somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

তবু একদিন হেমন্ত এলে অবকাশ পাওয়া যাবে

০৪ ঠা নভেম্বর, ২০২৬ ভোর ৫:২০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

“সুজাতাকে ভালোবাসতাম আমি-
এখনো কি ভালোবাসি?
সেটা অবসরে ভাববার কথা,
অবসর তবু নেই;
তবু একদিন হেমন্ত এলে অবসর পাওয়া যাবে
এখন শেলফে চার্বাক ফ্রয়েড প্লেটো পাভলভ ভাবে
সুজাতাকে আমি ভালোবাসতাম কি না।”


তবুও একদিন হেমন্ত আসে কিন্তু পুরোনো দিনের কথা ভাববার অবসর আসে না। একটা নির্জন বিকেলে কিংবা ভোরের আলোয় যখন কুয়াশা খেলা করে তখনকার অবসরটুকোও জোটে না। জীবন গতিশীল, যখন ব্যস্ত রাস্তায় হনহন করে হেঁটে চলি আনমনে; হুট করে অটোরিকশার মতো দু’একটা স্মৃতি এসে টোকা দিয়ে বলে, “মনে আছে? সেদিন কী বিষণ্নতা তোমাকে গ্রাস করেছিল!” তারপরে হয়ত ভাবতে ভাবতে মিরপুর ১০ ছাড়িয়ে স্টেডিয়াম রোডে গিয়ে ঘোর কাটে। আবার ‍ুপিছু ফিরে মেসের পথ ধরি সচেতন ভাবে। অবসর আর ব্যস্তার মুখোমুখি বসে থাকি বেলকনিতে। তবু একদিন হেমন্ত আসে, তবুও একদিন স্মৃতিরা ভাবায়, তবুও এক টুকরো অবসর পাওয়া যায়, তবুও পিছু ফেরা যায় না।


“তারপর তুমি এলে, মাঠের শিয়রে- চাঁদ;
পৃথিবীতে আজ আর যা হবার নয়, একদিন হয়েছে যা-
তারপর হাত-ছাড়া হ'য়ে হারায়ে ফুরায়ে গেছে-
আজো তুমি তার স্বাদ ল'য়ে আর-একবার তবু দাঁড়ায়েছো এসে!”


একদিন, বিমূর্ত তুমি বারবার ফিরে এসেছিলে বিভিন্ন কল্পনায় সেই সব মেঠোপথে। যেখানে তোমার-আমার স্মৃতির পর্বতমালা জড়ো হয়ে আছে দিগন্তের সীমারেখা জুড়ে। যেখানে তোমার ঘ্রাণ আজও অমলিন। কৈশোরের অবুঝ ভালোলাগা, মোহ, তোমার অশ্রুমালা যেখানে লীন হয়ে ফিরে আসে বারবার আমার হৃদয়ে। একদিন, বারবার তুমি ফিরে আসো ভোরের কুয়াশা চিরে সন্ধ্যার অবগাহনে। নদীর ওপারের ঝাউবনে তোমার দৃষ্টি পড়ে থাকতো রোজকার বিকেলে। সেসব বিকেলও আজ তোমাকে খুঁজে। আজও কার্তিকের জ্যোৎস্নায় আমার লীন হয়ে যেতে ইচ্ছে করে তোমার বাহুডোরে।



“মহীনের ঘোড়াগুলো ঘাস খায় কার্তিকের জ্যোৎস্নার প্রান্তরে।”

পৃথিবীর সুন্দরতম জ্যোৎস্না আসে কার্তিকের মাঠে। ধান কাটা হয়ে গেলে ঘুঘুর দল ঘুরে বেড়ায় ভোরের উঠোনে, যেখানে জড়ো হয়ে আছে শিথিল ধান। সবুজ মাঠে ক্রিকেটের পিচ করা আঙিনায় বালকের দল ভিড় করে। ক্রমশ সন্ধ্যা ঘিরে আসে পশ্চিমের বাতায়নে। মশার দল ভিড় করে বালকদের মাথার উপরে। দুপুরের রুপালি নদী বিকেলে শান্ত হয়ে আসে সোনালি মায়ায়। তারপরে শূন্য মাঠে গাঙচিল আর আর নিঃসঙ্গ প্যাঁচার দল তাকিয়ে থাকে ইঁদুরের পানে। কার্তিকের হিম কুয়াশায় ভোর হলে স্নিগ্ধ জ্যোৎস্নার রাত হারিয়ে যায় স্মৃতির অতল গহ্বরে।

“যদি আমি ঝরে যাই একদিন কার্তিকের নীল কুয়াশায়
যখন ঝরিবে ধান আমাদের ক্ষেতের বুকের থেকে আর-একবার,”




হেমন্তের ভোরে কুয়াশার আস্তিন চিরে আমরা ক’জন যারা হারিয়ে যেতাম তারা আজ আর নেই সেই সব মাঠে। সেখানে এখন কোলাহল নেই, শুধু সবুজ ছোট জঙ্গলে ভরে গিয়েছে আর হয়েছে টুনটুনি, দোয়েলের মতো কিছু পাখির নীড়। আর কিছু হয়েছে অট্টালিকার পাহাড়। প্রকৃতির সেই উদাস সন্ধ্যা খুঁজতে এখন পাড়ি জমাতে হয় বিজন অরণ্যে ঘেরা মাঠে। সেসব মাঠও হারানোর পথে । নদীর তীর ঘেঁষে সরু পথ আবিষ্কার করে, কখনো বেতফল কিংবা জাম চুরি করতে গিয়ে কাদায় পা ফেলে বাড়ি ফিরে আসার সময়ে অদ্ভুত এক সন্ধ্যার সাথে আমাদের পরিচয় হত। সারিসারি বকের দল ফিরতো নীড়ে। হঠাৎ উঁচু কোনো গাছের মগ ডাল দিয়ে ডানা ঝাপটানোর শব্দ হতো। আমরা ফিসফিস করে অনুসরণ করার চেষ্টা করতাম কোন পাখি!

নদীর অন্য পারে তীর ঘেঁষে মাইলকে মাইল চর, আর সেই চরে হোগল বন। একটি কলাগাছের ভেলা ভাসিয়ে সেই চরে যাবার পথে মাঝ নদীতে শুশুকের তাড়া খেয়ে ফিরে আসতাম হন্যে হয়ে। তারপরে শুশুকের মতো লুকিয়ে থাকতাম জ্বরের অতলে নকশিকাঁথার আড়ালে। মা এসে বকতেন, ওপাশের রুমে বাবার গম্ভীর কণ্ঠস্বর। আমাদের ঘরে রোজকার আলাপের পরে নিস্তব্ধতা নামলে হুট করে উত্তরের জানালার শীতল বাতাস চুপিচুপি এসে পর্দার ওপাশের জ্যোৎস্না শোভিত বাগান মেলে ধরতো আমার সামনে। জানালার শিক ধরে আকণ্ঠ পান করতাম বাগান ভরা জ্যোৎস্না। বিড়ালের মতো নিঃশব্দে দখিনের রুমে যেতাম; জানালায় দেখতাম জ্যোৎস্না লেগে আছে। জানালা খুলে দিলে শ্রান্তিহীন জ্যোৎস্না নেমে আসতো আমার কোলে। নদীর রুপালি জলে চিকিমিকি জ্যোৎস্নায় মাঝির উন্নাসিক সুর ধীরে ধীরে মিলিয়ে যেত পূবের দিকে। ধীরে ধীরে চাঁদ আমাকে ছাড়িয়ে কড়ই গাছের উপরে উঠে যেত। তারপর হঠাৎ মুয়াজ্জিনের ভাঙা স্বর “হাইয়া আলাস সালাহ, আস্সালাতু খাইরুম মিনান নাউম”। আধো ঘুম চোখে মসজিদ থেকে ফেরার পথে দেখতাম দূরের ঝাউবনের উপরে চাঁদ তখনো নিথর হয়ে আছে।

কবিতার পঙক্তিগুলো জীবনান্দ দাশের
সর্বশেষ এডিট : ০৪ ঠা নভেম্বর, ২০২৬ ভোর ৫:২২
১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

কোথায় পাই পাগলের শ্বশুর

লিখেছেন আলমগীর সরকার লিটন, ০৩ রা নভেম্বর, ২০২৬ সকাল ১১:৪৮


পাগলের পাতা ছাগলে খায়,
দাঁতের দোষটা হাতেই যে কয়;
দেয় রে দোষটা দেয় চোখের,
মনটা যে ধোয়া তুলসীপাতা,
কেউ দেখে না রে মুখের।

মুখের কথা ঠোঁটে কয়,
ছাগল ডাকে রে ভাই, ব্যাঁ-ব্যাঁ;
পাগলের কাজ পাগল করে সই,
সাধু... ...বাকিটুকু পড়ুন

পরিস্থিতি কি জটিল?

লিখেছেন শেরজা তপন, ০৩ রা নভেম্বর, ২০২৬ সকাল ১১:৫৯

বাইরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে বসে আছি, অথচ বাইরে পুলিশের সাউন্ড গ্রেনেড আর টিয়ার গ্যাসের শব্দে চারদিক প্রকম্পিত! মিরপুরে আমার বাসার কাছেই মেট্রো রেলের নিচে আগুন দেওয়া হয়েছে; কিছুক্ষণের জন্য মেট্রো... ...বাকিটুকু পড়ুন

আজকের ডায়েরী- ২০৩

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৩ রা নভেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৯



খাওয়া দাওয়া করাটা আজকাল বিরক্তকর লাগে।
কিন্তু মানুষের বেঁচে থাকতে হলে- খেতে হবে। না খেলে শরীর দুর্বল হয়ে যাবে। প্রিয় খাবার গুলোও খেতে ইচ্ছা করে না। ভালো লাগে... ...বাকিটুকু পড়ুন

আজ আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচন কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ০৩ রা নভেম্বর, ২০২৬ দুপুর ২:৫৬


এই লেখাটি যখন লিখছি, তখন এই গুজবটি ছড়িয়ে পড়েছে যে, ইসরায়েল ট্রাম্পকে রাজি করিয়েছে, যাতে মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরপরই আমেরিকা ইরানে পারমাণবিক বোমা হামলা করে। বিগত বছরগুলোতে ইসরাইল সারা বিশ্বের... ...বাকিটুকু পড়ুন

Haze দমনে সিঙ্গাপুরের কুটনৈতিক দক্ষতা

লিখেছেন ঢাবিয়ান, ০৩ রা নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৪:৩১

সিঙ্গাপুর সাম্প্রতিককালে স্মরনকালের ভয়াবহ Haze (ধোঁয়াশা ও বায়ুদূষণ) এর কবলে পড়ে। সেপ্টেম্বরের শুরুতেই সারা শহর ঘন ধোয়ার আবরনে ঢেকে যায়। জানালা দিয়ে বাইরে তাকালে মনে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×