সৈয়দ ওমর হাসান
অতিকায় এক পাহাড় তার পাদদেশেই সুড়ঙ্গ
সেটি এঁকেবেঁকে কোথায় হারিয়ে গেছে কেউ জানেনা
একদিন জিন্স-গেঞ্জি পরা পেটা শরীরের দুজন মানুষ এলো
সুড়ঙ্গটির সামনে।
পাহাড়ের অদূরে গ্রাম,সামনে দিয়ে সরু মেঠো পথ
চলে গেছে। সে পথ দিয়ে যাচ্ছিলো এক পথিক, সে
গ্রামেরই লোক হয়তোবা।
লোকটি জিন্সগেঞ্জির মানুষদের জ্ঞিগেস করলো, অপনারা
কারা? তাদের একজন বললো, আমরা বিজ্ঞানী,জীববিজ্ঞানী
জীব নিয়েই আমাদের কাজবাজ। পথিক ফের জ্ঞিগেস করলো,
এখানে কি কাজ আপনাদের? বিজ্ঞানী বললো, আমরা এ পাহাড়ের
গুহায় ঢুকবো, শুনেছি এখানে একটা বড়ো সাপ থাকে, সেটিকে
আমরা বের করে আনবো।
পথিক হেসে বললো, পারবেন না, কেউ কোনোদিন পারেনি।
গতবছর আপনাদের মতো একটা দল এসেছিলো, সাপটি তাদের
গিলে খেয়েছে। ওকে বাইরে বের করে আনলে গোটা পাহাড়টাই
ধ্বসে যাবে। কারণ পাহাড়টা দাঁড়িয়ে আছে ওর কুন্ডলীর উপর।
ওকে যে আপনারা কোন লোভ দেখিয়ে বের করে আনবেন তাও
পারবেন না কারণ ওর কোনো ুধাতৃষ্ণা নেই। খাবারের খোঁজে
ওকে বাইরে বের হতে কেউ কোনোদিন দেখেনি।
ওই যে দেখুন গুহামুখে ফুল আর চিনির কেলাস পড়ে আছে
কারা যেনো ওকে পুজো দেয়। সে সত্যিকারের একটা পুজো
দেবার মতো প্রাণী।
বিজ্ঞানী দুজন হাসলো, তাদের একজন বললো, পৃথিবীতে কোনোকিছু
অতো বড়ো নয়, আমরা দেখেছি।
পথিক প্রচন্ড আত্মবিশ্বাসে অন্যপ্রসঙ্গে চলে গেলো।( তার ধারনা, দুটো
সামান্য মানুষ অতিকায় সাপটিকে কিছুতেই বের করে আনতে পারবে না
যার উপর একটা পাহাড় দাঁড়িয়ে থাকে।)
পথিক দুজনকে প্রশ্ন করলো, আপনাদের পিঠে অত বড়ো বড়ো ব্যাগে
কি আছে? তার প্রশ্নের পর বিজ্ঞানী দুজন পিঠ থেকে ব্যাগ নামালো,
ব্যাগের চেইন খুলে একেকটা জিনিস বের করে আনতে লাগলো।
পথিককে ওগুলো দেখানো তাদের উদ্দেশ্য নয়। তারা গুহায় ঢোকার
প্রস্তুতি পর্বে জিনিসগুলো পরখ করে দেখছে। তাদের কাছে আছে শক্ত
হাতলের সাপ ধরার ক্যাচার, অক্সিজেন মাক্স বিষাক্ত গ্যাস সনাক্তকারী
ইলেকট্রোরাসয়নিক ডিভাইস, ফোল্ডিং লেডার, সমৃদ্ধ ফাস্ট এইড বক্স,
এন্টিভেনম ঔষদপত্র, আরো কতো কি!
বিজ্ঞানী দুজন হেডটর্চের তীর্ব আলো ফেলে গুহার ভেতর ঢুকলো,
পথিকও চলে গেলো তার নিজের পথে।
গুহার অভ্যন্তরে সতর্ক পদপে ফেলে ফেলে সাপ খুঁজতে লাগলো তারা।
গুহার দেয়াল, মেঝে, প্রতিটি কোনায় আর খাঁজে টর্চের আলো ফেলতে
লাগলো। কিছুদূর গিয়ে দেখলো অসংখ্য বাদুর ঝুলে আছে গুহার ছাদে।
তার নীচেই স্তুপিকৃত বাদুরের গু।
তারা ঘুরে গেলো অন্য টানেলে যেখানে পথ ক্রমশ সরু হয়ে যাচ্ছে। সেখানে
তাদের চলতে হলো হামাগুড়ি দিয়ে। একজন বলছিলো, জানিনা
ফিরে আসতে পারবো কিনা, এই ভয়ংকর অভিজ্ঞতার গল্প কাউকে শোনাতে
পারবো কিনা! টানেলের মেঝে স্যাঁতস্যাঁতে, কিছুদূর গিয়ে তারা দেখলো,
খানিকটা জায়গা জুড়ে স্বচ্ছ পানি, পানির মধ্যে তারা নামলো না, একজন সেখানে
টর্চ ফেলে গভীরভাবে অনুসন্ধান করতে লাগলো। লোকটি হঠাৎ বিস্ময়ভরা কন্ঠে
চেচিয়ে উঠলো; দেখেছো এগুলো কি! আরেকজন
টর্চ নামিয়ে পানির আরো কাছে চোখ রেখে নিস্পৃহ গলায় বললো,ওগুলো
ফিতা কৃমি, কতগুলো পরজীবি।
বিজ্ঞানীরা টানেলের প্রান্তমুখ বন্ধ দেখে আবার হামাগুড়ি দিয়ে
ফিরে এলো, ফিরে আসার পথে দেখলো একটা দুধসাদা সাপ কিন্তু
সাপটি ফনা তুলবার সময় টর্চের আলোতে দেখা গেলো ওর
মুখ গহবর মিশমিশে কালো। একজন বললো, সাবধান থেকো এটা সেই
আফ্রিকার ব্লাক মামবা, পৃথিবীর সবচেয়ে বিষধর সাপ। এর ছোবলে
মাত্র এক মিনিট সময় পাওয়া যায়। তারপর শতভাগ মৃত্যু।
অথচ এখান থেকে হাসপাতাল যেতে লাগবে তিন ঘন্টা। আরেক জন
সন্দেহ প্রকাশ করলো, ব্লাক মামবা সাধারনত গাছে থাকে, ওদের মূল শিকার পাখি,
পাখি ধরার জন্য ওরা ভীষণভাবে ছুটতেও পারে, ঘন্টায়
আঠের কিলোর বেশী। কিন্তু এ ব্যাটা পাহাড়ের অন্ধকার গুহায় কি করছে!
অপর জন বললো, এখানে অনেক বাদুর আছে ল্য করেছো? সম্ভবত ওগুলোর
খোঁজেই ও এসেছে। ওকে ধরো আমার দিকে ছুটে আসছে,
সাবধান একটুও যেনো এদিক সেদিক না হয়, নির্ঘাৎ মৃত্যু!
দুজনেই ক্যাচার দিয়ে সাপটিকে ধরে ফেললো, একজন ধরলো মাথার
দিকটা অন্যজন লেজের দিকে। তারপর একহাত দিয়ে একজন
ব্যাগের ভেতর থেকে প্লাস্টিকের একটা লম্বা চোঙ্গ বের করে সাপটিকে
হাতের স্পর্শ ছাড়াই শুধু ক্যাচার দিয়ে খুব সাবধানে চোঙ্গের মধ্যে ঢুকিয়ে ফেললো।
বিজ্ঞানী দুজন অন্য একটা দীর্ঘ টানেলে ঢুকলো , যার উপরের দিকে গভীর খাঁজ,
সে খাঁজে কি লুকিয়ে আছে নিচ থেকে ঠিক দেখা যায়না
একজন বললো, এখানেইতো গতবছর এসেছিলাম, ওই যে উপরের খাঁজে
ছিলো সাপটি, আমাকে ছোবল দিয়েছিলো, আমার কব্জির হাড় মুচড়ে
দিয়েছিলো। সেবার আমি একটা ভুল করেছিলাম। আমি ওর লেজটা
ধরে ফেলেছিলাম। এবার আমি মাথাটা ধরবো যাতে সে আমাকে ছোবল
না দিতে পারে। অন্যজন বললো, দেখেছো কথা কিভাবে ছড়ায়! গ্রামের
পথিকটি বলেছিলো, গতবার যারা এসেছিলো তাদের নাকি সাপটা
গিলে খেয়েছে! লোকটি হয়তো আমাদের কথাই বলেছে। আরেকজন বললো,
হয়তো অন্য কাউকে গিলে ফেলেছে, আমরা জানিনা, বড়বড়
পাইথনগুলো তো মানুষ পর্যন্ত গিলে ফেলে। সেেেত্র গুহায় দুএকটা কঙ্কাল
খুঁজে পেতে পার। তখন প্রথম জনের কাছ থেকে হঠাৎ টর্চটা
ছিটকে পড়ে গেলো। সে চিৎকার করে উঠলো, কি হলো! কি হলো!
তারপর সে টর্চটি কুড়িয়ে এনে চারদিকে তন্নতন্ন করে খুঁজতে লাগলো
কি কারনে টর্চটি ছিটকে পড়েছিলো। দ্বিতীয়জন যে একটু বয়স্ক সে
অপোকৃত তরুণ সহকর্মীকে পিঠ চাপড়ে বললো, তুমি খুব টেন্সড
হয়ে আছো, অতো ঘাবরিওনা, একটা চামচিকা তোমার টর্চের উপর এসে
পড়েছিলো। তারপর সে তার সঙ্গীকে বললো, এদিকে এসো ফোডিং
লেডারটা বের করো, আমার মনেহয় সাপটি এখানেই আছে, অতোবড়ো
সাপ খুববেশী জায়গা বদল করার কথা নয়।
লোকটি লেডারটি দেয়ালের গায়ে লাগিয়ে, উঁচুতে উঠে দীর্ঘ খাঁজটিতে
উঁকি দিয়ে চিৎকার করে উঠলো, এইতো সেটা এটা একটা রকপাইথন,
একটা দৈত্য, নিঃসন্দেহে এটা মানুষ খেতে পারে, আমি ওকে ধরে ফেলেছি।
পাইথনটি লোকটির হাত পেঁচিয়ে ধরেছিলো কিন্তু সাপের মাথাটি ছিলো
তার মুঠোর মধ্যে সে অবস্থায় সে লেডারটি নিয়ে মাটিতে
আছাড় খেয়ে পড়লো।
সাপটি তাকে ভীষণভাবে পেঁচিয়ে ধরেছিলো, অন্যজন সেটা বারবার
ছাড়িয়ে দিচ্ছিলো। তারপর একজন লেজ অন্যজন মাথা জাপটে ধরে
টেনেহিঁচড়ে সাপটিকে পাহাড়ের বাইরে বের করে নিয়ে এলো। সেসময়
গুহামুখের পুজার ফুল আর চিনির কেলাস তারা মাড়িয়ে এসেছিলো।
সাপটিকে দেখার জন্য গ্রামবাসী ভিড় করলো পাহাড়ের সামনে।
তাদের মধ্যে একজন বললো আরে সাপটি তো অতো বড় নয়! যতটা
শুনেছি। বিজ্ঞানীদের একজন সে কথায় সায় দিয়ে বললো, সাপকে
দূর থেকে সবসময় বড়ই মনে হয়।
বিজ্ঞানীদের অনুরোধে গ্রামবাসীরা সাপটিকে টেনে ধরলো আর তারা
(বিজ্ঞানীরা) তাকে গজফিতা দিয়ে মাপতে লাগলো।
সাপটি লম্বায় বিশফুট। একজন বিজ্ঞানী বললো, ফিতাটা শক্ত
কিন্তু ওর শরীর নরম তাই সঠিক মাপ আসেনি। কারন সাপটি
একেবেকে আছে, তার প্রতিটি বাঁকে ফিতাটা মিশিয়ে দেওয়া যায়নি
ওটি আসলে আরো বড় হবে।
তাদের একজন ব্যাগ থেকে স্বচ্ছ প্লাস্টিকের মাপক ফানেল
বের করলো। তারপর সাপটির মুখে টেপ পেঁচিয়ে ঢুকিয়ে দিলো
ফানেলের মধ্যে। সাপটি একেবেকে ফানেল পেরিয়ে গেলো
এতে তার দৈর্ঘ দুইফুট বেড়ে গেলো। কিন্তু বিজ্ঞানীরা সন্তষ্ট হতে
পারলো না। তারা বললো, সাপটি আরো বড় হবে, ওকে মাপতে হবে
ওর শরীরের মতো নরম দড়ি দিয়ে, প্রতিটি ভাঁজের সঙ্গে মিশিয়ে
মিশিয়ে।
দড়ি দিয়ে চূড়ান্ত মাপ পাওয়া গেলো। বিজ্ঞানীদের মুখে বিজয়ের হাসি।
তাদের একজন বললো, সপটি মাঝে মাঝে গুহা থেকে বের হতো
খাবারের খোঁজে। এই যে ওর শরীরে অনেকগুলো এঁটলি এগুলোই
তার বাইরে বের হবার প্রমান।
বিজ্ঞানীরা গ্রামবাসীদের মধ্যে সেই পথিকটিকে খুঁজতে লাগলো যার সঙ্গে
তাদের প্রথম দেখা হয়েছিলো। যে বলেছিলো, সাপটিকে কেউ কোনোদিন
বাইরে বের করে আনতে পারবেনা আর বলেছিলো, এই অতিকায় পাহাড়টি
ওর কুন্ডলির উপর দাঁড়িয়ে আছে।
গ্রামবাসীদের মধ্যে লোকটিকে তারা খুঁজে পেলো না। তারা মনেমনে
বললো, একটা বোকা পথিক কোথাকার।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


