মুশফিকুর, এটাও কিন্তু আপনার কাজ
উৎপল শুভ্র, ক্যান্ডি থেকে
সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ দলের অধিনায়কের অপেক্ষায় বসে আছেন সাংবাদিকেরা। পরদিন ওয়ানডে সিরিজের শেষ ম্যাচ। বৃষ্টিতে দ্বিতীয় ম্যাচ ভেসে যাওয়ায় বাংলাদেশের সিরিজ ড্র করার অপ্রত্যাশিত সুযোগ। এমন গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের আগে অধিনায়কের কথাই তো শুনতে চাইবে সবাই। অথচ সংবাদ সম্মেলনে এলেন কিনা কোচ শেন জার্গেনসেন ও আবদুর রাজ্জাক!
‘অধিনায়কত্ব পাওয়ার জন্য অভিনন্দন’—এই প্রতিবেদকের রসিকতায় রাজ্জাক বিব্রত হাসি দিয়ে বললেন, ‘না, না, আমি অধিনায়ক নই।’ সেটি তো সবারই জানা। তা যিনি অধিনায়ক, সেই মুশফিকুর রহিম কোথায়? তিনি এলেন না যে! মুশফিকুর তখন টিম হোটেলের সামনে বাসে বসে। বাংলাদেশ দল অনুশীলনে যাবে, তিনি সংবাদ সম্মেলন শেষের অপেক্ষায়।
এমন একটা গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের আগে অধিনায়ক সংবাদ সম্মেলনে এলেন না কেন? সংবাদ সম্মেলন শেষে বেরিয়ে যাওয়ার সময় বাংলাদেশ দলের মিডিয়া ম্যানেজার রাবিদ ইমাম ব্যাখ্যা দিলেন, ‘অধিনায়ককেই আসতে হবে, এমন কথা নেই। ও বলেছে, আবার তো গিয়ে ওই একই কথা বলতে হবে।’ পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা শ্রীলঙ্কা ক্রিকেটের মিডিয়া ম্যানেজার রাজিথ ফার্নান্ডো ভুলটা ধরিয়ে দিলেন, ‘এই সফরের এমওইউতে (মেমোরেন্ডাম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং) এটা বাধ্যতামূলক করা আছে। পরিষ্কার বলা আছে, ম্যাচের আগের দিনের সংবাদ সম্মেলনে অধিনায়ককে আসতে হবে আর ম্যাচ শেষের সংবাদ সম্মেলনে অধিনায়ক ও ম্যান অব দ্য ম্যাচকে।’
বলাই বাহুল্য, বাংলাদেশ দলের মিডিয়া ম্যানেজার তা জানতেন না। ম্যানেজারেরও ‘এমওইউ’ পড়ে দেখার সময় হয়নি। প্রথম ওয়ানডের পর সংবাদ সম্মেলনে শ্রীলঙ্কান অধিনায়ক অ্যাঞ্জেলো ম্যাথুস এলেও মুশফিকুর রহিম তাই আসেননি। অ্যাঞ্জেলো ম্যাথুস কালও এলেন। ১৬ কিলোমিটার দূরের পাল্লেকেলে স্টেডিয়ামে অনুশীলন করে ফিরেই সরাসরি সংবাদ সম্মেলনে।
বৃষ্টির পূর্বাভাস ছিল বলে দুই দলের অনুশীলনে যাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা ছিল। এ কারণেই মাঠের বদলে দুই দলের ক্যান্ডি-নিবাস মাহাভেলি রিচ হোটেলে আয়োজিত হয়েছিল সংবাদ সম্মেলন। যেটিতে অনুশীলন ও যাত্রাপথের ক্লান্তির পরও ম্যাথুস আসতে পারলেন আর হোটেলে থেকেও আসতে পারলেন না মুশফিকুর রহিম!
শ্রীলঙ্কাতে সংবাদমাধ্যমের উপস্থিতি খুব সরব নয়। এই সিরিজে সব সংবাদ সম্মেলনেই বাংলাদেশের সাংবাদিকেরা বিপুল ব্যবধানে সংখ্যাগুরু। কালকের সংবাদ সম্মেলনেও যেখানে বাংলাদেশের ২০ জনের বেশি সাংবাদিক, শ্রীলঙ্কার মাত্র তিন-চারজন। তার পরও অ্যাঞ্জেলো ম্যাথুস ঠিকই বুঝলেন, অধিনায়কত্বের অনেক দায়িত্বের মধ্যে সংবাদমাধ্যম সামলানোও একটি। মুশফিকুর যা বুঝলেন না।
মুশফিকুর রহিম যা-ই করেন, মনপ্রাণ ঢেলে করেন। নিজের খেলা নিয়ে সব সময়ই খুব সিরিয়াস। ঐচ্ছিক অনুশীলনে একজন গেলেও দেখা যাবে সেটি তিনি। অধিনায়ক হওয়ার পর পুরো দল নিয়ে চিন্তাভাবনাতেও একই রকম তীব্রতার ছাপ। দলের বাকি খেলোয়াড়দের কাছে এখানে তিনি রীতিমতো ‘রোল মডেল’। কিন্তু তাঁকে কে বোঝাবে, শুধু মাঠেই নয়, অধিনায়কের মাঠের বাইরেও অনেক দায়িত্ব থাকে। এই সফরে সেটি তিনি পুরোপুরি পালন করছেন কি না, এটা নিয়ে প্রশ্ন আছে।
প্রশ্ন তুলে দিচ্ছে হাম্বানটোটার একটি ঘটনা। হাম্বানটোটায় বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কা দুই দলই ছিল গ্র্যান্ড উদাওলাওয়ে সাফারি রিসোর্টে। এখানকার প্রথামতো তাদের স্বাগত জানাতে নানা আয়োজন ছিল। যার একটি অংশ ছিল অধিনায়ককে নিয়ে প্রদীপ প্রজ্বালন। অ্যাঞ্জেলো ম্যাথুস জ্বালিয়েছেনও। কিন্তু মুশফিকুর রহিমকে দিয়ে তা করানো যায়নি। প্রত্যাখ্যানটা খুব শোভনভাবে করেননি বলেও অভিযোগ।
একটি সূত্রে ঘটনাটা জানার পর কাল ওই হোটেলে যোগাযোগ করা হলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হোটেলের এক কর্মকর্তা খুব ব্যথিত সুরে বললেন, ‘আমরা অনেক টাকা খরচ করে ড্রামার এনেছিলাম, নাচের দল এনেছিলাম। সব দেশের ক্রিকেট দলকে স্বাগত জানাতেই আমরা তা করি। অধিনায়ক প্রদীপ জ্বালিয়ে হোটেলে ঢোকেন। এই ছবি পত্রিকায় ছাপা হবে বলে স্থানীয় দুজন সাংবাদিকও ছিলেন। কিন্তু বাংলাদেশ ক্যাপ্টেন বাস থেকে নেমে কোনো দিকে না তাকিয়ে রিসেপশনে চলে যান। আমি প্রদীপ হাতে নিয়ে তাঁর কাছে গিয়ে অনুরোধ করেছিলাম। কিন্তু তিনি করলেন না তো করলেনই না।’
ম্যানেজার তানজীব আহসানকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করায় তিনি দাবি করলেন, এমন কিছু তিনি জানেন না। ম্যানেজার ‘না জানলেও’ মুশফিকুর অবশ্য এটি স্বীকার করছেন। মিডিয়া ম্যানেজারের মাধ্যমে দেওয়া তাঁর বক্তব্যে ম্যানেজারেরও সম্পৃক্ততা আছে, ‘বাস জার্নি করে আমার শরীর ভালো লাগছিল না। আমি তাই ম্যানেজারকে জানিয়ে রুমে চলে গিয়েছিলাম।’
কলম্বো থেকে উদাওলাওয়ে বাসযাত্রায় ক্লান্ত হওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু মুশফিকুর রহিম নিজেই না বলেন, ক্রিকেটাররা হলো রাষ্ট্রদূত। তা-ই যদি হয়, কখনো কখনো ক্লান্তি আর বিরক্তি চেপে রেখে হাসিমুখে সেই ভূমিকাটা পালন করাও কি তাঁর উচিত নয়?

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


