আজ সাদিয়ার কথা খুব মনে পড়ছে..খুব ভালো ছিল মেয়েটা...অন্য মেয়েদের মত না..খুব-ই হাসি খুশি একটা মেয়ে ছিল সাদিয়া...university তে পড়ার সময় ওর সাথে পরিচয় হয়...প্রথম Physics ক্লাস এ ওর সাথে দেখা হয়...কপালটাও বেশ ভালো ছিল..একসাথে practical করেছি..
বেশ মনে আছে আমাদের ৪ টি গ্রুপ করেছিলেন sir ..আমরা সবাই যার যার গ্রুপের কাজ করছিলাম এমন সময় হঠাথ করে ক্লাস এ আসে সাদিয়া..জাহঙ্গীর sir ছিলেন ক্লাস-এ ..বেশ রাগী শিক্ষক বটে..কিন্তু সাদিয়ার মায়া মায়া মুখটা দেখে তিনি কেন যেন কিছু-ই বলতে পারেন নি সেদিন....শুধু সেদিন নয় এর পর এর কখনো sir সাদিয়া কে কিছু-ই বলেন নি...
সাদিয়া Lab এ ঢুকার পর আমরা সবাই অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিলাম ..বিশেষ করে রনজু ....ওহ পারলে মনে হয় একবারে-এ ধরে বিয়ে করে ফেলে...lab এ ঢুকলে sir নরম গলায় বলেছিলেন " কি বেপার মা এত দেরী কেন...? আজ প্রথম দিন তাই কিছু বললাম না .এর পর এর কখনো দেরী করো না ঠিক আছে..যে কোনো একটা গ্রুপে তুমি join করতে পার কোনো অসুবিধে নিই " ...আমরা তো সবাই অবাক sir আমাদের সবাই কে আপনি করে বলে এর সেখানে সাদিয়াকে তুমি করে বলছে..কিছুতে-ই মেনে নেয়া যায় না...মনে মনে ছেলেদের মধ্যে একটু খারাপ লাগলো বটে..
সবাই কে অবাক করে দিয়ে সাদিয়া আমাদের গ্রুপে join করে...অন্য সবার গ্রুপে ১০ জন এর আমাদের গ্রুপে ১১ জন...আমাদের গ্রুপে বদের হাড্ডি রনজু,মুহিত আর জামিল আর সাথে আমি তো আছি-ই...university তে ভত্তি হবার সময় একসাথে-ই ভত্তি হয়েছি আমরা কজন ..সেখান থেকে-ই দোস্তি সম্পর্ক..আর সাদিয়া join করার পর আমাদের আর পায় কে ..একেবারে পোয়া বারো ..
lab এর প্রথম সে দিন আমাদেরকে নিজেদের পরিচয় নিজেদেরকে দিতে হয়নি সাদিয়া নিজে থেকে-ই জেনে নিয়েছিল..তখন-ই বুঝেছি মেয়েটা অনেক মিশুখ..এক সপ্তাহে সবার আপন হয়ে গেলো মেয়ে টা..মনে মনে এমন একটা মেয়ে খুজেছি অনেক দিন থেকে ...এবার হয়ত পাওয়া গেলো.....
দিন দিন সাদিয়া আমাদের সাথে আরো আপন ভাবে মিশতে শুরু করলো...পরীক্ষা সামনে...practical গুলো সব একবারে জমা দিতে হবে...নতুবা একটা miss করতে ৫ নম্বর করে কাটা যাবে ফাইনাল থেকে..ছোট বেলা থেকে sincere বলে পড়াশুনা-এ একেবারে খারাপ ছিলাম না...তাই অন্যদের থেকে সাদিয়ার সাথে সম্পর্ক আরো ভালো ছিল....ক্লাস শেষে প্রায় দিন TSC তে আড্ডা দেয়া হত আমাদের ৫ জনের..সেসময় আড্ডাটা জমত বেশ ..
হঠাথ একদিন সাদিয়া সবাইকে অবাক করে দিয়ে বলল -তোদের মধ্যে আমাকে কে সবচাইতে বেশী ভালোবাসিস ?...আমি ছাড়া বাকি তিনজন-ই একসাথে উত্তরটা দিল -"আমি"..
সরাসরি আমাকে সাদিয়া জিজ্ঞাসা করলো ' কিরে তুই আমাকে ভালোবাসিস না...? '....সেদিন আমি আমার মুখের কথা হারিয়ে ফেলেছিলাম ...বুঝতে পারছিলাম না কি বলব ?
পরে সারাটা সপ্তাহ সাদিয়া আমার সাথে কোনো কথা বলল না ,সে যে আমার উপর রাগ করে আছে সেটা বুঝতে বাকি থাকলো না ..রনজু আমাকে অনেকটা ধমকের সুরে জিজ্ঞাসা করলো-'কিরে তোর কি হয়েছে তুই সাদিয়ার সাথে ঠিক মত কথা বলিস না কেন ?' মনটা বলতে চাচ্ছিল ' সাদিয়াকে আমি অনেক ভালোবাসি রে' কিন্তু মুখে কিসে যেন আটকে রেখেছিল সেদিন কোনো কথাই বলতে পারছিলাম না...কিছুদিনের মধ্যে-ই আবার সবার সম্পর্ক এক হয়ে যায়...
ক্লাস শেষে ৫ জন tsc এর দিকে যাচ্ছি..হঠাথ কি যেন আমার মাথায় এলো কিছু চিন্তা না করে-ই বলে ফেললাম-"সাদিয়া তুই তো সেদিন বলেছিলি যে আমরা কে কে তোকে ভালবাসি আজ আমি তোকে জিজ্ঞাসা করছি তুই কাকে ভালোবাসিস ?"...এমন ধরনের প্রশ্নে সবাই একটু বিব্রত হয়ে গেলো..সাদিয়া কি বলবে না বলবে ঠিক বুঝে উঠতে পারেনি কিন্তু কিচ্ছুক্ষন পর সে বলল -"আগামী বিশ্ব ভালবাসা দিবসে যে আমার বাসার সামনে রাত ১২ টায় প্রথমে আসবি আমি তাকে ভালবাসব "..এমন কথা শুনে সবাই একটু হতাশ হলে-ও ১৪-ই ফেব্রুয়ারী এর জন্য অপেক্ষা করছিল...
তখন ভালবাসা দিবস এতটা popular ছিলনা বাবা মায়ের কঠোর শাসনে ছেলে-মেয়ে থাকত...এর রাত ১২ টার সময় বাইরে যাবার কথা তো চিন্তা-ই করা যেতো না....তখন চলছে নভেন্বর মাস ..ফেব্রুয়ারী আসতে আরো অনেক দেরী...রনজু আর জামিল তো পারলে প্রতিদিন একবার করে রিহার্সেল করে কে কিভাবে কি পরে যাবে..বেশ মজাই লাগত..
সাদিয়ার প্রতি আমার মনে যে একটা ছোট কোন তৈরী হয়েছে সেটা বুঝতে পারছি কিন্তু বলতে পারছিনা..কাউকে বুঝতে পারছিনা...
অবশেষে এলো সেই ১৪-ই ফেব্রুয়ারী ..কিন্তু আমার কপাল পোড়া ছিল....বাসায় ছোট বোন কে বেশ বকাবকি করা হয়েছে পড়াশুনা তে অমনোযোগী হওয়াতে...ছোট বোনের পক্ষে কথা বলাতে আমার উপর সবাই রেগে আছে ...তাই বাসায় পরিস্থিতি খারাপ দেখে আমি আর রাতের বেলায় বের হবার সাহস করতে পারলাম না..
সকাল বেলায় যথারীতি ক্লাস-ই গিয়ে দেখি রনজু.মুহিত,জামিল আর সাদিয়ার মন খুবই খারাপ...জিজ্ঞাসা করে জানতে পারলাম রাতের বেলায় এক মহা কান্ড ঘটে গিয়েছে সাদিয়াদের বাসার সামনে ..রাতের বেলায় একসাথে তিন জন-ই গিয়ে রাজির সাদিয়াদের বাসার সামনে...একসাথে তিনজনকে দেখে সাদিয়ার বড় ভাই সন্দেহ করে...পরে সবাইকে বাসায় ডেকে আনে তেমন খারাপ বেবহার না করলে-ও পরে সবার বাবা মাকে ফোন করে যার যার ছেলে কে তার তার বাসায় পাঠিয়ে দেয়...বিষয়টা শুনে আমার এত হাসি পাচ্ছিল কিন্তু নিজের বন্ধুদের কথা চিন্তা করে হাসতে পারছিলাম না.....ক্লাস শেষ করে সাদিয়া আমাকে থাকতে বলে কি যেন খুব জরুরি কথা বলবে..
ক্লাস শেষ করে দেখি কেউ আর অপেক্ষা করলনা যার যার মত বাড়িতে চলে গেলো..থেকে গেলাম খালি আমি আর সাদিয়া..
হঠাথ করে সাদিয়া মুখ খুলে-"দেখ তুই আমার অনেক ভালো বন্ধু কিন্তু আমি কাল রাতে মনে মনে তোর জন্য অপেক্ষা করছিলাম ,আমি ভেবেছি তুই সবার আগে আসবি কিন্তু আমাকে সম্পূর্ণ হতাশ করলি তুই ...এখন কেউ নাই তুই বল,তুই কি আমাকে ভাববাসিস কি না ?'
বুজতে পারছিলাম না কি বলব সাদিয়াকে...জীবনে কখনো এমন পরিস্থিতির শিকার হইনি ...কিছুক্ষণ চিন্তা করে বললাম তোকে পরে জানাব
সাদিয়া আমার কথা ততক্ষণে না শুনে-ই হাটা শুরু করেছে,হাত ধরে পিছনে ডাকব সে সাহস হয় নি তখন...
২০ তারিখ সকালে ক্লাস্সে যেয়ে দেখি আমাদের friend এর মধ্যে কেবল আমি সাদিয়া আর মুহিত এসেছে.ক্লাস শেষ হবার সময় সাদিয়া কে জানালাম ও যেন ক্লাস এর পরে থাকে...ক্লাস শেষ করে বের হয়ে সোজা tsc তে গেলাম..সাহস করে সাদিয়া কে বললাম ' সাদিয়া কালকে ২১-ই ফেব্রুয়ারী তুই একটা লাল শাড়ি পরে আসিস তোর সাথে বই মেলায় যাব'....সাদিয়া কে কিছু বুঝে উঠতে বেয়ার আগে-ই আমি চলে আসি....
২১ ফেব্রুয়ারী আজ....সাদা কালো রঙের একটা পাঞ্জাবি পরেছি সাদিয়ার সাথে দেখা করব তাই ..সাদিয়া কে নিয়ে সোজা বইমেলায় চলে আসলাম...লাল টুকটুকে একটা শাড়ি পরেছে ও...মানিয়েছে বেশ ..বাংলা একাডেমি থেকে নজরুল ইসলাম এর একটা সংকলিত কবিতার বই কিনলাম ..সাদিয়া আমার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে বুঝতে পারছে না কি করবে ?...কিছু বুঝে উঠার আগে-ই আমি ওকে নিয়ে হাটতে হাটতে আমাদের আড্ডা দেয়ার সেই জায়গায় আসলাম...সাদিয়া কে বললা -চোখ বন্ধ কর ....সাদিয়াও কিছু না বলে চোখ বন্ধ করলো...পকেট থেকে লাল গোলাপ আর ছোট করে লেখা I LOVE YOU চিরকুট টা বইয়ের মাঝে রেখে সাদিয়ার হাতে দিলাম....
চোখ খুলে বইটা হাতে নিয়ে খুলল ও ....পুরো ১ মিনিট কিছুই বলতে পারেনি ও ...খুশিতে সাদিয়ার চোখে পানি চলে আসে ...ভুলতে পারিনি সেই দিন ...
সাদিয়া-আচ্ছা তুই আমাকে এত ভালবাসতি জানাস নি কেন আগে ?
-আগে জানালে কি এর এই মজা টা উপভোগ করতে পারতাম ?
সাদিয়া-আমি জানতাম তুই আমাকে ঠিক-ই একদিন হা বলবি
-ইস কত জানতিস টা তো দেখলাম-ই...চল আজ দুইজন মিলে Ice creme খাই ...
সাদিয়া- মন্দ হয় না
ধীরে ধীরে সাদিয়া এর সাথে আমার সম্পর্ক আরো মজবুত হতে থাকে ...decision নিই দুই জন বিয়ে করব...
আমার ছোট বোন সবসময় আমার দলে তাই ছোট বোনকে বুঝিয়ে বাবা-মা কে রাজি করিয়েছি সাদিয়ার বাসায় প্রস্তাব নিয়ে যাবার জন্য ...অনেক কষ্টে বাবা মা রাজি হন, দিন তারিক ঠিক করে সাদিয়ার বাসায় বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে যাওয়া হয়...সাদিয়ায় বাবা মা প্রথমে রাজি না হলে-ও অবশেষে রাজি হন ..ঠিক হয় বিয়ে যখন করবে-ই তখন ছেলের Masters শেষ করার পর বিয়ে হবে....যথারীতি তাই হবে...
অনার্স শেষ করে মাস্টার্স এর প্রথম বর্ষ ..প্রায় সন্ধার পর সাদিয়ার জর আসতো আবার আস্তে আস্তে কমে আসতো... হঠাথ করে একদিন সাদিয়া ক্লাস শেষ হবার পর মাথা ঘুরে পরে যায় ...ঢাকা মেডিকেল কাছে হবার কারণে ওকে নিয়ে দ্রুত ডাক্তারের কাছে যাই ..ডাক্তার কিছু টেস্ট করতে দেন...রিপোর্ট দেখার পর বললেন সাদিয়ার অবস্থা ভালো না ওর blood cancer ধরা পরেছে.... একথা শুনে আমাদের মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পরে...বাসায় নিয়ে আসি ওকে....কি করব বুঝতে পারি না.....সামনে ওর সাথে আমার বিয়ে ..দুই জন একসাথে অনেক দুরের পথ পাড়ি দেব এই স্বপ্নে বিভোর..তা ভেঙ্গে খান খান হয়ে যায় ...
ধীরে ধীরে সাদিয়া আমার থেকে দুরে দুরে সরে থেকে ..ঠিক মত কথা বলে না..আমি বুঝতে পারি ও চায় না আমি ওর সাথে নিজেকে জড়িয়ে শেষ হয়ে যাই..কিন্তু আমি যে সাদিয়া কে ছাড়া আর কিছু ভাবতে পারিনা ...বিয়ে করলে-ই ওকে-ই করব..বাসায় আমার মতামত জানিয়ে দেই...সাদিয়ার বাবা মা আমাকে অনেক বুঝায় কিন্তু আমি কিছুতে মানতে নারাজ....নিজের ভবিষ্যতের কথা বাদ দিয়ে সাদিয়াকে-ই অবশেষে সবার অমতে বিয়ে করি ....সাদিয়া সেদিন চোখে পানি ধরে রাখতে পারেনি ...আমি জানি সে কান্না ছিল খুশির কান্না আনন্দের কান্না ,ভালবাসার কান্না....
এভাবে-ই এগিয়ে যায় আমাদের বিবাহিত জীবন....সাদিয়ার শরীর খুব একটা ভালো না ....তারপর-ও দুই জন একসাথে বৃষ্টি তে ভেজা বিকেল বেলায় হাটতে যাওয়া ice creme খাওয়া কিছু-ই বাদ যেতো না....সাদিয়া কে কখনো বুঝতে দেই নি ওর এত বড় অসুখ...সবসমসয় হাসি খুশি রাখার চেষ্টা করতাম....
আমাদের আনন্দের দিন বেশিদিন টিকলো না ...বিয়ের দের বছরের মাথায় ওর শরীর আরো খারাপ হয়ে গেলো ...ডাক্তার জানালো আর বেশি দিন সাদিয়া থাকতে পারবেনা আমাদের সাথে চলে যাবে না ফেরার দেশে....বুকে এত কষ্ট চেপে রেখে-ও মুখে সব সময় হাসি ফুটিয়ে রেখেছি সাদিয়ার জন্য...সাদিয়ায় খুব ইচ্ছে ছিল শেষ ও আমার সাথে বৃষ্টিতে ভিজবে..কিন্তু ওর শেষ ইচ্ছা পূরণ হয় নি ..আমাদের কাউকে কিছু না বলে-ই কোনো এক ভোরবেলায় ও চলে যায় অচিন দেশে ....দুইজন এর একসাথে বৃষ্টিতে আর ভেজা হলো না ...........
চোখের নিচে,নাকের ঠিক উপরে চশমার দাগগুলো বেশ মোটা হয়েছে ...চোখটা বড্ড বেশি বেথা করছে আজকাল ঠিক মত দেখাও যাচ্ছে না ...জানালার পাশে বসে পুরনো দিনের কথা মনে করতে করতে কখন যে বৃষ্টি চলে এসেছে খেয়াল করি নি ...সাদিয়ার আর শেষ বৃষ্টি তে ভেজা হয় নি ...কিন্তু আজ আমি বৃষ্টি তে ভিজব.....মন খুলে প্রাণ ভরে আজ বৃষ্টি তে ভিজব ....
SHARE AND LIKE PLEASE http://www.facebook.com/MonerKothaBD

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



