somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

নূর মোহাম্মদ নূরু
নূর মোহাম্মদ নূরু (পেশাঃ সংবাদ কর্মী), জন্ম ২৯ সেপ্টেম্বর প্রাচ্যের ভেনিস খ্যাত বরিশালের উজিরপুর উপজেলাধীন সাপলা ফুলের স্বর্গ সাতলা গ্রামে

বিশ শতকের বাংলা ভাষার ইস্পাত হৃদয়ের কবি হুমায়ুন কবিরের ৪৬তম মৃত্যুবার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি

০৬ ই জুন, ২০১৮ বিকাল ৪:২৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


বাংলা ভাষার প্রগতিশীল কবি হুমায়ুন কবির। হুমায়ুন কবির ছিলেন বিশ শতকের ষাটের দশকে আভির্ভূত মেধাবী ছাত্র, অসামান্য প্রতিভাবান কবি,‘বাংলাদেশ লেখক শিবিরের’ অন্যতম আহ্বায়ক এবং বাংলা সাহিত্যের শক্তিমান শিল্পী ও রাজনিতিবীদ। স্বাধীনতা-পূর্ববর্তী বোহেমিয়ান সাহিত্যিকদের সম্মিলিত প্রয়াসের মধ্য দিয়ে বাংলা কবিতায় সচেতন ভাবে যে বাঁক বদলের চর্চা শুরু হয়েছিল, হুমায়ুন কবির সেই ধারার অগ্রপথিক। সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি রাজনৈতিকভাবে সমমনাদের নিয়ে স্বাধীনতার আগে গঠন করেছিলেন ‘লেখক সংগ্রাম শিবির’ যা পরে হয় ‘বাংলাদেশ লেখক শিবির’। ১৯৬৩ সালে ব্রজমোহন কলেজ থেকে সালে ম্যাট্রিক এবং একই কলেজ থেকে ১৯৬৫ সালে আই. এ. পাস করেন। ১৯৬৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় অনার্স এবং ১৯৬৯ সালে একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় এম. এ. পাস করেন। ১৯৭০-এ বাংলা অ্যাকাডেমি গবেষণা বৃত্তিলাভ করেন। বাংলা অ্যাকাডেমিতে তাঁর গবেষণার বিষয় ছিল ‘সাম্প্রতিক জীবন চৈতন্য ও জীবনানন্দ দাশের কবিতা’। পত্রপত্রিকায় তাঁর অসংখ্য প্রবন্ধ ছড়িয়ে আছে। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থ হচ্ছে ‘কুসুমিত ইস্পাত’ (১৯৭২) কবিতাগ্রন্থ এবং ১৯৮৫ সালে বাংলা অ্যাকাডেমি প্রকাশিত ‘হুমায়ুন কবির রচনাবলি’। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি বামপন্থী রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের এই শিক্ষক ১৯৭২ সালের আজকের দিনে ঢাকার ইন্দিরা রোডের বাসায় পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টির অন্তর্দ্বন্দ্বে নিহত হন। আজকাল হুমায়ুন কবিরকে নিয়ে খুব বেশি আলোচনা হয় না। আজ তার ৪৬তম মৃত্যুবার্ষিকী। মৃত্যুদিনে কবিকে স্মরণ করছি গভীর শ্রদ্ধায়।

কবি হুমায়ন কবির ১৯৪৮ সালের ২৫ডিসেম্বর বরিশালে জন্মগ্রহণ করেন। বেড়েউঠেছেন বরিশাল জেলায়। তার পিতার নাম কবিরুদ্দিন আহমদ। শিক্ষাজীবনে ব্রজমোহন কলেজ থেকে ১৯৬৩ সালে ম্যাট্রিক, ১৯৬৫ সালে একই কলেজ থেকে আই. এ. পাস করেন। ১৯৬৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় অনার্স এবং ১৯৬৯ সালে একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় এম. এ. পাস করেন। ১৯৭০-এ বাংলা অ্যাকাডেমি গবেষণা বৃত্তিলাভ করেন এবং ১৯৭২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের অব্যবহিত পূর্ব-মুহূর্তে বাংলার আবাল-বৃদ্ধ-বনিতার পাশাপাশি বাংলার প্রগতিশীল লেখক-সমাজও কলম ছেড়ে সরাসরি রাস্তায় নেমে আসেন। এই সংগ্রামী তরুণ লেখক গোষ্ঠির উদ্যোগে এ সময়ে সংগঠিত হয় ‘লেখক সংগ্রাম শিবির’। বাংলাদেশের ভৌগোলিক স্বাধীনতা অর্জিত হওয়ার পরপরই এই তরুণ লেখক গোষ্ঠির উদ্যোগে গঠিত হয় ‘বাংলাদেশ লেখক শিবির’ । শুরুতেই একটি ‘আন্দোলন’ হিসেবে লেখক শিবিরের আত্মপ্রকাশ ঘটে। এ পর্যায়ে হুমায়ুন কবির ও কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা ‘বাংলাদেশ লেখক শিবির’ এর আহ্বায়কের দায়িত্ব পালন করেন। বাংলাদেশ লেখক শিবিরের তৎকালীন তরুণ কর্মীদের মধ্যে সর্বজনাব আহম্মদ ছফা, ফরহাদ মাজহার, রফিক কায়সার, মুনতাসীর মামুন, হেলাল হাফিজ, রফিক নওশাদ প্রমুখের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ‘বাংলাদেশ লেখক শিবিরের’ অন্যতম আহ্বায়ক থাকাকালেই ১৯৭২ সালের ৬ই জুন অজ্ঞাত আততায়ীর গুলিতে হুমায়ুন কবির নিহত হন। এ সময়ে তিনি ইন্দিরা রোডে একটি ভাড়া বাসায় বাস করতেন। তাঁকে তৎকালীন পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটি সেলিম শাহনেওয়াজ ফজলু ও সুলতান চক্রের সক্রিয়, ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও বিশ্বাসঘাতক হিসেবে চিহ্নিত করে। তাকে হত্যায় অংশগ্রহণকারী গেরিলাদের পরবর্তীকালে অভিনন্দন জানিয়েছে কেন্দ্রীয় কমিটি। হুমায়ুন কবিরের বোনকে বিয়ে করেছিলেন সেলিম শাহনেওয়াজ ফজলু। এই আত্মীয়তার সম্পর্ক ছাড়াও হুমায়ুন কবিরের ব্যাপারে পার্টিতে অভিযোগ ওঠে তাঁর ভাই ফিরোজ কবিরের বহিষ্কারকে মেনে না নেয়া। ফিরোজ কবিরকে ইতিপূর্বে একজন "কমরেড" হত্যার অভিযোগে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। হুমায়ুন কবির হত্যার কারণ হিসেবে পার্টির বক্তব্যে বলা হয়, 'সাহিত্যিক হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করার পুরোপুরি বুর্জোয়া দৃষ্টিকোণ সম্পন্ন হওয়ায় স্বভাবতই হুমায়ুন কবিরের মধ্যে ব্যক্তি স্বার্থের প্রাধান্য ছিলো'। হুমায়ুন কবিরের হতযাজ্ঞ পরবর্তীতে পার্টি 'খতম করাটা ভুল হয়েছে' বলে মূল্যায়ন করে।

হুমাযুন কবিরের মৃত্যুর পর তার একমাত্র কাব্য ‌`কুসুমিত ইস্পাত` গ্রন্থটি প্রকাশ হয়েছিল। সমকালীন অন্য শক্তিমান কবিদের মতো নিজের করে বলার ভাষা তৈরি করে নিতে চেয়েছেন হুমায়ুন কবির। এজন্য নিজেকে প্রস্তুত করেছিলেন, আত্মকেন্দ্রিকতার সঙ্গে সঙ্গে নিজের অভিজ্ঞতাকে মিলিয়ে দিয়ে নির্মাণ করতে চেয়েছিলেন আলাদা পথ। সেই পথেরই সন্ধান পাওয়া যায় ‘কুসুমিত ইস্পাতে’। যাতে লিখেছিলেন `বাগানে যাই, বাগানে বড় সুখ, সেখানে পাতা বুকের মত বড়।`
কবি হুমায়ুন কবির খুন হবার পর তাঁর কমরেড ফরহাদ মজহার কবিতায় লিখেছিলেন, ‍"আমি তোকে ডেকে বলতে পারতুম হুমায়ূন অতো দ্রুত নয়, আরো আস্তে যা।" অর্থাৎ তার এই বদলে যাওয়াটা মজহারের পছন্দ হয় নি। হুমায়ূন কবির হত্যার পর মামলা হলেও বিচার এগোয় নি। বাংলা একাডেমি প্রকাশিত ‘হুমায়ুন কবির রচনাবলী’তে ‘রক্তের ঋণ’ নামে কবি হুমায়ুন কবিরের আরেকটি কাব্যগ্রন্থ সংকলিত হয়েছে। এই পাণ্ডুলিপিটি হুমায়ুন নিজ হাতে তৈরী করে যান নি। তাঁর মৃত্যুর পর ঢাকার একটি বিখ্যাত প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের অনুরোধে জনাব আলী মনোয়ার, মিসেস সুলতানা রেবু ও কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা এ গ্রন্থের পাণ্ডুলিপি তৈরি করেন। এই পাণ্ডুলিপিতে হুমায়ুনের গণ-জাগরণ-মূলক কবিতাগুলোর প্রাধান্য রয়েছে। ‘রক্তের ঋণে’র বাইরে প্রাপ্ত হুমায়ুনের অন্যান্য কবিতাবলী ‘অগ্রন্থিত কবিতা’ শিরোনামে উক্ত রচনাবলীতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। কবিতা ছাড়াও হুমায়ুন কবির কিছু প্রবন্ধ ও কিছু গল্পও লিখেছেন। জীবনানন্দ সম্পর্কিত প্রবন্ধাবলী ছাড়াও সাহিত্য, ও সমাজ, বিশেষতঃ ভাষা আন্দোলন সম্পর্কে হুমায়ুন কবির বেশ কিছু তীক্ষ্ণধী প্রবন্ধ লিখেছেন। ‘কণ্ঠস্বর’ পত্রিকাকে কেন্দ্র করে ষাটের দশকে যে কৃত্রিম গদ্যচর্চার আবহ সৃষ্টি হয়েছিলেণা, হুমায়ুনের বাক্যবিন্যাস সেই আবহেরই অনুবর্তী বলে অনুমিত হয়। হুমায়ুন কবির গল্প লিখেছেন অনেকটা খেয়ালের বশে। সত্তুরের দশকের শুরুতে রফিক নওশাদ সম্পাদিত গল্পপত্রিকা ‘সূচীপত্র’-ই ছিল তাঁর গল্পরচনার প্রধান প্রেরণা। তাঁর গল্পগুলোও কাব্যগন্ধী, সংক্ষিপ্ত ও প্রতীকী। হুমায়ুন কবির মাটি-মানুষের সঙ্গে একাত্ম হয়ে কবিতায় আপন অভিব্যক্তি তুলে এনেছেন। এছাড়া তার কবিতায় ভর করে আছে স্থিত জীবনদর্শন। রোমান্টিকতায় আচ্ছন্ন হুমায়ুন কবিরের কবি মন প্রেমচেতনাকে নিরাসক্ত দৃষ্টিতে দেখেনি। সমাজ আর মানবতার বিপর্যয়ের মাঝেও হুমায়ুন কবির আলোর রেখা দেখতে পেয়েছেন। আর এই বিশ্বাস উপমা, উৎপ্রেক্ষায় শব্দে-গন্ধে মেখে ফুটিয়ে তুলেছেন কবিতায়।

পারিবারিকজীবনে জনাব হুমায়ুনের স্ত্রী ছিলেন তাঁরই সহপাঠিনী সুলতানা রেবু। মৃত্যুকালে হুমায়ুন কবির এক পুত্র (আদিত্য কবির, ডাক নাম ‘সেতু’) ও এক কন্যার (অদিতি কবির, ডাক নাম ‘খেয়া’) জনক ছিলেন। মৃত্যুর কিছুদিন পর জন্মগ্রহণ করে তাঁর দ্বিতীয় পুত্র অনিন্দ্য কবির, ডাক নাম ‘অভীক’। আজ ইস্পাত হৃদয়ের কবি হুমায়ুন কবিরের ৪৬তম মৃত্যুবার্ষিকী। মৃত্যুদিনে কবির প্রতি আমাদের গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি।

নূর মোহাম্মদ নূরু
গণমাধ্যমকর্মী
ফেসবুক লিংক
সর্বশেষ এডিট : ০৬ ই জুন, ২০১৮ বিকাল ৪:২৩
৬টি মন্তব্য ৬টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

রিয়েলিটি আপনারা মাইনে নেন

লিখেছেন ধূসর সন্ধ্যা, ২৫ শে জুলাই, ২০২৬ রাত ১০:৩০



নরেন্দ্র মোদীকে আপনি যতই অপছন্দ করেন না কেন, তার একটা একটা প্রশংসনীয় গুণ আছে। সে বিশেষজ্ঞদের উপদেশ নিতে এবং সেই অনুযায়ী নিজের অপছন্দের কাজটা করতেও পিছপা হয় না।
সে... ...বাকিটুকু পড়ুন

এভাবেই নাকি এখন চলে!

লিখেছেন রাজীব নুর, ২৬ শে জুলাই, ২০২৬ দুপুর ১:০৯



চাবি সহযোগে তালা খোলা অতিশয় সহজ
কিন্তু আজকাল প্রায়শই গুলিয়ে ফেলি তালগোল!
এটা নিয়ে নিত্য বাহাসে ভেঙে যায় পাখিদের পার্লামেন্ট!
অতঃপর গোপনে সেরে ফেলি সহজ বোঝাপড়া!

প্রতিদিন যে পথে আসি... ...বাকিটুকু পড়ুন

Dr. Jahangir kabir স্যারের কোন পরামর্শ বা উপদেশ নতুন কিছু না।

লিখেছেন লিংকন বাবু০০৭, ২৬ শে জুলাই, ২০২৬ দুপুর ১:২৬

Dr. Jahangir kabir স্যারের কোন পরামর্শ বা উপদেশ নতুন কিছু না। আর এগুলো কোন কিছুই তার বানানো না। একেকটির বয়স শত বছর থেকে কিছুর ইতিহাস হাজার বছরের ও।
যদিও সে... ...বাকিটুকু পড়ুন

নদীর টানে, সবুজের গানে

লিখেছেন মাকার মাহিতা, ২৬ শে জুলাই, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৩৫

বয়ে চলে নদী দূর হতে দূরে,
অনন্তকালের শান্ত এক সুরে।
তার দুই কূলে রূপের মেলা,
সবুজ প্রকৃতির মিষ্টি খেলা।
হাওয়ায় দোলে ঘাস আর বন,
আকাশের সাথে মেলায় মন।
নদীর জলে আলোর ঝিলিক,
বাতাসে মেশে পাখির কিচিরমিচির।
গাছের ছায়ায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

"এ ট্রাজেডি অর ট্রাজেক্টরি অফ লাভ" (পর্ব-৩)

লিখেছেন তাহমিদ রহমান, ২৬ শে জুলাই, ২০২৬ রাত ১০:০৩

৩. নিষিদ্ধ স্বর্গ


পরদিন দুপুরবেলা। ইলির আকাশ আজ কিছুটা পরিষ্কার, মেঘের ফাঁক দিয়ে ফ্যাকাশে রোদ উঁকি দিচ্ছে।
ক্লারা তার ট্রাভেল এজেন্সির অফিসের ডেস্কে বসে কফি খাচ্ছিল। গতকাল ব্যাংকের সেই তরুণ এশীয় অফিসারটির... ...বাকিটুকু পড়ুন

×