somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

জগন্নাথ হল ট্র্যাজেডির ৩৫তম বার্ষিকী আজ

১৫ ই অক্টোবর, ২০২০ রাত ১২:০৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


১৯৮৫ সালের ১৫ অক্টোবর। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল। দুর্গাপূজার ছুটিতে পরদিন বাড়ি যাবার কথা ছিল নিহতদের অনেকেরই। তখন চিত্তবিনোদনের জন্য টিভি চ্যানেল হিসেবে বিটিভি বা বাংলাদেশ টেলিভিশনই ছিল একমাত্র অবলম্বন। রাত প্রায় পৌনে ৯টা। বিটিভির পর্দায় চলছিল মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে নির্মিত জনপ্রিয় ধারাবাহিক নাটক ‘শুকতারা’। সেনা শাসক লেফটেন্যান্ট জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের অগণতান্ত্রিক শাসনবিরোধী আন্দোলন তখন বেগবান। ছাত্ররা প্রতিবাদে উত্তপ্ত করে রেখেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। তখন ‘অ্যাসেম্বলি হল’ ছাত্রদের মিলনায়তন হিসেবে ব্যবহৃত হয়। অবশ্য তত দিনে ‘অ্যাসেম্বলি হল’ একাত্তরে শহীদ আবাসিক শিক্ষক অনুদ্বৈপায়ন ভট্টাচার্যের নামে নামকরণ করা হয়েছে। এই ‘অনুদ্বৈপায়ন ভবনে’ ১৯৭৯ সালে টেলিভিশন সেট স্থাপন করা হয়েছিল। এ সময় বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট নিম্নচাপজনিত কারণে রাজধানী ঢাকা মহানগরীর ওপর দিয়ে ঘণ্টায় ১০০ কিলোমিটার বেগে দমকা হাওয়া বয়ে যায় ও প্রচণ্ড বৃষ্টিপাত হয়। জনপ্রিয় এ নাটকে সতীর্থ মনন অধিকারীর অভিনয় দেখার জন্য ভিড় করে। দু-চারজন করে প্রায় চার শ ছাত্র এলে টেলিভিশন কক্ষ ভরে ওঠে। এছাড়াও সেখানে ছিল হলের কর্মচারী ও অতিথিরাও।


নাটক শুরু হওয়ার পর সবাই গভীর মনোযোগ দিয়ে তা উপভোগ করছিল। এমন সময়ে হঠাৎ প্রকট শব্দে ধসে পড়ে টিভি রুমের ছাদ। মুহূর্তের মধ্যেই টিভি রুম পরিণত হয় মৃত্যুপুরীতে। যারা ভেতরে জায়গা না পেয়ে দরজা বা জানালার ধারে বসে নাটক দেখছিল, তারা দৌড়ে বের হতে পারলেও অধিকাংশ ছাত্রই সেদিন ছাদচাপা পড়ে। সঙ্গে সঙ্গে বৈদ্যুতিক সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং চাপা পড়া ছাত্রদের আর্তচিৎকারে জগন্নাথ হলে এক ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। দুর্ঘটনা ঘটার সঙ্গে সঙ্গেই হলের অন্যান্য ভবনের ছাত্র এবং খবর পেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন শিক্ষক, ছাত্র, কর্মচারী ও সাধারণ মানুষ আর্তদের উদ্ধারে এগিয়ে আসে। একে তো টিপটিপ বৃষ্টি, অন্যদিকে বিদ্যুত্হীন অবস্থা—এই প্রতিকূল পরিবেশে সারা রাত উদ্ধারকাজ তেমন এগোতে পারেনি। উদ্ধারকৃতদের এক হাসপাতালে স্থান দেওয়া সম্ভব না হলে তাদের ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ, পিজি, সোহরাওয়ার্দী, সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ, হলি ফ্যামিলি হাসপাতাল, পঙ্গু ও সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। এ ছাড়া ব্যক্তি-মালিকানাধীন ক্লিনিকেও ভর্তি হয় বহু আহত ছাত্র। মাইকে তখন রক্তদান করার জন্য করুণ আকুতি ঘোষিত হচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা এবং বহু সাধারণ মানুষ এ আহ্বানে সাড়া দিয়ে হাসপাতালে চলে যায় রক্ত দিতে। রক্তদান করার আগ্রহীদের এত ভিড় স্মরণকালে আর দেখা যায়নি। তার পরও সব জীবন রক্ষা করা সম্ভব হয়নি। নিহতদের লাশ শহীদ মিনারের পাদদেশে সারিবদ্ধ করে রাখা হয়। পরের দিন দেশের সংবাদপত্রগুলোর প্রধান খবর ছিল এটাই। দৈনিক সংবাদ শিরোনাম দেয় : ‘জগন্নাথ হল মিলনায়তন ধসে ৫০ জন ছাত্র নিহত, আহত দুই শতাধিক। রক্তদানের আবেদন।’ বাংলার বাণী সংবাদ ছাপে এই শিরোনামে : ‘জগন্নাথ হলের ছাদধসে ৫০ জন ছাত্রের মর্মান্তিক মৃত্যু আহত ৩ শতাধিক।’ কোনো পত্রিকা একে লেখে ‘জগন্নাথ হল ট্র্যাজেডি’ বলেও। তখনো আহত ও নিহতের সঠিক হিসাব না পাওয়ায় সংবাদ শিরোনামে ভিন্নতা পরিদৃষ্ট হয়। পরে দেখা গেছে, মোট ৩৯ জন নিহত হয়েছে এবং আহতের সংখ্যা শতাধিক। আহতদের অনেকেই পঙ্গু হয়ে গেছে চিরতরে। এই দুর্ঘটনায় শোক প্রকাশ করেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি, কেন্দ্রীয় পনেরো ও সাতদলীয় ঐক্য জোটসহ অন্যান্য রাজনৈতিক নেতা। বিদেশি কূটনীতকরাও শোক জ্ঞাপন করেন। তিন দিন জাতীয় শোক ঘোষণা করে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রেখে ১৬ অক্টোবর সারা দেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এই দুর্ঘটনায় আহত ও নিহতদের আত্মীয়দের প্রতি শোক ও সমবেদনা প্রকাশ করেন। সে বছর থেকেই ১৫ অক্টোবরকে ঘোষণা করা হয় ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শোক দিবস’ হিসেবে পালন করা হয়। আজ জগন্নাথ হল ট্র্যাজেডির ৩৫তম বার্ষিকী। জগন্নাথ হল ট্র্যাজেডিতে নিহত আহত ছাত্র সহ সকলকে স্মরণ করছি গভীর শ্রদ্ধায়।


১৯৮৫ সালের ১৫ অক্টোবর দিনটি ছিল মঙ্গলবার। জগন্নাথ হলের যেখানে বর্তমানে অক্টোবর স্মৃতি ভব্ন সেখানেই ঘটেছিল এ মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। এই নির্মম ট্র্যাজেডির স্মৃতি রক্ষায় পরে নির্মিত নতুন ভবনটির নাম রাখা হয় অক্টোবর স্মৃতি ভব্ন। জগন্নাথ হলের ওই ভবনটি ছিল প্রাদেশিক পরিষদের সংসদ ভবন। পরিষদ ভবনের টিভি কক্ষটিই এক সময় সংসদ কক্ষ হিসেবে ব্যবহৃত হতো। ১৯৪৭ সালে পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক পরিষদের অধিবেশন বসত। একে ‘পরিষদ ভবন’ বা অ্যাসেম্বলি হল বলা হতো। এ ভবনটি ১৯৬৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরবর্তীকালে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ একে ধর্মীয় সংখ্যালঘু ছাত্রদের আবাসিক প্রতিষ্ঠান জগন্নাথ হলের সঙ্গে যুক্ত করেন। এই ভবনটি ছিল ব্রিটিশ আমলের মাঝামাঝি সময়ে অর্থাৎ প্রায় দেড় শ বছর আগে নির্মিত। এর নির্মাণে ছিল চুন ও সুরকির গাঁথুনি আর লোহার রডের বিম। ভবনটির দোতলায় ছিল হলের টিভি কক্ষ। কক্ষের সামনের যেদিকটা নিচু ছিল সেখানে রাখা ছিল টিভি। টিভির সামনের সমতল মেঝে চৌকির মতো রাখা ছিল। সেখানে বসতেন অনেকে। আর পেছনের দিকে চেয়ার সাজানো ছিল। সেখানে বসায় ছাত্রদের অগ্রাধিকার ছিল। ওই সময় বিটিভিতে চলত ধারাবাহিক নাটক 'শুকতারা'। 'শুকতারা' নাটক দেখার জন্য তখন হলের ছাত্র, কর্মচারী, অতিথিরা ভিড় করতেন। টিভি কক্ষে সেদিন উপস্থিত ছিলেন প্রায় ৩৫০-৫০০ জন। এই দুর্ঘটনার কয়েক দিন পর অর্থাৎ ১৯ অক্টোবর থেকে দুর্গাপূজা (ষষ্ঠী) আরম্ভ হয়। জগন্নাথ হলের এই শোকাবহ ঘটনায় সারা দেশে অনাড়ম্বরে পূজা অনুষ্ঠান করে ব্যানারে লেখা হয় ‘কাঁদো দেশবাসী কাঁদো’। যে মায়ের সন্তান নিহত বা আহত হলো মাত্র কয়েক দিন আগে, তাঁর কাছে পূজার আনন্দ কান্নার জলেই ভেসে গিয়েছিলো। অক্টোবর দুর্ঘটনার পর জগন্নাথ হলে ‘অক্টোবর স্মৃতিভবন’ নামে একটি নতুন ছাত্রাবাস ভবন নির্মিত হয়। এর মধ্যে বাস করে জগন্নাথ হলের মেধাবী, শান্ত ও সৌম্যদর্শন ছাত্ররা তাদের লেখাপড়া চালিয়ে যাচ্ছে মানুষের মতো মানুষ হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে।


দোতলার টিভি কক্ষটি আগে থেকেই ঝুকিপূর্ণ ভবন হিসেবে চিহ্নিত ছিল। ভবনে তখন মেরামত কাজ চলছিল। প্রকৃতি বুঝি আগে থেকেই বিপদ আঁচ করতে পারে। অঝোরে ঝড়ছিল বৃষ্টি। হঠাৎ বিকট শব্দে ছাদের মাঝের অংশ ভেঙে পড়ে। সঙ্গে সঙ্গে ধুলায় পুরো কক্ষ অন্ধকার হয়ে যায়। ঘটনাস্থলেই মারা যান ৩৪ জন। পরে মারা যান আরও ছয়জন। তাদের মধ্যে ২৬ জন ছিলেন ছাত্র। কর্মচারী ও অতিথি ছিলেন ১৪ জন। সেদিন শোকে ন্যুব্জ হয়ে পড়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ পুরো দেশ। ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান 'হলের মাঠে সার বেঁধে লাশগুলো রাখা হয়েছিল। একদিকে চলছিল তাদের পরিচয় নির্ণয়ের কাজ, অন্যদিকে রক্ত দেওয়ার জন্য লোক সংগ্রহ। কেউ মেডিকেলে যাবো বললে রিকশাচালকরা ভাড়া নেননি সেদিন।' জগন্নাথ হল ট্র্যাজেডি স্মরণে অক্টোবর স্মৃতি ভবনের নিচতলায় রয়েছে একটি ছোট জাদুঘর। সেদিনের ব্যবহূত টিভি সেটটি রাখা আছে এই জাদুঘরে। ওই ট্র্যাজেডিতে মৃত্যুবরণ করা বেশ ক'জনের ছবিও সংরক্ষণ করা হয়েছে। ভবনটির সামনে নিহতদের স্মরণে তাদের নাম সংবলিত একটি নামফলক স্থাপন করা হয়েছে। ১৫ অক্টোবর বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শোক দিবস হিসেবে পালন করা হয়। স্মরণসভা, শোকর‌্যালী, বিভিন্ন উপাসনামূলক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সন্তান হারানোর শোকে মূহ্যমান বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার প্রতিবছর দিনটিকে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে। জগন্নাথ হল ট্র্যাজেডিতে নিহত আহত ছাত্র সহ সকলকে স্মরণ করছি গভীর শ্রদ্ধায়।

নূর মোহাম্মদ নূরু
গণমাধ্যমকর্মী
নিউজ চ্যানেল :-& ফেসবুক
[email protected]
সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই অক্টোবর, ২০২০ রাত ১২:০৬
৫টি মন্তব্য ৫টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাটিয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে নবীজির শেখানো এক অনন্য আমল

লিখেছেন নতুন নকিব, ১১ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৯:০৩

দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাটিয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে নবীজির শেখানো এক অনন্য আমল

ছবি অন্তর্জাল থেকে নেওয়া।

মানুষের জীবন মূলত অসংখ্য ছোট-বড় সিদ্ধান্তের সমষ্টি। প্রতিটি বাঁকে, প্রতিটি মোড়ে আমাদের কোনো না কোনো... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্যা ফায়ার অফ মাই সউল

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১১ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৫:১৪

আমি যে ধরণের গান পছন্দ করি, সেগুলোর মাঝে ক্বারি আমির উদ্দিনের 'কুহু সুরে মনের আগুন' গানটি আমার খুব প্রিয়। এই গানটিকে সম্প্রতি ইংরেজিতে অনুবাদ করে গান বানিয়েছি, এনিমেশন... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬

লিখেছেন আঘাত প্রাপ্ত একজন, ১১ ই জুন, ২০২৬ রাত ৮:২৬

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬

[সম্ভাবনার ক্রমানুসারে নয়ঃ]

আর্জেন্টিনা: আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ তার ডিফেন্স আর ইনজুরি । ৩৮ বছরের তরুণ(!) সেন্টারব্যাক ওতামেন্দি আর কমপক্ষে এক হালি হাফ-ফিট ফুটবলার নিয়ে ১৯ জুলাই পর্যন্ত... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমার ডক্টর যেন বাঁচে ১৫০ বছর.....

লিখেছেন শায়মা, ১১ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৪



ডক্টরস, হসপিটাল এবং ওষুধ এসব নিয়ে আমার তিক্ত অভিজ্ঞতার শেষ নেই। এ কারনে আমি একদম এদের কাউকেই পছন্দ করি না। তবে কিছু তো করার নেই। জীবনের নানা সময়ে ইচ্ছের... ...বাকিটুকু পড়ুন

কবিতাঃ শরৎ বন্দনা

লিখেছেন ইসিয়াক, ১১ ই জুন, ২০২৬ রাত ১১:৫৯


শরৎ এলেই আকাশ জুড়ে সাদা মেঘের ভেলা
দিনমণি আর মেঘমালার লুকোচুরি খেলা।

রুম ঝুমঝুম নূপুর পায়ে ছুটছে নদীর ঢেউ
ভাটিয়ালি গাইছে গান অচিন সুরে কেউ।

বিলে ঝিলে শাপলা পদ্ম... ...বাকিটুকু পড়ুন

×