
বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু মিশরের তৃতীয় রাষ্ট্রপতি আনোয়ার সাদত।’৭৫-এর ১৫ই আগস্ট বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যার পর মিশরের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাত সে হত্যাকাণ্ডের জন্য নিজেকে অভিযুক্ত করে আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেছিলেন, “তোমরা আমার প্রিয়বন্ধুকে হত্যা করলে! তাও আবার আমারই দেয়া ট্যাংক ব্যবহার করে!…আমি নিজেকে এখন অভিশাপ দেই, কেন আমি তোমাদের ট্যাংক দিয়েছিলাম?” উল্লেখ্য, স্বাধীনতার পরপর বঙ্গবন্ধু সরকারের সেনাবাহিনীকে সমৃদ্ধ করার অংশ হিসেবে আনোয়ার সাদাত উপহারস্বরূপ একটি ট্যাংক বহর পাঠান। সাদাত ছিলেন ১৯৫২ সালের বিপ্লবে বাদশাহ ফারুককে ক্ষমতাচ্যুতকারী স্বাধীন অফিসারদের মধ্যে অন্যতম সিনিয়র অফিসার এবং জামাল আবদেল নাসেরের ঘনিষ্ঠ সহযোগী। নাসেরের অধীনে সাদাত দুই দফায় ভাইস প্রেসিডেন্টের দায়িত্বপালন করেছেন এবং ১৯৭০ সালে নাসেরের উত্তরসুরি হিসেবে রাষ্ট্রপতি হন। ১৯৭০ সালের ১৫ অক্টোবর থেকে ১৯৮১ সালের ৬ অক্টোবর পর্যন্ত তিনি এই দায়িত্বপালন করেছেন। ১৯৮১ সালের অক্টোবর মাসে কায়রোতে এক সামরিক প্যারেড পরিদর্শনের সময় কিছু সামরিক অফিসারের গুলিতে নিহত হয়েছিলেন মিশরেরর প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাত। আজ এই নেতার ৩৯তম মৃত্যুবার্ষিকী। বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু মুহাম্মদ আনোয়ার আল-সাদাত এর শাহাদৎ বার্ষিকীতে শ্রদ্ধাঞ্জলি।

মুহাম্মদ আনোয়ার আল-সাদাত ১৯১৮ সালের ২৫ ডিসেম্বর মিশরের মুনাফিয়া প্রদেশের ১৩ ভাই ও এক বোনের বিশাল সংসারে দরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা Anwar মুহাম্মদ আল-সাদাত এ্ববং মায়ের নাম সিত আল বিরাইন তিনি ছিলেন সুদানের অধিবাসী। সাদাতের বাবা স্থানীয় সামরিক হাসপাতালে ক্লার্ক হিসাবে কাজ করেন। তাঁর জন্মের সময় আনোয়ারের মিশর ব্রিটিশ উপনিবেশে পরিণত হয়েছিল। তিনি তার বন্ধু রাষ্ট্রপতি গামাল আবদেল নাসেরের অধীনে রাষ্ট্র মন্ত্রী পদে উন্নীত হন। তিনি দেশের দৈনিক 'আল গোমুরিয়া' পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন, যা দেশটির ব্রিটিশদের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভের পর প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ব্রিটিশরা মিশরে একটি সামরিক স্কুল তৈরি করে এবং সাদাত তার প্রথম ছাত্রদের মধ্যে একজন ছিলেন। এখানে তিনি গণিত ও বিজ্ঞান অধ্যয়ন করেন। ওই একাডেমী থেকে স্নাতক ডিগ্রি লাভের পর সাদাতকে সরকারি পদে নিয়োগ দেওয়া হয়, যেখানে তিনি গামাল আবদেল নাসেরের সঙ্গে দেখা করেন। তারা ব্রিটিশ শাসনকে উৎখাত করার এবং ব্রিটিশদের মিশর থেকে বের করে দেওয়ার জন্য পরিকল্পিত একটি বিপ্লবী দল গঠন করেছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি জার্মানদের সাহায্যে মিশর থেকে ব্রিটিশদের বের করে দেওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। ১৯৫৪ সালে তিনি তার বন্ধু রাষ্ট্রপতি গামাল আবদেল নাসেরের অধীনে রাষ্ট্র মন্ত্রী পদে উন্নীত হন। এছাড়াও তিনি দেশের দৈনিক 'আল গোমুরিয়া' পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন, যা দেশটির ব্রিটিশদের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভের পর প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ১৯৫৬ সালে রাষ্ট্রপতির পক্ষে নাসেরের নির্বাচনকে সমর্থন করেন। সাদাত বিভিন্ন উচ্চপদস্থ অফিসে অধিষ্ঠিত ছিলেন, যার ফলে তিনি উপরাষ্ট্রপতি (১৯৬৪-৬৬, ১৯৬৯-৭০) এ দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭০ সালের ২8 সেপ্টেম্বর তারিখে নাসেরের মৃত্যুতে তিনি ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি এবং ১৫ অক্টোবর রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। ১৯৭১ সালের ১৫ মে, সাদাত মিশরীয় নাগরিককে তার 'সংশোধনমূলক বিপ্লব' চালু করে, আরবী সমাজতন্ত্রের সরকারকে মুক্ত করার লক্ষ্যে এবং ইসলামী আন্দোলনের স্বাগত জানানোর লক্ষ্যে মিশরকে ভুল প্রমাণিত করার লক্ষ্য রাখে। ১৯৭১ সালে সাদাত আমেরিকা বা ইসরায়েল কর্তৃক গৃহীত 'যুদ্ধের যুদ্ধের' ব্যর্থ ব্যর্থতার প্রস্তাব সমর্থন করেন। ১৯৭৩ সালের সালের ৬ অক্টোবর তিনি 'ইয়েম কপপুর যুদ্ধ' চালু করেন, যা সিনাই উপদ্বীপে ইসরায়েলি দখলের বিরুদ্ধে আশ্চর্যজনক আক্রমণ। এর পর তিনি 'ক্রসিংয়ের হিরো' হিসাবে পরিচিত হন।

১৯৭৩ সালে মিশরের সিনাই উপদ্বীপ উদ্ধারের জন্য ইয়ম কিপুর যুদ্ধে তিনি মিশরের নেতৃত্ব দেন। ১৯৬৭ সালে ছয়দিনের যুদ্ধে ইসরায়েল তা দখল করে নিয়েছিল। এ কারণে মিশর ও আরব বিশ্বে তার জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পায়। এরপর তিনি ইসরায়েলের সাথে আলোচনায় বসেন এবং মিশর-ইসরায়েল শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তির কারণে আনোয়ার সাদাত ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী মেনাখেম বেগিম শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পান। চুক্তির ফলে মিশর সিনাই উপদ্বীপ ফিরে পায়। সাধারণ ভাবে মিশরীয়দের কাছে তা জনপ্রিয় হলেও মুসলিম ব্রাদারহুড ও বামপন্থিরা ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের ব্যাপারে কোনো প্রচেষ্টা না থাকায় তা প্রত্যাখ্যান করে। বাকি আরব বিশ্বের সাথে আলোচনা না করে ইসরায়েলের সাথে শান্তিচুক্তিকে সুদান ছাড়া বাকি আরব দেশগুলো ও প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশন প্রতিবাদ করে। ফিলিস্তিন ইস্যুতে তাদের সাথে আলোচনা প্রত্যাখ্যান করায় ১৯৭৯ থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত আরব লীগে মিশরের সদস্যপদ স্থগিত ছিল। আনোয়র সাদাত তার বিরোধী শত শত লোককে গ্রেফতারের নির্দেশ দিলেন। মিশরে এ সময় বিক্ষোভ চলছিল, ইসলামপন্থী গোষ্ঠীগুলো তাকে উৎখাতের পরিকল্পনা করছিল। অক্টোবর মাসেই কায়রোতে এক সামরিক প্যারেড পরিদর্শনের সময় ঘটলো সেই ঘটনা। ১৯৮১ সালের অক্টোবর মাসের ৬ তারিখ ইসরাইলের সাথে কায়রোর একটি সামরিক প্যারেডে মিশরের শেষ যুদ্ধের স্মারক অনুষ্ঠান হিসেবে একটি প্যারেডের আয়োজন করা হয়েছিল। তাতে উপস্থিত ছিলেন আনোয়ার সাদাতের স্ত্রী জিহান সাদাতও। ওই প্যারেড অনুষ্ঠানে আনোয়ার সাদাতকে গুলি করে হত্যা করা হয়। প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাতের সামনে দিয়ে যাবার সময় প্যারেডের একটি ট্রাক হঠাৎ থেমে গেল, তার থেকে নামলো চারজন সৈন্য , তারা গ্রেনেড ছুড়লো এবং গুলি করতে লাগলো। অন্তত ১০ জন লোক গুলিবিদ্ধ হলেন। আজ এই নেতার ৩৯তম মৃত্যুবার্ষিকী। বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু মুহাম্মদ আনোয়ার আল-সাদাত এর শাহাদৎ বার্ষিকীতে শ্রদ্ধাঞ্জলি।
নূর মোহাম্মদ নূরু
গণমাধ্যমকর্মী
নিউজ চ্যানেল
[email protected]
সর্বশেষ এডিট : ০৬ ই অক্টোবর, ২০২০ সকাল ১০:৫৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


