somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

নূর মোহাম্মদ নূরু
নূর মোহাম্মদ নূরু (পেশাঃ সংবাদ কর্মী), জন্ম ২৯ সেপ্টেম্বর প্রাচ্যের ভেনিস খ্যাত বরিশালের উজিরপুর উপজেলাধীন সাপলা ফুলের স্বর্গ সাতলা গ্রামে

কথা-সাহিত্যিক, কবি ও নাট্যকার শচীন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ২১তম মৃত্যুবার্ষিকীতে শ্রদ্ধাঞ্জলি

২৬ শে মে, ২০২০ রাত ৮:০৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


কবি, কথা-সাহিত্যিক ও নাট্যকার শচীন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়। শচীন্দ্রনাথ ক্রমশ লিখতে থাকেন গল্প, গান, কবিতা, উপন্যাস, নাটক। ১৯৩৭ সালে লেখা তাঁর প্রথম গল্প ‘বুভুক্ষা’ পড়ে মুগ্ধ শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় পকেট থেকে নিজের কলমটি বার করে তুলে দিয়েছিলেন বছর সতেরোর কিশোরের হাতে— ‘তোমার জীবনে সুখ আসবে, দুঃখ আসবে, কিন্তু এই কলমটি তুমি ছেড়ো না। মনে রেখো, এই কলমের জন্যই তুমি জন্মেছ।’ শচীন্দ্রনাথের মনে রেখেছিলেন কথাগুলো। ‘বুভুক্ষা’ লেখা হয়েছিল ‘মানসী’ পত্রিকা আয়োজিত গল্প প্রতিযোগিতা। বিচারক ছিলেন শরৎচন্দ্র। ১৯৪১ সালে লেখেন তাঁর প্রথম নাটক ‘উত্তরাধিকার’। সে বছরই বালিগঞ্জ শিল্পী সঙ্ঘের উদ্যোগে তা মঞ্চস্থ হয়। নাটক দেখে মুগ্ধ মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় গ্রিনরুমে এসে আলাপ করে যান নাট্যকার-অভিনেতা শচীন্দ্রের সঙ্গে। আর প্রমথেশ বড়ুয়া তাঁকে ডেকে নেন ‘ডাক্তার’ ছবিতে, সহকারী পরিচালক হিসেবে। ছবিতে একটি চরিত্রে অভিনয়ও করেছিলেন শচীন্দ্রনাথ। পঙ্কজকুমার মল্লিক, তুলসী লাহিড়ী বা অহীন্দ্র চৌধুরীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতাও হয়। অবিভক্ত বাংলার নড়াইলের চিত্রা নদী তাঁর কবিতাকে প্রভাবিত করেছে। হাতে লেখা পত্রিকা ‘সাথী’তে লিখেছেন, ‘পানিপথের দ্বিতীয় যুদ্ধে সৈন্য সমাবেশের বিন্যাস’ বিষয়ে প্রবন্ধ। এ লেখা তৈরিতে তাঁর জ্যাঠামশায়, প্রাবন্ধিক-ইতিহাসবিদ রমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রভাব ছিল। ১৮৮৮ খ্রিস্টাব্দে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার শচীন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়কে'বন্দরে বন্দরে’ উপন্যাসের জন্য বঙ্কিম পুরস্কারে সম্মানিত করে ।আজ কথা-সাহিত্যিক, কবি ও নাট্যকার শচীন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ২১তম মৃত্যুবার্ষিকী। ১৯৯৯ সালের আজকের দিনে তিনি কলকাতায় মৃত্যুবরণ করন। কথা-সাহিত্যিক শচীন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যুবার্ষিকীতে শ্রদ্ধাঞ্জলি।


শচীন্দ্রনাথ ১৯২০ সালের ৬ সেপ্টেম্বর কালীঘাটের ১০/১০ নেপাল ভট্টাচার্য স্ট্রিটে, মামাবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। এখানেই বছর সাতেক কাটানোর পর তাঁর শান্তিনিকেতন যাত্রা। দুষ্টু ছেলে, লেখাপড়ায় মন নেই। দাদামশায় ভাবলেন, শান্তিনিকেতন আশ্রম বিদ্যালয়ে ভর্তি করা গেলে যদি মানুষ করা যায়। কিন্তু সেখানে পাঠিয়েও শান্তি নেই দাদুর। মন কেমন করে, নাতির মুখখানা মনে পড়ে বার বার। বছর ঘুরতেই শচীন্দ্রনাথকে ফিরতে হল শান্তিনিকেতন থেকে। কিন্তু সেই সাময়িক বাস গভীর প্রভাব ফেলল শচীন্দ্রের মনে। রবীন্দ্রনাথকে দেখা প্রসঙ্গে শচীন্দ্রনাথ লিখেছেন, ‘একদিন হল কী, গানের দল ঘুরতে ঘুরতে উত্তরায়ণে প্রবেশ করল। আমরা গাইতে-গাইতে দাঁড়ালাম একটা বাড়ির দোতলার সামনে, গানের দল হঠাৎ নীরব হয়ে গেল। তাকিয়ে দেখি জানালায় দাঁড়িয়ে আছেন সেদিন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ। তাঁর স্বচ্ছ ললাটে গোল হয়ে পড়েছে সূর্যের আলো, আর আমার মনে হল, তাঁর ললাট-ধৃত সেই আলো থেকে রশ্মি ঠিকরে যেন এসে পড়ছে আমাদের বুকের মাঝখানে। শান্তিনিকেতন ছেড়ে ১৯৩৪ সালে পিতৃভূমি নড়াইলের ভিক্টোরিয়া কলেজিয়েট স্কুলে ভর্তি হলেন। সেখান থেকে ১৯৩৮-এ ম্যাট্রিকুলেশনে প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হয়ে এলেন কলকাতায়। ভর্তি হলেন আশুতোষ কলেজে।পড়া শেষ হল না। আর্থিক অনটনের কারণে ইন্ডিয়ান কপার কর্পোরেশনে ইনস্পেক্টরের চাকরি নিয়ে যেতে হল ঘাটশিলা। ঘাটশিলা তাঁর কলকাতার সাহিত্য-সঙ্গ কেড়ে নিল বটে, কিন্তু দিল এমন এক জনের স্পর্শ, যিনি হয়ে উঠেছিলেন তাঁর পথনির্দেশক। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়। তরুণ লেখককে পড়ে ফেলতে সময় নেননি বিভূতিভূষণ। সারা জীবন সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে আপন ভাগ্নি উমা দেবীর সঙ্গে বিয়েও দিয়েছিলেন শচীন্দ্রনাথের। ঘাটশিলার পরিবেশ শচীন্দ্রনাথের কলমে এনেছে বহু গল্প কবিতা গান, আর ‘এজন্মের ইতিহাস’ বা ‘সমুদ্রের গান’-এর মতো উপন্যাস। তবে এখানেও থিতু হতে পারলেন না বেশি দিন। ১৯৪৫-এ ‘এম এল ব্যানার্জি অ্যান্ড সন্স’ নামে এক জাহাজ কোম্পানির ব্রাঞ্চ ম্যানেজার হিসেবে ওয়ালটেয়র চলে গেলেন। এই যাত্রাও বাংলা সাহিত্যে তৈরি করল নতুন পথ।


অন্তহীন সমুদ্রতরঙ্গ শব্দ-ধ্বনি-প্রাণ নিয়ে ঢুকে পড়ল বাংলা সাহিত্যে। তৈরি হল ‘সাগর-বলাকা’, ‘প্রবাল বলয়’, ‘মাটি’, ‘মৎস্যকন্যা’, ‘বৃত্ত’, ‘প্রেম’, ‘বিষুব রেখা’-র মতো স্মরণীয় গল্প-যাত্রা। সাগরের হাওয়া এসে লাগল বাংলা গল্পে। এর আগে যে তাতে সমুদ্রের গন্ধ ছিল না তা নয়, কিন্তু তা এমন রক্ত-মাংস-স্পর্শের সাগর ছিল না। অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথায়— ‘ড্রয়িংরুমের সীমাবদ্ধতা ও পল্লি বাংলার রোম্যান্টিক পরিবেশ থেকে উদ্ধার করে বাংলা গল্পকে তিনি বিষুব-রৈখিক অঞ্চলে, ট্রপিক অরণ্য কান্তারে, আমিষগন্ধে ভরা সাত সাগরের তীরে তীরে, কখনও বন্দরে, কখনও মধ্য-সমুদ্রে, কখনও দ্বীপে দ্বীপান্তরে সরিয়ে নিয়ে গেছেন।’ বছরের পর বছর সমুদ্রে ভেসে চলা নাবিকের জীবন, যৌনতা, প্রেম, ত্যাগ, প্রাণময়তা, নিষ্ঠুরতা নিয়ে তাঁর আগে কেউ কলম ধরেছেন কি? ১৯৪৪-৪৫ নাগাদ লেখা হয় প্রথম উপন্যাস ‘এজন্মের ইতিহাস’। সরোজকুমার রায়চৌধুরী সম্পাদিত ‘বর্তমান’ পত্রিকায় ১৯৪৯ সালে তা ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত হয়েছিল। ১৯৫২ সালের ১৪ মার্চ ‘দেশ’ পত্রিকায় প্রকাশিত ‘জেগুয়ার’ নামের গল্পটি শচীন্দ্রনাথের জনপ্রিয়তা বাড়িয়ে দিল। এর আগে ‘ইঁদুর’ গল্পটিও প্রকাশিত হয় ‘দেশ’-এ। ১৯৫৩ সালে কলকাতায় ফিরে তিনি যোগ দেন রাজ্য সরকারের চাকরিতে, ১৯৬৬-তে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের তথ্য ও জনসংযোগ দফতরে। ১৯৮০ সালে ডেপুটি ডিরেক্টর পদে উন্নীত হয়ে অবসর। চেতলার মহেশ দত্ত লেনের বাড়ি ‘তীরভূমি’তে কেটেছে শেষ জীবন। তাঁর ‘জনপদবধূ’ দীর্ঘ কাল মঞ্চস্থ হয়েছে বিশ্বরূপা, স্টার বা রঙমহলে। ‘এই তীর্থ’ উপন্যাস থেকে হয়েছে ‘জীবন সংগীত’ চলচ্চিত্র। ‘বন্দরে বন্দরে’ উপন্যাসের জন্য ১৯৮৮-তে পেয়েছেন বঙ্কিম পুরস্কার। ছোটদের জন্য লিখেছেন ‘মার্কো’, ‘মেমোরিয়ালের পরী’, ‘বিভূতিভূষণের মৃত্যু’, ‘চন্দ্রলোক থেকে আসছি’ -র মতো গল্প, ‘ক্রৌঞ্চদ্বীপের ফকির’ উপন্যাস। বাঙালি পাঠক এক বার শচীন্দ্রনাথকে ফিরে পড়লে বাংলা সাহিত্যের অমূল্য রত্নরাজির সন্ধান পাবেন।


শচীন্দ্রনাথ নিজের শেষ লেখাটি শুরু করেছিলেন মৃত্যুর আগের দিন। ‘শেষ অধ্যায়’ নামের সেই অসম্পূর্ণ আত্মজৈবনিক উপন্যাসের শুরুতে লিখেছিলেন, ‘ভেবে দেখলাম আমার জীবনে প্রথম অধ্যায় বলে চিহ্নিত করবার মতো তেমন কিছু নেই। যা আছে তা শেষ অধ্যায়ে পুঞ্জীভূত।’...গোটা পনেরো বাক্য, লিখতে লিখতেই ১৯৯৯ সালের ২৫ মে সন্ধের দিকে অসুস্থ হয়ে পড়েন। হাসপাতালের পথে গাড়িতেই কোমায়, পর দিন ২৬ মে মারা যান কথাসাহিত্যিক-নাট্যকার শচীন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়। আজ কথা-সাহিত্যিক, কবি ও নাট্যকার শচীন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ২১তম মৃত্যুবার্ষিকী। কথা-সাহিত্যিক শচীন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যুবার্ষিকীতে শ্রদ্ধাঞ্জলি।

নূর মোহাম্মদ নূরু
গণমাধ্যমকর্মী
নিউজ চ্যানেল :-& ফেসবুক
[email protected]
সর্বশেষ এডিট : ২৬ শে মে, ২০২০ রাত ৮:৪১
৩টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

কেউ পুড়বে আর কেউ পোড়াবে!

লিখেছেন রাজীব নুর, ২১ শে জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৫

অনেকদিন নিশ্চুপ আছি কিছুদিনের অপেক্ষায়;
কেউ কেউ বলে কিছুদিন নাকি হারিয়ে গেছে,
অনেকদিনের গর্ভে তাই মেলাতে সরল গণিত।
কিছুদিনের অপেক্ষায় অপেক্ষায়-
ছেটে দিয়েছি কথামালার ডালপালা।
বসে বসে মেলাই কাণ্ডহীন বৃক্ষের... ...বাকিটুকু পড়ুন

Good governance starts with respecting public money....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ২১ শে জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:২৬



Good governance starts with respecting public money....

গত দুই দশক রাষ্ট্রীয় সফর মানেই ছিল বিশাল বহর, শত শত সঙ্গী, অপ্রয়োজনীয় জাঁকজমক আর জনগণের টাকায় এক শ্রেণির মানুষের বিদেশ ভ্রমণের... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইসলাম প্রতিষ্ঠায় যুদ্ধের প্রয়োজন নেই, ভালোবাসাই যথেষ্ট

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ২১ শে জুন, ২০২৬ রাত ১১:৪৮



চীনের লিংশান পর্বতে শুয়ে আছেন ইসলামের শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা (সাঃ)-এর দুই সাহাবী সা-কে-জু (Sa-Ke-Zu) এবং
উউ-কো-শুন (Wu-Ko-Shun)। এই নামেই তাঁদের চিনতো স্থানীয় চীনবাসীরা। অবাক হতে হয়, আরব... ...বাকিটুকু পড়ুন

প্রিয় সামু ব্লগারদের কাছে খোলা চিঠি.....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ২২ শে জুন, ২০২৬ সকাল ৮:৫০

প্রিয় সামু ব্লগারদের কাছে খোলা চিঠি.....

প্রিয় সহব্লগার,
একসময় সামু ছিল আমাদের ছোট্ট এক মহাবিশ্ব।
দৈনিক গড়ে তিন-চারশ' ব্লগার অনলাইনে থাকতেন। প্রতি মিনিটেই নতুন নতুন পোস্ট আসত। কেউ গল্প লিখছেন, কেউ কবিতা, কেউ... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ইউনিভার্সিটি অব চানখাঁরপুল

লিখেছেন রোকসানা লেইস, ২২ শে জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:০৭



বাংলাদেশে শেষ কবে সিনেমা হলে গিয়ে মুভি দেখেছিলাম মনে নাই। গতকাল সন্ধ্যায় আমন্ত্রিত হয়ে গিয়েছিলাম, স্টার সিনেপ্লেক্স মুভি থিয়েটারে। এখন আর আগের মতন সিনেমা হল নেই। অনেক কিছু বদলে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×