যে হালে রেখেছ মুর্শিদ
সেই হালে থাকি
গবেষণার কাজে প্রায়ই আমাকে বাংলাদেশে আসতে হয়। আমি সবসময় এই সুযোগটাই খুঁজে বেড়াই। বিদেশের যান্ত্রিক জীবনের মাঝে দেশে স্বল্প সময়ের অবস্থানও আমাকে অনেকটা শান্তির পরশ দেয়। তবে এবারের বাংলাদেশ সফরটা যেন অনেকটাই দ্রুত এবং কাজের চাপের মধ্যে চলে যাচ্ছিল। আত্মীয় স্বজনদের সাথেও যে মন ভরে কথা বলব, একটু ঘুরে বেড়াব সেই ফুসরতটুকু যেন পাচ্ছিলাম না। এমনই অবস্থায় ফরিদপুর যেতে হল। গত বছরের ডিসেম্বর মাসের ১৯ তারিখ আমি ফরিদপুর যাই।
এবারের ফরিদপুরের ভ্রমণ নানা কারণে একটি বিশেষ যায়গা করে নিয়েছে, কেননা এখানে এসেই আমার হাজেরা বিবি সম্পর্কে জানার আগ্রহ তৈরি হয়। সঙ্গ হিসেবে আমার শ্যালককে নিয়ে আসছিলাম। তন্ময় না থাকলে কিন্তু আমার পুরো সময়টাই খুব খারাপ-ভাবে যেত, এটা নিশ্চিত করেই বলা যায়। মোটামুটি খেয়ে দেয়ে, আর শুয়ে বসে সময় কাটছিল আমার। এর মধ্যেই খবর পেলাম বাউলগানের একটি অনুষ্ঠান হবে এবং হাজেরা বিবির পঞ্চম মৃত্যুবার্ষিকী স্মরণ করা হবে এর মধ্য দিয়ে। এটা শুনেই উঠে পরলাম। চলে গেলাম অনুষ্ঠান স্থলে। হাজেরা বিবি সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু না জানলেও বাউল গান শোনার লোভ সংবরণ করতে পারলাম না। এই অনুষ্ঠানে এসেই হাজেরা বিবি ও তার জীবন সম্পর্কে কিছুটা হলেও জানতে পারি এবং এটি আমার আগ্রহ কে আরো বাড়িয়ে তোলে।
লোক শিল্পী হাজেরা বিবির ৫ম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে ফরিদপুর সাহিত্য পরিষদ এর উদ্যোগে তাদের মিলনায়তনে হাজেরা বিবি’র স্মরণ সভা ও লোকজ সংগীতের আয়োজন করা হয়েছে। এখানে হাজেরা বিবির ভক্ত ও অনুসারী ছাড়াও অন্যান্য অনুরাগী এবং সাহিত্য পরিষদের বিভিন্ন ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন। হাজেরা বিবি সম্পর্কে বিভিন্ন বিষয় আলোচিত হচ্ছিল। বিষয়গুলো যেন এক একটি দৃশ্যপট হয়ে ভেসে উঠছিল মনের পর্দায়। না জানা অনেক বিষয় উঠে আসছিল বক্তাদের আলোচনার মাধ্যমে। এই অনুষ্ঠানটি মনের মাঝে একটি আকাঙ্ক্ষার জন্ম দিল হাজেরা বিবি সম্পর্কে আরও কিছু জানার। কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও তেমন কিছু জানতে পারলাম না। এমন একজন শিল্পী যিনি কিনা তারা সারাটি জীবন উৎসর্গ করেছেন লোকশিল্পের বিকাশে তার পঞ্চম মৃত্যুবার্ষিকীতেও তার জীবনী সংরক্ষণ এর কোন উদ্যোগ এই ফোরামে দেখলাম না। একজন বক্তা বললেন যে তিনি হাজেরা বিবির গান সংরক্ষণের একটি উদ্যোগ গ্রহণ করবেন। এটা একটা আশার বাণী হয়ে আসল যেন।
আমি ফরিদপুর সাহিত্য পরিষদের মফিজ ইমাম মিলন এর মাধ্যমে কিছু তথ্য জানতে পারলাম। হাজেরা বিবির জন্ম ফরিদপুর জেলার, কোতোয়ালি থানার অম্বিকাপুর এলাকার শোভা রামপুর গ্রামের একটি কুলীন হিন্দু পরিবারে। তার মাতার নাম ছিল শ্যামদাসী এবং পিতার নাম ছিল রাজকুমার। অনেকটা ঘটনা চক্রে পরে হাজেরা বিবি আজকের এই হাজেরা বিবি নামে সবার কাছে পরিচিতি লাভ করে। তার জন্মের পরই সেই সময়ের রিতি অনুযায়ী তার বিয়েও ঠিক হয়ে যায়। তার প্রথম স্বামীর নাম ছিল হিতিস। বাল্য বিবাহের রিতি অনুযায়ী হাজেরা বিবি প্রায় ১০-১১ বছরের সময় তার শ্বশুর বাড়ীতে স্বামী সংসার করতে যেতে বাধ্য হন। এর আগে তারা পিতা মাতা তাকে স্কুলেও ভর্তি করে দিয়েছিলেন। কিন্তু হাজেরা বিবির বিদ্যা অর্জন এর কোন প্রচেষ্টা আর সামনে অগ্রসর হতে পারেনি। সাংসারিক জীবনে হাজেরা বিবি কতটা সুখী বা আনন্দিত ছিল সেটা জানা যায় নি, তবে এই ঘরে তার একটি পুত্র সন্তানের জন্ম হয়েছিল, তার নাম মন্টু। কিন্তু দুর্ভাগ্য মন্টু দের বছর বয়সেই মারা যায়। তার জীবনের বড় ঘনঘটা নেমে আসে তার স্বামীর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে। তার ছেলে মারা যাবার কিছুদিন পরই হিতিস মারা যান।
এই সময় হাজেরা বিবির বয়স ছিল প্রায় ১৬-১৭ বছর। কাছাকাছি সময়ে তারা পিতা মাতাও ইহলোক ত্যাগ করেন। তার জীবনে দুর্যোগ নেমে আসে। এই সময়টাতেই তিনি পল্লী কবি জসিমউদ্দিন এর সংস্পর্শে আসেন। তার জীবনের পরবর্তী ধাপে কবি জসিমউদ্দিন এর অপরিসীম অবদান ছিল। এই জন্যই হাজেরা বিবিকে বলা হয় পল্লী কবির মানস কন্যা। পল্লী কবির সাথে তার যোগাযোগ হয় একটি গানের আসরে। হাজেরা বিবি কিভাবে গানের সাথে যুক্ত হলেন এই বিষয়টা অবশ্য আমি জানতে পারি নাই। হাজেরা বিবির গানের হাতে খড়ি ঠিক কোন সময়ে হয়েছিল সেটা না জানা গেলেও এটা যানা যায় যে, আব্দুল মুন্সি ছিলেন তার প্রথম ওস্তাদ। পল্লী কবির বাসভবনে একটি গানের অনুষ্ঠানে হাজেরা বিবি গান পরিবেশন করেন। কবির খুব ভাল লাগে হাজেরা বিবির গান শুনে। কবি যখন জানতে পারে হাজেরা বিবির কেউ নেই, তখন তিনি হাজেরা বিবিকে বলেন সে তার সাথে যাবে কিনা। হাজেরা বিবির কোন পিছুটান না থাকায় সে কবির সাথে তার বাসায় চলে আসেন। হাজেরা বিবি কবিকে বাবা বলে ডাকলেন। এই সময়টাতে হাজেরা বিবির জীবনের বড় একটি পরিবর্তন শুরু হয়। কবি তাকে বিচার গান করতে উদ্বুদ্ধ করেন। পল্লীকবি তাকে ঢাকায় নিয়ে আসেন। তাকে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতে উদ্বুদ্ধ করেন। হাজেরা বিবি রাজী থাকায় কবি তার অভিভাবকত্ব গ্রহণ করেন। এবং তার নাম পরিবর্তন করে হাজেরা বিবি রাখেন। এই সময়ে হাজেরা বিবি রেডিওতে প্রথম গান শুরু করেন। রেডিওতে গান গাওয়ার ৫/৬ বছর পরে তিনি টেলিভিশনে গান শুরু করেন।
ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করার পর কবি, হাজেরা বিবির বিয়ে দেন তার ধর্মপুত্র আজাহার মন্ডলের সাথে। আজাহার মন্ডলের এর আগেও একটি বিয়ে হয়েছিল। সেই সংসারে তার ছেলে মেয়ে ছিল। নতুন সংসার এবং নতুন জীবন শুরু করার পরও তার জীবনে যেন শান্তির সুবাস বইলনা। তার শিল্পী জীবনের সকল উপার্জিত পয়সার বেশীরভাগই খরচ করতে হতো এই সংসার পরিচালনার জন্য। তার নিজের হাতে কোন টাকা পয়সা দেয়া হত না। যেন এই পরিবারের ভরণ পোষণ নিশ্চিত করাই তার একমাত্র কাজ। এভাবেই চলতে থাকে তার নতুন জীবন। কিন্তু তার পারিবারিক জীবনে আরও সঙ্কটাপন্ন অবস্থার আবির্ভাব ঘটে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময়। এই সময় আজাহার মন্ডলের পূর্বের স্ত্রীর ছেলে, জলিল মণ্ডল, কৌশলে হাজেরা বিবির বাড়িটি জোর করে লিখিয়ে তার দখলে নিয়ে নেয়।
তার কিছুদিন পরেই হাজেরা বিবির বয়স যখন আনুমানিক ৪৫ বছর তখন তার স্বামী আজাহার মণ্ডল মারা যায়। এই সংসারের তার একমাত্র বন্ধনটিও আজাহার মণ্ডল এর মৃত্যুর পর শেষ হয়ে যায়। তার জীবন এই সময়ে এসে আরও ছন্নছাড়া হয়ে পরে। এরপর হাজেরা বিবি আলীয়াবাদ এর দয়া রামপুরের মনিরুদ্দিন ফকির এর কাছে আশ্রয় নেন। কিন্তু হাজেরা বিবির এই আশ্রয় নিয়েও গ্রামের মানুষ নানা রকম কথা বার্তা বলতে থাকে। এক পর্যায়ে গ্রামের লোকজনের চাপে হাজেরা বিবি এবং মনিরুদ্দিন ফকির এর বিয়ে সম্পন্ন হয়। জীবনের এতসব উত্থান পতনের মাঝেও তার সঙ্গীত সাধনার কোন পরিবর্তন ঘটে নাই। তার গান নিয়ে হাজেরা বিবি ছুটে বেড়াত বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রত্যন্ত এলাকাতে। তার সঙ্গীত ছড়িয়ে পরে গ্রামে গঞ্জে। বেড়ে উঠে তার ভক্ত ও শিষ্যদের সংখ্যা। তার প্রায় ১০০০ জন শিষ্য রয়েছেন। এভাবে লোক সঙ্গীতের সাধনা করতে থাকেন তার জীবনের শেষ সায়াহ্ন পর্যন্ত।
যতটা সহজ এবং সরল জীবন এর প্রতিচ্ছবি আমাদের সামনে ফুটে উঠেছে, হাজেরা বিবির জীবনটি কখনোই এমনটা ছিল না। তার জীবনের শেষ সময়টা কাটে চরম অর্থ কষ্টে। এই সময় হাজেরা বিবি বাংলাদেশ বেতার থেকে ২,৫০০ টাকা এবং সরকারের সংস্কৃতি বিভাগ থেকে বাৎসরিক ৭,২০০ টাকা ভাতা পেতেন। যা দিয়ে নিদারুণ অর্থকষ্টে তার দিনানিপাত করতে হয়েছিল। তার জীবনের নানা রকম হতাশার অনুভূতি হাজেরা বিবি নানা সময়েই প্রকাশ করতেন। যখন তিনি খুবই অসুস্থ অবস্থায় তার দিন অতিবাহিত করতে ছিলেন এবং তার অর্থকষ্টও ছিল সমানভাবে, সেই সময় তার আর বেঁচে থাকার কোন ইচ্ছা সে পোষণ করতেন না। এটা হয়ত হাজেরা বিবির অভিমান এর বহিঃপ্রকাশই ছিল। সারা জীবন মানুষের জন্য গান গেয়ে শেষ জীবনে এভাবে বেঁচে থাকা তার জন্য একটি চরম মানসিক কষ্ট বয়ে এনেছিল।
গানের স্বীকৃতি স্বরূপ হাজেরা বিবি কে সম্মাননা দেয়া হয় একুশে পদকের মাধ্যমে। এছাড়াও হাজেরা বিবি পদ্ম সম্মাননা সহ ৭টি স্বর্ণ পদক লাভ করেন। আর তার স্মৃতি রক্ষার্থে আমরা সমাজের মানুষজন তেমন একটা এগিয়েও আসছি না। হাজেরা বিবির ভক্ত এবং অনুসারীদের উদ্যোগে প্রতিবছর বৈশাখ মাসের ২৩ তারিখ ৩ দিন ব্যাপী অনুষ্ঠান প্রচলিত আছে, যেখানে হাজেরা বিবিকে স্মরণ করা হয় তার শিষ্যদের গানের মাধ্যমে এবং মেলার মাধ্যমে। ফরিদপুরের হাজেরা বিবি ফাউন্ডেশন এর উদ্যোগে গত বছর (২০১০) প্রথমবারের মত আয়োজন করা হয় 'হাজেরা বিবি পৌষমেলা'। ১৬ থেকে ৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত শোভারামপুর এলাকায় এ মেলা চলে। সরকারী উদ্যোগে কোন স্মরণ সভা বা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয় কিনা সেটা আমার জানা নেই। কিন্তু এই কালজয়ী লোক শিল্পীর জীবন ও কর্ম নিয়ে আরও গবেষণা জরুরী, তার জীবন ও কর্মকে দেশবাসীর নিকট তুলে ধরার জন্য। আমাদের দেশ থেকে এ ধরনের উদ্যোগ না নেয়া হলেও, পশ্চিম বঙ্গের প্রতিথযশা শিল্পী মৌসুমি ভৌমিক দুই বাংলার লোক শিল্পী এবং বাউলদের সৃষ্টি নিয়ে এমনই একটা উদ্যোগ গ্রহণ করেন যা তাদের দ্যা ট্রাভেলিং আর্কাইভ(http://thetravellingarchive.org/home.php) নামক ওয়েব সাইটে উল্লেখ আছে। এর অংশ হিসেবে মৌসুমি ভৌমিক হাজেরা বিবির সাথে সাক্ষাত করেন। ২০০৬ সালের ২৯ এপ্রিল মৌসুমি ভৌমিক হাজেরা বিবির সাথে তার বসতবাড়িতে দেখা করেন। মৌসুমি ভৌমিক এর একটি লেখায় তিনি উল্লেখ করেন যে, একাধিকবার তিনি হাজেরা বিবির সাথে দেখা করনে। খালি গলায় হাজেরা বিবি মৌসুমি ভৌমিক কে গানও গেয়ে শোনান। মৌসুমি ভৌমিকদের এই প্রচেষ্টাকে অবশ্যই সাধুবাদ জানাতে হবে। কিন্তু তাদের কাজে হাজেরা বিবির গান ও তার জীবনের উল্লেখযোগ্য অংশই উঠে আসেনি। সেই জায়গা থেকে উপলব্ধি করা যায়, এটার দায় এবং দায়িত্ব একজন বাংলাদেশী হিসেবে আমার এবং আমাদের কাঁধেই বর্তায়।
হাজেরা বিবির কর্মকে যদি আমরা ছড়িয়ে দিতে পারি সকলের মাঝে তাহলেই হয়ত তার প্রতি আমাদের যোগ্য সম্মান প্রদর্শন করা হবে। এছাড়াও আমাদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির এই লুপ্তপ্রায় বৈশিষ্ট্যকে ধরে রাখতে হলেও এর সংরক্ষণও জরুরী। আর এটা করা সম্ভব হলেই হাজেরা বিবি আমাদের মাঝে বেচে থাকবেন নিরন্তর। আর তার গানগুলোও যুগ যুগ ধরে বাংলার মানুষের মুখে মুখে ফিরবে।
আমার ভাব চিঠি লইয়ারে, আমার প্রেম চিঠি লইয়ারে
যারে কোকিল প্রাণ বন্ধুয়ার দেশে
উড়ে যারে প্রাণ কোকিল উজান বাতাসে
দুই নয়নের জলে করলাম দোয়াতের কালি
হৃদয় ছিঁড়িয়া লিখিলাম আমার দুঃখের ডালি
সে যেন এসে করে দেখা অভাগিনীর সাথে…….
বি. দ্র: এই প্রবন্ধে হাজেরা বিবির ছবি সংগৃহীত হয়েছে Click This Link ওয়েব সাইট থেকে।
সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই জুন, ২০১৪ দুপুর ১২:১৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


