
আজ সপ্তদশ আন্তর্জাতিক দুর্নীতিবিরোধী দিবস। দুর্নীতি একটি গুরুতর অপরাধ। এর ফলে সর্বত্রই সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকে। কোন দেশ, অঞ্চল বা সম্প্রদায়ই এর অভিশাপ থেকে মুক্ত নয়। ২০০৩ সালে জাতিসংঘ ৯ ডিসেম্বরকে আন্তর্জাতিক দুর্নীতিবিরোধী দিবস হিসেবে ঘোষণা করেছে। এরপর থেকেই এর বিভিন্ন সংস্থা যৌথভাবে বিশ্বব্যাপী প্রচারণা গড়ে তুলেছে, কীভাবে দুর্নীতি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ন্যায়বিচার, গণতন্ত্র, সমৃদ্ধি এবং উন্নয়নকে প্রভাবিত করে। দুর্নীতি শুধু বাংলাদেশের একক কোনো সমস্যা নয়, এটি বৈশ্বিক সমস্যা। পাশাপাশি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে দুর্নীতিকে অন্যতম চ্যালেঞ্জ।তাই জাতিসংঘ আন্তর্জাতিক দুর্নীতিবিরোধী কনভেনশন গ্রহণ করেছে। জাতিসংঘ ২০০৩ সালে ৯ ডিসেম্বরকে আন্তর্জাতিক দুর্নীতিবিরোধী দিবস ঘোষণা করে। সে হিসেবে এবার ১৭তম আন্তর্জাতিক দুর্নীতিবিরোধী দিবস পালিত হবে। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী বিশ্বব্যাপী প্রতিবছর প্রায় ১ লাখ কোটি মার্কিন ডলার সমপরিমাণের ঘুষ আদান-প্রদান হয়ে থাকে। অন্যদিকে দুর্নীতির মাধ্যমে ২ লাখ ৬০ হাজার কোটি মার্কিন ডলার চুরি করা হয় সারা বিশ্বে। এই দুইয়ের যোগফল বৈশ্বিক জিডিপির প্রায় ৫ শতাংশেরও বেশি।জাতিসংঘের উন্নয়ন কর্মসূচির হিসেবে দুর্নীতির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত তহবিলের পরিমাণ সরকারি উন্নয়ন সহায়তার ১০ গুণ। দুর্নীতির কালো হাত থেকে মুক্তি পেতে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে পালন করা হয় এ দিবস। প্রতি বছরের মতো এবারও জাতিসংঘ ঘোষিত এই দিবসটি পালনের জন্য দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। "দুর্নীতির বিরুদ্ধে একসাথে" স্লোগান নিয়ে পালিত হবে এ দিবস। দুদক ২০০৭ সালে দিবসটি পালন শুরু করে। সে হিসেবে আজ সপ্তদশ আন্তর্জাতিক দুর্নীতিবি রোধী দিবস। দুদক জানায়, ৯ ডিসেম্বরকে আন্তর্জাতিক দুর্নীতিবিরোধী দিবস পালনের অনুরোধ জানিয়ে ২০১৬ সালের ২৭ ডিসেম্বর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগকে চিঠি দেয় সংস্থাটি। পরে সরকার সে বছরে ৯ ডিসেম্বরকে আন্তর্জাতিক দুর্নীতিবিরোধী দিবস ঘোষণা করে। পাশাপাশি এই দিনটিকে দুর্নীতিবিরোধী দিবস হিসেবে পালনের লক্ষ্যে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক দিবস পালন সংক্রান্ত পরিপত্রের ‘খ’ শ্রেণিভুক্ত দিবস হিসেবে অন্তর্ভুক্তকরণের সিদ্ধান্ত নেয়। জাতিসংঘের দুর্নীতিবিরোধী সনদ (আনকাক) অনুযায়ী জাতিসংঘ প্রতিবছরের মতো এবারও ৯ ডিসেম্বর দিবসটি পালনের জন্য সদস্য দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। দুদক, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশসহ (টিআইবি) বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন নানা আয়োজনে দিনটি পালন করবে। আন্তর্জাতিক দুর্নীতিবিরোধী দিবস-২০১৯ (৯ ডিসেম্বর) উপলক্ষে রোববার মিট দ্য প্রেস অনুষ্ঠানে এ কথা বলেন দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ। চলমান দুর্নীতিবিরোধী অভিযান আরও জোরদার হবে বলে এ সময় উল্লেখ করেন তিনি। রাজধানীর সেগুনবাগিচায় দুদকের প্রধান কার্যালয়ে রিপোর্টার্স অ্যাগেইনস্ট করাপশনের (র্যাক) ওই অনুষ্ঠানে কমিশনের দুর্নীতি দমন ও প্রতিরোধ বিষয়ে বক্তব্য দেন ইকবাল মাহমুদ। তিনি বলেন, চলমান দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তালিকায় অনেক রুই-কাতলার নামও রয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির সুস্পষ্ট তথ্য পাওয়া গেছে। তালিকায় ১৮৯ জনের নাম রয়েছে। দুদকের জাল ছিঁড়ে কেউ বের হতে পারবে না। যারা দুর্নীতি করবে, তাদের দুদকের বারান্দায় আসতেই হবে।

‘আন্তর্জাতিক দুর্নীতিবিরোধী দিবস-২০১৯’ উপলক্ষে কর্মসূচি হাতে নিয়েছে দুদক।দুদক সূত্র জানায়, যানজট ও জনহয়রানির বিষয়টি মাথায় রেখে এবারও আন্তর্জাতিক দুর্নীতিবিরোধী দিবসটি পালন উপলক্ষে ব্যস্ত সড়কে কোনো র্যালি করা হবে না। দুর্নীতিবিরোধী গণস্বাক্ষর সংগ্রহ, মানববন্ধন, সততা সংঘের সমাবেশ, তথ্যচিত্র প্রদর্শনসহ অন্যান্য কর্মসূচি পালন করা হবে। পথচারীদের মনোযোগ আকর্ষণের মাধ্যমে দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই জোরদারের লক্ষ্যে বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংকের উদ্যোগে কয়েকটি বিলবোর্ড স্থাপন করা হয়। দুর্নীতি প্রতিরোধ সপ্তাহ এবং আন্তর্জাতিক দুর্নীতি বিরোধী দিবস উপলক্ষে শ্রমিকদের মধ্যে দুর্নীতির বিরুদ্ধে শ্লোগান সম্বলিত টি-শার্ট বিতরণ করা হয। রাজধানীসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে হাজার হাজার পোস্টার ছাপিয়ে সেগুলো দেয়ালে লাগানো হয়। এসব পোস্টারে দুর্নীতিকে না বলুন, ঘুষ দাতা ও গ্রহীতা উভয়েই জাহান্নামের আগুনে জ্বলবে এবং দেশ রক্ষায় দুর্নীতি প্রতিরোধ করুন লেখা থাকে। সকল নাগরিকের অধিকার সম্পর্কে তথ্য প্রদান এবং কর্তব্যরত কর্মকর্তাগণ জনগণকে কী ধরণের সেবা প্রদানে বাধ্য তা স্মারণ করিয়ে দিয়ে বাংলাদেশ পুলিশের সকল থানায় দুর্নীতি বিরোধী পোস্টার পাঠানো হয়। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে চলমান দুর্নীতিবিরোধী অভিযান সম্পর্কে চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ বলেন, এরই মধ্যে যাদের নাম এসেছে, তারা দুদকের জাল থেকে বের হতে পারবে না। এদের মধ্যে রুই-কাতলা পর্যায়ের অনেকে আছে। তাদের বিষয়ে তথ্য চেয়ে সিঙ্গাপুরসহ একাধিক দেশে চিঠিও পাঠানো হয়েছে। এ অনুসন্ধান তদন্তে দুদক শক্ত অবস্থানে আছে। ক্যাসিনোকাণ্ডে জড়িত অনেককে রিমান্ডে নেওয়া হচ্ছে। তাদের কাছ থেকে অনেকের নাম পাওয়া যাচ্ছে। যাদের নাম বেশি বেশি সামনে আসছে, তাদের আগে ধরা হচ্ছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরতে হবে। এ কাজটি করতে পারলেই দেশে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

বেসিক ব্যাংকে নিয়োগ দুর্নীতি নিয়ে প্রশ্নের জবাবে দুদক চেয়ারম্যান বলেন, গণমাধ্যমে এ নিয়ে যে খবর প্রকাশ হয়েছে, তার ভিত্তিতে ব্যাংকটিতে নিয়োগ নিয়ে কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেলের (সিএজি) নিরীক্ষা প্রতিবেদন চাওয়া হবে। প্রায় ১২শ' কর্মকর্তা-কর্মচারীর নিয়োগ নিয়ে নজিরবিহীন অনিয়ম-দুর্নীতির ঘটনা ঘটেছে ব্যাংকটির সাবেক চেয়ারম্যান শেখ আবদুল হাই বাচ্চুর আমলে। ওই সময়ে রাষ্ট্রায়ত্ত ওই ব্যাংকের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে দুদকের করা মামলার চার্জশিট কবে দেওয়া হবে- এ প্রশ্নের জবাবে ইকবাল মাহমুদ বলেন, আত্মসাৎকৃত অর্থ সর্বশেষ কোন চ্যানেলে কার কাছে গেছে, তা এখনও বের করা সম্ভব হয়নি। এ কারণে চার্জশিট দিতে দেরি হচ্ছে। চার্জশিটে বাচ্চুর নাম আসবে কি-না জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটি তদন্তের বিষয়। তদন্তে তার বিরুদ্ধে প্রমাণ পাওয়া গেলে তদন্ত কর্মকর্তা সে হিসাব করেই চার্জশিট তৈরি করবেন। ইকবাল মাহমুদ বলেন, বর্তমানে যেভাবে দুর্নীতিবিরোধী কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে, তাতে কমিশনের প্রতি জনআস্থা বাড়ছে। সাম্প্রতিক সময়ে ২২ হাজার ২২৩টি অভিযোগ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ৩০০টি অভিযোগের অনুসন্ধান শুরু করা হয়েছে। দুদক চেয়ারম্যান বলেন, বর্তমান সময়ে কমিশন দেশের মানুষের কাছে একটা বার্তা পৌঁছাতে পেরেছে। সেটি হলো, কেউ দুর্নীতি করলে তাকে দুদকের বারান্দায় আসার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। কারণ, দুর্নীতি করলে আজ হোক, কাল হোক বের হবেই। দুর্নীতির তথ্য তামাদি হয় না। যে দুর্নীতি করবে, তাকে জবাবদিহি ও আইনের আওতায় আসতেই হবে। ব্যবসায়ীদের কারসাজিতে পেঁয়াজের মূল্যবৃদ্ধি প্রসঙ্গে তিনি বলেন পেঁয়াজের মূল্যবৃদ্ধিতে ব্যবসায়ীদের কারসাজি সম্পর্কে দুদক চেয়ারম্যান বলেন, এ বিষয়টি শুল্ক গোয়েন্দা অধিদপ্তর নিবিড়ভাবে পর্যক্ষেণ করছে। এ ক্ষেত্রে কারসাজির মাধ্যমে ব্যবসা করে অবৈধ সম্পদ অর্জন করা হলে সেটি দুদক তদন্ত করতে পারে। এর আগে অনুষ্ঠানে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দেন ইকবাল মাহমুদ। এ সময় তিনি বলেন, কমিশন জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে চায়। ফাঁদ মামলা সম্পর্কে বলেন, ঘুষের টাকাসহ সরকারি কর্মকর্তাদের হাতেনাতে ধরার কাজ শুরু হওয়ায় সার্বিকভাবে ঘুষের মাত্রা কিছুটা হলেও কমেছে। জনগণকে ঘুষ, দুর্নীতি, হয়রানি-বিবর্জিত সরকারি সেবা দিতে হবে। দুদকের মামলায় সাজার হার সম্পর্কে তিনি বলেন, সাজার হার না বাড়লেও কমেনি। শতভাগ সাজা নিশ্চিত করতে কমিশনের প্রসিকিউটররা কাজ করছেন। বিচারাধীন বিভিন্ন মামলায় সাক্ষীদের আইনি প্রক্রিয়ায় সুরক্ষার কাজও করা হচ্ছে। টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীর উদ্যোগে চলমান অভিযান দেশবাসীর মনে আশার সঞ্চার করেছে। তবে এ লড়াইয়ের দায়িত্ব প্রধানমন্ত্রীর একার নয়। এজন্য দুদক সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানকে চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে দুর্নীতি প্রতিরোধে এগিয়ে আসতে হবে। সবাই সোচ্চার হলেই দুর্নীতি রোধ করা সম্ভব। এজন্য সরকারকে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে হবে। তবে আইনের মাধ্যমে নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধের মতো পদক্ষেপ বাতিল করতে হবে। টিআইবি উত্থাপিত দাবিগুলো হল- ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ও ফরেন ডোনেশনস রেগুলেশন আইনের নিবর্তনমূলক ধারা বাতিল, সরকারি চাকরি আইন ২০১৮-এর বিতর্কিত ধারা বাতিল, ব্যাংকিং খাতে দুর্নীতি ও জালিয়াতি এবং আর্থিক কেলেঙ্কারির সঙ্গে জড়িতদের বিচারের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা এবং ব্যাংকিং খাতে প্রয়োজনীয় সংস্কারে স্বাধীন কমিশন গঠন করা। এছাড়াও রয়েছে- বিচার ব্যবস্থা প্রশাসন ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থায় সমন্বিত ও পরিপূরক কৌশল গ্রহণ, সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধান ও সদস্যদের নিয়োগে যোগ্যতার মাপকাঠি নির্ধারণ এবং স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় নিয়োগ নিশ্চিত করা এবং তথ্য অধিকার আইনের কার্যকর প্রয়োগের উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করা। সমাজের সকল স্তরের দুর্নীতি প্রতিরোধ করে দেশকে এগিয়ে নিতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার বিকল্প নাই। দুর্নীতি প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায়গুলোর অন্যতম হচ্ছে জনগণের মধ্যে নৈতিকতা বোধ জাগিয়ে তোলা। এ ব্যাপারে সমাজের ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানসমূহ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। তাই আসুন আমরার দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে একতাবদ্ধ হই।
নূর মোহাম্মদ নূরু
গণমাধ্যমকর্মী
[email protected]
সর্বশেষ এডিট : ০৯ ই ডিসেম্বর, ২০১৯ দুপুর ২:০২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


