বহুত বহুত দিন আগে মহাস্থানগড়ে ( তখন নাম ছিল পুন্ড্রনগর) আজীবকরা বাস করত। ঈশ্বর বিশ্বাসের দিক থেকে নাস্তিক। তবে যোগীদের মতই কঠোর সাধক। মোহকালী ঘোষাল এই আজীবক দর্শনের প্রবক্তা। এক কালে জৈন ধর্মগুরু মহাবীরের শিষ্য ছিলেন। তবে নিজেদের চিন্তা ভাবনার পার্থক্যের কারণে এক সময় তারা আলাদা হয়ে যান।
তারপর দিন যায় রাত যায়। গঙ্গার পানি সমুদ্রে গড়ায় । করতোয়া পাড়ের পুন্ড্র নগর দিনে দিনে সমৃদ্ধ হয়ে উঠে। আলেকজান্ডার ভারতে আসে। মার-পিট-সন্ধি করে চলেও যায়। তক্ষশিলার আচার্্য চাণক্য শিষ্য চন্দ্রগুপ্ত কে নিয়ে বিপ্লব করে অত্যাচারী নন্দদের গদি কেড়ে নেয়। পশ্চিম ভারতে গ্রীকদের পিটিয়ে পারস্যে চালান করে দেয়। একে একে ভারতের সব রাজ্য সেই চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের অধীনে আসে। একীভূত ভারতীয় রাষ্ট্রের সব বিদেশী বিতাড়িত হয়। শান্তি আর সুখ নেমে আসে।
রাজ্যের সবার খুব সুখ। ইচ্ছা মত ধর্ম পালন করা যায়। যার যা মত তা প্রকাশ করতে পারে। দিনে দিনে চন্দ্রগুপ্ত বুড়ো হল। একসময় রাজ্যপাট ছেলে বিন্দুসারের হাতে বুঝিয়ে দিয়ে সন্যাসী হয়ে গুহাবাসী হলেন।
বিন্দুসারও বাবার মতই সুযোগ্য সম্রাট। রাজ্যের নানা জ্ঞানী-গুনী আচার্য-ঋষি-দার্শনিক তার দরবারে আসেন। নিজ নিজ তত্ত্ব শোনান। একদিন এক আজীবক তাকে আজীবক দর্শনের কথা শোনালেন। সম্রাটের খুব মনে ধরল। প্রতিদিন আজীবকদের কথা শুনেন আর তারিফ করেন। একদিন নিজেই আজীবক হয়ে যান। (হ্যা জনাব সসাগরা সমগ্র ভারতবর্ষের দ্বিতীয় নবাব নাস্তিক ছিলেন)
তিনিও একসময় বৃদ্ধ হন। আর সেই সুযোগে ভাইদেরকে মেরে রাজা হন অশোক। (ঠিক আওরঙ্গজেবের মত) । রাজা হয়েও মন ভরেনা। যুদ্ধ তার রক্তে, রক্তের খেলা না দেখলে শান্ত হন কিভাবে? আক্রমণ করেন শান্তিপ্রিয় কলিঙ্গ রাষ্ট্রকে। দেশপ্রেমিক কলিঙ্গরা জীবনপণ যুদ্ধ করে। রক্তের বান ডেকে যায় যুদ্ধের প্রান্তরে। লক্ষ লক্ষ লাশের দামে যুদ্ধ জিতেন অশোক। রাতে যুদ্ধের প্রান্তরে বের হন সম্রাট । লাশের মিছিল দেখে বিচলিত হন, অনুতপ্ত হন। বার বার অনুশোচনা করেন। ঠিক করেন আর যুদ্ধ নয়। এবার পুরোপুরি শান্তির পথে হাঁটবেন। যুদ্ধ শিবিরেই তিনি বুদ্ধের বানী অহিংসার বানীকে আলিঙ্গন করেন। বৌদ্ধ ধর্মে দীক্ষিত হন।
রাজা রাজধানীতে ফিরেন। অহিংসার পথে চলেন আর শান্তির বানী প্রচার করেন । দিন যায় , রাত যায়। রাজার আর ভালো লাগে না। রাজার মাথায় একটাই চিন্তা ---কীভাবে আরো ক্ষমতা পাওয়া যায় ? কূটবুদ্ধি দেওয়ার লোকেরও অভাব হয় না ।শান্তির বানীকেই রাজনীতির অস্ত্র হিসেবে প্রয়োগ করেন। চিন্তা করেন----এই দেশে এত ধর্মের, এত লোকের বাস; এরা সবাইকে যদি আমার মতে, আমার চিন্তাধারায় ভাবাতে পারতাম তাহলে আমি কতই না ক্ষমতাধর হব। যা ভাবা তাই কাজ। রাজকোষ লোপাট করে দিকে দিকে বিহার খোলেন। লোকে অত রাজনীতি বোঝে না। লোকে বলে ভালোই ত। আমাদের যুদ্ধবাজ রাজা শান্তি যায়। বেশ বেশ। কিছুদিন পর সারা রাজ্যে জীবহত্যা নিষিদ্ধ করে। এবার লোকেরে টনক নড়ে। জেলের মাছ ধরা নিষেধ, ব্যধের শিকার করা নিষেধ এমনকি ব্রাক্ষনের পাঁঠা বলীও নিষেধ। লোকে বলে একি একি। রাজা এসব কি করে ? রাজা দেখে বিপদ আসন্ন। যোগ দেন বৌদ্ধ সংঘে। ততদিনে বৌদ্ধরাও সংখায় বেড়েছে। সেনাবাহিনীও রাজার অনুগত। রাজার শান্তি হয়। প্রজারা দুঃখ চেপে রাজার তালে তালে চলে।
রাজার মাথায় আবার চিন্তা করে----এভাবে তো সবাইকে বশ করা যাবে না। ধর্ম প্রচারে লোকে ধার্মিক হচ্ছে , আমার বশ হচ্ছে কই ? এবার তীর্থে তীর্থে স্তূপা বসান, স্তম্ভ গড়েন। তাতে যদি বুদ্ধের বানী থাকে একটা, অশোকের বানী থাকে দশটা।
আবার সেই পুন্ড্রনগরের গপ্পে আসি। আজীবকরা শিপ্লে, সাহিত্যে উন্নত। যা সত্য তা বলতে তারা দ্বিধা করে না। ঠোটকাটা এই আজীবকদের অশোক পছন্দ করেননা। তাছাড়া অশোকের বাবা ছিলেন আজীবক আর অশোক আজীবক নন ,বৌদ্ধ। অতএব আজীবকরাও তাকে খুব ভালো চোখে দেখে না। তো একদিন এক আজীবক ছোকড়া একটা ছবি একে বসল ------মহাবীরের পদপ্রান্তে শাক্যমুনি বুদ্ধ নিজেকে সমর্পণ করেছে। এই খবর পৌছালো আশোকের কানে। আর কে যায় কোথায়। রাজা বলল ধরে আন সেই ছোকড়াকে। কিন্তু আজীবকরাই বা একে কান তুলে দিবে রাজার হাতে ? নাহয় একটা ছবিই বা একেছে। এতে আবার শাস্তি কেন বাপু। বাকযুদ্ধের জবাব বাকযুদ্ধে দিবে--- এইতো ভারতবর্ষের নিয়ম।
মাথাগরম রাজা কী আর অতো কিছি বোঝে ? সৈন্য পাঠায় পুন্ড্রে। সেইখানেই আজীবকদের পায় সেখানেই খুন করে। করতোয়া নদীর জল রক্তে লাল হয়। ছেলে হারান মায়ের অশ্রুতে রক্তের সিন্ধু ধুয়ে যায়। ১৮,০০০ আজীবক হত্যা করে তবেই রাজার হাড় জুড়ায়।
সারা রাজ্যে ছি ছি রব পড়ে। হিন্দু, জৈন, নিগ্রন্থ মায় বৌদ্ধরা পর্যন্ত ধিক্কার দেয়। রাজার তাতে কী ? রাজ্যপাট চালিয়ে যায় নিজের মত করে।
এককালে রাজা মরে। একে একে দশরথ, সম্প্রতি, বৃহদ্রথ ক্ষমতায় বসে।প্রজাদের মধ্যে আর মৌর্যদের প্রতি দরদ নেই। মোর্যদের সেই সুদিনও আর নেই। অনেক অঞ্চল নিজেদের স্বাধীন দাবী করে। অনেক এলাকা মৌর্যদের হাতছাড়া হয়ে যায়। তায় আবার বৃহদ্রথ ছিলেন দূর্বল শাসক। যে মৌর্যরা এককালে আলেকজান্ডারের অজেয় বাহিনীকে পেদিয়ে ভারত থেকে বের করেছিলেন, সেই গ্রীকদের পত্তন করা গ্রামগুলো একজোট হয়ে আক্রমণ করে অর্ধেক মৌর্য সাম্রাজ্য দখল করে নিল। বৃহদ্রথ মোটেও যুদ্ধ করল না। শান্তির বানী আওড়াতে আওড়াতে সব চেয়ে চেয়ে দেখল। বৃহদ্রথের আর্য ব্রাহ্মণ সেনাপতি পৌষ্যমিত্রর এসব কিছুতেই ভালো লাগে না। বিশাল সেনাবাহিনী তার অধীনে। সম্রাটের ইঙ্গিত পেলেই গ্রীকদের ঝাড়ে-বংশে শেষ করে ফেলতে পারে। অথচ সম্রাটই কিনা অথর্বের মত নিশ্চুপ আছে। পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের রাজারা তাকে নানা ভাবে বুদ্ধি দেয়, সমর্থন দেয়। পৌষ্যমিত্র সব শুনে আর মাথা ঝাকায়।
সম্রাটকে সামরিক শক্তিমত্তা দেখাতে বিশাল মহড়ার আয়োজন করে। মহড়ার দিন সমস্ত সৈন্যবাহিনী, মন্ত্রীসভা ও প্রজাদের সামনেই বৃহদ্রথকে হত্যা করে ক্ষমতা দখল করে পৌষ্যামিত্র শুঙ্গ। ভারতের ইতিহাসে নতুন যুগের শুরু হয়। কৌটিল্যের (চাণক্য) নির্দেশনায় চন্দ্রগুপ্তের বিদ্রোহের মধ্য দিয়ে শুরু হয়া মৌর্য সাম্রাজ্যের পতন হয়। সামরিক অভুত্থানের মধ্য দিয়ে শুরু হয় নতুন সম্রাট, নতুন রাজবংশ শুঙ্গদের রাজ্যপাট।
বিঃদ্রঃ--
১/ অশোকের বহু জনহিতৈষী কর্মকান্ড আছে। একটি ঘটনা দিয়ে তাকে বিচার করা যায় না। করা উচিতও না । এখানে তার চিন্তা-ভাবনাকে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণের চেষ্টা করা হয়েছে মাত্র।
২/ প্রায় সকল তথ্যই উইকিপিডিয়া থেকে নেওয়া।
৩/ আজীবক ধর্মগুরুর নাম Makkhali Gosala । মহাকালী ঘোষাল তার নামের বাঙ্গালীকরন বলা যেতে পারে।
৪/ প্রচুর টাইপোতে ভরপুর। এগুলো ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন আশাকরি।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


