শেষ পর্যন্ত টিপাইমুখে বাঁধ হবে না বলে মনে করেন আসামের জনগণ।তাদের ধারণা,বাংলাদেশ ও ভারতে এই বাঁধ নিয়ে রাজনীতি চলছে।মিডিয়া ব্যাপারটিকে ফুলিয়ে ফাপিয়ে তুলছে।কিন্তু কোনও কিছু স্পষ্ট নয়।বরাকের জল ঘোলা হচ্ছে শুধু।আর বাংলাদেশের পানিও ঘোলা করছে রাজনীতি।(টিপাইমুখ থেকে ঘুরে এসে জানাচ্ছেন সৌমিত্র দেব)
আমরা বাঙালী দলের নেতা সাধন পুরকায়স্থ বলেন,বরাক উপত্যকার মানুষের চল্লিশ বছর ধরে প্রাণের দাবি এই টিপাইমুখ বাঁধ। কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকার বাঙালীদের ভাষার দাবিকে যেমন উপেক্ষা করেছে,তেমনি এই বাঁধ নিমাণেও করেছে টালবাহানা।সে কারণে বরাক উপত্যকার বন্যা সমস্যা নিয়ে তাদের কোনও মাথা ব্যাথা নেই।নানা ছলছুতোয় তারা শেষ পর্যন্ত এই বাঁধ নির্মাণ করবে না বলে মনে হয়।
গুরুচরণ কলেজের শিক্ষক অর্জুন চৌধুরী বলেন,টিপাইমুখ বাঁধ নিয়ে সরকার কি করতে চাচ্ছে তা আমাদের কাছে স্পষ্ট নয়।দৈনিক নববার্তা প্রসঙ্গ পত্রিকার প্রকাশক মুজিবুর রহমান চৌধুরী বলেন,জনগণ বুঝে গেছে শেষ পর্যন্ত টিপাইমুখে বাঁধ হবে না।সে কারণে এখানে কোনও আন্দোলন সংগ্রাম নেই।
আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড.তপোধীর ভট্রাচার্য বলেন,বরাক উপত্যকার মানুষ শীত ঘুমে আচ্ছন্ন।আর তাই এখানে টিপাইমুখ বাঁধে র পক্ষে বা বিপক্ষে কোনও আন্দোলন নেই।
কাছাড় কলেজের অধ্যাপক দীপক কুমার নায়ার বলেন,বিদ্যুৎ উৎপাদন যদি টিপাইমুখ বাঁধে র লক্ষ হয়ে থাকে।তা হলে ভারত সরকার অরুণাচলের খরস্রোতা নদীগুলো বেছে নিতে পারে।এত প্রতিবাদের মধ্যে টিপাইমুখ বাঁধ নির্মাণের কোনও যুক্তি থাকতে পারে না।
প্রবীণ লোকজনের কাছে শোনা যায়, ১৯৬৬ সালে বরাক উপত্যকায় প্রচন্ড বন্যা হয়েছিল। তখনই টিপাইমুখ বাঁধকে প্রথম রাজনৈতিক ইস্যু করা হয়। তখনকার তরুণ কংগ্রেস নেতা সন্তোষ মোহন দেব বরাকের মানুষকে আশ্বস্ত করেন বন্যা নিয়ন্ত্রন করতে টিপাইমুখে বাঁধ দেয়া হবে। সেটাই হয়ে যায় তার নির্বাচনী ইস্যু। আমাকে ভোট দিন ক্ষমতায় গেলে টিপাইমুখে বাঁধ দেবো।
জনগণ এই ডাকে সারা দেন। ক্ষমতায় যান সন্তোষ মোহন দেব। একবার নয় বারবার। একাধিকবার কেন্দ্রীয় মন্ত্রীও হন। কিন্তু টিপাইমুখে আর বাঁধ হয়না। প্রতিবছর বন্যা হয়। বরাকে বন্যা হলে তার রেশ বাংলাদেশের সিলেটকেও স্পর্শ করে। কারণ বরাক নদী সিলেটের সুরমা ও কুশিয়ারা নামে প্রবাহিত।
এবছর নির্বাচনের আগে সন্তোষ মোহন বুঝতে পারেন তার মাঠের অবস্থা খুব খারাপ। টিপাইমুখ ইস্যুটা আগের মতো বললে আর কাজ হবে না। সে কারণে প্রধানমন্ত্রী মন মোহন সিং'কে দিয়ে শিলান্যাস বা ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের উদ্যোগ নেন। কিন্তু ভিত্তিপ্রস্তরও টিপাইমুখে স্থাপন করতে পারেননি।
সেটা স্থাপন করেছেন মনিপুরের রাজধানী ইমফলে। এতো কিছুর পরেও এবার আর নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে পারেননি সন্তোষ। সে কারণে বরাকবাসী বাঁধের ব্যাপারে অনেকটাই হতাশ। তাদের ধারণা কেন্দ্রীয় সরকার উত্তর-পূর্ব ভারতের উন্নয়নের ব্যাপারে উদাসীন।
বরাক উপত্যকার প্রতি তাদের আচরণ আরো বেশী বিমাতাসুলভ। সুতরাং যে কোন অজুহাতে এই বাঁধ নির্মাণ থেকে তারা সরে দাঁড়াতে পারেন। আর এ ব্যাপারে অনেকগুলো ফ্যাক্টর তো মাঠে আছেই। যেমন - মণিপুরের উগ্রপন্থীরা টিপাইমুখ ঘিরে আছে, পরিবেশবাদীরা বাঁধ বিরোধী কথা বলছে, বাংলাদেশে বাঁধের বিরুদ্ধে আন্দোলন চলছে সর্বোপরি যিনি এই বাঁধের প্রধান উদ্যোক্তা সেই সন্তোষ দেব নিজেই এবার নির্বাচনে হেরে গেছে।
বাঁধ প্রকল্পের সাথে সম্পৃক্ত একজন প্রকৌশলী বলেন, এই টিপাইমুখ বাঁধ হলে বাংলাদেশের ক্ষতির চেয়ে লাভ বেশি। প্রথমত এই বাঁধের কারণে সিলেট অঞ্চলে মৌসুমী বন্যার প্রকোপ কমবে। কারণ মূলত আসামের বন্যার নিয়ন্ত্রনের জন্যই এই বাঁধ। উপরন্তু সেখানে শুষ্ক মৌসুমে পানি পাওয়া যবে।
তিনি এই প্রকল্প সর্ম্পকে আরো বলেন, এটি একটি হাইড্রো ইলেকট্রিক মাল্টি পারপাস প্রকল্প। স্ক্যাচমেন্ট এরিয়া প্রায় সাড়ে ১২ হাজার বর্গকিলোমিটার। স্টোরেজ ক্যাপাসিটি নয় লক্ষ হেক্টও মিটার। উচ্চতা ১৬৩ মিটার (ফুট ৫৩৪) উপরাংশে থাকবে ৯০ মিটার বাকিটা নিচে। টানেল দুইটা। গেট চারটা। প্রতিটির সাইজ ১৩/১৩ মিটার।
মৌসুমের সময় পানি এক মিটার কম হবে। মিজোরামের তুইবাই নদী যেখানে মিশেছে বরাকের সঙ্গে মণিপুরের সঙ্গম স্থলে সেখানেই টিপাইমুখ বাঁধ। শিলচর থেকে সড়ক পথে এর দুরত্ব প্রায় ১৬০ কিলোমিটার।
টিপাইমুখ বাঁধ হলে সেখানে পরিবেশের উপরে কিছু খারাপ প্রভাব পড়বে সেটাও তিনি স্বীকার করেন।
তিনি বলেন, মণিপুর ও মিজোরাম রাজ্যে শতাধিক আদিবাসী গ্রাম এই প্রকল্পের কারণে ধ্বংস হবে। তবে তাদের পূর্ণবাসনের জন্য ২’শ কোটি রূপি বরাদ্দ হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে সেখানে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাবে মোট ১৫’শ মেগাওয়াট। এর ১১ ভাগ পাবে মণিপুর ও এক ভাগ পাবে মিজোরাম। তবে এখনো সেখানে কাজ শুরু করার মতো অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হয়নি। বিশেষ করে এখন পর্যন্ত বন ও পরিবেশ বিভাগের অনুমোদন পাওয়া যায়নি।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


