
মানুষ প্রেমে পড়ে কদাচিৎ; সুন্দর সময়ে, সুন্দর মুহূর্তে, অনুকূল পরিবেশে। আর আমি প্রেমে পড়ি হাটে, মাঠে, ঘাটে, মেলা, ময়দানে, পার্কে, কফিশপে, রেস্তোরাই, শপিংমলে। আমার প্রেম শুরু হয় যেখানে, শেষও হয় সেখানেই, শুধু “রেশ” টা রয়ে যায় পরবর্তী কয়েক দিন। পেটে খাবার না থাকলে কেবল মাত্র প্রেম আমাকে আকূল করতে পারে, ব্যাকুল করতে পারে, ভাবাতে পারে, কাঁদাতে পারে। তাই তো রেশ থেকে যাওয়া প্রেমের কূলখানিটা প্রায়শ-ই আমাকে বেশ ঘটা করেই করতে হয়।
অনেকেই বলেন তিনি প্রেমে পড়েন না আর আমার ক্ষেত্রে হয় পুরাই উলটা “আমি আবার প্রেম ছাড়া থাকতে পারি না”। এবং তাদের জন্য আমার দুঃখ-ই হয়, যাদের জীবনে প্রেম আসে না।
১.
মিরপুর শ্যাওড়া পাড়াতে থাকি। বিভিন্ন কাজে শাহবাগ যেতে হয়। এই কাজটা আমার কাছে যুদ্ধ জয়ের মতো কঠিন। কারণ এখান থেকে না যেতে পারি রিকশাতে, না সিএনজি তে। রিকশা ঐ রুটে যেতে পারে না। আর সিএনজি চালকরা যাবেন না। অগত্যা আমাকে পাবলিক ট্রান্সপোর্ট নিতে হলো। টিকিট কেটে বিআরটিসি তে উঠলাম। আহ! ইটস মাই ডে। সিট পেলাম তাও বাম দিকে জানালার পাশে। পরের দুই ঘন্টা ছিলো কেবলই "আমাদের"।
এরপর কাজ সেরে ক্যাম্পাসে গিয়ে বান্ধবীকে কল দিলাম। বান্ধবী তুমি যেখানেই থাকো ১০ মিনিটের মধ্যে লাইব্রেরীর সামনে আসোঃ
- বান্ধবি, আই এ্যাম ইন লাভ
- কার?
- ভদ্রলোক এখন বারডেমে
- সারা শহরভর্তি সুস্থ লোক রেখে তুই শেষ পর্যন্ত এক রোগীর প্রেমে পড়লি!
- তিনি রোগী নন। রোগী সাথে করে এনেছেন। এই বয়সে কারো বহুমূত্র রোগ হয়না।
- তা কি করে প্রেম হলো?
- সরি, প্রেমটা এখনো হয় নাই। আমি কেবল মাত্র প্রেমে পড়েছি
- তা লাফিয়ে পড়েছিস না ঝাপিয়ে
- দেখে শুনে ধীরে সুস্থে পড়েছি
- কিভাবে হলো সরি পড়লি ঐ প্রেমে
- আমি বিআরটিসি করে শাহবাগ আসছিলাম। ফিল্ম আর্কাইভে কাজ ছিলো। বিজয়স্মরনী তে আমাদের প্রথম দেখা। ঠিক আমাদের নয় আমি তাকে দেখেছি। জ্যামে বসে ছিলাম। ভদ্রলোকও তার গাড়ীতে ছিলেন। প্রথমে ঘড়ি থেকে দেখা শুরু করলাম। আমি জীবনেও কাউকে এতো স্টাইলিশ ঘড়ি পড়তে দেখি নাই। তারপর লক্ষকরলাম নাহ, হাত সুন্দর বলেই না ঘড়িটা এতো ভালো মানিয়েছে। এরপর দেখি আরে সর্বনাশ এই লোক তো সুন্দর করে স্টিয়ারিং হাত রাখে। ঠিক যেমনটা আমি পছন্দ করি।
- হইছে এবার তুমি আবেগে গাড়ীর বর্নণা দিতে শুরু করবা। লোকটা দেখতে কেমন?
- লোক বলে তো! ভদ্রলোক। তা তো দেখি নাই
- নাও হইছে চল আজ আমেরিকান বার্গার খাইতে যাই
- তুই এই গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা কে মোটেও গুরুত্ব দিচ্ছিস না। আমি এখন বিজয়স্মরনী দিয়ে কিভাবে যাবো? ভদ্রলোককে মনে পড়বে বারবার!
- ঐ রাস্তা দিয়ে যাওন লাগবোনা। অন্য রাস্তা দিয়ে যাস। চল খাইতে যাই। পেটে খাবার গেলে পড়া প্রেম থেকে উঠে আসা যায়।
- খেয়ে আর কী হবে, খাওয়া-ই কী জীবনের সব?
- নাহ! প্রেমই জীবনের সব। তাই এখন কি বসুন্ধরায় না গিয়া বারডেমে যামু
- ইনি নিশ্চয় এতোক্ষনে বাসায় চলে গেছেন
- সো স্যাড, চল তাইলে বার্গার খাইতে যাওয়াই উত্তম।
- না রে আমার এখন বিরহকাল।
- সেজন্য-ই তো, খেতে খেতে না হয় বিরহের বাকি গল্পটা শুনবো।
২.
আমার দ্বিতীয় প্রেমে সাক্ষী ঐ রাস্তা, যে জানে প্রথম দেখাতেই আমি কতটা তার প্রেমে পড়েছিলাম। তাহলে শুনুন সেই কথাঃ
- তানিয়া আমি তো প্রেমে পড়েছি! আমার কি হবে?
- কি হবে মানে? প্রেম হবে!
- কিভাবে হবে?
- দুনিয়া শুদ্ধু লোকেদের যেভাবে হয়
- কিন্তু কার সাথে!
- কেন? যার প্রেমে পড়েছেন তার সাথে
- তাকে আমি কোথায় পাবো, খুইজা আইনা দাও
- মানে কি! খুঁজতে হবে কেন! কে তিনি?
ধানমন্ডি ১৫তে KFC’র উলটা দিকে দাঁড়িয়ে ছিলাম ট্রান্সপোর্ট এর জন্য। ট্রাফিক হাত উঁচু করে সিগন্যাল দিলো। সিগন্যালে দাঁড়ানো রিকশা থেকে এক ছেলে বেশ অনেকক্ষন আমার দিকে তাকিয়ে আছে। প্রথমে আমি কৌতুহল নিয়ে তাকালাম, কী বিষয়! আমি কি তাকে চিনি। না আমার পরিচিত কেউ নয়। তাহলে?? এবার বেশ আগ্রহ নিয়ে তাকালাম, না চিনি না। তবে………… বিশেষ লক্ষ্যনীয় বিষয় হচ্ছে, ছেলেটার চোখ হাসে। হাসি মুখ, ঠোঁটের হাসি অনেক দেখেছি। এই প্রথম কোনো ছেলের চোখের হাসি আমাকে মুগ্ধ করলো। আমি ভীষন ভাবে বিশ্বাস করি, “মানুষের চোখ কখনো মিথ্যে বলতে পারে না”।
তানিয়া বললো,
- আচ্ছা ভাইয়া কী পোশাক পরে ছিলেন?
- তাতো খেয়াল করি নাই। কেন?
- ধরেন, যদি ফরমাল পোশাকে থাকতো তাহলে এই পথ দিয়ে বাসায় ফিরছিলো। আর ক্যাজুয়াল পোশাকে থাকলে তার বাসা আশে পাশে কোথাও হবে। সেক্ষেত্রে খুঁজে দেখা যেতে পারে।
- আমার কিন্তু মন খারাপ লাগছে।
- সে ক্ষেত্রে কিছু খাওয়া দাওয়া করা দরকার। চলেন “কুক” এ যায়।
কুক এর পরিবেশ বেশ শান্ত। খাবার মো্টামুটি। তবে বসার জায়গাটা বেশ ভালো। আপদামস্তক কাঁচের ভিতর দিয়ে ধানমন্ডি লেক টা দেখতে পারবেন সাথে জাহাজ বাড়ী। টেবিলে রাখা আছে, মাটির ঘণ্টা। যেটা বাজিয়ে আপনি ওয়েটারদেরকে ডাকতে পারবেন। খাবার অর্ডার করে অপেক্ষা করতে লাগলাম। কিন্তু আমার মন তো উচাটন! তাই বসে বসে ঘন্টা টুন টুন করছিলাম। বার তিনেক ওয়েটার এসে ঘুরে গেলো। তখন তানিয়ার সেই ঐতিহাসিক আন্তরিকতা, “ভাই আপনার বার বার আসার দরকার নেই, আমরা একটু মিউজিক প্রাকটিস করছি”। এরপর আমার দিকে তাকিয়ে বললো, “তাই না?”। আমার সেই বিখ্যাত হাসি, হুমমমম।
৩.
খালিদ রহমান, তুমি যেখানেই থাকো এক্ষনি ধানমন্ডিতে আসো।
- কেন আপা! কিছু হয়েছে?
- হ্যাঁ খুব বিশেষ, আসতে কতক্ষণ লাগবে?
- ক্লাস থেকে পেছনের দরজা দিয়ে বের হতে যতক্ষণ লাগবে। তারপর-ই রিকশা করে উড়ে আসতেছি।
- আচ্ছা আসো।
ঘন্টা খানিক বাদে বেচারা হাঁপাতে হাঁপাতে আসলো। অফিস রুমে চেয়ার টেনে বসতে বসতে প্রশ্ন করলো, কী হয়েছে আপা? আমি খুব উৎকন্ঠিত ভাবে বললাম, “I am in Love”। অনতিবিলম্বে দ্বিতীয় প্রশ্ন, “With whom?”। বললাম, চিনি না। ধানমন্ডি ৮ নম্বর ব্রিজের ওখানে দেখে এসেছি। ওয়ার্ল্ড ফুড প্রোগ্রাম অফিসের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলো। খালিদ খুব কাতর ভাবে অনুনয় করলো, আপা ৩’৩০ বাজে। এরপরে গেলে বুমার্সে আর লাঞ্চ পাওয়া যাবে না। চলেন খেতে খেতে কথা বলি।
বিপদেরই বন্ধুর পরিচয় পাওয়া যাই। আমি আছি প্রেমের পেরেশানে আর বকু ব্যস্ত খাবার নিয়ে। কিন্তু এই মুহূর্তে তো ওর সাহায্যের ভীষণ প্রয়োজন। তাই বাধ্য মেয়ের মতো বুমার্সে গেলাম।
-এবার বকুর তৃ্তীয় প্রশ্ন, “আমাকে কী করতে হবে বলেন?”
- আমি বিরক্ত মুখে বললাম, কী করতে হবে মানে? গিয়ে বলবা, এই যে Mr. X Y Z, my APA is in love with you”।
- বকুর রেসপন্স সেই মাত্রার হতাশাজনক। “আমি গিয়ে বললে কী ভালো দেখাবে?”।
-আমার তো সেই মেজাজ চড়তাছে, “ভালো দেখাবে মানে? দুলাভাই তোমার, বলবে কি পাড়া প্রতিবেশী গিয়ে?।
-খালিদ রহমান ব্যাকফুটে, না তা না। অবশ্যই আমার বলা উচিত। কিন্তু আমার থেকে আপনি বললে বেশি গুছিয়ে বলতে পারতেন, এই আর কি!”
-শোনো ভাইয়া, কেউ কি নিজের ভালো লাগার কথা নিজ মুখে বলে? আমাদের সময় সেগুলো বন্ধু স্থানীয়রাই গিয়ে বলতো। তুমি আমার ভাই আর তু্মিই তো আমার সবথেকে ভালো বন্ধু, তাই না?
- একদম ঠিক কথা। বিল দিয়ে চলেন, Big Boss এ যাই। প্রস্তাব নিয়ে যাওয়ার জন্য আমার কিছু ভালো পোশাক কেনা দরকার। ক্রেডিট কার্ড আনছেন তো?
- একেই বলে এতো “জানাজার আগে কুলখানির আয়োজন”।
ধুম করে বাস্তবে ফিরে আসলাম। তাই তো আজকে তো ক্রেডিট কার্ডের বিল জমা দেয়ার লাস্ট দিন। অফিস খোলা আছে আর মাত্র এক ঘন্টা রীতিমত রকেটের গতিতে না ছুটলে জাস্ট ধরা! বললাম প্রেমের প্রস্তাব তো আজ পাঠাতে পারছি না রে। তুমি টিউশনি তে যাওগা। আজকে আমার অন্য কাজ আছে।
৪.
সপ্তাহে অন্তত একবার “নিউমার্কেট” না গেলে কেমন যেন সপ্তাহ টা ফাঁকা ফাঁকা লাগে। নিউমার্কেটে আমি মুলত মানুষ দেখতে যাই। বইয়ের দোকানে ঢু মেরে বই দেখি আর “ব্রেডম্যান” এ তেরিন বার্গার ধবংস করি। মাস খানিক আগে রুটিন মাফিক নিউমার্কেট ভিজিটে গেলাম। একাই ছিলাম। চন্দ্রিমা সুপার মার্কেটের সামনে রিকশা থেকে নেমে ফুট ওভার ব্রিজের নিচের গেইটটা দিয়ে ঢুকলাম। তারপর, রুটিনের বাত্যয় ঘটিয়ে দিলো একজন মানুষ।
এক কথায় কি বলা যায়, “ Love at first sight”। ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে ছিলেন। আমাদের চোখাচোখি হতেই তিনি হাঁটা শুরু করলেন। আমি তার ঠিক তিন/চার হাত পেছনে। আমিও হাঁটছি। তাকে দেখে প্রথম যে কথা টা আমার মনে হলো “Yes! I am in love”। সত্যি বলতে কি, আমি এর আগে কখনো কাউকে, এতো সুন্দর করে হাঁটতে দেখি নাই। মানুষ হাঁটলে এতো সুন্দর লাগে, এই মানুষ টাকে না দেখলে আমার জানাই হতো না।
হঠাৎ লোকটার সেলফোন বেজে উঠলো। তিনি ধীরে সুস্থে পকেট থেকে ফোন বের করে কথা বলা শুরু করলেন। কী অদ্ভুত সুন্দর ভঙ্গিতে কথা বলতে লাগলেন। বোধহয় অফিসের ফোন ছিলো। কাজের কথাই বলছিলেন।
এক পর্যায়ে আমি টের পেলাম, আমি গন্তব্য পেরিয়ে অনেকটা দূর চলে এসেছি। এবার না ফিরলেই নই। গিয়ে সোজা ব্রেডম্যানে বসলাম। বাবু ভাই কে রুটিন মেন্যু অডার করে, নেটে বসে গেলাম। এই সময়ে কাছের কারো কাছে এই অভিজ্ঞতা শেয়ার করা আর খাল কেটে কুমির আনা একই কথা। সেই তো বিল আমাকেই দিতে হবে। বোনাস হিসেবে আবোল-তাবোল বুঝ বোঝাবে। এখন থেকে নিজের সমস্যা নিজেকে সমাধান করা শিখতে হবে।
তাই এবার নিজেকে নিজেই বুঝ দিলাম, “একদিন 'আমাদের' ঠিকই দেখা হয়ে যাবে। অন্তত 'তাকে' তার প্রশংসা টুকু শোনানার জন্যে হলেও আমাদের দেখা হওয়াটা খুব জরুরী”
সর্বশেষ এডিট : ১৩ ই ডিসেম্বর, ২০২০ রাত ৮:৫১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




