
১০ অক্টোবর হল পৃথিবীর সকলের মানসিক স্বাস্থ্য শিক্ষা, সচেতনতার দিন ।সারাবিশ্বে মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্দেশে প্রতিবছর ১০ অক্টোবর নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে এই দিবস পালন করা হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য মতে, প্রতি ৪০ সেকেন্ডের মধ্যে কেউ না কেউ আত্মহত্যার মাধ্যমে প্রাণ হারান। আত্মহত্যাজনিত মৃত্যুর অধিকাংশই প্রতিরোধযোগ্য। অধিকাংশ ব্যক্তিই আত্মহত্যার সময় কোনো না কোনো মানসিক রোগে আক্রান্ত থাকেন।সাধারণত সেটা গুরুত্ব দেয়া হয় না বা মানসিক রোগ নিশ্চিত হলেও যথাযথ চিকিৎসা করা হয় না বলেই আত্মহত্যা বেড়ে যাচ্ছে। মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নয়নের মাধ্যমে আত্মহত্যার এ হার কমিয়ে আনা সম্ভব। ১৯৯২ সালে এটি প্রথমবার পালন করা হয়েছিল । কিছু দেশে একে মানসিক রোগ সচেতনতা সপ্তাহের অংশ হিসাবে পালন করা হয়। নোচিকিৎসক, মনোবৈজ্ঞানিক, নার্স, অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী, সমাজকর্মী, স্বেচ্ছাসেবক, জনস্বাস্থ্য নীতিমালা ও স্বাস্থ্য আইন প্রণেতারা, সেবা ব্যবহারকারী এবং সেবা প্রদানকারী জনগোষ্ঠী, কমিউনিটি নেতা, সরকারি প্রতিনিধি, বেসরকারি সংস্থা এতে অংশ নিয়ে থাকেন। মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি সচেতনতা বৃদ্ধি এবং উন্নত মানসিক স্বাস্থ্য গঠনের প্র্রচেষ্টার সার্বিক উদ্দেশ্য নিয়ে প্রতি বছরের মতো আজ পালিত হচ্ছে বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য ‘‘সবার জন্য মানসিক স্বাস্থ্য : অধিক বিনিয়োগ, অবাধ সুযোগ’।’। করোনা পরিস্থিতিতে সৃষ্ট বেকারত্ব, ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার পাশাপাশি ব্যবসা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বিনোদন কেন্দ্রগুলো বন্ধ থাকায় বিশ্বব্যাপী জনগণের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। এবারের বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবসের প্রতিপাদ্য যথাযথ হয়েছে। বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস উপলক্ষে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা আজ থেকে একটি ক্যাম্পেইন শুরু করেছে। মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক সব খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান জানিয়ে ক্যাম্পেইনটির নাম রাখা হয়েছে ‘মুভ ফর মেন্টাল হেলথ : লেট’স ইনভেস্ট’। জীবনের প্রয়োজনে হোক বা জীবিকার প্রয়োজনেই হোক প্রতিটি মানুষকে কিছু না কিছু কাজ করতেই হয়। পেশা এবং মেধা মানুষের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আয়ের পথ ছাড়াও তারা আমাদেরকে আমাদের ব্যক্তিগত উদ্দেশ্য, সামাজিক নেটওয়ার্ক এবং পেশার উন্নয়নে সহায়তা করে থাকেন। পেশা এবং মেধা স্বাস্থ্যবান জনসাধারণের উন্নয়নের চাবিকাঠি। যদিও কাজের ধরণের পরিবর্তনের ফলে চাকুরীতে বড় ধরণের আবেগিক চাপ অনুভূত হয়। প্রাপ্তবয়স্কদের দিনের অধিকাংশ সময়ই কর্মক্ষেত্রে ব্যয় হয়। দীর্ঘমেয়াদী কর্ম-সংক্রান্ত মানসিক চাপ মারত্মক ভাবে শারীরিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি করে। সার্বক্ষণিক কর্মসংক্রান্ত চিন্তা কখনও কখনও অতিরিক্ত খাদ্যগ্রহণের অভ্যাস ও ব্যায়াম না করার অভ্যাসের কারণে শরীরের ওজন বেড়ে উচ্চরক্তচাপ এবং উচ্চ কোলেষ্টেরল এর অবস্থা সৃষ্টি করে। যার ফলে বিষন্নতা, হৃদরোগ, স্ট্রোক, অতিরিক্ত মেদ, খাদ্যাভ্যাসের রোগ, ডায়াবেটিস, বিভিন্ন ধরণের ক্যান্সার এর প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। বিভিন্ন পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, অনেক কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য যেমন, চাকুরীর চাপ, কর্ম-জীবন, দ্বন্ধ, অপমান, এবং আগ্রাসনের ফলে সামাজিক ক্ষতি, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর কর্মক্ষেত্রের তাৎপর্যপূর্ণ প্রভাব প্রতীয়মান, যা কোনো প্রতিষ্ঠানের বা দেশের অর্থনৈতিক স্বাস্থ্যেও চূড়ান্ত অবদান রাখে। এছাড়া কর্মক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা আমাদের সামগ্রিক সুশৃঙ্খলতার অন্যতম নির্ধারক। মানসিক সমস্যার কারণে কর্মদক্ষতা হ্রাস পায় এবং সামগ্রিক উৎপাদনশীলতা ব্যাহত হয়।’ এ দৃষ্টিকোণ থেকে এবারের বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবসের প্রতিপাদ্য ‘কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য’ অত্যন্ত সময়োপযোগী। মানসিক স্বাস্থ্য ঠিক থাকলে কর্মদক্ষতা বৃদ্ধি পাবে এবং সামগ্রিক উৎপাদনশীলতা বাড়বে, এই সচেতনতা বৃদ্ধি করাই এবারের মূল উদ্দেশ্য।

"মানসিক রোগ একটি গুরুত্বপূর্ণ অসংক্রামক ব্যাধি"। দেশে মানসিক রোগের কারণে ব্যক্তিগত, পারিবারিক, পেশাগত ও সামাজিক জীবন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।’বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, বিশ্বে ৩০ কোটির বেশি মানুষ বিষণ্নতায় ভুগছে এবং জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, আমাদের দেশে প্রাপ্তবয়স্ক জনগোষ্ঠীর শতকরা ১৬ ভাগ ও শিশু-কিশোরদের মধ্যে শতকরা ১৮ ভাগ মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছেন, যার প্রভাব পড়ছে স্বাভাবিক কর্মক্ষমতা ও উৎপাদনশীলতার ওপর। কর্মক্ষেত্রে দুর্বল মানসিক স্বাস্থ্যের কারেণ প্রতিবছর ৭০ মিলিয়নের বেশী কর্ম ঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে, প্রতিবছর। দুশ্চিন্তা,সামাজিক চাপ এর উপসর্গের কারণে বিষন্নতা, বাইপোলার ডিসঅর্ডার এবং অবসেসিভ কমপাল্সিব ডিসঅর্ডার এর মতো রোগ দেখা দেয়। বিশ্বব্যাপী মানসিক রোগে আক্রান্ত মানুষেরা একবিংশ শতাব্দীতেও পারিবারগত, পেশাগত তথা সামাজিকভাবে অবহেলিত ও নিগৃহীত। গবেষণায় দেখা যায় প্রতি চারজনের মধ্যে একজন প্রাপ্তবয়স্ক লোক মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভোগেন। প্রতি পাঁচজনের মধ্যে একজন প্রাপ্তবয়স্ক লোক “কর্মক্ষেত্রে” মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার শিকার হয়ে থাকেন। সারা বিশ্বে প্রতি বছর মানসিক সমস্যার জন্য ২.৫ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার খরচ হয়ে থাকে, যা ২০৩০ সালের মধ্যে ৬ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে। ব্যক্তি, সমাজ এবং দেশের জন্য কর্মসংস্থান গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তবে গবেষণায় দেখা যায় প্রায় ৮০% লোক যারা মারাত্মক মানসিক সমস্যায় ভোগেন তারা চাকরীচ্যুত হয়ে যান। “মানসিক স্বাস্থ্য” কখনো কখনো কর্মকর্তা কর্মচারীদের মাঝে অবহেলার ব্যাপার হয়ে থাকে। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার পরিসংখ্যান অনুযায়ী “বিষন্নতা” রোগ অন্যান্য রোগের শীর্ষে অবস্থান করছে সারা বিশ্বে। যারা বিষন্নতা এবং অন্যান্য মানসিক যন্ত্রণায় কষ্ট পান তারা কর্মক্ষেত্রে হয়তো অক্ষম অথবা যতটুকু কাজ করতে সক্ষম তার চেয়ে কম কাজ করতে পারেন। কিন্তু সামাজিক কুসংস্কারের ফলে কর্মমুখী মানুষ চিকিৎসা নিতে বাধাগ্রস্ত হয়ে থাকেন। স্বাস্থ্যকর কর্মক্ষেত্র শ্রমিক এবং মালিক পক্ষের উভয়ের জন্য সমভাবে উন্নতি বয়ে আনে। কর্মক্ষেত্রে শ্রমজীবী মানুষের মানসিক স্বাস্থ্য সুস্থ্য রাখরলে প্রতিষ্ঠানের কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে এবং সর্বোপরি দেশের অর্থনীতি চাঙ্গা হবে, দেশ উন্নত হবে। তাই আসুন, সবাই মিলে বিশ্বমানসিক স্বাস্থ্য দিবস উদযাপন করি এবং জনগনকে “কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য” সম্পর্কে অনুপ্রাণিত করি, সচেতন করি।
নূর মোহাম্মদ নূরু
গণমাধ্যমকর্মী
নিউজ চ্যানেল
[email protected]
সর্বশেষ এডিট : ১০ ই অক্টোবর, ২০২০ দুপুর ১২:৩৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

