আর একটা ব্যাপার আমরা জানি যে আমেরিকায় আইন বা আইনি শাসন সবার ঊপরে । কয়েকদিন আগে আমার এক আত্মীয় গাড়ী কিনবে, তাই এক কার-ডিলারের কাছে গিয়েছিলাম । লোকটির বাড়ী লেবাননে। নাম নাবিল আহমেদ । লোকটির সংগে অনেক বিষয়ে কথা হল ।কতদিন আমেরিকায় আছেন -এই প্রসঙ্গে যা বলল তা’আমি শুনে তাজ্জব । আহমদ আগে এই Car-শপের কর্মচারি ছিল না। মালিক ছিল একজন ইহুদি । ১০|১৫ বছর আগে নাকি প্যালেসটাইন এর সঙ্গে লেবাননের সংঘর্ষ হয়। আহমদের কথায়’ “রাজনৈতিক এই ঘটনার জের হিসাবে সেই দোকানের ইহুদি মালিক গুলিভরা পিস্তল নিয়ে আমাকে তাড়া করল মারবার জন্য । মালিক ধরা পড়ে গিয়েছিল। বিচারে মালিকের ১৫ বছরের জেল হল। এখন তার দোকানের পুরাপুরি মালিক এখন আমি । সেই ইহুদি জেল থেকে চেয়েছিল মিউচুয়াল করার জন্য। নাবিল তার জন্য চেয়েছে ৫০ লাখ ডলার যা সেই মালিকের ক্ষমতার মধ্যে এখন নেই” । ধন্যবাদ দিচ্ছি আমেরিকার বিচারক ও বিচার-ব্যবস্থাকে । প্রমানিত হলে অপরাধীর কোনো ছাড় নেই বা অর্থ দিয়ে বা প্রভাব খাটিয়ে বাঁচা যাবে না ।
আমেরিকাতে সরকারী ছুটির দিন খুব কম । ৫-৬টা উৎসব । একত্রিশে অক্টোবর রাতে যে উৎসব হয় তা’ হল হলউইন । একমাস আগে থেকে ২৫০ গ্রাম থেকে ১০-২০ কিলো ওজনের কুমড়ো বিক্রি হচ্ছে । কুমড়ো গুলো কেটে কেটে ভুত তৈরী করে বাড়ীর সামনে সাজানো থাকে । এ দিন রাত্রে ভুতুড়ে ফিল্ম দেখা,অদ্ভুত অদ্ভুত পোষাক পরে ঘোরা আর নিজেদের বাড়িকে ভুতুড়ে পরিবেশ বানানোতে হলউইন এর মজা ।পুর্বপুরুষদের আত্মারা এই দিন আসে বলে এদের বিশ্বাস । এরপর নভেম্বর এর চতুর্থ বৃহস্পতিবার হল থ্যাংকসগিভিং ডে । কেউ কেউ টার্কি ডে বলে । ‘ফসল কাটার পর ধন্যবাদ’ থেকে এই উৎসব শুরু হয়েছিল। ১৬২১ খৃষ্টাব্দে ভার্জিনিয়াতে প্লাইমাউথের নয়া বাসিন্দারা নেটিভ আমেরিকানদের কাছ থেকে চাষ শিখে প্রথম ফসল কাটা উৎসব পালন করে ছিল । এ দিন ভাল মন্দ খাওয়া বিশেষ করে ৭-৮ কিলো ওজনের টার্কি মুরগী খাওয়া বা খাওয়ানো এই উৎসবের অংগ। আমাদের এক প্রতিবেশী ৫/৭ কিলো ওজনের ড্রেসিং করা একটি টার্কি মুরগী উপহার দিল । হালাল কিনা ভেবে আমরা অন্য এক আমেরিকান প্রতিবেশী কে সেটা চালান করে দিলাম । বিমানে যাত্রা থেকে শুরু করে ফিরে না আসা পর্যন্ত চোখ কান খোলা না রাখলে হারাম পেটে যাবার খুব সম্ভাবনা । প্যাকেট ড্রাই ফুডসের ভিতরে কি আছে তা গায়ে লেখা কম্পোজিসন থেকে,
চকলেট, টুথ পেষ্ট ও অন্যান্য খাবারের গায়ে সাংকেতিক কিছু অক্ষর দেখে চিনতে হবে,সেটা হারাম না হালাল ।
Pumpkins were dressed as witches Halloween day
ডিসেম্বর এর উৎসব হল এক্স-মাস ডে বা ২৫ শে ডিসেম্বর। বাজারে বিভিন্ন ধরনের মাল আমদানী হয় ও পশরা লাগে,যেমন আমাদের দেশে ঈদ বা পুজোতে বাজার জমজমাট থাকে। বাড়িতে বাড়িতে খৃষ্টমাস-ট্রি আলো দিয়ে সাজানো থাকে । বাড়ির সংলগ্ন ঘাসের বাগানে আলোর হরিণ বা সান্তা ক্লজ সাজানো । খ্রীষ্টমাসের দু-পাঁচ আগে,কোনদিন ঠিক মনে নেই, বিরাট ট্যাবলো মিছিল বের হয় । দেখার মতো মিছিল । কত রকমের সাজ-সজ্জা বিশেষ করে যীশুর জীবনের ঘটনা ও স্যান্টাক্লারা দাদুর নকল কোরে , আলোক সজ্জা কোরে গাইতে গাইতে নাচতে নাচতে চলতে থাকে ট্যাবলো । লম্বা লম্বা গাড়ির উপর ট্যাবলোগুলি সাজানো থাকে । পয়লা জানুয়ারী তো সারা বিশ্বে নববর্ষ উৎসব পালিত হয়। মনে হয় এদের তুলনায় আমাদের দেশে আমরাও কোনো কম করি না । ছুটির দিনগুলিতে রাস্তায় গাড়ি-ঘোড়া কম চলে । শনি রবিবারে বোট নিয়ে কেউ কেউ শহরের বাহিরে, লেকে স্পীড বোট নিয়ে বাইচ কোরতে যায় । সারা বছর চাকা-লাগানো এই সব নৌকাগুলো ঘরের সামনে পড়ে থাকে। লেকে যাবার সময় অন্য গাড়ীর সঙ্গে বেঁধে টেনে নিয়ে যায় । পয়লা জানুয়ারিতে টি.ভি তে নানা অনুষ্ঠান প্রচারিত হয় । প্রধান অনুষ্ঠান হয় রাত ১২টায় । অবশ্য আমাদের দেশেও অনেকে পয়লা জানুয়ারীতে ফুর্তিতে ওদের থেকে কম যায় না ।
স্বাধীনতা দিবস হল ফোর্থ জুলাই । ১৭৭৬ সালের ৪ঠা জুলাই ব্রিটিশ সরকারের নাগপাশ থেকে স্বাধীনতা লাভ করে । এখানে এরা বলে ফেডারেল হলিডে । রাজধানীতে নানা রং-বেরং প্যারেড হয় । রাত্রে কোনো পার্কে অথবা লেকের পাড়ে আলোর হাউই বাজি,পটকা ফাটানো হয় । প্রচুর জনসমাগম হয় দেখার জন্য। কেউ কেউ পিকনিক করতে পাহাড়ের কোলে অথবা পার্কে যায় ।
পিকনিকের খাদ্য তালিকার মধ্যে অবশ্য-ই থাকে বার-বি-কিউ । গো-মাংস বা ড্রেস করা আস্ত মুরগী মশলা মেখে কাঠের আগুনে বিশেষ প্রকৃয়ায় পোড়ানোকে বার-বি কিউ বলে । খেয়ে দেখেছি,শিক-কাবাবের মত লাগে ।
আমেরিকানদের জীবনযাপন পদ্ধতি ব্যক্তি কেন্দ্রিক । আমাদের দেশে বলি ওল্ড ইজ গোল্ড । এখানে কিন্তু ওল্ড ইজ বোল্ড । কাজে কর্মে অবসরের কোনো বয়স নেই । কিন্তু ৬৫ বৎসর বয়স হলে এবং নিজের নামে গাড়ী-বাড়ী না থাকলে সরকারী পেনশন ও মেডিক্যাল সাহায্য পেতে পারে । বুড়ো-বুড়ি তখন হোমে অথবা আলাদা ঘর নিয়ে থাকে। সপ্তাহে বা মাসে ছেলে মেয়েরা দেখে যায় । এখানে দেখেছি হোটেল ব্যবসা খুব ভাল চলে । কেননা এরা স্বামী-স্ত্রী ও ছেলে মেয়েরা সবাই ডিনার খায় হোটেলে গিয়ে । সকালের ব্রেকফাস্ট বাড়িতে তৈরী করে । যে যখানে কাজকরে লাঞ্চ করে সেখানে । সন্ধার পর খাওয়া হোটেলে । একদিন আমাদের এক আমেরিকান প্রতিবেশী আমাদের ঘরে এসে ভাত তরকারী রান্না করতে দেখে অবাক হয়ে জিগ্যাসা করল তোমরা প্রত্যেক দিন এত কষ্ট কর এবং সময় নষ্ট কর । এদের সমাজে ডাইভোর্সের সংখ্যা নেহাত কম নয় । কাগজে কলমে শতকরা প্রায় ১২-১৫ ভাগ । বাস্তবে আরও বেশী হতে পারে । মেয়েরাই ডাইভোর্স করতে উৎসাহিত হয় বেশী। ডিভোর্স করলে মেয়েরা খোরপোস পাবে, আর পাবে স্বাধীন জীবন । আমেরিকায় যা আমাদের ভাল লাগবে তা হল এখানকার প্রাকৃতিক পরিবেশ আর নিরবিচ্ছিন্ন সস্তায় বিদ্যুত ও পানীয় জলের অঢেল ব্যবস্থার জন্য । নিয়তির রোষে আমেরিকায় প্রতি বছর ধ্বংশের পরিমান কিন্তু কম নয় । দাবানল আর জলোচ্ছাস কোথাও না কোথাও হবেই হবে ।
( সমাপ্ত )
সর্বশেষ এডিট : ০৪ ঠা আগস্ট, ২০১১ দুপুর ১২:৫৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


