সাল:৭৫৮৯
পৃথিবীর মানচিত্র বদলে গেছে।
সমুদ্রপৃষ্ঠ আশি মিটারেরও বেশি উঁচু হয়ে যাওয়ার পর বিশ্বের অধিকাংশ উপকূলীয় শহর পানির নিচে হারিয়ে গেছে। একসময়ের নিউইয়র্ক এখন ডুবন্ত আকাশচুম্বী ভবনের কঙ্কাল। টোকিওর উপকূলের ওপর ভেসে আছে বিশাল ভাসমান কলোনি। বাংলাদেশ, নেদারল্যান্ডস, মালদ্বীপ—সবই ইতিহাসের পাতায় রয়ে গেছে।
মানুষ বেঁচে আছে, কিন্তু আগের মতো নয়।
এখন পৃথিবীর নতুন রাজধানী হলো সমুদ্র।
ভাসমান নগরী, গভীর সমুদ্রের গবেষণা স্টেশন, পানির নিচের খনিশহর আর উদ্ধারকারী সাবমেরিন—এসব নিয়েই নতুন সভ্যতা।
কিন্তু সমুদ্র আগের চেয়েও বেশি রহস্যময় হয়ে উঠেছে।
কারণ গত বিশ বছরে পৃথিবীর বিভিন্ন গভীর খাদ থেকে এমন সব অদ্ভুত সংকেত ধরা পড়েছে, যার কোনো ব্যাখ্যা আজও বিজ্ঞানীরা দিতে পারেননি।
অনেকে বলে—
সমুদ্রের নিচে আমরা একা নই।
ভারত মহাসাগরের মাঝখানে ভাসমান উদ্ধার কেন্দ্র ওশান-৯।
এখানেই কাজ করে ছাব্বিশ বছরের তরুণ মেরিন ইঞ্জিনিয়ার আদনান রহমান।
তার পরিচয় খুবই সাধারণ।
সে কোনো বিখ্যাত বিজ্ঞানী নয়।
কোনো সামরিক অফিসারও নয়।
তার কোনো বড় ডিগ্রি নেই।
কিন্তু একটা জিনিসে সে অসাধারণ।
ভাঙা জিনিস ঠিক করতে।
পুরোনো সাবমেরিন...
অচল ড্রোন...
ক্ষতিগ্রস্ত অক্সিজেন রিঅ্যাক্টর...
যে মেশিনকে সবাই স্ক্র্যাপ ঘোষণা করে, আদনান সেটার ভেতরে সম্ভাবনা খুঁজে পায়।
তার বাবা বলতেন,
"যে মেশিন এখনো পুরোপুরি ভাঙেনি, তাকে কখনো আবর্জনা বলো না।"
বাবা আর নেই।
দশ বছর আগে এক উদ্ধার অভিযানে গভীর সমুদ্রের চাপ সহ্য করতে না পেরে সাবমেরিন বিস্ফোরণে মারা গিয়েছিলেন।
সেই থেকে আদনানের জীবন একটাই।
কাজ।
আর মেশিন।
সকাল আটটা।
ওশান-৯-এর বিশাল স্ক্র্যাপ ডকে দাঁড়িয়ে আদনান একটা পুরোনো উদ্ধার সাবমেরিনের ইঞ্জিন খুলে বসে আছে।
তার হাত পুরো কালো তেলে মাখা।
ঠিক তখনই পিছন থেকে ভেসে এল পরিচিত কণ্ঠ।
"আদনান!"
সে মাথা তুলল।
তার বন্ধু ও সহকর্মী রায়হান দৌড়ে আসছে।
হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,
"আজ স্ক্র্যাপ অকশন।"
আদনান ভ্রু কুঁচকাল।
"তাতে?"
"শুনেছি আজ অদ্ভুত কিছু এসেছে।"
"প্রতিবারই তো অদ্ভুত কিছু আসে।"
"না... এবার নাকি পুরো একটা বিশাল সাবমেরিন।"
আদনান হেসে ফেলল।
"যেটা চালানো যায় না?"
"নাকি ভেতরে ভূত আছে?"
রায়হান কাঁধ ঝাঁকাল।
"লোকজন তাই বলছে।"
ওশান-৯-এর স্ক্র্যাপ অকশন প্রতি মাসে একবার হয়।
ডুবে যাওয়া জাহাজ...
অচল গবেষণা যান...
পুরোনো যুদ্ধযান...
যা মেরামত করা অসম্ভব, সেগুলো নিলামে বিক্রি হয়।
বেশিরভাগ মানুষ আসে ধাতু কেনার জন্য।
আদনান আসে কৌতূহল থেকে।
দুপুরের দিকে বিশাল হ্যাঙ্গারের দরজা খুলতেই সবাই চুপ হয়ে গেল।
ধীরে ধীরে অন্ধকারের ভেতর থেকে একটা দৈত্যাকার ছায়া বেরিয়ে এল।
মানুষজন নিঃশ্বাস আটকে তাকিয়ে রইল।
এত বড় সাবমেরিন কেউ আগে দেখেনি।
দৈর্ঘ্যে প্রায় চারশো মিটার।
গায়ে কোনো দেশের পতাকা নেই।
কোনো সিরিয়াল নম্বর নেই।
কোনো নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের চিহ্ন নেই।
পুরো গায়ে অদ্ভুত কালো ধাতু।
যেটা মরিচা ধরেনি।
বরং আলো শুষে নিচ্ছে।
একজন বৃদ্ধ উদ্ধার কর্মকর্তা বললেন,
"এটা তিন মাস আগে জাভা ট্রেঞ্চের আট হাজার মিটার গভীর থেকে উদ্ধার করা হয়েছে।"
সঙ্গে সঙ্গে হলঘরে গুঞ্জন শুরু হলো।
"অসম্ভব!"
"ওই গভীরতায় তো আধুনিক সাবমেরিনও টিকতে পারে না!"
কর্মকর্তা মাথা নাড়লেন।
"আমরাও তাই ভেবেছিলাম।"
তিনি বিশাল সাবমেরিনের দিকে তাকালেন।
"কিন্তু এটা সেখানে ছিল।"
একটা হোলোগ্রাফিক স্ক্রিন জ্বলে উঠল।
অজানা ডিপ-সি অবজেক্ট
উৎপত্তি : অজানা
বয়স : অনুমান করা যায়নি
ইঞ্জিন : অজানা
শক্তির উৎস : অজানা
অস্ত্র : অজানা
চালু অবস্থা : সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয়
বাজার মূল্য : প্রায় শূন্য
সরকারি শ্রেণিবিন্যাস :
স্ক্র্যাপ।
লোকজন হাসতে শুরু করল।
"স্ক্র্যাপ?"
"এত বড় লোহার টুকরো কে কিনবে?"
কিন্তু আদনান হাসল না।
সে ধীরে ধীরে সাবমেরিনের গায়ের কাছে এগিয়ে গেল।
তার আঙুল ধাতুর ওপর ছুঁয়ে দিল।
অদ্ভুত।
এটা ঠান্ডা নয়।
গরমও নয়।
মনে হচ্ছে যেন...
জীবন্ত।
সে নিচু হয়ে হালের একটা ছোট্ট অংশ পরীক্ষা করল।
সেখানে একটা সূক্ষ্ম ফাটল।
ফাটলের ভেতর থেকে ক্ষীণ নীল আলো বেরিয়ে আবার নিভে গেল।
এক সেকেন্ড।
তারও কম।
কেউ খেয়াল করল না।
শুধু আদনান।
তার বুকের ভেতর ধক করে উঠল।
কোনো মৃত মেশিন এভাবে আলো দেয় না।
"শুরু মূল্য..."
নিলাম কর্মকর্তা ঘোষণা করলেন।
"...দশ ক্রেডিট।"
পুরো হলঘর হেসে উঠল।
কেউ হাত তুলল না।
একজন ব্যবসায়ী বলল,
"ওটা টেনে নিয়ে যেতে যত খরচ হবে, তার চেয়ে বেশি দাম পড়বে।"
আরেকজন বলল,
"কেটে বিক্রি করলেও লাভ নেই।"
এক মিনিট।
দুই মিনিট।
কেউ কিনল না।
কর্মকর্তা বিরক্ত হয়ে বললেন,
"কেউ কি নেবেন?"
আদনান হাত তুলল।
"আমি।"
সবাই ঘুরে তাকাল।
রায়হান অবাক হয়ে বলল,
"তুই পাগল নাকি?"
আদনান শান্তভাবে উত্তর দিল,
"হয়তো।"
নিলাম শেষ হতে এক মিনিটও লাগল না।
কারণ প্রতিযোগী ছিল না।
দশ ক্রেডিট দিয়ে পৃথিবীর সবচেয়ে অদ্ভুত সাবমেরিনের মালিক হয়ে গেল আদনান রহমান।
কাগজে সই করার সময় কর্মকর্তা হেসে বললেন,
"ছেলে, আশা করি তোর কাছে বড় ক্রেন আছে।"
আদনানও হাসল।
"আমি ক্রেন কিনিনি।"
"তাহলে?"
"আমি সমস্যা কিনেছি।"
সন্ধ্যা নেমে এসেছে।
স্ক্র্যাপ ডকের একেবারে শেষ প্রান্তে একা দাঁড়িয়ে আছে বিশাল কালো সাবমেরিন।
বাকি সবাই চলে গেছে।
আদনান হাতে টর্চ নিয়ে ধীরে ধীরে ভেতরে ঢুকল।
প্রথম দরজাটা অবাক করার মতো সহজেই খুলে গেল।
একটুও শব্দ হলো না।
ভেতরে সম্পূর্ণ অন্ধকার।
কোনো মরিচা নেই।
কোনো দুর্গন্ধ নেই।
মনে হচ্ছে যেন—
গতকালই এটি তৈরি হয়েছে।
টর্চের আলো দেয়ালে পড়তেই সে থেমে গেল।
পুরো দেয়ালজুড়ে অদ্ভুত প্রতীক।
কোনো ভাষা নয়।
কোনো পরিচিত লিপিও নয়।
জ্যামিতিক চিহ্ন।
বৃত্ত।
ত্রিভুজ।
অদ্ভুত সর্পিল রেখা।
যেন এগুলো লেখা নয়...
বরং কোনো সার্কিটের নকশা।
আদনান সাবধানে এগোতে লাগল।
তার জুতোর শব্দ ধাতব করিডোরে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।
হঠাৎ...
টক...
সে থেমে গেল।
পিছনে কেউ আছে?
সে ঘুরে তাকাল।
কেউ নেই।
আবার হাঁটতে শুরু করল।
টক... টক...
আবার সেই শব্দ।
এবার যেন তার পদশব্দের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আসছে।
সে টর্চ ঘুরিয়ে চারপাশ দেখল।
শূন্য।
পুরো সাবমেরিনে সে একাই আছে।
তাহলে?
হঠাৎ টর্চটা নিভে গেল।
চারদিকে অন্ধকার।
একেবারে নিখুঁত অন্ধকার।
আদনান বিরক্ত হয়ে টর্চে চাপ দিল।
কাজ করছে না।
"চমৎকার..."
সে বিড়বিড় করল।
ঠিক তখনই...
করিডোরের দুই পাশের দেয়ালে একটার পর একটা নীল রেখা জ্বলে উঠতে শুরু করল।
প্রথমে একটা।
তারপর দশটা।
তারপর শত শত।
মুহূর্তের মধ্যে পুরো করিডোর নীল আলোয় ভরে গেল।
আদনান স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
"এটা..."
সাবমেরিন তো বন্ধ ছিল!
তাহলে আলো জ্বলল কীভাবে?
একটা গভীর, ধাতব কম্পন পুরো কাঠামো কাঁপিয়ে দিল।
মনে হলো বহু শতাব্দী ধরে ঘুমিয়ে থাকা কোনো বিশাল যন্ত্র ধীরে ধীরে নিঃশ্বাস নিচ্ছে।
দেয়ালের অজানা প্রতীকগুলো একে একে আলোকিত হতে লাগল।
তারপর...
করিডোরের শেষ প্রান্তে গোলাকার একটি দরজা নিজে থেকেই খুলে গেল।
ভেতর থেকে ভেসে এল কোমল নীল আলো।
আর সেই আলোর সঙ্গে এমন এক কণ্ঠস্বর, যার ভাষা সে কখনো শোনেনি...
তবুও অদ্ভুতভাবে বুঝতে পারল।
"জৈব পরিচয় শনাক্ত..."
"প্রোটোকল পুনরায় সক্রিয়..."
"পাঁচ হাজার তিনশো বারো বছর পর..."
এক মুহূর্ত নীরবতা।
তারপর সেই কণ্ঠস্বর আবার বলল—
"স্বাগতম... ক্যাপ্টেন আদনান।"
আদনানের শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।
সে কখনো এই সাবমেরিনে আসেনি।
তাহলে...
এটি তার নাম জানল কীভাবে?
—চলবে…সাল: ২০৮৯
পৃথিবীর মানচিত্র বদলে গেছে।
সমুদ্রপৃষ্ঠ আশি মিটারেরও বেশি উঁচু হয়ে যাওয়ার পর বিশ্বের অধিকাংশ উপকূলীয় শহর পানির নিচে হারিয়ে গেছে। একসময়ের নিউইয়র্ক এখন ডুবন্ত আকাশচুম্বী ভবনের কঙ্কাল। টোকিওর উপকূলের ওপর ভেসে আছে বিশাল ভাসমান কলোনি। বাংলাদেশ, নেদারল্যান্ডস, মালদ্বীপ—সবই ইতিহাসের পাতায় রয়ে গেছে।
মানুষ বেঁচে আছে, কিন্তু আগের মতো নয়।
এখন পৃথিবীর নতুন রাজধানী হলো সমুদ্র।
ভাসমান নগরী, গভীর সমুদ্রের গবেষণা স্টেশন, পানির নিচের খনিশহর আর উদ্ধারকারী সাবমেরিন—এসব নিয়েই নতুন সভ্যতা।
কিন্তু সমুদ্র আগের চেয়েও বেশি রহস্যময় হয়ে উঠেছে।
কারণ গত বিশ বছরে পৃথিবীর বিভিন্ন গভীর খাদ থেকে এমন সব অদ্ভুত সংকেত ধরা পড়েছে, যার কোনো ব্যাখ্যা আজও বিজ্ঞানীরা দিতে পারেননি।
অনেকে বলে—
সমুদ্রের নিচে আমরা একা নই।
ভারত মহাসাগরের মাঝখানে ভাসমান উদ্ধার কেন্দ্র ওশান-৯।
এখানেই কাজ করে ছাব্বিশ বছরের তরুণ মেরিন ইঞ্জিনিয়ার আদনান রহমান।
তার পরিচয় খুবই সাধারণ।
সে কোনো বিখ্যাত বিজ্ঞানী নয়।
কোনো সামরিক অফিসারও নয়।
তার কোনো বড় ডিগ্রি নেই।
কিন্তু একটা জিনিসে সে অসাধারণ।
ভাঙা জিনিস ঠিক করতে।
পুরোনো সাবমেরিন...
অচল ড্রোন...
ক্ষতিগ্রস্ত অক্সিজেন রিঅ্যাক্টর...
যে মেশিনকে সবাই স্ক্র্যাপ ঘোষণা করে, আদনান সেটার ভেতরে সম্ভাবনা খুঁজে পায়।
তার বাবা বলতেন,
"যে মেশিন এখনো পুরোপুরি ভাঙেনি, তাকে কখনো আবর্জনা বলো না।"
বাবা আর নেই।
দশ বছর আগে এক উদ্ধার অভিযানে গভীর সমুদ্রের চাপ সহ্য করতে না পেরে সাবমেরিন বিস্ফোরণে মারা গিয়েছিলেন।
সেই থেকে আদনানের জীবন একটাই।
কাজ।
আর মেশিন।
সকাল আটটা।
ওশান-৯-এর বিশাল স্ক্র্যাপ ডকে দাঁড়িয়ে আদনান একটা পুরোনো উদ্ধার সাবমেরিনের ইঞ্জিন খুলে বসে আছে।
তার হাত পুরো কালো তেলে মাখা।
ঠিক তখনই পিছন থেকে ভেসে এল পরিচিত কণ্ঠ।
"আদনান!"
সে মাথা তুলল।
তার বন্ধু ও সহকর্মী রায়হান দৌড়ে আসছে।
হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,
"আজ স্ক্র্যাপ অকশন।"
আদনান ভ্রু কুঁচকাল।
"তাতে?"
"শুনেছি আজ অদ্ভুত কিছু এসেছে।"
"প্রতিবারই তো অদ্ভুত কিছু আসে।"
"না... এবার নাকি পুরো একটা বিশাল সাবমেরিন।"
আদনান হেসে ফেলল।
"যেটা চালানো যায় না?"
"নাকি ভেতরে ভূত আছে?"
রায়হান কাঁধ ঝাঁকাল।
"লোকজন তাই বলছে।"
ওশান-৯-এর স্ক্র্যাপ অকশন প্রতি মাসে একবার হয়।
ডুবে যাওয়া জাহাজ...
অচল গবেষণা যান...
পুরোনো যুদ্ধযান...
যা মেরামত করা অসম্ভব, সেগুলো নিলামে বিক্রি হয়।
বেশিরভাগ মানুষ আসে ধাতু কেনার জন্য।
আদনান আসে কৌতূহল থেকে।
দুপুরের দিকে বিশাল হ্যাঙ্গারের দরজা খুলতেই সবাই চুপ হয়ে গেল।
ধীরে ধীরে অন্ধকারের ভেতর থেকে একটা দৈত্যাকার ছায়া বেরিয়ে এল।
মানুষজন নিঃশ্বাস আটকে তাকিয়ে রইল।
এত বড় সাবমেরিন কেউ আগে দেখেনি।
দৈর্ঘ্যে প্রায় চারশো মিটার।
গায়ে কোনো দেশের পতাকা নেই।
কোনো সিরিয়াল নম্বর নেই।
কোনো নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের চিহ্ন নেই।
পুরো গায়ে অদ্ভুত কালো ধাতু।
যেটা মরিচা ধরেনি।
বরং আলো শুষে নিচ্ছে।
একজন বৃদ্ধ উদ্ধার কর্মকর্তা বললেন,
"এটা তিন মাস আগে জাভা ট্রেঞ্চের আট হাজার মিটার গভীর থেকে উদ্ধার করা হয়েছে।"
সঙ্গে সঙ্গে হলঘরে গুঞ্জন শুরু হলো।
"অসম্ভব!"
"ওই গভীরতায় তো আধুনিক সাবমেরিনও টিকতে পারে না!"
কর্মকর্তা মাথা নাড়লেন।
"আমরাও তাই ভেবেছিলাম।"
তিনি বিশাল সাবমেরিনের দিকে তাকালেন।
"কিন্তু এটা সেখানে ছিল।"
একটা হোলোগ্রাফিক স্ক্রিন জ্বলে উঠল।
অজানা ডিপ-সি অবজেক্ট
উৎপত্তি : অজানা
বয়স : অনুমান করা যায়নি
ইঞ্জিন : অজানা
শক্তির উৎস : অজানা
অস্ত্র : অজানা
চালু অবস্থা : সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয়
বাজার মূল্য : প্রায় শূন্য
সরকারি শ্রেণিবিন্যাস :
স্ক্র্যাপ।
লোকজন হাসতে শুরু করল।
"স্ক্র্যাপ?"
"এত বড় লোহার টুকরো কে কিনবে?"
কিন্তু আদনান হাসল না।
সে ধীরে ধীরে সাবমেরিনের গায়ের কাছে এগিয়ে গেল।
তার আঙুল ধাতুর ওপর ছুঁয়ে দিল।
অদ্ভুত।
এটা ঠান্ডা নয়।
গরমও নয়।
মনে হচ্ছে যেন...
জীবন্ত।
সে নিচু হয়ে হালের একটা ছোট্ট অংশ পরীক্ষা করল।
সেখানে একটা সূক্ষ্ম ফাটল।
ফাটলের ভেতর থেকে ক্ষীণ নীল আলো বেরিয়ে আবার নিভে গেল।
এক সেকেন্ড।
তারও কম।
কেউ খেয়াল করল না।
শুধু আদনান।
তার বুকের ভেতর ধক করে উঠল।
কোনো মৃত মেশিন এভাবে আলো দেয় না।
"শুরু মূল্য..."
নিলাম কর্মকর্তা ঘোষণা করলেন।
"...দশ ক্রেডিট।"
পুরো হলঘর হেসে উঠল।
কেউ হাত তুলল না।
একজন ব্যবসায়ী বলল,
"ওটা টেনে নিয়ে যেতে যত খরচ হবে, তার চেয়ে বেশি দাম পড়বে।"
আরেকজন বলল,
"কেটে বিক্রি করলেও লাভ নেই।"
এক মিনিট।
দুই মিনিট।
কেউ কিনল না।
কর্মকর্তা বিরক্ত হয়ে বললেন,
"কেউ কি নেবেন?"
আদনান হাত তুলল।
"আমি।"
সবাই ঘুরে তাকাল।
রায়হান অবাক হয়ে বলল,
"তুই পাগল নাকি?"
আদনান শান্তভাবে উত্তর দিল,
"হয়তো।"
নিলাম শেষ হতে এক মিনিটও লাগল না।
কারণ প্রতিযোগী ছিল না।
দশ ক্রেডিট দিয়ে পৃথিবীর সবচেয়ে অদ্ভুত সাবমেরিনের মালিক হয়ে গেল আদনান রহমান।
কাগজে সই করার সময় কর্মকর্তা হেসে বললেন,
"ছেলে, আশা করি তোর কাছে বড় ক্রেন আছে।"
আদনানও হাসল।
"আমি ক্রেন কিনিনি।"
"তাহলে?"
"আমি সমস্যা কিনেছি।"
সন্ধ্যা নেমে এসেছে।
স্ক্র্যাপ ডকের একেবারে শেষ প্রান্তে একা দাঁড়িয়ে আছে বিশাল কালো সাবমেরিন।
বাকি সবাই চলে গেছে।
আদনান হাতে টর্চ নিয়ে ধীরে ধীরে ভেতরে ঢুকল।
প্রথম দরজাটা অবাক করার মতো সহজেই খুলে গেল।
একটুও শব্দ হলো না।
ভেতরে সম্পূর্ণ অন্ধকার।
কোনো মরিচা নেই।
কোনো দুর্গন্ধ নেই।
মনে হচ্ছে যেন—
গতকালই এটি তৈরি হয়েছে।
টর্চের আলো দেয়ালে পড়তেই সে থেমে গেল।
পুরো দেয়ালজুড়ে অদ্ভুত প্রতীক।
কোনো ভাষা নয়।
কোনো পরিচিত লিপিও নয়।
জ্যামিতিক চিহ্ন।
বৃত্ত।
ত্রিভুজ।
অদ্ভুত সর্পিল রেখা।
যেন এগুলো লেখা নয়...
বরং কোনো সার্কিটের নকশা।
আদনান সাবধানে এগোতে লাগল।
তার জুতোর শব্দ ধাতব করিডোরে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।
হঠাৎ...
টক...
সে থেমে গেল।
পিছনে কেউ আছে?
সে ঘুরে তাকাল।
কেউ নেই।
আবার হাঁটতে শুরু করল।
টক... টক...
আবার সেই শব্দ।
এবার যেন তার পদশব্দের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আসছে।
সে টর্চ ঘুরিয়ে চারপাশ দেখল।
শূন্য।
পুরো সাবমেরিনে সে একাই আছে।
তাহলে?
হঠাৎ টর্চটা নিভে গেল।
চারদিকে অন্ধকার।
একেবারে নিখুঁত অন্ধকার।
আদনান বিরক্ত হয়ে টর্চে চাপ দিল।
কাজ করছে না।
"চমৎকার..."
সে বিড়বিড় করল।
ঠিক তখনই...
করিডোরের দুই পাশের দেয়ালে একটার পর একটা নীল রেখা জ্বলে উঠতে শুরু করল।
প্রথমে একটা।
তারপর দশটা।
তারপর শত শত।
মুহূর্তের মধ্যে পুরো করিডোর নীল আলোয় ভরে গেল।
আদনান স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
"এটা..."
সাবমেরিন তো বন্ধ ছিল!
তাহলে আলো জ্বলল কীভাবে?
একটা গভীর, ধাতব কম্পন পুরো কাঠামো কাঁপিয়ে দিল।
মনে হলো বহু শতাব্দী ধরে ঘুমিয়ে থাকা কোনো বিশাল যন্ত্র ধীরে ধীরে নিঃশ্বাস নিচ্ছে।
দেয়ালের অজানা প্রতীকগুলো একে একে আলোকিত হতে লাগল।
তারপর...
করিডোরের শেষ প্রান্তে গোলাকার একটি দরজা নিজে থেকেই খুলে গেল।
ভেতর থেকে ভেসে এল কোমল নীল আলো।
আর সেই আলোর সঙ্গে এমন এক কণ্ঠস্বর, যার ভাষা সে কখনো শোনেনি...
তবুও অদ্ভুতভাবে বুঝতে পারল।
"জৈব পরিচয় শনাক্ত..."
"প্রোটোকল পুনরায় সক্রিয়..."
"পাঁচ হাজার তিনশো বারো বছর পর..."
এক মুহূর্ত নীরবতা।
তারপর সেই কণ্ঠস্বর আবার বলল—
"স্বাগতম... ক্যাপ্টেন আদনান।"
আদনানের শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।
সে কখনো এই সাবমেরিনে আসেনি।
তাহলে...
এটি তার নাম জানল কীভাবে?
—চলবে…

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

