somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বিদআত কি? এবং বিদআত এর পরিণাম

১৩ ই নভেম্বর, ২০২০ বিকাল ৪:০৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


বিদআত হলো যে গুনাহের কাজকে মানুষ ইবাদত বলে মনে করে। বিদআত শব্দের আভিধানিক অর্থ= নতুন আবিষ্কার। শরিয়াতের পরিভাষায় বিদআত হচ্ছে ধর্মের নামে নতুন কাজ, নতুন ইবাদাত আবিষ্কার করা। আগের কোনও দৃষ্টান্ত ও নমুনা ছাড়াই কোনও কিছু সৃষ্টি ও উদ্ভাবন করা হলো বিদআত। দ্বীনের মধ্যে এমন বিষয় সৃষ্টি করা, যা রাসূল (সা.) ও সাহাবায়ে কেরামের যুগে ছিল না, বরং পরে তা উদ্ভাবন হয়েছে। বিদআত আবিষ্কারকারী যত বড় ধর্মীয় পণ্ডিতই হোক না কেন, ইসলামে তা গ্রহণযোগ্য নয়। মোটকথা সে কাজকে বিদআত বলা হয় যা সোয়াব ও পূণ্যের নিয়তে করা হয় কিন্তু শরীয়তে তার কোন ভিত্তি বা প্রমাণ পাওয়া যায়না। অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিজে করেননি এবং কাউকে তা করার অনুমতি ও প্রদান করেননি। এরূপ আমল আল্লাহর কাছে গ্রহণ যোগ্য হয় না। (বুখারী ও মুসলিম) নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, “যে ব্যক্তি এমন আমল করবে যার ব্যাপারে আমার শরীয়তের নির্দেশনা নেই, উহা প্রত্যাখ্যাত।” (মুসলিম হা/৩২৪৩) তিনি আরো বলেন- " নিঃসন্দেহে সর্বোত্তমকথা হচ্ছে আল্লাহ্র কিতাব, সর্বোত্তম পদ্ধতিহচ্ছে রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এর পদ্ধতি। আর নিকৃষ্ট কাজহচ্ছে শরীয়াতে নতুন কিছু সৃষ্টি করা, এবংপ্রত্যেক বিদ'আত হচ্ছে ভ্রষ্টতা। (মুসলিমঃ ৭৬৮)"রাসুল (সাঃ) আরো বলেছেন-যে আমার সুন্নাহথেকে মুখ ফিরিয়ে নিবে সে আমার দলভুক্ত নয়।[বুখারীঃ ৫০৬৩] অর্থাৎ যে রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এর পদ্ধতি থেকে মুখফিরিয়ে নিয়ে নতুন নতুন ইবাদাত আবিষ্কার করবে অথবা আল্লাহ নৈকট্যের জন্য নতুন নতুন পদ্ধতি আবিষ্কার করবে সে রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এর পদ্ধতিকে তুচ্ছ মনে করল। আর রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এর দেখিয়ে দেয়া পদ্ধতি এবং ইবাদাত সমূহকে উত্তম মনে না করে, ইসলামী শরিয়তে বিদআতের কোনো প্রকার স্থান নেই যেমনটা আমরা বিভিন্ন বইয়ে পেয়ে থাকি যে বিদআত দুই প্রকার- ১.বিদআতে হাসানাহ ২.বিদআতে সায়্যিয়াহ। এবং এতে হকুম লাগানো হয়ে থাকে যে হাসানাহ করা যাবে, সায়্যিয়াহ করা যাবে না। এই সমস্ত প্রকার সম্পূর্ণই মানুষদের বানানো। বর্তমান যুগের আলেমদের দেখিয়ে দেয়া পদ্ধতি এবং ইবাদাত সমূহকে উত্তম মনে করে তবে উপরের হাদিস অনুযায়ী সেইব্যক্তি আর রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এর উম্মত-ই থাকবে না। বিদআতের বিরুদ্ধে রাসূল (সাঃ) কঠিন হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই সর্বোত্তম বাণী আল্লাহর কিতাব। আর সর্বোত্তম আদর্শ মুহাম্মদ (সাঃ) এর আদর্শ। সবচেয়ে নিকৃষ্ট বিষয় হলো- দ্বীনের মধ্যে নব-উদ্ভাবিত বিষয়। দ্বীনের মধ্যে নব-উদ্ভাবিত সব কিছুই বিদআত। প্রত্যেক বিদআত ভ্রষ্টতা, আর প্রত্যেক ভ্রষ্টতার পরিণাম জাহান্নাম।’ (মুসলিম, হাদিস : ১৫৩৫, নাসায়ি, হাদিস: ১৫৬০)


বিদ‘আতের চারটি বৈশিষ্ট্য রয়েছে যথাঃ
১। বিদ‘আতকে বিদ‘আত হিসেবে চেনার জন্য সুনির্দিষ্ট কোন দলীল পাওয়া যায় না; তবে তা নিষিদ্ধ হওয়ার ব্যাপারে মূলনীতিগত ‘আম ও সাধারণ দলীল পাওয়া যায়।
২। বিদ‘আত সবসময়ই শরীয়তের উদ্দেশ্য, লক্ষ্য ও মাকাসিদ এর বিপরীত ও বিরোধী অবস্থানে থাকে। আর এ বিষয়টিই বিদ‘আত নিকৃষ্ট ও বাতিল হওয়ার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। এ জন্যই হাদীসে বিদ‘আতকে ভ্রষ্টতা বলে অভিহিত করা হয়েছে।
৩। অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিদ‘আত এমন সব কার্যাবলী সম্পাদনের মাধ্যমে হয়ে থাকে যা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াল্লাম ও সাহাবাদের যুগে প্রচলিত ছিল না। ইমাম ইবনুল জাওযী রহ: বলেন,
‘বিদ‘আত বলতে বুঝায় এমন কাজকে যা ছিল না, অতঃপর তা উদ্ভাবন করা হয়েছে’।
৪। বিদ‘আতের সাথে শরীয়তের কোনো কোনো ইবাদাতের কিছু মিল থাকে। দু’টো ব্যাপারে এ মিলগুলো লক্ষ্য করা যায়:
প্রথমতঃ দলীলের দিক থেকে এভাবে মিল রয়েছে যে, কোনো একটি ‘আম দলীল কিংবা সংশয় অথবা ধারণার ভিত্তিতে বিদ‘আতটি প্রচলিত হয় এবং খাস ও নির্দিষ্ট দলীলকে পাশ কাটিয়ে এ ‘আম দলীল কিংবা সংশয় অথবা ধারণাটিকে বিদ‘আতের সহীহ ও সঠিক দলীল বলে মনে করা হয়।
দ্বিতীয়তঃ শরীয়ত প্রণীত ইবাদাতের রূপরেখা ও পদ্ধতির সাথে বিদ‘আতের মিল তৈরী করা হয় সংখ্যা, আকার-আকৃতি, সময় বা স্থানের দিক থেকে কিংবা হুকুমের দিক থেকে। এ মিলগুলোর কারণে অনেকে একে বিদ‘আত মনে না করে ইবাদাত বলে গণ্য করে থাকেন।


আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে বলেনঃ
অতঃপর কোন বিষয়ে যদি তোমরা মতবিরোধ কর তাহলে তা আল্লাহ ও রাসূলের দিকে প্রত্যার্পণ করাও। (সূরা নিসা, আয়াত : ৫৯)
এ আয়াত থেকে বিদআত সম্পর্কে শিক্ষাঃ
১। যখন কোন বিষয়ে মত বিরোধ সৃষ্টি হবে তখন তার সমাধান আল্লাহ তাআলার কিতাব কুরআনুল কারীম ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর হাদীসে খুঁজতে হবে।
২। আল্লাহর বিধানে সমাধান না খুঁজে নিজেদের পক্ষ থেকে যুক্তি দিয়ে কোন বিষয় সংযোজন ও বিয়োজন করা যাবে না। কুরআন-সুন্নাহর মূল ধারার বাইরে কোন ব্যাখ্যা দাঁড় করানো যাবে না।বিদআতীদের তওবা বা কোনো আমল আল্লাহর নিকট গৃহীত হবে না, যতোক্ষণ না বিদআতী কর্মকান্ড থেকে সরে আসবে। যেসব ব্যক্তি বিদআত কাজে জড়িত আল্লাহ তাদের হাউজে কাউসারের পানি পান করাবেন না। আল্লাহ তাদের বলবেন, ‘যারা আমার দ্বীনকে পরিবর্তন করেছ, তারা দূর হও, দূর হও।’ (বুখারি, হাদিস: ৬৬৪৩)
বিদআতি আমলের পরিণামের বিষয়ে হজরতে জাবির (রাঃ.), রাসূল (সা.) থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, ‘নিশ্চয়ই সর্বোত্তম বাণী হচ্ছে আল্লাহর কিতাব এবং সর্বোত্তম পথ হচ্ছে মুহাম্মাদ (সা.)এর পথ, আর সবচেয়ে নিকৃষ্ট বিষয় হল দ্বীনের মাঝে নতুন কোনো কিছু সৃষ্টি করা অর্থাৎ বিদআত। আর এই ধরনের সকল বিদআতই গুমরাহী, আর প্রত্যেক গুমরাহীই জাহান্নামী’। (সহী মুসলিম- ৮৬৭)
উক্ত হাদীসে কয়েকটি বিষয়ে প্রমাণ বহন করে তার ভেতরে উল্লেখযোগ্য দুটি হল- ১. বিদআতের কোনো প্রকার হতে পারে না সকল প্রকার বিদআতই গুমরাহী এবং ২. প্রত্যেক বিদয়াতির শেষ ফলাফল জাহান্নাম।
বিদআতের সবচেয়ে ক্ষতিকর যে পরিণাম সে বিষয়ে হাসসান ইবনু আত্বিয়্যাহ (রহঃ.) বলেন, ‘কোনো জাতি যখনই দ্বীনের ভেতর কোনো বিদআত সৃষ্টি করে তখনই আল্লাহ তা’আলা তাদের থেকে সে পরিমাণ সুন্নত উঠিয়ে নেন, কিয়ামত পর্যন্ত সে সুন্নত আর ফিরিয়ে দেয়া হয় না’। (সহীহ দারেমী- ৯৮)
রাসূল (সাঃ) বলেছেন, ‘আমি তোমাদের আমার ও আমার পরবর্তী সঠিক পথপ্রাপ্ত খলিফাদের অনুসরণকে তাগিদ দিচ্ছি। তোমরা একে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরে থাকো। দ্বীনের মধ্যে নব-উদ্ভাবিত বিষয় সম্পর্কে সাবধান হও। কেননা প্রতিটি নব-উদ্ভাবিত বিষয়ই বিদআত। আর প্রতিটি বিদআত হচ্ছে পথভ্রষ্টতা।’ (মুসনাদে আহমাদ ও তিরমিজি)


রাসুল (সা.) এর মৃত্যুর পর থেকে এই পর্যন্ত ইসলাম বিধ্বংসী বিদয়াতের কারণে কত সুন্নতের বিলুপ্তি ঘটেছে একমাত্র আল্লাহই ভাল জানেন। তাই বিদআত থেকে আমাদের সকলেরই সতর্ক হতে হবে এবং আমাদের অন্য সকল মুসলিম ভাইদেরও সতর্ক করতে হবে। অল্প আমলেই যথেষ্ট যদি সেটা সঠিক হয়, তাই আমরা অল্প আমল হোক কিন্তু সর্বদা সঠিকটাই করব, আল্লাহ আমাদের সকলকে বিদআত থেকে হেফাজত করুন। আমিন।

নূর মোহাম্মদ নূরু
গণমাধ্যমকর্মী
নিউজ চ্যানেল :-& ফেসবুক
[email protected]
সর্বশেষ এডিট : ১৩ ই নভেম্বর, ২০২০ বিকাল ৪:০৩
১২টি মন্তব্য ১২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র - ভ্রাম্যমান লাইব্রেরী ভাবনা

লিখেছেন ইফতেখার ভূইয়া, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ৮:৪৬


শ্রদ্ধেয় আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যাররে হাতে গড়া প্রতিষ্ঠান বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র তার জন্মলগ্ন ১৯৭৮ সাল থেকে অনেকটা পথ পেরিয়ে এসেছে। আমার মনে পড়ে, আমি স্কুলে পড়াকালীন সময়ে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র থেকে স্কুল... ...বাকিটুকু পড়ুন

=একান্ত নিজস্ব জিনিসগুলো পর হয়ে যাচ্ছে=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ৯:৪৫



যে চোখ দিয়ে দেখেছি ধরার আলো, সে চোখও দিচ্ছে ফাঁকি,
যে চোখের আলোয় দেখেছি পুকুর নদী, শুকনো উঠোন;
বৃষ্টি ভেজা দিন, দেখেছি ময়না শালিক, ঘুঘু ডাকা দুপুর
সে চোখ পর হয়ে যাচ্ছে অল্প... ...বাকিটুকু পড়ুন

রবিন খুদারা কেন বাংলাদেশে বিনিয়োগ করেন না ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১১ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:২৩


Robin Khuda ঢাকার ছেলে। স্কুল পড়েছেন এই দেশেই। তারপর অস্ট্রেলিয়া গেছেন, AirTrunk বানিয়েছেন, Blackstone তাকে ১৬ বিলিয়ন ডলারে কিনে নিয়েছে, আর এখন তিনি ভারতে ৩০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্যা ফায়ার অফ মাই সউল

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১১ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৫:১৪

আমি যে ধরণের গান পছন্দ করি, সেগুলোর মাঝে ক্বারি আমির উদ্দিনের 'কুহু সুরে মনের আগুন' গানটি আমার খুব প্রিয়। এই গানটিকে সম্প্রতি ইংরেজিতে অনুবাদ করে গান বানিয়েছি, এনিমেশন... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমার ডক্টর যেন বাঁচে ১৫০ বছর.....

লিখেছেন শায়মা, ১১ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৪



ডক্টরস, হসপিটাল এবং ওষুধ এসব নিয়ে আমার তিক্ত অভিজ্ঞতার শেষ নেই। এ কারনে আমি একদম এদের কাউকেই পছন্দ করি না। তবে কিছু তো করার নেই। জীবনের নানা সময়ে ইচ্ছের... ...বাকিটুকু পড়ুন

×