আমি 'স্কুল-কোচিং-বাসা' বাঁধাধরা রুটের রেগুলার যাত্রী, আমি অল্প সর্দিতেই কাতর হয়ে পড়ি, আমার জ্বর হলে মা-বাবার কপালে ভাঁজ পড়ে, টেবিলে জমে অ্যান্টিবায়োটিক আর পথ্যের পাহাড়, আমি সেই লোক যে বছরে একদিন ঘুড়ি উড়াতে পেরে ভাবি আমি কি হনু রে...
তবে আমার শৈশব একেবারে খারাপ কেটেছে বলবো না। সেখানে মাঠের সবুজ ঘাস ছিল, কাল মেঘের ভাঁজে আচমকা বাজ পড়ার আওয়াজ ছিল, মাঠে ক্রিকেট বা ফুটব
ল খেলে সন্ধ্যার আঁধারে পা টিপে টিপে বাবা-মা'র চোখ এড়িয়ে ঘরে ফেরা ছিল, নির্জন দুপুরে সাইকেলে থেকে পড়ে গিয়ে ছিলে যাওয়া হাত ধোয়ার টলমলে পুকুরের জল ছিল। আকাশ ছিল,বৃষ্টি ছিল, ছিল ফড়িং-প্রজাপতিদের পিছনে দৌড়ে বেড়ানো। মন্দ কী?
এখানে অবশ্য আমার শৈশব নিয়ে রচনা লিখতে আসি নি। আজকের শিশুরা, বা আগামীর সম্ভাবনা নিয়ে কিছু কথা বলব। আজকালকার ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা অনেক বেশি ঘরকুনো হয়ে গেছে। তারা ফুটবল খেলে হাতের আঙ্গুল খুইয়ে ফেলে। ওদের-ই বা দোষ দিয়ে লাভ কি? পুরো বিশ্ব যখন হাতের মুঠোয়, তখন কে-ই বা আর পায়ের ব্যবহার করে?
সকালে ঘুম ঘুম চোখে কাঁধে ১০ কেজি বস্তা নিয়ে স্কুলে যাওয়া-সেখান থেকে স্যারের বাসা-বাসায় ফিরে হোমওয়ার্ক আর 'ভাইয়া'র জ্বালাতন... সময় কোথায়? সময় বাদ দেই। খেলবেটা কোথায়? সবুজ ঘাস তো এখন ফিফা ছাড়া দেখাই যায় না ঢাকা শহরে। ওরা মুক্তভাবে শ্বাস নিতেও ভুলে গেছে। এসির 'শুদ্ধ বায়ু'ই ওদের বুক ভরে শ্বাস নিতে শেখায়।
আর সব কিছু বাদ দিয়ে এখানে টিভি প্রোগ্রাম নিয়ে কিছু কথা বলি।
ক্যাবল লাইন আছে,অথচ স্টার প্লাস-স্টার জলসা-জী বাংলা দেখেন না, এমন পরিবার হাতে গোনা। এসব গাঁজাখুরী দেখে পোলামাইয়া 'গুটি করা' ছাড়া আর কিছু শেখে বলে মনে হয় না। সারাক্ষণ সাংসারিক প্যাঁচঘোঁচ দেখে দেখে ওদের নির্মল মনটাও হয়ে যায় জিলিপীর মত। কাউকে সহজে বিশ্বাস করতে পারে না।
এবার আসি দেশী প্রোগ্রামে। সিসিমপুর এর পরেই ডিরেক্ট প্রেমনগর স্টেশনে ট্রেন থামে। মাঝখানের কিশোর কিশোরীদের জন্যে খুব কম প্রোগ্রাম-ই আছে। তাই লাল পরী-ফুল পরীদের কল্পনার জগৎ ফুরোতে না ফুরোতেই ওরা জানে বয়ফ্রেন্ড/গার্লফ্রেন্ড না থাকলে আজকের দুনিয়ায় স্মার্ট হওয়া যায় না। ঈদের প্রোগ্রামেও দেখা যায় তাই ফালতু প্রেমের কাহিনী নিয়ে লোকজনের এত মাতামাতি। ফলাফল দেশ গড়া চুলোয় তুলে পোলারা মেট্রোসেক্সুয়াল হয়, আর মেয়েরা ছোটে জিরো ফিগার আর রঙঢঙে কেশসজ্জার দিকে।
হাই সোসাইটিতে তো আজকাল পরকীয়া একটা ফ্যাশন। এককালে যা ছিল মধ্যবয়সী পুরুষের ভীমরতি, আজ সেটাই সকলের মতি। আর উঠতি বয়সের ছেলেমেয়েরা মনে করে 'আমেরিকান পাই' বেদবাক্য-''লুজ ইউর ভার্জিনিটি বিফোর কলেজ''!
এত পোংটাচ্ছি কেন? বলছি। আমি খুবই পুরনো ধ্যান ধারণার মানুষ। তাই এসব দেখে কষ্ট লাগে কখন জানেন? যখন দেখি আমাদের প্রজন্মটা বেপথে যাচ্ছে। উঁচু উঁচু ইমারত আমরা গড়ছি ঠিক-ই। কিন্তু আমাদের মূল্যবোধটুকু যে তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে,সেটা বুঝছি না। তাই পাড়ায় পাড়ায় আগে যেখানে পাঠাগার গড়ে উঠত,সেখানে এখন পাড়ায় পাড়ায় ছাতার মত ক্লিনিক খুলে অ্যাবোরশন ব্যবসা জাঁকিয়ে বসলেও কারো কিচ্ছুটি বলবার নেই।
দেশকে স্বাধীন করেছে যে প্রজন্ম, তারা বিগতপ্রায়। এবার এই স্বাধীনতাকে টিকিয়ে রাখাটা আমাদের দায়িত্ব আর কিশোর সমাজ-যুব সমাজ এমন মন-কামের বাঁধনে জড়িয়ে গেলে দেশের কী হবে? দেশ গড়ার জন্য নারী-পুরুষ উভয়ের শক্ত হাত দরকার। সে হাতে রিস্ট ব্যান্ড থাক ক্ষতি নেই,মানসিক দাসত্বের হাতকড়া যেন না থাকে।
((( লিখেছেনঃ- অনুরাজ বিশ্বাস অভিক )))

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


