
‘কলকাতা কেবল ভুলে ভরা’ এই গানের স্রষ্টা শরৎচন্দ্র পণ্ডিত।। বাংলা সংবাদমাধ্যমে পরাধীন ভারতেও যার ছিল নির্ভীক বিচরণ।বাংলা সাহিত্যের পাঠক সমাজে কথাশিল্পী ও সাংবাদিক শরৎচন্দ্র পণ্ডিত দাদাঠাকুর নামেই পরিচিত ছিলেন। শরৎচন্দ্র পণ্ডিতে মুখে মুখে ছড়া, হেঁয়ালী ও হাস্য কৌতুক রচনা করতেন। তাই অনায়াসে ইংরাজিতে নিজেকে পত্রিকার এডিটরের বদলে ‘এইড-ইটার’ বলতেই বেশী পছন্দ করতেন। কোন কমেডি রিয়ালিটি শোয়ের বিচারকের আসনে না বসেও,সেই কবে চূড়ান্ত রসবোধ নিয়ে গান লিখেছিলেন “কলকাতা কেবল ভুলে ভরা, হেথা উল্টো ডাঙ্গায় লোকে সোজা হয়ে হাঁটে, বাগবাজারে নেই কো বাঘ, শিয়ালদহে নেইকো শিয়াল”। জেলার জঙ্গীপুর ছিল দাদা ঠাকুরের কর্মক্ষেত্র। ১৯১৪ সালে জঙ্গীপুরের পণ্ডিত প্রেস থেকে তার একক প্রচেষ্টায় 'জঙ্গীপুর সংবাদ' নামে একটি সাপ্তাহিক সংবাদপত্র প্রকাশ করতে থাকেন। যার মূল্য ছিল এক পয়সাঃ এই পত্রিকা বাংলার বলিষ্ঠ মফস্বল সাংবাদিকতার প্রথম উদাহরণ। তার সাপ্তাহিক মুখপত্র “বিদূষক”। এই পত্রিকার মধ্যে সেই সময় ও রাজনীতির কারবারীদের লক্ষ্য করে সমান ভাবে চলত তীব্র স্যাটার এর আক্রমণ। সাদামাটা জীবন যাপন অধিকারী হয়েও, তাঁর লেখনীতে ছিল ক্ষুরধার। কাউকে তোষামোদ না করেই লিখেছিলেন “আয় ভোটাররা যদুর কপালে ভোট দিয়ে যা, হাত ঘুরালে নাড়ু দেব, গাই বিয়োলে দুধ দেব, মাছ কাটলে মুড়ো দেব, যদুর কপালে তোরা ভোট দিয়ে যা।” তাই আজ হয়তো অনেকে মজা করে মুচকি হেসে বলছেন, ‘শরৎ পণ্ডিতের পত্রিকা চালু থাকলে ভোটের বাজারে ‘যদু’ বাবুদের কৃপায় বিজ্ঞাপন পাওয়াটা যে বিধিবাম হত তা এক প্রকার নিশ্চিত। তার রচিত নানান হাসির গল্প বাঙলা সাহিত্যের অমর কীর্তি৷ তার প্রকাশিত বিখ্যাত গ্রন্থ বোতল পুরাণ। পণ্ডিত প্রয়াত হয়েছিলেন ১৯৬৮সালে। এতকাল পরে আজও সমান প্রাসঙ্গিক দাদাঠাকুর শরৎ চন্দ্র পণ্ডিত। পশ্চিম বাংলার অন্যতম কালজয়ী পুরুষ শরৎচন্দ্র পণ্ডিতের আজ ১৩৯তম জন্মবার্ষিকী এবং ৫২তম মৃত্যুবার্ষিকী। ১৮২১ সালের এই দিনে ভারতের বিরভূম জেলায় জন্ম এবং ১৯৬৮ সালের দিনে মুর্শিদাবাদে মৃত্যুবরণ করেন দাদা ঠাকুর। সাংবাদিক শরৎ চন্দ্র পণ্ডিতের জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকীতে শুভেচ্ছা ও শ্রদ্ধাঞ্জলি।

শরৎচন্দ্র পণ্ডিত ১৮২১ সালের ২৭ এপ্রিল ভারতের বীরভূম জেলার নলহাটি থানার অন্তর্গত সিমলান্দী গ্রামে মামার বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা হরিলাল পণ্ডিত ও মাতা তারা সুন্দরী দেবী। দাদা ঠাকুরের আদি বাড়ি বীরভূম জেলার ধরমপুরে এবং তাঁর পৈতৃক বাড়ী ছিল মুর্শিদাবাদ জেলার জঙ্গিপুর মহকুমার অন্তর্গত দফরপুর গ্রামে। দাদা ঠাকুরের জন্মের দু বছরের মধ্যে তাঁর পিতা হরিলালের মৃত্যু হয়। পিতার মৃত্যুর পাঁচ বছরের মধ্যে তাঁর মাতা তারাসুন্দরি দেবীরও মৃত্যু হয়। কিন্তু তাঁর পিতৃব্য রসিকলাল তাঁকে কোনদিনই তাঁদের অভাব বুঝতে দেন নি। তাঁর স্নেহ-ভালবাসা বেড়ে ওঠা দরিদ্র পরিবারের সন্তান শরৎচন্দ্র জঙ্গিপুর হাইস্কুল থেকে এন্ট্রান্স পাশ করে বর্ধমান রাজ কলেজে এফ.এ. ক্লাসে ভর্তি হন। কলেজে বিনা বেতনে পড়ার সুযোগ পেলেও নিজের খাবার খাওয়ার খরচা চালনার জন্য টিউশনি করতে হত। প্রখর আত্ম মর্যাদার জন্য টিউশনি করার আয় ও ঠিক মত নিতেন না , শেষ পর্যন্ত টাকার অভাবে পড়া শেষ করতে পারেননি তিনি। ছাত্র অবস্থায় দাদা ঠাকুরের মনে কবিত্বের বিকাশ ঘটেছিল। মুখে মুখে ছড়া বাঁধার বিরল ক্ষমতা ছিল তাঁর।

ঠাকুরদা রসিকলালের ইচ্ছানুযায়ী ছাত্রাবস্থায় বিয়ে করতে হয় দাদা ঠাকুরকে। মাত্র ১১ বছরের বালিকা প্রভাবতী দেবী এলেন দারিদ্র লাঞ্ছিত স্বামীর সাথে ঘর করতে। ঠাকুরদার কথা মত অল্প বয়সেই বাড়ী ছাড়তে হয় রোজগারের জন্য। তিনি চলে আসেন জঙ্গীপুরে। জঙ্গীপুরে তিনি অত্যন্ত সাধারণ জীবন যাপন করতেন কিন্তু অত্যন্ত তেজস্বী মানুষ ছিলেন। চারিত্রিক দৃঢ়তায় ছিলেন আধুনিক কালের বিদ্যাসাগর। চাকরি করা তার অভিপ্রায় ছিল না কেননা চাকরি মাত্র গোলামী তার মতে ” it is better to starve than serve”.। স্বাধীন ব্যবসার কথা ভাবতে গিয়ে মাথায় ছাপা খানা করার ইচ্ছে জাগে। খবরের কাগজে বিজ্ঞাপন দেখে ১৯০২ খ্রিস্টাব্দে কলিকাতার ব্যবসায়ী ভোলানাথ দত্তের কাছ থেকে কিনে ফেললেন একটি ছাপা খানা মাত্র ৪৬ টাকার বিনিময়ে। সঙ্গে একটি প্রিন্টার্স গাইড নিয়ে দাদা ঠাকুর দেশে ফিরলেন। মাত্র ২১ বৎসর বয়সে ১৯০২ খ্রিস্টাব্দে রঘুনাথগঞ্জে আড়াই টাকায় ভাড়া নেওয়া ঘরে যাত্রা শুরু হলো হস্তচালিত ছাপাখানা পণ্ডিত প্রেসের। তিনি নিজেই সেই ছাপাখানার প্রোপাইটর , কম্পোজিটার, প্রুফ রিডার এমনকি ইঙ্কম্যানও। আর প্রেসম্যানটি হচ্ছেন তাঁর স্ত্রী প্রভাবতী দেবী। পরবর্তীকালে তিনি তাঁর ছাপাখানার বিবরণ দিতে গিয়ে বলতেন - " আমার ছাপাখানার আমিই প্রোপাইটর, আমি কম্পোজিটর, আমি প্রুফ রিডার, আর আমিই ইঙ্ক-ম্যান। কেবল প্রেস-ম্যান আমি নই। সেটি ম্যান নয় - উওম্যান অর্থাৎ আমার অর্ধাঙ্গিনী। ছাপাখানার কাজে ব্রাহ্মণী আমাকে সাহায্য করেন, স্বামী-স্ত্রীতে আমরা ছাপাখানা চালাই।" হ্যান্ডবিল বিয়ের কার্ড আর প্রশ্নপত্রের কাজ সব সময় মেলেনা তাই তিনি প্রেস সবসময় সচল রাখতে শুরু করেন সংবাদ পত্র প্রকাশনা। দাদা ঠাকুর হুঁকোর দ্বারা ধূমপান করতেন । সেই হুঁকোর যন্ত্রপাতি দেখে এক বিদেশি সাহেব ১০০ টাকায় তাকে একটি প্রেস কিনে দিলেন। রঘুনাথগঞ্জে সেই সময় এই একটি মাত্র প্রেস বলে কিছু সরকারি কাজ পেতেন । সেই সময় দাদা ঠাকুরের বৃহৎ সংসারে এই উপার্জন সংসার চালনার পক্ষে দূরহ হয়ে পড়েছিল। তাঁর সংসারে আটটি সন্তান যার মধ্যে – চারটি পুত্র ও চারটি কন্যা ছিল। পুত্রদের মধ্যে সত্যেন্দ্র কুমার ও বিমল কুমার শৈশবে মারা যায়। তার জীবিত পুত্র ও কন্যাগণ হলেন – বিনয় কুমার , অনিল কুমার, ইন্দুমতি, বিন্দুবাসিনী, রেনুকা ও কণিকা।

১৩২৯ বঙ্গাব্দের ৬ই মাঘ বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে একটি বিশেষ স্মরণীয় দিন। প্রকাশিত হয় সাপ্তাহিক মুখপত্র “বিদূষক” । একে একে বের হলো হাস্যকৌতুক কাগজ “বিদূৃষক” ও “বোতল পুরাণ” । রঘুনাথগঞ্জে পত্রিকা ছেপে তিনি ইংরেজি, বাংলা ও হিন্দি ছড়া কেটে কলকাতার ফুটপাতে বিক্রি করতেন। সেই সময় কলকাতা পুলিশ হকারদের খুব হেনস্থা করতো , সেই জন্য কলকাতা করপোরেশনের তৎকালীন মুখ্য নির্বাহী আধিকারিক সুভাষ চন্দ্র বসু নিজের পকেট থেকে চার টাকা ছ আনা পয়সা খরচ করে একটি লাইসেন্স করে দিয়েছিলেন।দাদাঠাকুর নিজে কলকাতার রাস্তায় রাস্তায় গিয়ে বিক্রি করতেন এই পত্রিকা। প্রাক স্বাধীনতার সময় কলকাতার রাস্তায় গান গেয়ে 'বোতল পুরান' পুস্তিকাটি ফেরি করতে গেলে ব্রিটিশ পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করতে আসে, তাদের জন্য তৎক্ষণাৎ বানিয়ে ইংরেজিতে গান ধরলেন তিনি। "আই অ্যাম কামিং ফ্রম মুর্শিদাবাদ/ বাট নট ফ্রম বারহাম্ পোর,/হ্যাড আই কাম ফ্রম দ্যাট ভেরি প্লেস/অল মাইট হ্যাভ শাট্ আপ দ্য ডোর,/দে মাইট হ্যাড থট্ দ্যাট্ হ্যাভ কাম/ ফ্রম দ্য ফেমাস অ্যাসাইলাম,/আই অ্যাবোড ইন সাচ এ প্লেস/হুইচ ইজ নাউ ইন ফুল ডিসট্রেস্। .... দ্য ম্যজিস্ট্রেট হ্যাজ ইন্ডেন্টেড মি/টু এন্টারটেন্ ইওর এক্সেলেন্সি।_" শ্বেতাঙ্গ পুলিশ খালি গা ও খালি পায়ের এমন এক হকারকে ইংরেজিতে গান গাইতে দেখে হতবাক হয়ে যায় এবং শুধু উৎসাহ জোগাতেই আট কপি কিনে নিয়ে। তার কাব্যপ্রতিভা, রসবোধ ও প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব ছিল সহজাত। ইংরেজি ভাষাতে যে প্যালিনড্রোম বা উভমুখী শব্দ আছে সেরকম বাংলায় শব্দ সৃষ্টি করেছেন। সেই গান ও তিনি বিভিন্ন ভাষায় গাইতেন । “বোতল পুরাণ” ফেরি করার সময় কলকাতার বাঙালি পাড়ায় গাইতেন- “আমার বোতল নিবি কে রে? এই বোতল নেশাখোরের নেশা যাবে ছেড়ে বোতল নিবি কেরে?” তিনি কলকাতায় ইংরেজ বসবাসকারী এলাকায় ফেরি করার সময় গাইতেন – ” হিউমার , স্যাটায়ার উইট আর ইন ম্যাই পাবলিকেশন জেন্টলম্যান টেক দি বটল ফর ইউর রিলাক্সেশন”। আর কলকাতায় অবাঙালি হিন্দিভাষী এলাকায় তিনি হিন্দীতেই গাইতেন – “কালা এইসা বোতলমে লাল রঙ কে মাল দো আনা পইসা দেকে পিয়ালামে ঢাল”। হিন্দি ও ইংরেজিতেও কাব্য লিখেছেন তিনি। তার ব্যাঙ্গাত্বক কবিতাগুলি ছিল সমাজের অত্যাচারী কুপ্রথার বিরুদ্ধে জলন্ত প্রতিবাদ স্বরূপ। স্বয়ং নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু তাকে শ্রদ্ধা করতেন।

দাদা ঠাকুরের জীবদ্দশায় তাঁর জীবনী নিয়ে বাংলা চলচ্চিত্র নির্মিত হয়। অভিনেতা ছবি বিশ্বাস জিতে নেন রাষ্ট্রপতি পুরস্কার । কিন্তু এই দাদাঠাকুরের জীবনে কোনো সরকারী উপাধি পাবার সৌভাগ্য হইনি। হতে পারে তাঁর রচিত সাহিত্য প্রথম শ্রেণীর নয় কিন্তু এই সরল অনাড়ম্বর অথচ জ্ঞানী এই মানুষটিকে সন্মান জানানোর অনেক সুযোগ ছিল কিন্তু বাস্তবে হইনি কিছু। দীর্ঘ চার বছর রোগ ভোগের পর এই মহান ব্যক্তি১৯৬৮ সালের ২৭ এপ্রিল মুর্শিদাবাদে মৃত্যুবরণ করেন তাঁর জন্মদিনই পরিণত হয়েছে মৃত্যু দিনে। বর্তমানে রঘুনাথগঞ্জে সেই পণ্ডিত প্রেসের কিছু চিনহ এখনো দেখা যায় । পুরনো পণ্ডিত প্রেসটি এখন দোকানে পরিণত ।” নিউ পণ্ডিত স্টেশনারি দোকানে বর্তমানে বইপত্র , খাতা , কলম ও ছোট খাটো প্রিন্টিং এর কাজ করা হয় । দোকানটিতে দাদা ঠাকুরের প্রতিষ্ঠিত আদি প্রেসের কিছু অংশ এখনো সযত্নে রাখা আছে । তাঁর ব্যবহৃত চেয়ার , টেবিল ও কয়েকটি ছবি বাঁধানো আছে । পশ্চিম বাংলার অন্যতম কালজয়ী পুরুষ শরৎচন্দ্র পণ্ডিতের আজ ১৩৯তম জন্মবার্ষিকী এবং ৫২তম মৃত্যুবার্ষিকী। সাংবাদিক শরৎ চন্দ্র পণ্ডিতের জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকীতে শুভেচ্ছা ও শ্রদ্ধাঞ্জলি।
নূর মোহাম্মদ নূরু
গণমাধ্যমকর্মী
নিউজ চ্যানেল
[email protected]

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

