
বিংশ শতাব্দির মহানায়ক, সমাজতন্ত্রী বিপ্লবী কিউবান রাজনৈতিক নেতা ফিদেল কাস্ত্রো যিনি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একাধারে প্রায় চার যুগ বিশেষ ভূমিকা রেখেছেন। স্নায়ুযুদ্ধ এবং বিশ্বব্যাপী মার্কিন নেতৃত্বাধীন পুঁজিবাদের জয়জয়কারের মধ্যেও সমাজতান্ত্রিক কিউবাকে টিকিয়ে রেখে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের প্রবাদ পুরুষ হিসেবে পরিচিতি পান তিনি। ১৯৫৩ সালে সশস্ত্র দল নিয়ে মনকাডা আর্মি ব্যারাকে হামলা করেন কাস্ত্রো। মনকাডা হামলায় অভিযুক্ত হিসেবে কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে ফিদেল যে জবানবন্দি দিয়েছিলেন তার মধ্য দিয়ে কিউবার রাজনৈতিক সংকট এবং তার সমাধানের পথ-নির্দেশ করেন তিনি। তার এ বক্তৃতা আলোড়ন তোলে গোটা কিউবায়, জননায়কে পরিণত হন ফিদেল। বিচারে তার ১৫ বছরের কারাদণ্ড হলেও প্রবল জনমতের কাছে মাথা নত করে দুই বছরের মাথায় তাকে মুক্তি দিতে বাধ্য হন বাতিস্তা। ১৯৫৯ সালে সশস্ত্র বিপ্লবের মধ্য দিয়ে কিউবার মার্কিন সমর্থিত একনায়ক ফুলগেন্সিও বাতিস্তাকে উৎখাত করে যুক্তরাষ্ট্রের নাকের ডগায় একটি সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকেই বিশ শতকের কিংবদন্তিতে পরিণত হয়েছিলেন ফিদেল কাস্ত্রো। আজ এই মহান নেতার ৯৪তম জন্মবার্ষিকী। ১৯২৬ সালের আজকের দিনে কিউবায় জন্ম গ্রহণ করেন ফিদেল কাস্ত্রো। কিউবা বিপ্লবের নেতা সাবেক প্রেসিডেন্ট ফিদেল কাস্ত্রোর জন্মদিনে আমাদের ফুলেল শুভেচ্ছা।

ফিদেল কাস্ত্রো ১৯২৬ সালের ১৩ আগস্ট কিউবার পূর্বাঞ্চলে বিরান জেলায় স্পেনীয় বংশোদ্ভূত এক অসচ্ছল অভিবাসী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পুরো নাম ফিদেল আলেসান্দ্রো কাস্ত্রো রুজ। তার পিতা ছিলেন ছোট্ট আখের খামারি।তাই তার শৈশব মোটেও সচ্ছল ছিল না। দরিদ্র শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষায় ছোট বেলা থেকেই কাজ করেছেন কাস্ত্রো। মাত্র ১৩ বছর বয়সে নিজের বাবার আখের খামারে শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে সংগঠিত করেন এবং একটি ধর্মঘটের ব্যবস্থা করেন। অসচ্ছলতার মাঝে একটি জেসুইট বোর্ডিং স্কুল থেকে আইনের স্নাতক হিসেবে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শেষ করেন। লেখাপড়ার পাশাপাশি খেলাধূলায়ও ফিদেল ছিলেন তুখোড়। ১৯৪৪ সালে কিউবার সেরা অলরাউন্ডার স্কুল অ্যাথলেট পুরস্কার পান। আইন বিষয়ে ডিগ্রী নেওয়ার পরপরই হাভানায় একজন আইনজীবী হিসেবে পেশা জীবন শুরু করেন ফিদেল। আইন পেশায় দরিদ্র মক্কেলদের পক্ষে লড়ে অল্প সময়ের মধ্যেই সুনাম ও খ্যাতি অর্জন করেন এবং পরবর্তীতে সক্রিয় দলীয় রাজনীতিতে যোগ দেন।



১৯৫৯ সালের ৯ জানুয়ারি রাজধানী হাভানায় ঢুকে দেশের নিয়ন্ত্রণভার নিয়ে নেয় ফিদেল কাস্ত্রোর গেরিলারা। হাভানা জয়ের পরপরই কিউবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন ফিদেল। ১৯৬৫ সালে কমিউনিস্ট পার্টি অফ কিউবার সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন এবং কিউবাকে একটি সমাজতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রে রূপান্তরের কাজ শুরু করেন। ১৯৭৬ সালে কিউবার প্রেসিডেন্ট অফ দ্য কাউন্সিল অফ স্টেটস এবং কাউন্সিল অফ দ্য মিনিস্টারস নির্বাচিত হন তিনি। একইসঙ্গে সশস্ত্র বাহিনীর কমান্ডার ইন চিফ হিসেবেও দায়িত্ব গ্রহণ করেন তিনি। কিউবা-বিপ্লবের পর থেকে অর্ধ শতক ধরে পরপর ১০ জন মার্কিন প্রেসিডেন্ট তাকে হত্যা কিংবা উৎখাতের জন্য লাগাতার চেষ্টা চালিয়ে গেলেও সেসবকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে কিউবার শাসন ক্ষমতায় ছিলেন ফিদেল। অবশেষে ৮১ বছর বয়সে স্বেচ্ছায় কিউবার প্রেসিডেন্টের পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। স্বাস্থ্যগত কারণে ২০০৬ সালের ৩১ জুলাই সাময়িকভাবে ক্ষমতা তুলে দেন ছোট ভাই রাউল কাস্ত্রোর হাতে৷ এরপর নির্জনে চলে তাঁর চিকিৎসা ৷পরবর্তীতে এই স্বাস্থ্যের কারণেই দুই বছর পর স্থায়ীভাবে ক্ষমতা দিয়ে দেন ছোট ভাইকে ৷এর পর থেকে কাস্ত্রোর স্বাস্থ্যগত অবস্থা নিয়ে নানা গুঞ্জন চলছে। যোগাযোগের সামাজিক মাধ্যমে খবর রটে, ফিদেল কাস্ত্রো মৃত্যুশয্যায়। তিনি মারা গেছেন বলেও গুঞ্জন ওঠে। গুঞ্জনক অসত্য প্রমান করে তিনি জনসমক্ষে আসেন ২০১৪ সালের জানুয়ারি মাসে যখন তিনি রাজধানী হাভানায় একটি সাংস্কৃতিক কেন্দ্র উদ্বোধন করছিলেন। দ্বিতীয়বার ভেনেজুয়েলার একটি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার জন্য চলতি বছরের এপ্রিলে পুনরায় জনসমক্ষে আসেন। সে বার ১৪ মাস পরে তাঁকে প্রকাশ্য দেখা গিয়েছিল। ২০ জুলাই নিজ নিজ দেশে পররাষ্ট্রের দূতাবাস খোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও কিউবা, এমন এক সময়ে তিনি আবারও জনসমক্ষে এলেন। গত জুলাই মাসে নিজের বাসভবনের সামনে পনির কারখানা পরিদর্শনের জন্য পুনরায় জনসমক্ষে হাজির হয়েছেন কিউবার বিপ্লবের নেতা তথা প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট ফিদেল কাস্ত্রো। স্বল্প সময়ের ব্যবধানে দুই বার গণমাধ্যমের সামনে আসার দৃষ্টান্ত তার নেই। কিউবা ও যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতায় আসার পর তিনি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম গ্রানমায় লিখেছিলেনযুক্তরাষ্ট্রের নীতিতে আমি কখনও আস্থা রাখি না। কিন্তু তাই বলে এটাও নয় যে আমি সংঘাতের শান্তিকামী সমাধানে বিশ্বাসী নই

নূর মোহাম্মদ নূরু
গণমাধ্যমকর্মী
নিউজ চ্যানেল
[email protected]
সর্বশেষ এডিট : ১৩ ই আগস্ট, ২০২০ দুপুর ১:৩৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



