
আঠারো থেকে পঁচিশ বছর বয়সের মধ্যে আটকে আছি। শিক্ষক হিসেবে দ্বিতীয় সেমেস্টারে নির্ধারিত কোর্স পড়ানোর মধ্য দিয়ে প্রতিটি ব্যাচের সাথে পরিচিতি শুরু, মাস্টার্সে গিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক সমাপ্তি। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে আমার শিক্ষকদেরকে দেখতাম তাড়াহুড়ো করে রুমের তালাখুলে এটেণ্ডেন্সের রেজিস্ট্রার খাতা নিয়ে ক্লাসে ঢুকতেন। ঠিক ৫০ মিনিট পার হলে খাতাটা অফিস রুমে রেখে চলে যেতেন। অথচ একজন শিক্ষকের দরজা তো শিক্ষার্থীদের জন্য সুনির্দিষ্ট কর্মঘন্টা খোলা থাকার কথা। শিক্ষকদের কিসের এত ব্যস্ততা?
ফারদিন ইফতেখার দিহান বৃহস্পতিবার (৭ জানুয়ারি) দুপুর আনুমানিক ১২টার দিকে বাদীর মেয়ে স্কুলছাত্রীকে প্রেমে প্রলুব্ধ করে মোবাইল ফোনে ডেকে নিয়ে যায়। এরপর ৬৩/৪, লেক সার্কাস ডলফিন গলি, পান্থপথ, কলাবাগানের ফাঁকা বাসায় মেয়েটির সাথে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করে। সে সময় প্রচুর রক্তক্ষরণে মেয়েটি অচেতন হয়ে পড়ে। দিহান মেয়েটিকে নিয়ে আনোয়ার খান মডার্ন মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে যায়। সেখানে মেয়েটির মৃত্যু হয়। ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসকরা নিহত কিশোরীর যৌনাঙ্গ ও পায়ুপথে আঘাতের চিহ্ন পেয়েছেন। তার শরীরের অন্য কোথাও কোনও আঘাতের চিহ্ন ছিল না। তদন্ত সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, নিহত কিশোরীর সঙ্গে ধর্ষণের অভিযোগে অভিযুক্ত দিহানের পূর্ব পরিচয় ছিল। নিহত কিশোরীর এক বান্ধবীর মাধ্যমে দিহানের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। এরপর তাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক তৈরি হয়। সেই সম্পর্কের সূত্র ধরেই বাসা ফাঁকা পেয়ে কিশোরী প্রেমিকাকে তার বাসায় নিয়ে যায়। সনদ অনুযায়ী দিহানের জন্ম তারিখ ২০০২ সালের ২৫ মে। ঘটনার সময় তার বয়স ছিল ১৮ বছর সাত মাস। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে।
ফারদিন ইফতেখার দিহান আমার শিক্ষার্থীর বয়েসি একজন। দিহান যে বিকৃত যৌন রুচির পরিচয় দিয়েছে সে দায় কী কেবল দিহানের একার? নাহ, শিক্ষক হিসেবে এই দায় খানিকটা আমার উপরও বর্তায়। ক্লাসরুম আসলে একটা প্ল্যাটফর্ম যেখানে একজন শিক্ষককে পারফর্মেন্স করতে হয়। ৮/১০টা চ্যাপ্টার পড়লেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না, আমার কাজ আরো বৃহত্তর শিক্ষার্থীদের দৃষ্টিভঙ্গির ইতিবাচক পরিবর্তন। নাজুক কিংবা দূর্বল শিক্ষার্থীর হাতটা শেষ পর্যন্ত শক্ত করে ধরে রাখাতে হবে। অন্তত সেই নীতিতে আমি বিশ্বাসী। শিক্ষার্থী ক্লাস রুমে অমনোযোগী হলে, ক্লাসে অনিয়মিত হলে কিংবা মানসিক অস্থিরতার ভিতর দিয়ে গেলে সেটা একজন শিক্ষকের চোখ এড়িয়ে যাওয়ার কথা নয়। দিহান’রা কি তাহলে পরিবারে কিংবা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অভিভাবক স্থানীয়দের পূর্ণ মনোযোগিতা পাচ্ছে না?
প্রায়শ শিক্ষার্থীদের ফেসবুক বায়োতে লেখা থাকে ‘I am, what I am’ কিংবা ‘My life, my rules’। বাচ্চারা কেন এতটা ঔদ্ধত্ত্যপূর্ন বাক্য লিখেন? ক্লাসে একদিন কথা ছলে জানতে চেয়েছি এই বাক্য দুটো আসলে কি বার্তা দেয়। প্রত্যেকজন একক আসলেই একক। তবে তার জানা প্রয়োজন আসলেই সে কে। জানা জরুরী ব্যক্তিজীবনে কোন নিয়ম-নীতি সে অনুসরন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। শিক্ষার্থীদেরকে বলি, জীবন হলো ……। শূন্যস্থান পূরণ করেন। বেশির ভাগই নেতিবাচক শব্দ বসায়। অর্থ সংকট আর ইগনোরেন্স সুনির্দিষ্ট এই বয়সটার উপর জেঁকে বসেছে। ১৮ থেকে ২৫ বছর বয়েসীদের কেবল Friend, Fun & Frustration নয়, তরুণরা বরং কথা বলুক Family, fair & Future নিয়ে। Plain Living- High Thinkingকে ছুঁড়ে ফেলে এখন বহুল চর্চিত কনসেপ্ট High living- Plain Thinking। আত্মীয় বন্ধুদের বাসায় দেখি অনেকেই ডাইনিং টেবিলে বসে একসাথে খাবার খায় না। নিজের রুমে কম্পিউটারের সামনে বসে খায়। Dining Table Manner তাহলে শিখছে কোথায়? পারিবারিক সহযোগিতা অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। সামাজিক শাসন কথাটা বইয়ের পাতা থেকেও মুছে যেতে বসেছে!
সময়ও জানিয়ে দিচ্ছে, সময় এখনো আছে সচেতন হওয়ার। এক দিহানের শাস্তি নিশ্চিত হলেই সমাজ শুধরে যাবে না। সন্তানকে সুস্থ স্বাভাবিক জীবন চেনানোর দায়িত্বটা সমাজের সবার। সুদিন আসবেই; আমি আশাবাদী মানুষ। শিক্ষকতা ছাড়া আমার কোনো ব্যস্ততা নেই, আমার কর্মঘন্টার পুরোটা সময় দরজা খোলা থাকে শিক্ষার্থীদের জন্য। যেকোন বিষয় নিয়ে নিঃসংকোচে আলাপ করতে আমি আগ্রহী। বেঁচে থাকলে এই আগ্রহ জারি থাকবে ২০৫০পর্যন্ত, ইনশা আল্লাহ।
সর্বশেষ এডিট : ২৬ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২১ দুপুর ১:৫৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


