশেষ ক্ষেত্রে ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছেন একমাত্র কাজী আনোয়ার হোসেন। তবে হুমায়ুন অবদান রেখেছেন সামগ্রিক পরিসরে। দ্বিতীয়ত, বাংলা উপন্যাস সাহিত্যে মধ্যবিত্ত বাঙালি মুসলমানকে স্থায়ী আসন দিয়েছেন তিনি। এর আগের ১৫০বছরের উপন্যাস পড়ে তেমন করে বোঝা যায় না যে বাঙালীদের ৬০ ভাগ মুসলমান। তৃতীয়ত, উপন্যাসের কাটতি বাড়াতে তিনি সেক্স বা ভায়োলেন্সের আশ্রয় নেন নি কখনও। এরপর কেটেছে প্রায় দুই দশক। বাংলা সাহিত্যের প্রথম বেস্টসেলার লেখক বঙ্মিমচন্দ্র্ তাঁকে ছাড়িয়ে যান শরৎচন্দ্র। সেকালের জনসংখ্যা ও শিক্ষার হারের কথা মনে রেখেও বলা যায়, কাটতিতে হুমায়ুন ছাড়িয়ে গিয়েছেন তাকেঁও। হয়তো বাংলা সাহিত্যে সর্বকালের সেরা বেস্টসেলার লেখক তিনিই। অবশ্য গুণ, মান ও শৈলীর বিচার আসছে না এখানে । সে বিচারের জন্য কিছুদিন দেরি করতে হবে আমাদের। হুমায়ুন সাফল্য দেখিয়েছেন আরও নানা ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গের ঐতিহ্যবাহী ‘দেশ’ এর পূজা সংখ্যায় তিনি করে নিয়েছেন স্থায়ী আসন। বাংলাদেশের কোনও লেখকের জন্য এ এক বিরল প্রতিষ্ঠা। এতে এই আশা জেগেছিলো আমাদের, বাংলাদেশের মত পশ্চিমবঙ্গের বাজারে হয়তো বেস্টসেলার হবে তার বই। সেই হওয়াটা অসম্ভব কিছু ছিলো না, কিন্তু তার আগে আমরা হারালাম তাকে। ফলে এ বিশাল সম্ভাবনা এখন সুদূুর পরাহত হয়ে রইলো আমাদের কাছে। কারণ তার শূন্য স্থান আর পূরণ হবে না সহজে। সেলিম আউয়াল||লেখক : গল্পকার সিলেটের ডাক
২টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র - ভ্রাম্যমান লাইব্রেরী ভাবনা

লিখেছেন ইফতেখার ভূইয়া, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ৮:৪৬


শ্রদ্ধেয় আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যাররে হাতে গড়া প্রতিষ্ঠান বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র তার জন্মলগ্ন ১৯৭৮ সাল থেকে অনেকটা পথ পেরিয়ে এসেছে। আমার মনে পড়ে, আমি স্কুলে পড়াকালীন সময়ে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র থেকে স্কুল... ...বাকিটুকু পড়ুন

=একান্ত নিজস্ব জিনিসগুলো পর হয়ে যাচ্ছে=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ৯:৪৫



যে চোখ দিয়ে দেখেছি ধরার আলো, সে চোখও দিচ্ছে ফাঁকি,
যে চোখের আলোয় দেখেছি পুকুর নদী, শুকনো উঠোন;
বৃষ্টি ভেজা দিন, দেখেছি ময়না শালিক, ঘুঘু ডাকা দুপুর
সে চোখ পর হয়ে যাচ্ছে অল্প... ...বাকিটুকু পড়ুন

রবিন খুদারা কেন বাংলাদেশে বিনিয়োগ করেন না ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১১ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:২৩


Robin Khuda ঢাকার ছেলে। স্কুল পড়েছেন এই দেশেই। তারপর অস্ট্রেলিয়া গেছেন, AirTrunk বানিয়েছেন, Blackstone তাকে ১৬ বিলিয়ন ডলারে কিনে নিয়েছে, আর এখন তিনি ভারতে ৩০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্যা ফায়ার অফ মাই সউল

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১১ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৫:১৪

আমি যে ধরণের গান পছন্দ করি, সেগুলোর মাঝে ক্বারি আমির উদ্দিনের 'কুহু সুরে মনের আগুন' গানটি আমার খুব প্রিয়। এই গানটিকে সম্প্রতি ইংরেজিতে অনুবাদ করে গান বানিয়েছি, এনিমেশন... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমার ডক্টর যেন বাঁচে ১৫০ বছর.....

লিখেছেন শায়মা, ১১ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৪



ডক্টরস, হসপিটাল এবং ওষুধ এসব নিয়ে আমার তিক্ত অভিজ্ঞতার শেষ নেই। এ কারনে আমি একদম এদের কাউকেই পছন্দ করি না। তবে কিছু তো করার নেই। জীবনের নানা সময়ে ইচ্ছের... ...বাকিটুকু পড়ুন

×