মাঠ প্রশাসনে উপজেলা চেয়ারম্যানদের হাতে লাঞ্চিতও হতে চাননা প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা। প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা নির্বাহী বিভাগের পদগুলোতে কর্মরত জুডিশিয়াল ক্যাডারের কর্মকর্তাদের প্রত্যাহার চান।
এনিয়ে প্রশাসন ক্যাডারের বিভিন্ন পর্যায়ের দুই শতাধিক কর্মকর্তা রবিবার আইন মন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাদের ক্ষোভের কথা জানিয়েছেন। একই সঙ্গে প্রশাসন ক্যাডারকে রক্ষায় প্রয়োজনীয় আইন-কানুন তৈরির ও মোবাইল কোর্ট আইন-২০০৯ দ্রুত অনুমোদনের দাবী করেছেন।
তাদের অনেক দিনের জমানো ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছেন আইনমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের মাধ্যমে। এর বদলে এসব পদে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের পদায়নের দাবি করেছেন।
প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা দাবী করেন, বিচার বিভাগ পৃথকীকরনের পর নানা কারনে আমাদের ক্ষমতা অনেক কমে গেছে। তাই মাঠ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছি। এজন্য সিভিল প্রশাসন চালানোর মতো ক্ষমতা দরকার। জনগণ আমাদের কাছ থেকে অনেক কিছু আশা করে। তাদের প্রয়োজন মেটাতে পারছি না। এখনই নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের ক্ষমতায়ন করা না হলে দেশ গভীর সঙ্কটের মুখে পড়বে। আইন মন্ত্রী প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের বক্তব্য মনযোগ দিয়ে শোনেন এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস দেন।
আইন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, রবিবার সকাল সাড়ে দশটায় পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব মোজাম্মেল হোসেন খান, ঢাকার বিভাগীয় কমিশনার ড. খোন্দকার শওকত হোসেন ও ঢাকার ডিসি জিল্লার রহমানের নেতৃত্বে ২০ সদস্যের একটি দল আইন মন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে যান।
তারা আইন মন্ত্রীর দপ্তরে বৈঠক শুরু করলে প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আইন মন্ত্রীর বৈঠক হচ্ছে সংবাদটি জেনে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও অধিদপ্তরে কর্মরত প্রশাসন ক্যাডারের দুই শতাধিক কর্মকর্তা আইন মন্ত্রণালয়ে ছুটে আসেন। এরপর আইন মন্ত্রী মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে প্রশাসন ক্যাডারের উপস্থিত কর্মকর্তাদের নিয়ে আসেন।
এ সময় আইন সচিব কাজী হাবিবুল আউয়ালসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। এরপর বেলা ১১ টায় প্রশাসন ক্যাডারের সঙ্গে আইন মন্ত্রীর বৈঠক শুরু হয়।
সূচনা বক্তব্যে ঢাকার বিভাগীয় কমিশনার খোন্দকার শওকত হোসেন বলেন, বিচার বিভাগ পৃথকীকরনের প্রকৃত সুফল জনগণ পাচ্ছে না। দেশের আদালতগুলোতে এখন সাড়ে নয় লাখ মামলা জট লেগেছে। এজন্য দিন দিন মানুষের ভোগান্তি বাড়ছে। নিম্ম আদালতের বিচারকরা নির্বাহী বিভাগের বিভিন্ন পদে কর্মরত থাকায় তারা বিচার কাজে মনযোগ দিতে পারছেন না। তাই জুডিশিয়াল কর্মকর্তাদের নির্বাহী বিভাগের পদগুলো থেকে অবিলম্বে ফেরত দেয়ার দাবি করছি।
তিনি বলেন, আইন মন্ত্রণালয়ের জুডিশিয়াল কর্মকর্তারা নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করছে। এটা কারও কাম্য হতে পারে না। কয়েক দিন আগে সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ে গিয়েও তারা খারাপ ব্যবহার করেছেন। এ ব্যাপারে আমি মন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।
ঢাকার বিভাগীয় কমিশনার বলেন, বিচার বিভাগ পৃথকীকরনের পর মাঠ প্রশাসনের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা কাজ করতে পারছেন না। এজন্য মাঠ প্রশাসনে এক ধরনের ক্ষমতার ভারসাম্য তৈরি হয়েছে। এছাড়া কাজ কর্মে সমন্বয়ের অভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
‘গোটা মাঠ প্রশাসনে এখন চাপা অসন্তোষ বিরাজ করছে’ বলে তিনি বলেন, “তাই নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটকে ক্ষমতায়ন করা না হলে বর্তমান সমস্যা সমাধান করা কঠিন হয়ে পড়বে।”
তাই গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকায় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের ক্ষমতায়ন ও মামলার জট কমাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে আপনার কাছে আহবান জানাচ্ছি।
ঢাকার বিভাগীয় কমিশনার বলেন, কাউকে কাজ দিলে আইনি ক্ষমতা দিতে হয়। তাই নির্বাহী বিভাগকে আইনি ক্ষমতা না দিলে তারা সরকারের গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা বাস্তবায়ন করতে পারবে না। এর
দায়ভার প্রশাসনকেই নিতে হবে।
বিভাগীয় কমিশনারের এ বক্তব্য দেয়ার সময় সভাকক্ষে নিরবতা লক্ষ্য করা যায়। প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা এ সময় বলেন, অনেক দেরীতে হলেও স্যার আমাদের মনের কথা বলেছেন।
বিভাগীয় কমিশনারের বক্তব্যের পর ঢাকার ডিসি জিল্লার রহমান বলেন, নির্বাহী বিভাগের হাত-পা বেধে রাখলে সরকারের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা কঠিন হবে। আমি মনে করি পারিপার্শ্বিক অবস্থা ও সংস্কৃতি ঠিক রেখে ক্ষমতার ভারসাম্য থাকা উচিত।
প্রশাসন ক্যাডারের দুই কর্মকর্তার বক্তব্য শোনার পর আইন মন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ বলেন, প্রেষণে বদলি নিয়ে একটি মামলা বর্তমানে বিচারাধীন আছেন। ওই মামলার রায়ের উপর অনেক কিছু নির্ভর করছে। তাই এ বিষয়ে আপাতত কিছু বলতে চাচ্ছি না। আমিও মনে করি বিচার বিভাগ সঠিকভাবে পৃথকীকরন থাকা উচিত। তাই হঠাৎ করে আমরা প্রেষণে বদলির আদেশ বাতিল করতে পারি না।
আইন-শৃঙ্খলার অবনতি বা উন্নতি লক্ষ্য করার দায়িত্ব স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উল্লেখ করে তিনি বলেন, “এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে আপনারা বলুন, আমাদের প্রয়োজনীয় ক্ষমতা দেয়া না হলে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা কঠিন হয়ে পড়েছে। আপনারা যে কথাগুলো বলছেন তা আমরা খতিয়ে দেখবো।”
এর আগে শনিবার রাতে বিয়াম মিলনায়তনে বিভিন্ন ব্যাচের কর্মকর্তারা একটি সভায় মিলিত হন। ওই সভায় তারা আইন মন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের এজেন্ডা ঠিক করেন। একই সঙ্গে কে কে বৈঠক করবেন তার নাম ঠিক করেন।
ওদিকে আইন মন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের পর জুনিয়র ব্যাচের কর্মকর্তারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের (ইউএনও) হেনস্তা করায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
শনিবারও কিশোরগঞ্জে এক ইউএনও লাঞ্চিত হয়েছেন তারা বলে জানান। আইনি ক্ষমতা না থাকায় উপজেলা চেয়ারম্যানসহ বিভিন্ন দলের রাজনৈতিক নেতারা ইউএনওদের উপর হামলা করছেন। এ দুরবস্থা থেকে প্রশাসন ক্যাডারকে বাঁচাতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেয়ার এখনই সময়।
রেডটাইমস বিডি ডটকম/ও বি/আর বি এম

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


