আমাদের চলনে বলনে ও বাংলা ভাষায় ইংরেজী শব্দের যে ব্যাবহার তাতে, আমার মতো ছোট মাথার মানুষের অস্বস্তি এবং আপত্তি দুইই হয়। এ নিয়ে আপত্তি প্রকাশের আগে আমরা বাংলা ভাষায় শব্দ ভান্ডারে উকি দিয়ে দেখবো, গোলাতে ঠিক ক'টা শব্দ আছে! কিন্তু তার ও আগে স্মরন করা দরকার, বাংলা ভাষা ঠিক সংস্কৃত হতে আসে নি। যদিও এ ভাষায় সংস্কৃত ভাষার প্রতাপ বেশি, তবুও এর জন্ম ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা গোষ্ঠীর গৌড়ীয় বা মাগধি প্রাকৃতের মধ্যেই। অতঃপর ক্রমে ক্রমে আধুনিক বাংলা ভাষার লাবন্য ফুটে উঠতে, চর্যাপদ পদ হতে নব্যযুগ পর্যন্ত আমাদের অপেক্ষা করতে হয়েছে।। সেই তো কত কত পন্ডিত, ভাষাবিদদের বহু বহু সাধনা এবং বায়ান্নর রক্ত দিয়ে এ ভাষা যৌবনে পা দিয়েছে। আর যৌবনে কি না সুন্দর হয়!
হাজার বছরের সাধনার ফল খুঁজতে গিয়ে আমরা টের পাই এক লক্ষ পঁচিশ হাজার শব্দ এ ভাষায় গান করে, কবিতা লেখে, কথা কয়, গল্প লেখে। বাংলাভাষায় লাখের ঘরে টেক্কা দেয়া শব্দ গুলোর দিকে তাকালে মনে হতেই পারে, এ ভাষা কতনা উদার পন্থি! এ ভাষায় পঞ্চাশ হাজার ততসম শব্দ আছে, আরবী আছে আড়াই হাজার, ইংরেজী আছে দেড় হাজার, তুর্কি শব্দ চারশ, পর্তুগিজ-ফরাসী আছে দেড় শ, বাদ বাকি সত্তর হাজার সাড়ে চারশ শব্দ খাটি বাংলা, তদ্ভব এবং অন্যান্য। এতো এতো শব্দের ভীড়ে নিশ্চই নতুন করে বিদেশ থেকে শব্দের আমদানির প্রয়োজন পড়ে না। কারন ভুলে যাওয়া শব্দ একদিন অভিধানও মনে রাখেনা।
এখন আমরা ভাষার কিছু বিবর্তন গত রুপের কথা স্মরন করবো। যেহেতু ভাষা যোগাযোগের সহজাত ব্যবস্থা, তাই আমরা ভাষার কিছু রুপ খুঁজে পেয়েছি যেমনঃ লিংগুয়া ফ্রাংকা, ক্রেওল, পিজিন ইত্যাদি। কিন্তু এখানে আমরা পিজিন ভাষা নিয়েই আলাপ করবো।
পিজিন (Pidgin) শব্দটি ইংরেজী Business শব্দের অপভ্রংশ থেকে উদ্ভব হলেও কোন দেশের ভাষা এ নয়। মুলত এখানে ক্রিয়ার সাধিত রুপের পরিবর্তে ক্রিয়াবাচক অব্যয় ব্যবহৃত হয়। পিজিন ভাষার পরিচয় অত্যন্ত সস্তা। এটাকে বলা হয় মিশ্র ভাষারীতির কৃত্রিম ভাষা। আবার ভাষা বিজ্ঞানী ইয়াসপারসেন একে ধরেই নিয়েছেন সাময়িক ব্যবস্থার ভাষা হিসেবে।
তখনকার ব্রিটিশ আমলে হগ মার্কেটের স্থানীয় ব্যাবসায়ীরা ব্রিটিশ খরিদ্দারদের সাথে এ ভাষায় কথা বলতেন। যেমনঃ "টেক তো টেক, নো টেক তো নো টেক, একবার তো সী" (নিতে হলে নিন, না নিলে নাই নিলেন, একবার তো দেখুন)। এই হলো পিজিন ভাষার ছিরি! আমাদের ভাষাবিজ্ঞানী সুকুমার সেন একে অপভাষার তকমা লাগিয়েছেন।
আমাদের পাশ্চাত্য আধুনিকতা যখন বাংলার ঘরে ঘরে, তখন টিভি দেখে শয়তান মহাশয় লজ্জায় জীভ কাটেন। সেখানে পরিবর্তনশীল ভাষা কে টিকিয়ে রাখে! হাজার বছর ধরে তিল তিল করে গড়ে ওঠা বাংলা ভাষার যখন কোন যায়গায় কমতি নেই, তখন কেনো দুইশ বছর পেছন ফিরে গিয়ে পিজিন ভাষায় কথা বলা, কবিতা লেখা,গল্প লেখা?
(২০১৫ সালের ভাবনা। এখনো প্রাসঙ্গিক মনে হয়। সেই সাথে ইচ্ছে করে আরও অনেক ভাবনা নিয়ে আলাপ করি।)
সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই মার্চ, ২০২০ রাত ২:৩৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


