somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

মেজর নাজমুল হক : অকৃতজ্ঞ জাতির এক অচ্ছ্যুৎ সেক্টর কমান্ডার

২৬ শে সেপ্টেম্বর, ২০০৯ ভোর ৬:২০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ওভাবে মরাটা উচিত হয়নি মেজর নাজমুল হকের। নির্ঘুম কয়েক রাত শেষে বৃষ্টি ভেজা পাহাড়ি রাস্তায় জিপ চালাচ্ছিলেন। চশমার কাচটা বুঝি ঝাপসা হয়ে এসেছিলো। গাড়ি উল্টে খাদে পড়ে মৃত্যুবরণ করেছিলেন তিনি। কিন্তু ওভাবে নয়, তার চেয়ে বরং কোনো পাকিস্তানী ব্যাটেলিয়ানের দিকে দু হাতে মেশিনগানের গুলি ছুড়তে ছুড়তে মরলে সেটা একটা কাজের কাজ হতো। বীরশ্রেষ্ঠ না হোক, একটা বীর প্রতীক কিংবা বীর বিক্রম জুটেই যেত। যুদ্ধে বীরত্ব বলতে ramboর চেয়ে কম কিছু আমাদের আসে না। অভাগা নাজমুল হক, মরলেন কিনা যুদ্ধের দ্বিতীয় শ্রেনীর মরণ! তাও ভালো যে শরণার্থী শিবিরের বৃদ্ধ এবং শিশুদের মতো কলেরা কিংবা ডায়েরিয়ায় মরেননি। সেটা হতো তৃতীয় শ্রেনীর মরণ। এসব মৃত্যুর কোনো স্বীকৃতি নেই। তাই স্বীকৃতি জোটেনি নাজমুল হকেরও। মেজর নাজমুল হক (কোন পদবী নেই মরহুম ছাড়া), সে সময় অন ডিউটি ছিলেন। মেজর নাজমুল হক মুক্তিযুদ্ধের ৭ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার ছিলেন। সোনাদীঘি মসজিদে তারই সেকেন্ড ইন কমান্ড বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরের পাশেই শুয়ে আছেন তিনি। তার বদলী অবসর ভেঙ্গে যুদ্ধে যোগ দেওয়া লে. কর্ণেল কাজী নুরুজ্জামানও একজন বীর উত্তম। প্রত্যেক সেক্টর কমান্ডারই তাই। মেজর নাজমুল হক কোনো গ্যালান্টারি এওয়ার্ড পাননি, তার নামের ব্র্যাকেটে মরহুম লিখতে হয়- এটাই তার খেতাব।



আর বীরত্বের খেতাব! তিনি একজন সেক্টর কমান্ডার ছিলেন- এটাই প্রতিষ্ঠা করতে তার পরিবারের লেগেছে ৩০টি বছর। ছোট্ট দুটো দুধের শিশুকে নিয়ে তার স্ত্রী কিভাবে দিনপাত করেছেন খোজ নেননি কোনো সরকার। কেনো? কোন ব্যাপারটা মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে অচ্ছ্যুৎ রেখেছে নাজমুল হককে? গাড়ী দূর্ঘটনায় মৃত্যু? বিভ্রান্তির এখানেই শেষ নয়। আপনি ভালো ভালো অনেক ওয়েবসাইটে দেখবেন ৭ নম্বর সেক্টরের খতিয়ান। নাজমুল হকের দায়িত্ব সীমা লেখা আছে ১৪ আগস্ট ১৯৭১ পর্যন্ত! তার মানে দাঁড়ায় কি? হি লস্ট হিজ কমান্ড! যেই এএসএম সামসুল আরেফীনের মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ব্যক্তির অবস্থান বইটিকে নথিপত্রের বিচারে সবচেয়ে অথেনটিক হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়, সেখানেও নাজমুল হকের নামের শেষে শহীদ আগস্ট ‘৭১ লেখা। অথচ উনি মৃত্যুবরণ করেছেন ২৭ সেপ্টেম্বর। মুনতাসীর মামুন সম্পাদিত মুক্তিযুদ্ধ কোষে আরো করুণ দশা। ক্যাপ্টেন আনোয়ার আর সুবেদার রব নাকি সেখানে সেক্টর কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করেছেন, পরে মুজিব নগর সরকার তাকে দায়িত্ব দেয়, আর মুজিব নগর থেকে ফেরার পথে তিনি গাড়ী দূর্ঘটনায় মারা যান! একজন সেক্টর কমান্ডার! যুদ্ধের শুরুর উদ্যোক্তাদের একজন, লড়িয়েদের একজন!! হি ইজ নট জাস্ট এনিবডি গড ড্যামইট!!!



‘৬২তে কমিশন পাওয়া নাজমুল হক, আইএসআইতে ছিলেন। পাকিস্তান আর্মি ইন্টেলিজেন্সে। হো.মো এরশাদের প্রভুভক্তি তার থাকলে ডেপুটেশনে তাকে নওগা পাঠানো হতো না, তাও ইপিআরের উইং কমান্ডার করে। ১৮ থেকে ২৩ মার্চ তাকে ঘুরিয়েছেন মেজর আকরাম কমান্ড হস্তান্তরে গরিমসি করে। দায়িত্ব হাতে পেয়েই বিন্যস্ত করেছেন তার অধীনস্ত কোম্পানিগুলোকে। ২৫ মার্চ রাতের গণহত্যার পর সেনাবাহিনীর বিদ্রোহের খবর তার কানে আসেনি। তিনি বিদ্রোহ করেছেন তার ইপিআর নিয়ে। পিলখানার নারকীয় হত্যার খবর ততক্ষণে পৌছে গেছে তার কাছে। ১২ জুলাই ১৯৭১ আনুষ্ঠানিকভাবে ৭ নম্বর সেক্টরের দায়িত্ব সঁপা হয় নাজমুল হককে। তরঙ্গপুরকে সদরদপ্তর বানিয়ে তার ওপর ভার পড়ে রাজশাহী-পাবনা-বগুড়া ও দিনাজপুরের দক্ষিনাঞ্চল শত্রুমুক্ত করার। এর আগে সেক্টর কমান্ডারদের অধিবেশনে নাজমুল নজর কাড়েন দুটো বিশেষ সিদ্ধান্তের উপর জোর দিয়ে : মুক্তিযোদ্ধাদের পর্যাপ্ত চিকিৎসা এবং সেনা-ইপিআর-পুলিশ নির্বিশেষে অস্ত্রের একত্রিকরণ।



একজন সেক্টর কমান্ডার হিসেবে নয়, যোদ্ধা হিসেবে নাজমুল হক কোনো খেতাব পেতে পারেন কি? রাজশাহী পুলিশ লাইন যেখানে রাজাকারদের ট্রেনিং হতো- স্বয়ং আক্রমণ করেছেন নাজমুল তার বাহিনী নিয়ে। ২৯ মে হারিতকাডাঙায় এক যুদ্ধে নিজে আক্রমনে লিড দিয়েছেন, ১১ জন মুক্তিযোদ্ধার বিনিময়ে প্রাণ নিয়েছেন ১৮ জন পাকিস্তানীর। দখল করেছেন দুটো ভারী ও চারটি মাঝারি মেশিনগানসহ প্রচুর অস্ত্র। ১৮ জুন দিনাজপুরের কাঞ্চন ব্রিজে মাত্র এক কোম্পানি সৈন্য নিয়ে এই একইরকম বীরত্ব দেখিয়েছেন নাজমুল। এসব আমার মুখের কথা না, সামরিক বাহিনীর নথিতেই লিপিবদ্ধ আছে। রেকর্ড আছে। আমরা মেজর নাজমুল হককে, সম্মুখ যুদ্ধে অংশ নেওয়া বিরল সেই সেক্টর কমান্ডারদের একজনকে মরহুমের বেশী কোনো সামরিক খেতাব দিই না।

যে রাতে তার মৃত্যু হয় সেদিন ফিরে ১হাজার ৮০০ জনের গেরিলা দলকে ব্রিফিং দেওয়ার কথা ছিলো তার। একজন মুক্তিযোদ্ধা সেই স্মৃতি জাগিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন মুক্তিযোদ্ধা যাদুঘরে আয়োজিত স্মরণসভায়। না সেখানে কোনো সেক্টর কমান্ডার পায়ের ধুলি রাখেন নি, এসেছিলেন সাধারণ মুক্তিযোদ্ধারাই। স্ত্রী কন্যাদের দূরে ফেলে এই সাধারণ মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গেই যে খেতেন ঘুমাতেন তাদের প্রিয় নাজমুল স্যার। মালদহ গিয়েছিলেন ভারতীয় সেনা সদরের জরুরী তলবে। সেখানে তার ম্যাপ রিডিংয়ে মুগ্ধ (নাজমুল আর্টিলারীর অফিসার ছিলেন) ভারতীয় জেনারেল মোহনলাল বলেছিলেন- নাজমুল গো এহেড, আ’ম উইথ ইউ। পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সুযোগ আর হয়নি নাজমুলের।

যে দেশের মুক্তির জন্য নাওয়া খাওয়া ছেড়ে, স্বজন-সন্তান ছেড়ে অস্ত্র হাতে নিয়েছিলেন, নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তারই মতো একদল লড়াকু মুক্তিপাগলের, সেই দেশে, সেই স্বাধীন বাংলাদেশে আজ বড়ই ব্রাত্য নাজমুল। মেজর নাজমুল হক। গুলশান-২ এর একটি সড়ক নামকরণের মধ্যে দিয়ে যার সেক্টর কমান্ডার পরিচয়ের জানান পাই আমরা। মেজর নাজমুল হক। মুক্তিযুদ্ধে দ্বিতীয় শ্রেনীর মৃত্যুবরণকারীদের একজন। মেজর নাজমুল হক। খেতাবহীন, সম্মাননাহীন একজন সেক্টর কমান্ডার।
বাট, আই স্যালুট ইউ স্যার।

আরো পড়তে পারেন : ১০ মে, ১৯৭১ নিউজউইকে প্রকাশিত নাজমুল হকের সাক্ষাতকার


(২৭ সেপ্টেম্বর ১৯৭১, এই বীর সেক্টর কমান্ডারের মৃত্যু দিবস। তাকে শ্রদ্ধা জানাই)



শেষ কথা : আমার কাছে তার কোনো ছবি নেই। তাই মুক্তিযুদ্ধে ইপিআর বাহিনীর দুটো যুদ্ধছবি তুলে দিলাম। ভিডিওফুটেজটিতে সম্ভবত নাজমুল হক কথা বলেছেন, আমি নিশ্চিত নই।

ছবি কৃতজ্ঞতা : অণৃণ্য
সর্বশেষ এডিট : ২৭ শে সেপ্টেম্বর, ২০০৯ দুপুর ২:৩৪
৬৬টি মন্তব্য ৫১টি উত্তর পূর্বের ৫০টি মন্তব্য দেখুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বন - আমার প্রিয় বন্ধু

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ১৮ ই জুন, ২০১৯ রাত ২:৪৮



জীবন ও জীবিকার প্রয়োজনে গ্রাম থেকে গেছি শহরান্তে, শহর থেকে গেছি দেশান্তরে, যেখানেই গেছি আমার জীবনে খাবার নিয়ে ভাবতে হয়নি কারণ আমার বন্ধু কখনো আমাকে ছেড়ে যায়নি, বেইজীং সাংহাই... ...বাকিটুকু পড়ুন

**** পথে চলতে চলতে **** ( পর্ব দশ )

লিখেছেন ওমেরা, ১৮ ই জুন, ২০১৯ দুপুর ১:৪৯



২০০৮ সালের জানুয়ারী মাসের একটা দিন । সেদিনটা ছিল শনিবার ও খুবই দূর্যোগপূর্ণ একটা দিন । আকাশ থেকে মুসুলধারে স্নো পরছিল সাথে প্রচন্ড ঠান্ডা বাতাস ছিল। সকাল ১১টা বাজলেও... ...বাকিটুকু পড়ুন

এক ফেরাউনের মৃত্যু

লিখেছেন হাসান কালবৈশাখী, ১৮ ই জুন, ২০১৯ দুপুর ২:৫২

মুরসিকে মিশরের 'গোলাম আজম' বলা যায়।
কারন মুরসির দল ব্রাদারহুড ও বাংলাদেশের জামাতিরা ছিল একই আদর্শের।
ব্রাদারহুডের প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক দল ফ্রিডম অ্যান্ড জাস্টিস পার্টি ।
এর আগে এই দলটি ছিল জঙ্গি সন্ত্রাসি। টুরিষ্ট... ...বাকিটুকু পড়ুন

মোহাম্মদ মুরসি- নির্ভীক এক সাহসী সৈনিকের প্রস্থান; সত্যের পথে লড়ে গেলেন জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত

লিখেছেন নতুন নকিব, ১৮ ই জুন, ২০১৯ বিকাল ৩:০৪



মিশরের রাজধানী কায়রোর নিকটবর্তী আল ওয়াফা আল আমাল পাবলিক কবরস্থান (The Al-Wafaa Wa al-Amal public cemetery in Cairo)। এখানেই সমাহিত করা হয়েছে প্রেসিডেন্ট মোহাম্মাদ আল মুরসিকে।
ছবি: আল জাজিরাহ... ...বাকিটুকু পড়ুন

গ্রেট নায়ক রজনীকান্ত

লিখেছেন রাজীব নুর, ১৮ ই জুন, ২০১৯ বিকাল ৩:৪৯




গত দুই বছরে অসংখ্য সাউথ ইন্ডিয়ান মুভি দেখেছি। বিপুল আনন্দ পেয়েছি। দেড় দুই ঘন্টা- মনে হয় বেশ আনন্দে পার করলাম। যারা মুভি দেখেন, তারা জানেন সাউথ ইন্ডিয়ান... ...বাকিটুকু পড়ুন

×