লন্ডনের মায়াময় সপ্ন আর সপ্নের লণ্ডনের মায়াজাল ছড়িয়ে সিলেট অঞ্চল জুড়ে এখন ক্রমশঃ বিতৃত হচ্ছে ‘লন্ডনী বিয়ে’ বাণিজ্যের অভিনব প্রতারনার ফাঁদ। যুক্তরাজ্য,যুক্তরাষ্ট্র,কানাডা সহ দুরপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের ‘সিটিজেন’ বাংলাদেশী বংশোদ্ভুত প্রবাসীদের সাথে বাংলাদেশে বসবাসরত বিবাহযোগ্য ছেলে মেয়েদের বিয়ে দেয়ার নাম করে ভদ্রবেশী এসব প্রতারকরা ভেঙ্গে দিচ্ছে হাজারো তরুন-তরুনীর সপ্ন।
হাতিয়ে নিচ্ছে কোটি কোটি টাকা। বিয়ের নামে এমন নির্মম প্রতারনার সাথে কিছু বিকৃতরুচির প্রবাসীদের পাশাপাশি জড়িত রয়েছে বিয়ের ঘটক ও ম্যারেজ মিডিয়া নামধারী প্রতারকচক্র। এসব প্রতারকচক্রের খপ্পরে পড়ে সিলেটের চার জেলার হাজারো তরুন-তরুনী ও তাদের পরিবার আর্থিক,সামাজিক ও মানষিকভাবে চরম ক্ষতির শিকার হয়েছেন বলে জানা গেছে।
তথ্যানুসন্ধান ও ক্ষতিগ্রস্থ একাধিক তরুন তরুনীদের সাথে আলাপকালে জানা গেছে, সিলেট বিভাগজুড়ে শুধুমাত্র লন্ডনী বিয়ের ঘটকালির নামে একটি সংঘবদ্ব চক্র দেশে বিবাহযোগ্য সুন্দরী ও সুদর্শন তরুন তরুনীদের টার্গেট সিটিজেন বিয়ের নাম করে কয়েকলাখ টাকার চুক্তি করে মাঠে নাম
"কিছুদিন আগে সিলেটের বিয়ানীবাজারের এক লন্ডন প্রবাসী বৃদ্ধ তার প্রতিবন্ধী ছেলের জন্য এক এক করে ঘরে আনেন তিন সুন্দরী পুত্রবধু। বিয়ের পর তার তিন পুত্রবধুকে নিজের প্রাসাদোপম অট্টালিকায় আটকে রাখেন।একপর্যায়ে পুত্রবধুদের সাথে অনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করতে গেলে পুত্রবধুরা ঐ শশুরের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। পুত্রবধুর মামলায় কারাগারেও যেতে হয় শশুরকে।"
লন্ডন আমেরিকা ও কানাডা প্রবাসী পরিবারে বিয়ে হলে ছেলে-মেয়ে সুখে-স্বাচ্ছন্দে থাকবে,এমনকি অভিভাবকরাও পাবেন কাড়ি কাড়ি ডলার পাউন্ড এমন প্রলোভনের ফুলঝুরি ছড়িয়ে প্রলুব্ধ করা হয় অভিভাবকদের। বিনিময়ে বিয়ের আগেই প্রবাসী বর-কনেদের মামা,চাচা, খালা বা ভাইবোনদের দেয়ার কথা বলে বিয়ের আগেই আদায় করে নেয়া হয় মোটা অংকের টাকা।
প্রতারকচক্র ভুয়া লন্ডনী বর-কনে সাজিয়েও প্রতিনিয়ত বিস্তৃত করছে প্রতারনার ফাঁদ। এছাড়া ছেলে মেয়ে বিয়ে দেওয়ার পর অনেক প্রবাসী বৃদ্ধ দেশে এসে অল্পবয়সী মেয়েদের বিয়ে করেন। আবার আগের দুই-তিনটি বিয়ে গোপন করে অনেক লন্ডনী কন্যা দেশে এসে বিয়ের পিড়িতে বসেন এমন অভিযোগও কম নয়।
কিছুদিন আগে সিলেটের বিয়ানীবাজারের এক লন্ডন প্রবাসী বৃদ্ব তার প্রতিবন্ধী ছেলের জন্য এক এক করে ঘরে আনেন তিন সুন্দরী পুত্রবধু। বিয়ের পর তার তিন পুত্রবধুকে নিজের প্রাসাদোপম অট্টালিকায় আটকে রাখেন।একপর্যায়ে পুত্রবধুদের সাথে অনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করতে গেলে পুত্রবধুরা ঐ শশুরের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। পুত্রবধুর মামলায় কারাগারেও যেতে হয় শশুরকে। তখন বিষয়টি নিয়ে দেশজুড়ে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়।
গত ২৬ জুন রাতে সিলেট শহরের একটি বাসা থেকে ভুয়া লন্ডনী কন্যা সাজিয়ে বিয়ের সময় চাঁদনী বেগম(২০) নামে এক ভুয়া লন্ডনী কন্যা সহ ঘটক সোহেল (৩৫) ও রুনু বেগম নামে তিন জনকে বিয়ের আসর থেকে আটক করে পুলিশ।
এর আগে ১৮তম বিয়ে করতে যাওয়ার সময় ২৫ জুন ১৭তম স্ত্রী সহ জনতার হাতে ধরা পড়ে হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলার মোস্তফাপুর গ্রামের লন্ডন প্রবাসী মইনুল ইসলাম।
সর্বশেষ গত ২ জুলাই রাতে সিলেট নগরীর একটি হোটেলে তৃতীয় বিয়ের অনুষ্ঠান থেকে দ্বিতীয় স্ত্রী ও তার স্বজনদের সহযোগীতায় আব্দুল বাছিত চৌধুরী (৪০)নামে এক যুক্তরাজ্য প্রবাসী ও তার পিতা সহ ছয়জনকে আটক করে পুলিশ।
মৌলভীবাজার সদর থানা পুলিশ সম্প্রতি ভুয়া লন্ডনী কন্যা সাজিয়ে প্রতারনার মাধ্যমে বিয়ের সময় একটি সংঘবদ্ধ চক্রকে আটক করে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মৌলভীবাজার শহরতলীর এক তরুন (২৮) রেডটাইমস বিডি ডটকমকে জানান, ২০০৫ সালে একই গ্রামের এক যুক্তরাজ্যপ্রবাসী পরিবারের এক তরুনীর সাথে পারিবারিকভাবে বিয়ে হয় তার। বিয়ের ঘটকালীবাবদ তরুনীর এক বড়ভাইকে দিতে হয় চারলক্ষ টাকা। বিয়ের মাসখানেক পর তার স্ত্রী লন্ডন ফিরে গেলেও তাকে লন্ডনে নিতে নানা গড়িমসি শুরু করে তার স্ত্রী ও শশুরবাড়ির লোকজন।
নানা সালিশ বৈঠকের পর তাকে লন্ডনে নেয়ার খরচ বাবদ আরও তিনলাখ টাকা পরিশোধের পর ২০০৮ সালের জানুয়ারীতে তাকে লন্ডনে নেয়া হয়। সেখানে যাওয়ার পর তার স্ত্রী ও শশুরবাড়ির লোকজনের আচরনে হতবাক হন ওই তরুন।
তিনি রেডটাইমস বিডি ডটকমকে জানান,তাকে তার শাশুড়ি কাজ জুটিয়ে দেন পুর্ব লন্ডনের একটি বাঙালী রেষ্টুরেন্টে। প্রতি সপ্তাহে পারিশ্রমিকের ১২০ পাউন্ডের পুরোটাই নিয়ে যেতেন তার স্ত্রী ও শাশুড়ী। তিনি কয়েকবার প্রতিবাদ করতে গেলে তার স্ত্রীর ভাইয়েরা তাকে মারধোর করে পুলিশে ধরিয়ে দেওয়ার ভয় দেখায়।
কান্নাজড়িত কন্ঠে তিনি আরো জানান,তার স্ত্রী অনেক রাতেই ঘরে ফিরতো না। রেষ্টুরেন্টের সব কাজ শেষ করে বাসার কাপড় ধোঁয়া থেকে শুরু করে সব কাজই করতে হতো তাকে। পরে ২০০৮ সালের মধ্য নভেম্বরে লন্ডন সিটির শশুরালয় থেকে পালিয়ে যান তিনি।
আশ্রয় নেন কার্ডিফের এক দুরসম্পর্কের এক চাচাতো ভাইয়ের রেষ্টুরেন্টে। কিন্তু তার স্ত্রীর দায়ের করা নির্যাতন মামলায় জেলে যেতে হয় তাকে। পরে ২০০৮ সালের ৪ ডিসেম্বর দেশে ফিরে আসেন তিনি।
এদিকে ২০০২ সালে ২০ জুলাই মৌলভীবাজার শহরের অবসরপ্রপ্ত ব্যাংক কর্মকর্তার কলেজপড়ুয়া কন্যা সোনিয়ার (২৩)( ছদ্মনাম) বিয়ে হয় নবীগঞ্জের এক যুক্তরাজ্য প্রবাসী যুবকের সাথে। বিয়ের পর জানা যায়,লন্ডনের ম্যানচেষ্টারে সোনিয়ার স্বামীর স্ত্রী সন্তান রয়েছে। স্বামী লন্ডন ফিরে যাওয়ার পর আস্তে আস্তে সোনিয়ার সাথে সব যোগাযোগই বন্ধ যায়। বিয়ের সাত বছর পেরিয়ে যাওয়ার পরও স্বামীর ফেরার পথ চেয়ে এখনো অপেক্ষায় রয়েছেন সোনিয়া।
লন্ডনী বিয়ে সংক্রান্ত এসব বিষয়ে মৌলবীবাজার-৩ আসনের সাংসদ মুক্তিযোদ্ধা সৈয়দ মহসীন আলী শনিবার রেডটাইমস বিডি ডটকমকে জানান, বিয়েকে বিয়ে হিসেবেই দেখা উচিত। আর প্রতারনার ঘটনা হয়তো ঘটছে কিছু কিছু ক্ষেত্রে।এজন্য আমাদের পুরো প্রবাসী কমিউনিটিকে দায়ী করার কোন যৌক্তিকতা নেই। এজন্য সর্বাগ্রে আমাদের সমাজে,অভিভাবক মহলে সচেতনতার দরকার। আর বিদেশে জন্ম নেয়া বা বড় হওয়া তরুন তরুনীদের সাথে অনেক ক্ষেত্রেই আমাদের দেশে বড় হওয়া ছেলে মেয়েদের মানসিকতার বা চিন্তার দুরত্ব থেকে যায়। সেকারনেই এসব বিয়ে কোন কোন ক্ষেত্রে ভেঙ্গে যায়।
যুক্তরাজ্য পররাষ্ট্র ও কমনওয়েলথ অফিসের কনস্যুলার সার্ভিসের পরিচালক জুলিয়ান ব্রেইথওয়েইট সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে জানান, সিলেটে ফোর্স ম্যারেজের হার আস্তে আস্তে কমছে। আগে বছরে এ সংক্রান্ত ৬৫টি অভিযোগ পাওয়া গেলেও চলতি বছরে এখন পর্যন্ত অভিযোগ পাওয়া গেছে মাত্র ১২টি।
এদিকে ফোর্স ম্যারেজ হার কমে এলেও বহুবিবাহ কমছে না বলে জানা গেছে। আর একারনে অনিশ্চয়তা আর নিপীড়নের কারনে অনিশ্চয়তার বর্তে আটকে যাচ্ছে অনেক তরুন-তরুনীর জীবন।
রেডটাইমস বিডি ডটকম/প্রতিনিধি/আরবিএম

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


