শীতকাল, এক উপশহরের এক প্রান্তে আমাদের বাসা। তখনকার শহর আজকের মতো এত ব্যস্ত, এত উঁচু উঁচু কংক্রিটের দেয়ালে ঢাকা ছিল না। শহরটা যেন ধীরে ধীরে গ্রামের দিকে গিয়ে মিশে যেত।
সেই শীতের এক সকাল। বড় টেবিলের সামনে আমি বসে আছি, বইগুলো খোলা। মা কড়া গলায় বলেছিলেন, “পরীক্ষা সামনে, মন দিয়ে পড়।” টেবিলের উপর রোদ এসে পড়েছে, পাতার উপর সোনালি আলো। কিন্তু আমার মন বইয়ের অক্ষরে আটকে নেই।
সিঁড়ির ধারে দাঁড়িয়ে আছে আমার ছোট ভাই আর পাড়ার একটু বড় এক ছেলে। দু’জনের গায়ে চেক ডিজাইনের শীতের কাপড়, নরম রোদে তাদের জামার রং যেন আরও উজ্জ্বল। তারা বাইরে যাবে, দৌড়াবে, খেলবে, হয়তো রাস্তা পেরিয়ে মাঠের দিকে চলে যাবে। তাদের হাসির শব্দ আমার বুকের ভেতর টান ধরাচ্ছিল।
আমার ভেতরে এক অদ্ভুত অস্থিরতা। মনে হচ্ছিল, বই ছুঁড়ে ফেলে আমিও ছুটে যাই। নরম শীতের রোদে দৌড়াতে দৌড়াতে রাস্তা পার হয়ে, ফসলের মাঠের ভেতর দিয়ে, হালকা কুয়াশা ভেদ করে। সেই কুয়াশা যেন সূর্যের আলোয় আস্তে আস্তে ছিঁড়ে যাচ্ছিল। দূরে যেখানে শহর শেষ, সেখান থেকেই শুরু হতো গ্রাম। টিনের চালের ঘর, উঠানে মুরগি, খেতে নুয়ে থাকা কৃষক, চুলা থেকে ধোঁয়া উঠছে।
তখন আমার বয়স হবে দশ। জীবন জটিল ছিল না। বুকভরা শক্তি, অকারণ আনন্দ, আর সীমাহীন কৌতূহল। শহরের কংক্রিটের জঞ্জাল তখনও পুরোপুরি গ্রামকে ছুঁতে পারেনি। মনে হতো, আসল জীবনটা ওখানেই, খোলা আকাশের নিচে।
আরও একটু বড় হওয়ার পর, আমি প্রায়ই হাঁটতে বের হতাম। হাঁটতাম আর হাঁটতাম। শহরের সীমানা পেরিয়ে গ্রামের পথে ঢুকে যেতাম। মনে হতো, যত দূরে যাব, তত বেশি কিছু আবিষ্কার করব। ফসলের মাঠের পেরিয়ে দূরের দিগন্তরেখায় যে সবুজ গ্রামের সারি দেখা যায়, তার পেছনে কী আছে। ওই রঙিন আকাশরেখা, যেখানে আকাশ আর মাটি মিশে গেছে, সেখানে কি অন্য কোনো জগৎ লুকিয়ে আছে।
আমি জানতে চাইতাম নিজের চোখে।
বারবার আমি সেই দূরের দিগন্তরেখার দিকে হেঁটেছি। মনে হতো, ওখানে হয়তো লুকিয়ে আছে শৈশবের মতো কোনো স্বচ্ছ জিনিস, নির্দোষ, মুক্ত, রঙিন। এমন কিছু, যা শহরের বড় হয়ে ওঠা মানুষদের চোখে আর ধরা পড়ে না।
আজও শীতের নরম রোদে দাঁড়ালে, সেই সিঁড়ির ধারে দাঁড়ানো দু’টি ছেলের ছবি ভেসে ওঠে। বইয়ের উপর পড়ে থাকা সোনালি আলো, আর আমার বুকের ভেতর ছুটে চলা এক ছোট্ট ছেলের আকুলতা, দৌড়ে চলে যাওয়ার, দূরে, আরও দূরে। যেখানে জীবন সহজ, আর আকাশটা একটু বেশি নীল।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

