
গল্প:শুভাকাঙ্ক্ষী
২০০৪ সাল।আমি তখন বরিশাল মহিলা কলেজে পড়ি। কলেজ হোস্টেলে থাকি।চারিদিকে পৌষ মাসের তীব্র শীত।শীতের হীম হীম ছোঁয়া মনে অনেক কিছু দোলা দিয়ে যায়।কারন বয়সটাও তখন কম। ইন্টারমিডিয়েট পরিক্ষা দিবো।একটা দুষ্টু মন মাঝে মাঝে পাগল হতে চায়। ইচ্ছে গুলো নিয়ন্ত্রনহীন নিজের আকাশে উড়ে বেড়ায় । মাঝে মাঝে স্বপ্ন গুলো অর্থহীন সমুদ্রে সাতার কাটে ।
এদিকে হোস্টেল সুপার আমাদের খুব কড়া শাসনে রেখেছে। প্রায় পাঁচশ ছাত্রী আছে হোস্টেলে।এতো গুলো মেয়েকে চোখে চোখে রাখা সত্যি কঠিন।
সে সময়টায় নতুন মানুষ কিংবা নতুন যে কোন কিছুতে পুলকিত হতাম সহজে।
হঠাৎ একদিন বুঝতে পারলাম কয়েকটা মেয়ের হাতে মোবাইল আছে। তারা মোবাইল দিয়ে অনেক ধরনের মজা করে।
সে সময় মোবাইল থাকা মানে অনেক কিছু। হোস্টেলে মোবাইল ব্যবহার নিষেধ ছিল। ওদের চুপি চুপি অনেক আনন্দ করতে দেখে আমারও মোবাইল ব্যবহার করতে ইচ্ছে করতো।একদিন আমার রুম মেট রোজ বাড়ি থেকে এসে আমাকে জানালো সে মোবাইল নিয়ে এসেছে। আমরা রোজ কে দুষ্টামি করে গোলাপি বেগম বলে ডাকতাম।
শীতের রাত। সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে । আমার রুম মেট রোজ একটা মোবাইল নাম্বার দিয়ে বলল , এটা আমার দুলা ভাইয়ের নাম্বার ।মিসকল দে ।যদি ফোন ব্যাক করে পরিচয় দিবি না । মজা করব ।
আমি একটু চিন্তা করে মিসকল দিলাম । কিছুক্ষন পর একটা কল এল । আমি মোবাইলটা রোজ কে দিলাম । ও মোবাইল কানে নিয়ে কথা শুনল ।
তারপর বলল ,আল্লাহ্ । ভাইয়া আমাকে চিনেন নাই । আমি রোজ আপনার শালিকা।
ওপাশের কণ্ঠস্বর বলল , বাহ ।ভাল তো । বিয়ে না করতেই শালিকা পেয়ে গেলাম ।
রোজ বলল , আমি সব খুলে বলছি ।আমি আসলে মজা করছিলাম ।
ওপাশের কণ্ঠস্বর বলল , এখন অনেক শীত । সব খুলতে হবে না । আপনি এমনি বলেন ।
এ কথা শোনার সাথে সাথে রোজ মোবাইলটা আমাকে দিয়ে দেয় । আমি ঠান্ডা গলায় হ্যালো বললাম । সে খুব ভদ্র ভাবে বলল ,মনেহয় রং নাম্বার । আমার নাম সুখন । আমি সিলেট থেকে বলছি ।
আমি পুরো ঘটনা বুঝিয়ে বললাম । সে ও ভুল বুঝাবুঝির জন্য দুঃখ প্রকাশ করল । সেদিন এমন করেই কথা শেষ হল ।
তারপর দুইদিন পর । ঠিক রাত দশটার দিকে মোবাইল ফোনটা এল । আমিই ফোনটা রিসিভ করলাম ।
সুখন বলল , হ্যালো আমি সুখন । আপনার সাথে একটু কথা বলতে পারি
আমি বললাম , বলেন । কি বলতে চান ।
সুখন বলল , এই তো । আমরা কি পরিচিত হতে পারি ।
আমি বললাম , ঠিক আছে ।কোন সমস্যা নেই ।
সুখন জিজ্ঞেস করলো , আপনার নামটা কি জানতে পারি ।
আমি একটু থামলাম । আসল নাম বলব কি না চিন্তা করতে সময় নিলাম ।
সুখন আবার বলল , আচ্ছা ঠিক আছে বলতে হবে না । সমস্যা থাকলে দরকার নেই ।
আমার কাছে মনে হল ছেলেটার ভদ্রতা আছে । তারপর বললাম , আমার নাম সুষমা মনোহারিণী ।
সে উৎফুল্ল হয়ে উঠল, বাহ বেশ সুন্দর নাম । প্রথমেই মিলে গেছে ।
আমি জিজ্ঞেস করলাম , মানে । প্রথমেই মিলে গেছে । বুঝলাম না ।
সুখন বলল , আপনার আর আমার নামের প্রথম অক্ষর মিলে গেছে ।
কথা বলতে বলতে সে বলল , আচ্ছা আপনি কখন ঘুমাতে যাবেন । আমি কি বারটার পর কথা বলতে পারি ।এখন একটু ব্যস্ত ।
আমি বললাম , ঠিক আছে । আমার ও ঘুমাতে অনেক দেরি হয় ।
রাত বারটার পর সে আবার ফোন দিল । আর ওদিকে হোস্টেলের সবাই কানাঘুষা করতে শুরু করল – ও আল্লাহ সুষমা এত খারাপ । একটা অপরিচিত ছেলের সাথে রাতে কথা বলছে ।
আমি মান সম্মানের ভয়ে তাকে জানালাম , আমি আসলে রাতে কথা বলতে আগ্রহী নয় ।
এরপর রাত ১ টা ১ মিনিটে সে বলল ,আচ্ছা ।সমস্যা নেই ।
একটা এসএমএস দিল ।
শুভ রাত্রি ।স্বপ্ন গুলো সুন্দর হউক ।
তারপর অনেক দিন ও কোন ফোন দেয়নি । কিন্তু প্রতিদিন মধ্যরাতে একটা এসএমএস পেতাম । এক বা দুই লাইনের বেশি কিছু লিখত না । কিন্তু খুব সুন্দর সব শব্দ আর কথা থাকতো । মনের ভিতরে খুব ছুঁয়ে যেতো । আমি ধীরে ধীরে অনুভব করলাম আমি যেন রাতের সে এসএমএস টার জন্য অপেক্ষা করি । এমন কি এসএমএস পেয়ে আমি দশ থেকে পনের বার পরতাম । আমার খুব ভাল লাগত । কিন্তু কেন জানি কখনও প্রতিউত্তর দেওয়া হয়নি । কখনও নিজ থেকে ফোন ও দেওয়া হয়নি । এভাবে ছয় মাস কেটে গেল ।
হঠাৎ একদিন এসএমএস টা এল না । আমি অপেক্ষা করতে করতে ঘুমিয়ে গেলাম ।
পরের দিন ক্লাস শেষে দুপুরবেলা খেয়ে শুয়ে আছি ।এমন সময় ছেলেটার কথা মনে পড়ল ।নানা রকম ভাবনা কাজ করল । ছয় মাসে একদিন ও বাদ যায়নি । তবে কেন আজ এসএমএস টা এল না । কে সে ।
কেন সে আমাকে এতোদিন মনে রাখল । আবার মনে হতে লাগল । ছেলেটা নিশ্চয়ই ভাল । আমার ভাল লাগে না বলে কোনদিন ফোন দিয়ে বিরক্ত করেনি । এমন অনেক রকম ভাবনায় যখন ডুবে যেতে লাগলাম । ঠিক তখন ফোনের রিংটোন টা বেজে উঠল । আমি দেখলাম সে নাম্বার থেকে কল এসেছে । খুব অবাক হলাম ।
অনেক কৌতূহল নিয়ে বললাম , হ্যালো ।
সুখন বলল ,কেমন আছেন সুষমা
আমি উত্তর দিলাম ,এই মুহূর্তে খুব ভাল । আপনি
সে বলল , অনেকটা আপনার মতোই ।
এইভাবেই কথা শুরু হল । ধীরে ধীরে কথার পরিমান বেড়ে গেল । আপনি থেকে আমরা পরস্পরের কাছে তুমি হয়ে গেলাম । বেশির ভাগ সময়ে রাতে কথা হতো । সারাদিন কি করলাম ,কোথায় গেলাম , ফ্যামিলি , ফ্রেন্ডস ,নিজের যাপিত জীবন আর শখে কথা । ও বই পড়তে ভালবাসত । অনেক ইংরেজি লেখকের বই পড়তো । যাদের নাম আমি কখনও শুনিনি । সে সব গল্প খুব সুন্দর করে বলতো । আমি মুগ্ধ হয়ে শুনতাম । কথা বলতে বলতে এমন হতো ভোরের আযান দিয়ে দিয়েছে । ওর সাথে কথা না বলে থাকতে পারতাম না ।
একদিন না খেয়ে না খেয়ে থাকতে পারি । কিন্তু ওর সাথে কথা না বলে থাকতে পারি না ।আন্তরিকতা ,সম্মান আর ভাললাগা বেড়েই গেল । বুঝলাম মানুষটাকে খুব বেশি ভালবেসে ফেলেছি । এভাবেই কথায় কথায় চলে যেতে লাগল সময় গুলো । এরপর ২০০৭ সাল । আমি থাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই । বাসা থেকে সিলেট ট্যুরে যাবার সিদ্ধান্ত হল । আমিতো খুশিতে পাগল প্রায় । ওকে কিছু জানালাম না । সব দিনের মতো সেদিনও কথা বললাম ।
বাইরের আওয়াজে সে জিজ্ঞেস করল , কোথায় যাও ।
আমি বললাম, বাড়িতে । তবে আমার নয় ।তোমার বাড়িতে ।
সে আনন্দে চিৎকার করে উঠল । বিশ্বাস করতে চাইল না । চমকে উঠে আমাকে জিজ্ঞেস করল ,তুমি সিলেট আসছ । আমি শান্ত ভাবে বললাম , কালকে সন্ধ্যায় আমাদের হোটেলে আসো ।তখন সত্য মিথ্যা বুঝা যাবে । তারপর সারারাত আমরা সবার চোখ লুকিয়ে কথা বললাম । সকালে সিলেট যাওয়ার পর কিভাবে পরিবারের লোকজন কে জানাব বুঝতে পারছিলাম না । পরিক্ষার হলে কিছু না পারলে টেনশনে তল পেটের নিচে কেমন মোচড় দিয়ে উঠতো ।সেদিনও তেমন অস্থিরতা কাজ করছিল । অনেক ভেবে আমার বড় ভাইকে জানালাম যে সিলেটের এক বন্ধু দেখা করতে চায় । তিনি জানালেন রিসেপশনে আসতে বল ।
সন্ধ্যা ৭ টায় একটা মোটর সাইকেল হোটেলের সামনে থামল । খুব সুদর্শন আর আত্মবিশ্বাসী এক ছেলে মোটরসাইকেল থেকে নামল । আমার বুঝতে বাকি রইল না । সে হাসি মুখে সামনে এসে বলল , সুষমা ।
আমি বললাম ,হ্যাঁ । আমার বড় ভাই ।
আমার ভাইয়ের সাথে সাধারন পরিচয় হল ।তারপর ভাইয়া কি যেন কাজে বাইরে গেল । আমরা খুব অল্প কিছু সময় বসে কথা বললাম ।ঢাকায় ফেরার পর আগের মতোই কথা চলতে লাগলো । কিন্তু আমার মনে মনে অনেক জটিলতা কাজ করতে লাগল । কেন না ও উচ্চবিত্ত ঘরের ছেলে ,পেশায় ইঞ্জিনিয়ার আর অনেক প্রতিষ্ঠিত হওয়ার স্বপ্ন দেখে ।আর আমি মধ্যবিত্ত ঘরের সাধারন চেহারার মেয়ে । নিজের ভিতরেই কেমন একটা দূরত্ব তৈরি হল । নিজেদের কে কেমন লাগল মুখে বলা হয়নি । তাই ভাবলাম একটু কথা কমিয়ে দূরত্ব তৈরি করি ।তাহলে ওর সত্যিকারের অনুভূতি বা প্রতিক্রিয়া বুঝা যাবে ।
কিন্তু ও কোন প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করল না । নিজ থেকেও ফোন দেওয়া কমিয়ে দিল । মনে মনে ভাবলাম ।হয়ত আমাকে ভাল লাগেনি কিংবা আত্মসম্মানের কারনে দিচ্ছে না ।প্রায় বিশ দিন কথা হল না । আমার দিন গুলো খুব খারাপ কাটতো । বুকের ভিতরটা ভার হয়ে আসতো । তারপর ধীরে ধীরে পড়াশুনা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে গেলাম । হঠাৎ একদিন রাত তিনটার দিকে ও ফোন দিল । ওর কণ্ঠটা ভাঙা ।
আমাকে বলল ,তোমাকে কি এতো রাতে বিরক্ত করলাম ।
কেন জানি আমি ওকে কিছুই বলতে পারলাম না । শুধু বুকের ভিতর কিছু ভেঙ্গে যাওয়ার শব্দ শুনতে পেলাম ।আমি চুপ করে রইলাম ।
ও আবার বলল , সম্পর্কটা আমিই শুরু করেছিলাম ।কিন্তু শেষ করতে পারলাম না ।আমাকে ক্ষমা করে দিও ।কাল আমি লন্ডন চলে যাচ্ছি । আচ্ছা আমাদের বয়স যখন ষাট হবে তখন তুমি বেঁচে থাকলে তোমাকে আমি ফোন দিব । আমাকে চিনবে তো ।আমার জন্য মন খারাপ করোনা ।অনেক ভাল ছেলে তোমার জন্য অপেক্ষা করছে । তারপর অনেকক্ষন চুপ করে রইল ।
আমি তখনও কিছু বলতে পারলাম না ।শুধু মুচকি হাসলাম। কিন্তু আমার চোখ দুটো হাসলো না ।
অনেক বছর পর । আমি প্রথম মা হয়ে বাসায় ফিরেছি ।হঠাৎ সে আমাকে ফোন করল । খুব গভীর ভাবে বলল , তোমাকে খুব মনে পড়ল ।
আমি জিজ্ঞেস করলাম ,বিয়ে করনি ।বয়স তো কম হল না ।
ও নির্বিকার ভাবে উত্তর দিল ,না ।তুমি জানো না আমি তো চিরকুমার থাকবো ।
তারপর আমি আমার বাচ্চা ,ঘর আর স্বামীর গল্প করলাম । এরপর ফেসবুক বন্ধু হলাম । এক দুই বছর পর পর ও আমাকে ফোন দেয় । ফেসবুকে তেমন কোন যোগাযোগ হয় না । কিন্তু টাইম লাইনে আমরা দুজনেই দুজনের পাল্টে যাওয়া জীবন ছবি দেখি ।পাল্টে যাওয়া ভালবাসা গুলো এমন করে গোপনেই পাল্টে যাক ।
হয়ত আজ আমি ওকে ভালবাসি না । আবার ভাল ও বাসি । তবে একটা অজানা অনুভূতি কাজ করে ।খুব আপন করে গোপনে । যেটা থাকবে সব সময় । যেটার ব্যাখ্যা কারও দেওয়া সম্ভব নয় ।
তাই আজ আমরা একে অপরের শুধুই শুভাকাঙ্ক্ষী ।
সর্বশেষ এডিট : ০৪ ঠা মার্চ, ২০১৭ রাত ১১:০৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


