
আজ ২৬ জুন, মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার ও অবৈধ পাচারবিরোধী আন্তর্জাতিক দিবস। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশসহ বিশ্বের অধিকাংশ দেশেই মাদকাসক্তি একটি মারাত্মক সামাজিক ব্যাধি হিসেবে দেখা দিয়েছে। তাই দিবসটিতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মাদক সেবনে ক্ষতিকারক দিকগুলো সকলকে বিশেষ করে যুবসমাজকে সচেতন করতে নানা উদ্যোগ গ্রহন করা হয়ে থাকে। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১৯৮৮ সাল থেকে প্রতিবছরের ২৬ জুন সারা বিশ্বে মাদকবিরোধী দিবস পালিত হচ্ছে। এ দিবসের ইতিহাস আমাদেরও স্মরণ করা দরকার। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভারতবর্ষে উৎপাদিত আফিম দিয়ে চীনকে অর্থনৈতিক, শারীরিক ও মানসিকভাবে পর্যুদস্ত করতে থাকে, এর প্রতিক্রিয়ায় চীনের সম্রাট মাদকের বিরুদ্ধে ১৮৩৯ সালের এই দিনে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। ব্রিটেনের সঙ্গে চীনের এই যুদ্ধই ইতিহাসে প্রথম আফিম-যুদ্ধ হিসেবে পরিচিত। এই যুদ্ধের মধ্য দিয়েই চীন আধুনিক যুগে প্রবেশ করে এবং উন্নতির পথে নতুন দিগন্তের সূচনা করে। "শুদ্ধ জ্ঞানেই সঠিক যত্ন হবে, জ্ঞানের আলোয় মাদক দূরে রবে" এই প্রতিপাদ্য নিয়ে মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার প্রতিরোধ ও মাদকমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের উদ্যোগে আজ ‘মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার ও অবৈধ পাচারবিরোধী আন্তর্জাতিক দিবস’ পালিত হচ্ছে। তবে মহামারী করোনা ভাইরাসের কারণে দিবস মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার ও অবৈধ পাচারবিরোধী আন্তর্জাতিক দিবসউপলক্ষে তেমন কোন কর্মসূচি গ্রহন করা হয়নি। সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে সীমিতভাবে দিবসটি উদযাপিত হচ্ছে।তবে অনলাইনে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে।

বাংলাদেশের মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী দেশে মাদকাসক্তের সংখ্যা ৪৬ লাখ। বেসরকারি সংস্থা ফ্যামিলি হেলথ ইন্টারন্যাশনাল এক পৃথক পরিসংখ্যানে জানা যায় বাংলাদেশে সুই-সিরিঞ্জের মাধ্যমে মাদক গ্রহণকারীর সংখ্যা প্রায় এক লাখ এবং এই সকল মাদক গ্রহণ কারিরা এইচআইভি সংক্রামণের ঝুঁকিতে রয়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার জরিপে বাংলাদেশে মাদকাসক্তির এক উদ্বেগ জনক চিত্র উঠে এসেছে। বাংলাদেশের মাদক পরিস্থিতি নিয়ে জাতিসংঘের এক জরিপ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে বাংলাদেশে কমপক্ষে ৬৫ লাখ মানুষ সরাসরি মাদকাসক্ত যার মধ্যে ৮৭ ভাগ পুরুষ এবং ১৩ ভাগ নারী। এক লখের বেশী মানুষ নানাভাবে মাদক ব্যবসার সাথে জড়িত উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে সমাজের প্রভাবশালী ব্যক্তি থেকে শুরু করে নারী এবং শিশু-কিশোররাও মাদক ব্যবসার সাথে জড়িত। দেশে বর্তমানে ৩২ ধরনের মাদক সেবন চলছে। এ পর্যন্ত ভিন্ন ভিন্ন নামের যেসব মাদক উদ্ধার হয়েছে সেগুলো হচ্ছে হেরোইন, গাঁজা, চোলাই মদ, দেশি মদ, বিদেশি মদ, বিয়ার, রেক্টিফায়েড স্পিরিট, কেডিন, ফেনসিডিল, তাড়ি, প্যাথেড্রিন, টিডি জেসিক, ভাং, কোডিন ট্যাবলেট, ফার্মেন্টেড, ওয়াশ (জাওয়া), বনোজেসিক ইনজেকশন (বুপ্রেনরফিন), টেরাহাইড্রোবানাবিল, এক্সএলমুগের, মরফিন, ইয়াবা, আইএসপিল, ভায়াগ্রা, সানাগ্রা, টলুইন, পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট, মিথাইল, ইথানল ও কিটোন। এছাড়া ইনোকটিন, সিডাক্সিনসহ বিভিন্ন ঘুমের ট্যাবলেট, জামবাকসহ ব্যথানাশক ওষুধ কিংবা টিকটিকির লেজ পুড়িয়ে কেউ কেউ নেশা করে বলে তথ্য পাওয়া গেছে। বাংলাদেশে অবৈধ ভাবে কত টাকার মাদক আমদানি হচ্ছে সে বিষয়ে নির্ভর যোগ্য কোন পরিসংখ্যান পাওয়া না গেলেও বিভিন্ন সংস্থার কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অবৈধ মাদক আমদানির জন্য প্রতি বছর ১০ হাজার কোটি টাকারও বেশি দেশি মুদ্রা পাচার হচ্ছে। কিন্তু ফ্যামেলি হেলথ ইন্টারন্যাশনালের পরিসংখ্যানে বলা হয়, প্রতি বছর ভারত থেকে প্রায় ৩৪৭ কোটি টাকার বিভিন্ন ধরণের মাদকদ্রব্য দেশে আসে। এরমধ্যে শুধু ফেন্সিডিলই আসে ২২০ কোটি টাকার। শতকরা ৬০ ভাগ মাদকাসক্ত মাদকের টাকা জোগাড় করতে গিয়ে জড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে।

দেশে এক লাখেরও বেশি মানুষ নানাভাবে মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। প্রভাবশালী ব্যক্তি থেকে শুরু করে নারী এবং শিশু-কিশোররাও জড়িত মাদক ব্যবসার সঙ্গে। রাজধানীতে মাদক ব্যবসার ‘বাজার’ নিয়ন্ত্রণ করে থাকে এমন ১১৬ জন প্রভাবশালী ব্যবসায়ীর তালিকা করেছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। প্রতিবেদন মতে, প্রতিবছর কমছে ফেনসিডিল আসক্তের সংখ্যা। গত বছর তা ছিল মাত্র ১ শতাংশ। ২০১৭ সালে ছিল ২ শতাংশ। এর আগে ২০১৬ সালে ১.৯৪, ২০১৫ সালে ২.৯৮, ২০১৪ সালে ৩.১০ এবং ২০১৩ সালে ছিল ৪.২৬ শতাংশ। প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত কয়েক বছরে ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধার বেড়েই চলেছে। গত বছর দেশে ইয়াবা উদ্ধার করা হয়েছে পাঁচ কোটি ৩০ লাখ ৪৮ হাজার ৫৪৮টি। ২০১৭ সালে ছিল চার কোটি ৭৯ হাজার ৪৪৩টি। ২০১৬ সালে দুই কোটি ৯৪ লাখ ৫০ হাজার ১৭৮টি, ২০১৫ সালে দুই কোটি ১৭ হাজার, ২০১৪ সালে ৬৫ লাখ ১৩ হাজার, ২০১৩ সালে ২৮ লাখ ২১ হাজার ৯৬, ২০১২ সালে ২১ লাখ ৩৪ হাজার ৩৯৫ এবং ২০১১ সালে ১০ লাখ ৭৭ হাজার ৩০১টি ইয়াবা ট্যাবলেট জব্দ করা হয়। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ফেনসিডিল উদ্ধারের পরিমাণ কিছুটা কমে আবার বেড়েছে। ২০১১ সালে ৯ লাখ ৩৪ হাজার ১৩ বোতল, ২০১২ সালে ১৩ লাখ ৪৬ হাজার ৫৭৮ বোতল, ২০১৩ সালে ৯ লাখ ৮৭ হাজার ৭৮১ বোতল, ২০১৪ সালে সাত লাখ ৪১ হাজার ১৩৭ বোতল, ২০১৫ সালে আট লাখ ৭০ হাজার ২১০ বোতল, ২০১৬ সালে ৫৬ লাখ ৬৫ হাজার বোতল, ২০১৭ সালে সাত লাখ ২০ হাজার ৪৩ বোতল ফেনসিডিল উদ্ধার করে বিভিন্ন সংস্থা। গত বছর ফেনসিডিল উদ্ধার করা হয়েছে সাত লাখ ১৫ হাজার ৭২৯ বোতল। বিভিন্ন থানা এলাকায় অনুসন্ধান চালিয়ে এই তালিকা করা হয়েছে। তবে মাঠ পর্যায়ের এসব ব্যবসায়ীদের গডফাদাররা এখনও পর্দার আড়ালেই রয়ে গেছে। প্রকৃত মাদক ব্যবসায়ীদের অনেকের নামই তালিকায় নেই। এসব তালিকা হালনাগাদ করতেও তেমন আগ্রহ প্রকাশ করে না আইন-শৃংখলা বাহিনীর সদস্যরা। সামাজিক আন্দোলন ছাড়া শুধু আইন শৃঙ্খলা বাহিনী দিয়ে এই বিশাল সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। বাংলাদেশে মাদকের অপব্যবহার এবং কিশোর-তরুণরা সচেতন হলে মাদকমুক্ত সমাজ গঠন সম্ভব। মাদক সমস্যা নিরসনে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি সংগঠন, শিক্ষক, মসজিদের ইমাম, পিতা-মাতা-অভিভাবকসহ সমাজের সব শ্রেণী-পেশার মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে।
নূর মোহাম্মদ নূরু
গণমাধ্যমকর্মী
নিউজ চ্যানেল
[email protected]
সর্বশেষ এডিট : ২৬ শে জুলাই, ২০২০ সকাল ৭:৩৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




