somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বড় গল্পঃ নেকড়ের ডাক

২০ শে সেপ্টেম্বর, ২০১৭ দুপুর ১:১৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :




কদিন থেকে একটা ব্যাপার আমার মনে হচ্ছে যে কেউ যেন সব সময় আমার দিকে তাকিয়ে থাকে । চোখে চোখে রাখে । দিনের বেলা এই অনুভুতিটা কম হলে রাতে বেলা অনুভুতিটা বাড়তেই থাকে । বিশেষ করে রাতের বেলা যখন টিউশনী থেকে ফিরি তখনই মনে হয় কেউ যেন আমার দিকে তাকিয়ে আছে । আমাকে দেখছে । আমার অস্বস্থিটা অনেক দিনের ।

আবন্তিকে এই কথা বলতেই আবন্তি কেমন যেন গম্ভীর হয়ে গেল । অবশ্য ও এমনিতেও গম্ভীর । খুব একটা কথা বলে না দরকার ছাড়া । আমার সাথে তো তাও কিছু কথা বলে অন্য কারো সাথে একদমই কথা বলে না !

তবে আজকে ওর মনটা অন্য যেকোন দিনের থেকে বেশি গম্ভীর , কারনটা যদিও আমার কাছে পরিস্কার । রিদির কাছে শুনতে পেলাম আজকে হলে নাকি আবন্তির সাথে লিসা খুব বাজে ব্যবহার করেছে । ওর সাথে ইচ্ছে করে ঝগড়া বাধানোর চেষ্টা করেছে । আবন্তি কেবল চুপচাপ দাড়িয়ে ছিলো । কোন কথা বলে নি ।
লিসা মেয়েটাকে নিয়ে আর পারা গেল না । মেয়েটার সাথে আরও ভাল করে কথা বলতে হবে দেখছি ! আরও ভাল করে বোঝাতে হবে !
আমি আবন্তির দিকে তাকিয়ে বললাম
-কি ব্যাপার এমন চুপ করে রয়েছো কেন ? মন খারাপ ?
আবন্তি আমার দিকে তাকালো । ওর চোখে খানিকটা টা চিন্তার রেখা দেখতে পেলাম । আমার দিকে তাকিয়ে বলল
-কবে থেকে এমন মনে হচ্ছে ?
-কি মনে হচ্ছে ?

আমি প্রথমে ঠিক বুঝতে পারি নি আসলে ও কোনটার কথা বলছে । তারপর বুঝতে পারলাম আসলে ও কোনটার কথা বলছিলো । আমাকে কেউ দেখছে কিংবা ফলো করছে এই অনুভুতির কথা বলছে । আসলে আমি ওকে ঠিক কিছু ভেবে কথাটা বলি নি । ওকে দেখে অন্যান্য দিনের চেয়েও একটু বেশি গম্ভীর মনে হচ্ছিলো । তাই কিছু একটা বলতে চাচ্ছিলাম । আমি বললাম
-বেশ কিছু দিন থেকে !
-আমাকে বল নি এর আগে ?
-আসলে ? আমি ঠিক বুঝতে পারি নি !
-তোমার যদি কিছু হয়ে যেত তখন ?

আমি কিছুই বুঝতে পারলাম না । আমার কি হবে ! কিন্তু ওর কন্ঠস্বর শুনে মনে হল ও আসলেই আমার এই ব্যাপারটা নিয়ে একটু চিন্তিত । কিন্তু আমি ঠিক বুঝতে পারলাম না এতো চিন্তার কি আছে ! আমি আসলেই ঠিক বুঝতে পারছিলাম না । তবে আমার জন্য ওর এই চিন্তা দেখে আমার বেশ ভাল লাগছিলো । মনের ভেতরে একটা সুক্ষ আনন্দবোধ হচ্ছিলো । তবে আবন্তি আর কোন কথা বলল না । আমরা আরও কিছুটা সময় চুপ করে বসে রইলাম । সন্ধ্যা হওয়ার আগে মুহুর্তে ওকে হলের গেটে রেখে এলাম । আমার আবার টিউশনীতে যেতে হবে !



রাতের বেলা আবন্তির ফোন পেয়ে আমি একটু অবাক হলাম । এতো রাতে আবন্তি কখনই ফোন দেয়না । এতো রাতে কেন আবন্তি কোন সময়ই আমাকে ফোন দেয় না । আমি ওকে ফোন দিলে ও কথা বলে । ওর কথা শুনে ঠিক বুঝতে পারি না ও আমার প্রতি আগ্রহী কিংবা বিরক্ত ! একবার মনে হয় ও আমার প্রতি খুব বেশি আগ্রহী । ঠিক যেমনটা আজকে বিকেলে হয়েছিলো । আমার কোন একটা ব্যাপার নিয়ে ও বেশ চিন্তিড় হয়ে উঠেছিলো । আবার কোন কোন সময় মনে হয় ও আমাকে ঠিক চেনেই না ।

ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি প্রায় দুইটা বাজে । এতো রাতে আবার ওকে আমার কি দরকার পড়লো ।

-হ্যালো ।
-অপু !

আমি একটু চমকে উঠলাম । আবন্তির কন্ঠে কেমন ভীত মনে হল । আমি বললাম
-কি হয়েছে ? এমন কেন করছো ?
-তুমি এখনই চলে আসো ?
-মানে কি ? কি হয়েছে ? আমাকে বল কি সমস্যা !
-প্লিজ তুমি চলে আসো ! প্লিজ !

আবন্তি ফোন রেখে দিল । আমি ফোন রেখে কি করবো ঠিক বুঝতে পারছিলাম না । আবন্তি থাকে ভার্সিটির হলে । এই রাতের বেলা ওখানে কি হল ঠিক বুঝতে পারলাম না । ও কন্ঠে এমন কিছু ছিল যা আমাকে সত্যিই চিন্তিত করে তুলল । আবন্তি আমাকে কোন ভাবেই ফান করার জন্য এই ভাবে ফোন দিবে না । তাহলে ?
আমি আরেকবার ফোন দিবো কি না বুঝলাম না । আবন্তির হোস্টেলে আমার আরও কিছু বন্ধুরা থাকে । আমি ঘর থেকে বের হতে হতে রিনা ফোন দিলাম । রিনাও ঐ হলেই থাকে । দুইবার রিং বাজার পরেও কেউ ফোন ধরলো না । আমার কাছে কেন জানি মনে হল কোন না কোন সমস্যা নিশ্চয়ই হয়েছে । আমি আবন্তির হলের দিকে দৌড়াতে লাগলাম ।

এই রাতের বেলা ওর রুমে কিভাবে ঢুকবো বুঝতে পারলাম না । তবে আগে ওখানে যাই তো তারপর দেখা যাবে । কিন্তু যখন ওখানে পৌছালাম আমাকে অবাক হতেই হল । হলের সামনে মানুষ গিজ গিজ করতে । সেই সাথে পুলিশের গাড়ি । চারিদিকে আলো সাইরেনে ভরপুর । আমার মনের ভেতরে কেমন করে উঠলো । আমি হলের গেটের ভেতরে চট করে ঢুকে গেলাম । এতো মানুষ চারিদিকে যে এটা যে মেয়েদের হল সেটা কারো মনে নেই ।

আমি যতই সামনে যাচ্ছি ততই যেন ভীড় বাড়ছে । আমার কেন জানি মনে হল সামনে কোন না কোন ধামেলা হয়েছে । আমি আরও সামনে যাবো ঠিক এমন সময় একজন আমার পেছন থেকে হাত চেপে ধরলো । পেছনে তাকিয়ে দেখি আবন্তি ! ওর চোখ দিয়ে পানি পড়ছে । আামকে দেখতেই আমাকে জড়িয়ে ধরলো । আমি বললাম
-কি হয়েছে এখানে ?
আবন্তি আমাকে জড়িয়ে ধরা অবস্থাতেই বলল
-লিসাকে না কে মেরে ফেলেছে ?
আমি ধাক্কার মত খেলাম । অবাক হয়ে বললাম
-মেরে ফেলেছে মানে কি ? কে মেরে ফেলেছে ?
-জানি না । ওর রুমমেটরা কি যেন বলছে ! কি এক প্রাণী নাকি ওকে খেয়ে ফেলেছে ।

আমি অবিশ্বাসের চোখে আবন্তির দিকে তাকিয়ে রইলাম । কি অবিশ্বাস চোখে তাকিয়ে রইলাম । ওকে দেওয়ালের এ পাশে রেখে আমি সামনে এগিয়ে গেলাম । যা জানতে পারলাম তার সারমর্ম হল হল লিসাকে আসলেই কেউ কিংবা কিছু মেরে ফেলেছে । পুলিশ পরীক্ষা করে দেখেছে । কোন মানুষের পক্ষে এমন ভাবে কাউকে মেরে ফেলা সম্ভব না । কারন লিসার পেটের ঠিক মাঝ খানে খুব বড় একটা ক্ষত । দেখলে মনে হয় যেন কোন হিংস্র প্রাণী সেই জায়গা খেয়ে ফেলেছে । পুরো ঘরে রক্তে ভেসে একাকার অবস্থা ।
লিসার রুমমেট ঠিক মত কোন কথা বলতে পারছে না । তবে যে যে কয়েক লাইন বলছে সেটা অনুযায়ী যখন লিসার চিৎকার শুনে ওর ঘুম ভাঙ্গে ও লাইট জ্বালায় এবং দেখে একটা ৫/৬ হাত লম্বা একটা কালো নেকড়ের মত প্রাণী লিসার পেটের দিকে কামড়ে চলেছে । এটা দেখে ওর রুম মেট চিৎকারে । তারপর প্রাণীটা দরজা দিয়ে দ্রুত বের হয়ে যায় ।


আমি আর কিছু জানতে চাইলাম না । আর কিছু জানারও নেই অবশ্য । আমি আবন্তিকে ব্যাগ গোছাতে বললাম । ও ওর রুমে গিয়ে ব্যাগ গুছিয়ে নিয়ে এল । দেখলাম আবন্তির মত অনেকেই হল ছেড়ে দিচ্ছে । এমন ভয়ংকর ঘটনা ঘটেছে কেউ আর এখানে থাকতে চাইছে না । তবে এতো কিছু হওয়ার পরেও আমার মনের ভেতরে একটা আনন্দের ব্যাপার ঘটলো যে আবন্তি আমার সাথে যাচ্ছে ।


দুই
আবন্তি ছোট ছোট চুমুক দিচ্ছে মগে । চোখটা সামনের দিকে । খোলা আকাশের নিচে আমি আর ও বসে আছি সেই বিকেল থেকে । ছাদের এই দিকটা বসার জন্য বাড়ির মালিক একটা সিমেন্টের বেঞ্চ বানানো । আবন্তি সেই বেঞ্চে বসে আছে । আমি ওর থেকে একটু দুরে বসে আছি । ওর দিকে তাকিয়ে আছি । নীল জিন্স আর সাদা রংয়ের একটা গোলগোলা টিশার্ট পরে আছে । গলার স্টিলের মালাটা পরিস্কার দেখা যাচ্ছে । একটু অদ্ভুদ লাগছে দেখতে ।

আবন্তিকে আমি প্রথম লক্ষ্য করি ওর গলাতে এই অদ্ভুদ মালা দেখে । আসলে ঠিক এটাকে মালা না বলে কলার বলাই ভাল । ইদানিং অনেক মেয়েই গলাতে এমন প্যাচানো মালা/ বেল্ট পরে যেটা কি গলার সাথে পেঁচিয়ে থাকে । কিন্তু আবন্তির গলায় পরানো বেল্ট টা ছিল স্টিলের । একেবারে গলার সাথে শক্ত করে লেগে থাকতো । আবন্তি সব সময় বড় কলারওয়ালা জামা পরে থাকতো বলে সেটা খুব একটা বোঝা যেত না । কিন্তু আমার মনে কৌতুহল গেলেই থাকতো । মনে হত মেয়েটা গলাতে কি চাপ পরে না ? চকচকে স্টিলের বেল্ট টা যেন চেপে বসে আছে ওর গলার সাথে ।

আমি আস্তে আস্তে আবন্তির সাথে কথা বলা শুরু করলাম । তবে আবন্তি ছিল নিরুপ্তাপ । ঠিক আগ্রহ প্রকাশ করতো না আবার বিরক্তও হত না । তবে দিন দিন ওর সাথে মেলা মেশা শুরু করতে করতে লক্ষ্য করলাম যে আবন্তিও আমার সাথে টুকটাক কথা বলছে । আমার ভাল লাগতো । মেয়েটা খুব ঠান্ডা আর শান্ত স্বভাবের ছিল । তবে ওর চোখের মাঝে কিছু একটা ছিল । অন্য কারো সাথে ঠিক কথাই বলতো না । আমার সাথেই কেবল মিশতো ! আমিও ওকে টুকটাক মিশতাম ।




ক্লাস বলতে গেলে একেবারে বন্ধই হয়ে গেছে। আমরা কেউই ক্লাস করি না। সবার ভেতরেই নাকি একটা চাপা ভয় কাজ করছে। এভাবে লিসার মারা যাওয়াটা কেউ ঠিক মেনে নিতে পারছে না।

আরেকটা ব্যাপার অবশ্য আছে। লিসার চাচাতো বড় ভাই আমাদের ক্যাম্পাসের বড় ছাত্র নেতা। তার বোন এভাবে মারা গেছে ব্যাপারটা এতো সহজে মিটমাট হওয়ার নয়। তারা চায় খুনির সাজা হোক । কিন্তু পুলিশ কোন কুল কিনারাই করতে পারছিলো না ।

ওর দুই রুমমেট কে প্রথমে সন্দেহ করা হলেও পোস্ট মার্টাম রিপোর্টে অদ্ভুদ কিছু পাওয়া গেছে। লিসার শরীরে যে সব আঘাত পাওয়া গেছে সে সব নাকি কোন অস্ত্রের আঘাত নয়। বড় কোন বন্য যন্তু ওকে আক্রমন করেছে।

এতে রহস্য আরও ঘন হয়েছে। কেউ কিছু বলতে পারছে না। লিসার জন্য একটু খারাপ লাগছিলো । সেই সাথে আবন্তির জন্য একটু চিন্তা হচ্ছিলো । লিসার সাথে ঐদিন আবন্তির কিছু একটা হয়েছিলো । হলের অনেকেই দেখেছে । আমি খবর পেলাম যে এই কথাটা নাকি লিসার চাচাতো ভাইয়ের কাছেও গেছে । সে নাকি আবন্তিকে দেখা করতে বলেছে । কিন্তু আমি চাচ্ছি না আবন্তি তার সামনে পরুক । বলা যায় কি থেকে কি করে বসতে পারে । তাই আবন্তিকে নিজের কাছেই রেখে দিয়েছি ।

ঐদিনের পর থেকে আবন্তি আমার সাথেই রয়েছে। ক্যাম্পাসের কাছেই একটা বাসার চিলেকোঠা ভাড়া নিয়ে থাকি আমি। সেখানেই উঠেছে ও। শুরু থেকেই আবন্তি আমার কাছে একটা রহস্যময় চরিত্র ছিল। ওর সাথে কথা বলেও আমি ঠিক বুঝতে পারতাম না যে ও আসলে কি চায়। একবার মনে হত ও আমাকে পছন্দ করে আরেকবার মনে হত করে না। কিন্তু গত এজ সপ্তাহ ধরে মনে হচ্ছে মেয়েটা কেবল পছন্দই করে না, আমাকে ভালবাসে।

এই কটা দিনে ওর কাছ থেকে অদ্ভুদ কিছু তথ্য পেলাম। যার একটা যে ওদের হলে নাকি আসকেই এমন একটা পশুকে দেখা গেছে আগেও। অনেকে নাকি পশুটার চাপা গর্জন শুনতে পেয়েছে। গত বছর ফার্স্ট ইয়ারের একটা মেয়ে নাকি নিচ তলার করিডোরে একটা চার পেয় জন্তু দেখতে পেয়েছিল। মেয়েটা দেখেই চিৎকার দিয়েছিল। কিন্তু কেউ তখন ওর কথা বিশ্বাস করে নি। কেউ কেউ আবার ধারনা করেছে যে মেয়েটা হয়তো কোন কুকুরকে দেখেছে। হয়তো কোন কুকুর ঢুকে পরেছিল। কেউ তার কথায় কান দেয় নি । তারপর অনেকেই নাকি তাদের দরজার বাইরে চাপা গর্জন শুনেছে । বেশির ভাগই নিজেদের রুমের দরজা বন্ধ করে শুয়ে থেকেছে ভয়ে । কেউ কেউ সাহসী হয়ে বাইরে বের হয়ে এসেছে তবে কেউই কিছু দেখে নি ।

ব্যাপারটা এমনও না যে তারা ঘুমের ঘোরে শুনেছে । রাত জেগে যারাই পড়াশুনা করতো তারা নাকি এই চাপা গর্জন শুনতো । এটা নাকি হলের সবাই জানতো । আবন্তি এই কদিন কেমন যেন একটু অন্য রকম আচরন করছে । শুরু থেকেই ও একদম চুপচাপ থাকতো । তবে এই কদিন আমার সাথে ও প্রাণ খুলে কথা বলছে । কত কথা যে বলছে আমার সাথে । আমি খানিকটা অবাক হচ্ছি ।

আজ বিকেল থেকেই ছাদে বসে ওর সাথে গল্প করেই যাচ্ছি । ও এসব নিয়েই কথা বলছিলো । তখনই ও নেকড়ে মানবের কথা বলল । হলের অনেকেই নাকি বিশ্বাস করে ওদের হলে যে পশুটার কথা বলে হচ্ছে সেটা নাকি কোন স্বাভাবিক পশু নয় । সেটা আদি ভৌতিক নেকড়ের মানব । যেটা কি না রাতের বেলায় নেকড়ের রূপ নেই আবার কেউ দেখার আগেই মানুষ হয়ে যায় । কেউ এই জন্য সেটাকে দেখতে পায় না । আমি ওর কথা শুনে হেসে উঠতেই আবন্তি বলল
-সত্যি বলছি কিন্তু !
-বুঝলাম ।
-তুমি আমার কথা বিশ্বাস করছো না ?
-না না করবো না কেন ! করছি তো । তোমার কথা বিশ্বাস না করে উপায় আছে । তবে আমার মনে একটা কথা বারবার মনে আসছে ।
আবন্তি আমার দিকে তাকিয়ে বলল
-কি ?
-তুমি আগে আমার সাথে কেমন যেন আচরন করতে । এই কদিন একদম অন্য রকম করে আচরন করছো ! এটার কারন কি ?

আবন্তু কি বলবে ঠিক বুঝতে পারলো না । আমার দিকে কেবল তাকিয়ে রইলো কেবল । তারপর বলল
-তোমাকে আমি পছন্দ করি সেটা কি তুমি জানো ?
বললাম
-এখন জানলাম । আসলে আমি খানিকটা কনফিউজ ছিলাম । কখনও মনে হত পছন্দ কর আবার কখনও মনে হয় কর না ! আসলে আমি তোমার প্রতি যে দুর্বল সেটা তুমি জানো নিশ্চয়ই । তবে তোমার মনভাব ঠিক আমি বুঝতে পারি নি । এখন জেনে ভাল লাগছে ।

আবন্তি আমার সিমেন্টের বেঞ্চের অপর থেকে ওপাশ থেকে আমার শরীর ঘেষে বসলো । তারপর আমাকে অবাক করে দিয়ে আমার ঠোঁটে একটা চুমু খেল । বলল
-আমাকে কেউই ঠিক পছন্দ করে না । জানো তো !
-মানে ?
-লিসা আমাকে একদম পছন্দ করতো না ।

লিসা যে আবন্তিকে পছন্দ করতো না সেটা আমি জানতাম । তার অবশ্য কারন আছে । লিসা আমাকে পছন্দ করতো । পছন্দ করতো বলতে আমার জন্য পাগল ছিল বলা চলে । তবে লিসা খানিকটা উগ্র স্বভাবের থাকার কারনে আমার ঠিক ওকে পছন্দ ছিল না । তার উপরে ওর ওর বড় ভাই ছিল বড় ছাত্র নেতা । সেই পাওয়ার সে সবার উপরেই দেখাতো । আমার উপরেও দেখানোর চেষ্টা করতো । আর লিসা আবন্তিকে পছন্দ করতো না । কারন আমি আবন্তিকে পছন্দ করতাম বলে । হলে নাকি বেশ কয়েকবার ওকে টিজ করার চেষ্টাও করেছে । আবন্তি কেবল চুপ করে থাকতো ! আমার এসবই জানা ছিল । আবন্তি আবারও বলল
-কেবল লিসাই কেন, আমাকে ঠিক কেউ ই পছন্দ করে না । আমার মাও আমাকে দেখতে পারে না । কেবল বাবা আমাকে পছন্দ করতো খুব ! আর এখন তুমি কর !
তাকিয়ে দেখি ওর চোখে পানি কেমন টলমল করছে । কেন জানি বুকের ভেতরটা কেমন করে উঠলো । আমি ওকে নিজের বুকের ভেতরে টেনে নিলাম ! তারপর ওর মাথায় একটু হাত দিয়ে বললাম
-বিয়ে করবে আমাকে ?
আবন্তি যেন এবার কেঁদে উঠলো । তারপর বলল
-আমার জীবনের অনেক কিছুই তুমি জানো না । জানলে হয়তো তুমি আমাকে আর ভালবাসবে না !
আমি ওকে আরও একটু শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বললাম
-আমি তোমাকেই ভালবাসবো । যাই কিছু হোক না কেন এটা কোন দিন বদলাবে না !

আবন্তি নিজের বাবার সম্পর্কে আমাকে আগে বলেছে । ওর দাদা নাকি এলাকার জমিদার ছিল । জমিদাড়ি শেষ হলেও গ্রামের মাথা ছিল । বিশাল বাড়ি লোকজন সবই ছিল তাদের । তারপর ওর দাদার পরে ওর বাবা সব কিছু মালিক হল । কিন্তু একদিন নাকি কে বা কারা এসে ওর বাবাকে মেরে লাশ গুম করে ফেলল । কোথায় তাকে সরিয়ে দেওয়া হল সেটা কেউ জানে না । কিন্তু অবাক হওয়ার বিষয় যে এই ঘটনার পরে ওর বাবাকে কেউ খোজার কোন চেষ্টাই করে নি । ওর মায়ের পক্ষে জমিদারি দেখা শুনার করা সম্ভব ছিল না । আর ওর মা কেন জানি ওর বাবাকে ঠিক পছন্দ করতো না । বিয়েটা নাকি আবন্তির মায়ের অমতেই হয়েছিলো । বাবা মারা যাওয়ার কেয়ার টেকারের হাতে সব কিছু দিয়ে ঢাকা চলে আসে আবন্তির নানা বাড়ি । সেদিকের খোজ খবর খুব একটা রাখে না !

আবন্তিও চলে আসে কিন্তু একটা ব্যাপার সে লক্ষ্য করতে শুরু করে যে ওর মা ওর কাছ থেকে দুরে দুরে থাকছে । কিছুদিন পরে ওর মায়ের আবারও বিয়ে হয়ে গেলে মায়ের কাছ থেকে একদমই দুরে চলে আসে । ওর রয়ে যায় ওর নানা বাড়ি । কিন্তু নানা বাড়িতেও ওকে সবাই যেন একটু এড়িয়েই চলতো । প্রথম প্রথম কিছু বুঝতে না পারলেও একটা সময় ও সব বুঝতে পারে । নিজেকে নিজের মাঝেই গুটিয়ে নেয় !



তিন

-আপনেরা কার বাড়ি যাইবেন ?

আবন্তি এগিয়ে গেল লোকটার দিকে । বলল
-জমিদার বাড়ি ! রাস্তাটা কোন দিকে বলতে পারেন ?

লোকটা যেন কেমন চোখ তাকালো আবন্তির দিকে । তারপর আমার দিকে । আমার লোকটার চেহারার দিকে তাকিয়ে কেবল একটা কথাই মনে হল যে সে আমাদের এই জমিদার বাড়ি যাওয়ার ব্যাপারটা ঠিক পছন্দ করছে না । তবে লোকটা আমাদের হাত দিয়ে একটা রাস্তা ঠিকই দেখিয়ে দিল । আবন্তি লোকটার দিকে খানিকটা হেসে আমার দিকে তাকিয়ে বলল
-কই চল !
-হ্যা ! এই তো ! আসছি !

আমার চোখ তখনও লোকটার দিকে । কেন জানি লোকটার চাহনী আমার কাছে ঠিক ভাল লাগলো না । কেন ভাল লাগলো না আমি সেটা আমি ঠিক বলে বোঝাতে পারবো না । আমি লোকটার দিক থেকে চোখ সরিয়ে আবন্তির দিকে তাকালাম । দেখি ও সামনের দিকে হাটতে শুরু করেছে । আমিও আর কিছু না ভেবে আবন্তির পেছন পেছন হাটতে লাগলাম ।

ঢাকা থেকে দুপুরের দিকে আমি আর আবন্তি রওনা দিয়েছি ওদের গ্রামের বাড়ির দিকে । এবার গরমের ছুটি যেন একটু আগে আগেই দিয়েছে । আমাদের হাতে করার মত তেমন কিছুই করার নেই । প্রতিবার ছুটি পেতেই আমি বাড়ির দিকে রওনা দিতাম কিন্তু এবার পরিস্থিতি অন্য রকম । আবন্তি তার নানা বাড়িতে যেতে চাইছে না । তাই ঠিক হল কোথা থেকে আমরা ঘুরে আসবো । কোথায় ঘুরা যায় এটা বের করতে গিয়ে আবন্তিই বলল যে ওদের গ্রামের বাড়ি যাওয়া যায় । ঢাকা থেকে খুব বেশি দুরে নয় । যেতে খুব একটা সমস্যা হবে না । আর ওদের ওখানে নিজেদের বাড়ি রয়েছে । সুতরাং আরাম করে থাকা যাবে ! তাই আর খুব বেশি চিন্তা না করে বের হয়ে এলাম ।

আমি ভেবেছিলাম আবন্তিদের জমিদার বাড়িটা একটা ধ্বংশ স্তুপ হবে । কিন্তু ওদের জমিদার বাড়ির অবস্থা বেশ ভাল দেখলাম । সব থেকে আকর্ষনীয় হচ্ছে জমিদার বাড়ির গেটটা । এখনও কেমন মাথা তুলে দাড়িয়ে আছে । আমি কিছুটা সময় তাকিয়ে তাকিয়ে দেখতে লাগলাম । আবন্তিও চুপাচাপ অনেকটা সময় তাকিয়েই রইলো নিজেদের বাসাটার দিকে ।

এসব দেখা শুনার জন্য একজন কেয়ার টেকার রাখা আছে । কয়েক মিনিট অপেক্ষা করতেই দেখি একজন ৬০/৬৫ বছরের বৃদ্ধ বের হয়ে এল । আমাকে বাদ দিয়ে আবন্তির দিকে একভাবে তাকিয়ে রইলো । আবন্তি বলল
-রাইনাল চাচা কেমন আছে ?
আবন্তি বলল
-আমাকে চিনেন নাই চাচা ? আমি আবন্তি !
নামটা শুনতেই দেখলাম রাইনাল চাচার মুখটা উজ্জল হয়ে এল ।
-আপনে আইছেন মা মনি !
-হ্যা ! কেমন আছেন আপনি ?
-ভালা আছি ! তা বেগম সাহেবা আসেন নাই ? উনি কই ?
-আম্মু আসে নি ! আমি আর আমার বন্ধু এসেছি । কয়েকদিন থাকবো এখানে !

কয়েকদিন থাকবো শুনেই রাইনাল চাচার মুখটা কেমন কালো হয়ে গেল । এটা আমার চোখ এড়ালো না । তবে সে কিছু বলল না । কেবল বলল যে আমাদের জন্য সে ঘর খুলে দিচ্ছে । সব কিছু পরিস্কার করে রাখছে । আমরা যেন পেছনের পুকুর পাড়ে গিয়ে বসি । ব্যাগ গুলো আমাদের কাছ থেকে নিয়ে গেল ।

আমরা পেছনের পুকুরের পাড়ে গিয়েই বসলাম । যদিও সান বাঁধানো পুকুর তবে অনেকটাই ভেঙ্গে গেছে । অনেক পুরাতন সেটা দেখলেই বোঝা যায় ! আবন্তি বলল
-এই পুকুর পাড়টা আমার সব থেকে প্রিয় ছিল । প্রায় দিনের বেশির ভাগ সময়ই এখানে কাটতো । বাবাও মাঝে মাঝে আসতেন বিকেলে তার কাজ সেরে !

আবন্তি একেবারে আমার গাঘেষে বসলো । যেন হঠাৎ ই ওর কিছু একটা মনে পড়েছে । আমি বললাম
-একটা ব্যাপার লক্ষ্য করেছো ?
আমার দিকে তাকিয়ে ও বলল
-তুমি এখানে থাকবে শুনে রাইনাল চাচা কেমন যেন খুশি হলেন না । আবার ঐ লোকটা যার কাছে রাস্তা জানতে চাইলে সেও দেখলাম কেমন বেজার চোখে তাকিয়েছিল ।
-হ্যা করেছি !
-কেন ?
-কারন তো আছেই । কিন্তু দুজনের চিন্তার কারন ভিন্ন ! তোমাকে বলেছিলাম না আমার বাবাকে কারা যেন মেয়ে লাশ গুম করে দিয়েছিলো !
-হ্যা বলেছিলে !
-রাইনাল চাচা ভয় পাচ্ছে আমার অবস্থাও না এরকম হয় ! আফটার অল এই সব কিছুর মালিক আমিই । আর ঐ যে লোকটা মুখ কালো করে ছিলো সে ভয় পাচ্ছে অন্য কারনে !
-কি কারন ?
-এতো কিছু জানতে হবে না তো ! তুমি এতো প্রশ্ন কর কেন ?
আমি কিছু বলতে যাবো তখনই রাইনাল চাচার ডাক শুনতে পেলাম । ঘর গোছানো শেষ !
আবন্তি আমাকে নিয়ে বাড়ির দিকে রওনা দিল ।


চার

দুইটা দিন কেটে গেল খুব চমৎকার ভাবেই । আবন্তির জায়গা সম্পত্তির কোন অভাব নেই । বলতে গেলে পুরো এলাকাটাই ওদের । সব নাকি লিজ দেওয়া । বছরে আবন্তির মা কিংবা মামাদের কেউ আসে । সব হিসাব পত্র নিয়ে চলে যায় । তবে গ্রামের অনেকেই আছে নাকি যারা কিছু কিছু জাগয়া সম্পত্তি দখল করে রেখেছে । তবে এখনও আবন্তিদের দখলে অনেক কিছু আছে । এসব নিয়ে আবন্তির কোন চিন্তার কারন দেখলাম না ।

এই দুইদিন আমরা গ্রাম এদিক ওদিক ঘুরতে লাগলাম । গ্রামের পাশ দিয়ে একটা ছোট নদী বয়ে গেছে । শোনা কথা যে আবন্তির বাবাকে নাকি এই নদীতেই মেরে ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছে । আমরা দুইদিনই নদীর পাড়ে গিয়ে বসে থাকতাম । রাইনাল চাচা আমাদেরকে বাইরে বারবার নিষেধ করতো । বারবার বলতো যেখানেই যাই জলদি যেন ফেরৎ আসি । লোকটা আসলেই আবন্তির নিরাপত্তা নিয়ে খানিকটা চিন্তিত । তবে আমার কাছে ব্যাপারটা কেমন যেন উল্টা মত হত । কারন আমি দেখতাম যখন আমরা বাইরে বের হতাম গ্রামের যার সাথেই দেখা হোক না কেন সে কেমন যেন ভীত চোখে আমাদের দিকে তাকিয়ে থাকতো । তারা যে আমাকে নয় আবন্তিকে ভয় পাচ্ছে সেটা বুঝতে আমার মোটেই কষ্ট হত না । কিছু একটা এখনও আছে যেটা আমি ঠিক ধরতে পারছি না । কিন্তু কি সেটা ?


তৃতীয়দিন বিকেল বেলা আবন্তি আর আমি হাটতে হাটতে অনেক দুর চলে এলাম । হাটতে হাটতে আমরা দুজনেই ক্লান্ত হয়ে গেছি ! সামনে একটা বিশাল বড় বট গাছ দেখে সেদিকে এগিয়ে গেলাম । বট গাছটার গোড়াটা সিমেন্ট দিয়ে বাঁধানো ! আবন্তি আমাকে সেটা দেখিয়ে বলল
-আমাদের সম্পত্তি এই সীমানা পর্যন্ত !
আমি খানিকটা অবাক হয়ে বললাম
-খাইছে আমারে ! তুমি দেখি আসলেই রাজকন্যা !
আমি হাসতে হাসতে সিমেন্টের বেদীর পাশে বসলেও আবন্তি বসলো না । আমাকে রেখে গাছের পেছন দিয়ে এগিয়ে গেল । আমিও এগিয়ে গেলাম ওর পেছন পেছন এগিয়ে গিয়ে দেখি ঐ গাছের পেছনের দিকে একজন সাধু বাবার টাইপের লোক বসে আছে চোখ বন্ধ করে । আমরা গিয়ে দাড়াতেই চোখ খুলে তাকালো । আমার দিকে এক পলক তাকিয়েই আবন্তির দিকে তাকালো । গভীর ভাবে ওকে দেখতে লাগলো । তারপর বলল
-তুমি ছোট জমিদারের মাইয়া না ?
আবন্তি একটু হেসে বলল
-জি !
-অনেক দিন পরে আইলা এইখানে !
-জি ! এখন তো আর থাকি না এইখানে ! সাধু ফকির বলল
-বাপের ভিটায় আইতে হয় । বুঝলা !
আবন্তি আবারও হাসলো । তারপর বলল
-এবার থেকে আসবো !
ফকির আরও কিছু সময় তাকিয়ে থেকে বলল
-তুমি সাবধানে থাইকো । সামনে বিপদ হইতে পারে তোমার !
আবন্তি বলল
-ভয় নেই । আমার কিছু হবে না !

আমি আসলে এসবের কিছুই বুঝতে পারছিলাম না । তবে আবন্তি আর বেশি সময় অপেক্ষা করলো না । সাধু ফকির কে সালাম করেচাটা দিল । আমিও একই কাজ করলাম । তারপর আবন্তির পেছন পেছন আসতে লাগলাম । বললাম
-ইনি কে ?
-আব্বু এই ফকির কে অনেক সম্মান করতো । কেন করতো জানি না তবে লোকটা ভাল । আমাদের খারাপ চান নি । আব্বুর উপর হামলা হওয়ার আগে তিনি সাবধান করেছিলেন । আব্বুর আসলে নিজের লোকেদের উপর খুব বিশ্বাস ছিল তাই খুব একটা হা করে নি !
-লোকটার তো অনেক বয়স তাহলে ? কিন্তু দেখে মনে হয় না তো !
-তোমাকে বলে লাভ নেই । তুমি বলবে কুসংস্কার ।

আবারও আমরা বাড়ির পথ ধরলাম ! আরও কয়েকদিন কেটে গেল এভাবে । পুরো গ্রাম তখন খুব ভাল ভাবেই জেনে গেছে যে জমিদার বাড়ির মেয়ে ফিরে এসেছে । এখানে থাকা শুরু করেছে ।




একদিন সকাল বেলা আবন্তির সাথে সাথে হাটছি । আমার সকাল বেলা ওঠার অভ্যাস সেই ছোট বেলা থেকেই । তবে আবন্তির বেলা করে ঘুমানোর অভ্যাস । আমার জন্য ঘুমাতে পারছে না । আমিই ওকে জোর করে তুলে নিয়ে গিয়ে বাইরে বের হচ্ছি । ও যে খুব একটা বিরক্ত সেটা আমার মনে হয় না । বরং ওর জন্য ভালই লাগছে । ধবধবে সাদা একটা সেলোয়ার কামিজ পরে ও আমার পাশে হাটছে । গ্রামের পরিবেশটা আসলেই চমৎকার !

ঢাকায় যখন সকাল বেলা হাটতে বের হই তখন পথঘাট একেবারে ফাঁকা মনে হয় । ঢাকা বাসী সকাল বেলা ঘুম থেকে ওঠে না । তবে গ্রামের সবাই জলদি জলদি ওঠে । হাটতে গিয়ে দেখলাম যে অনেকেই মাঠের কাজও করা শুরু করা দিয়েছে । রাস্তায় ও অনেকের সাথে দেখা হয়ে গেল । তবে একটা ব্যাপার ঠিকই লক্ষ্য করলাম যে আবন্তির দিকে সবাই যেন কেমন চোখে তাকাচ্ছে । সেই দৃষ্টিতে যে খানিকটা ভয় মিশ্রিত ছিল সেটা আমার চোখ এড়ালো না । ওরা ঠিক কি কারনে আবন্তিকে ভয় পাচ্ছে আমি ঠিক বুঝতে পারছি না ।

আরও কিছু দুর এগোতে একটা ভীড় দেখতে পেলাম । কিছু মানুষ এক সাথে দাড়িয়ে কথা বলছে । কিছু একটা ঘিরে রেখেছে । আমার কেন জানি দেখতে খুব কৌতুহল হল । ওদিকে পা বাড়াতে যাবো তখনই আবন্তি আমার হাত চেপে ধরলো । বলল
-যেতে হবে না ।
-কেন ?
-বলেছি না যেতে হবে না । আসো !

আমি আবন্তির হঠাৎ রেগে যাওয়াটা ঠিক বুঝতে পারলাম না । আবন্তি আমাকে এক প্রকার জোর করেই টেনে নিয়ে গেল । আমি ঠিক বুঝতে পারলাম না । আবন্তির পেছন পেছন হাটতে লাগলো । আমার কেন জানি মনে হল আবন্তি কারো সামনে পড়তে চাইছে না । একটু যেন দ্রুত হাটতে লাগলো ।

কিছুদুর এগোর পর আমাদের পথ আগলে কয়েকজন মানুষ দাড়ালো । আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে রাগত স্বরে । সামনের মাঝ বয়সী লোকটার আমাদের দিকে তাকিয়ে বলল
-এদিকে কেন এসেছেন ?
আমি এগিয়ে গিয়ে বললাম
-এদিকে কেন এসেছি মানে কি ? এখানে আসা নিষেধ নাকি ?
মাঝ বয়সী লোকটা আরও একটু ভারী কন্ঠ বলল
-আজকে সকালে একটা গরু মারা পরেছে । দেখেছেন ? এটা কে মেরেছে আমরা জানি । সময় থাকতে এখান থেকে চলে যান । নয়তো ফল ভাল হবে না ।

আমি আসলেই ঠিক বুঝতে পারলাম লোকটা কি বলতে চায় ! একটা গরু মারা পরেছে এটার সাথে আমাদের কি সম্পর্ক ! আমি আবন্তিকে আড়াল করে দাড়িয়ে আছি । ওদের আক্রমনাত্বক মনভাব আমার কাছে ঠিক ভাল ঠেকছে না । মনে হল যে কোন সময় আমাদের উপর ওরা আক্রমন করতে পারে !

কয়েক মুহুর্ত কেটে গেল কেউ কোন কথা বলল না । হঠাৎই রাইনাল চাচাকে দৌড়ে আসতে দেখলাম । একেবারে আমাদের মাঝ খানে এসে হাজির হল । রাইলান চাচা একবার ওদের দিকে তাকিয়ে আমাদের দিকে ফিরলো । বলল
-আরে এইখানে দাড়ায়া কি করেন । চলেন । নাস্তা রেডি !

আমি আবন্তির হাত ধরে ওদের পাশ কাটিয়ে হাটা দিলাম । কেউ কোন কথা বলল না । আমাদের কে যেতে বাঁধাও দিল না । তবে ওদের চোখটা আমাদের দিকেই ছিল । সেখানে ছিল ভয় আর আক্রোষের মিশ্রেন । যেতে যেতে আমি রাইনাল চাচাকে বললাম
-কি ব্যাপার লোক গুলো এমন আচরন কেন আমাদের সাথে !
রাইনাল চাচা বলল
-ওগো যে নেতা দেখতাছেন না, ঐডার নাম আজগর আলী । মা মনিরা তো এখানে আর থাকে না । মা মনিদের অনেক জমি জমা এই আজগর আলী নিজে দখল কইরা নিছে । এখন মা মনি যদি আবার ফিরা আসে তাইলে সেইটা ওদের জন্য চিন্তার বিষয় না ?
আমি বললাম
-আর একটা গরুকে নাকি কিসে মেরে ফেলেছে । এটার সাথে আমাদের কি সম্পর্ক ?

আমার কথা শুনে রাইনাল চাচার মুখের সামনে থেকে রক্ত সরে গেল ।
-কি কইলেন ? কেডায় মারছে ?
-সেটা তো জানি না !
-আইচ্ছা আপনেরা ঘরেত যান । আমি আইতাছি !

আমাকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে রাইনা চাচা আবারও সেদিকেই চলে গেল । আমার মাথায় আসলেই কিছু ঢুকছিলো না ! কি হচ্ছে এসব ! এখানে মনে হচ্ছে আর থাকাটা ঠিক হবে না ! ওকে এখানে আর রাখা ঠিক হবে না । এ



পাঁচ


রাইনাল চাচার উত্তেজিত কন্ঠ শুনে বাইরে চলে এলাম । আমার দিকে তাকিয়ে রাইনাল চাচা বলল
-মা মনি কই ?
-সে ঘরে । শুয়ে আছে ।
-আপনেরা এখনই চইলা যান ! এখনই ....
আমি খানিকটা অবাক হয়ে বললাম
-কেন কি হয়েছে ?

আজগর শেখ আসতেছে গ্রামের মানুষে নিয়া । গতকাইল রাইতে তার পোলারে বাঘে ধরছিলো ।
-মানে ? এখানে বাঘ আসবে কই থেকে ? আর তাকে বাঘে ধরলে আমাদের কেন চলে যেতে হবে ?
-আপনে বুঝতানেনা বাজান ! জলদি করেন ।

আমি ঠিক বুঝতে পারলাম না । তবে রাইনাল চাচার চোখে মুখের ভয় দেখে খানিকটা চিন্তিত হয়ে উঠলাম । আমি দ্রুত ঘরে ভেতরে ঢুকলাম । তাকিয়ে দেখি আবন্তি তখনও ঘুমিয়ে আছে । আমি ওর কপালে একটা ছোট চুমু খেলাম । সাথে সাথেই চোখ মেলে তাকালো । আমার কেন যেন মনে হল ও ঠিক ঘুমিয়ে ছিলো না । কেবল চোকখ বন্ধ করে ছিল । আমার চুমু খাওয়ার সাথে সাথে চোখ মেলল ! আমি বিছানার পাশে বসলাম ! বললাম
-ঘুম ভেঙ্গেছে কখন ?
আবন্তি বলল
-অনেক সময় । তুমি যখন উঠে পড়েছিলে তখনই ।
-ডাকলে না কেন ?
-এমনি !

ছোট করে উত্তর দিয়ে চুপ করে রইলো আবন্তি । আমার কেন যেন মনে হল ও আরও কিছু বলতে চায় । আমি ওর চোখের দিকে তাকিয়ে বললাম
-কিছু বলতে চাও ?
-হুম !
-বল !

আবন্তি আরও কিছুটা সময় চুপ করে থেকে বলল
-আমি ..... আমি কারো কোন ক্ষতি করি নি কোন দিন । কোন দিন না ! তুমি আমাকে বিশ্বাস কর তো !
আমি ওর চোখের দিকে তাকিয়ে দেখি, আবন্তি টলটল চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে । সেখানে একটা ভয় আছে একটা সংশ্বয় আছে কিন্তু কোন মিথ্যা নেই । আমি নিশ্চিত জানি আবন্তি মিথ্যা বলছে না ।
আমি বললাম
-আমি জানি । তুমি কোন দিন কারো ক্ষতি করতে পারো না ।
আবন্তি আর কিছু না বলে আমার কোলের উপর মাথা গুজে শুয়ে পড়লো আবার । আমি বললাম
-রাইনাল চাচা কি অদ্ভুদ কথা বলছে । ঐ আজগর আলীর ছেলেকে নাকি কাল রাতে বাঘ ধরেছিলো । কিন্তু এখানে বাঘ আসবে কোথা থেকে বলতো ?

মাথা না তুলেই আবন্তি বলল
-ওটা বাঘ না ।
-তাহলে ?
-নেকড়ে !
আমি সাথে সাথেই বুঝে গেলাম আবন্তি কি বলতে চায় । আমি বললাম
-আবন্তি এসব কুসংস্কার তুমি বিশ্বাস কর ? এটা কোন কথা ?
কিছু বলতে গিয়েও যেন বলল না । আমি আবারও বললাম
-তা না হয় বুঝলাম । কিন্তু এই জন্য আমাদের চলে যেতে হবে কেন বল তো ? আমি ঠিক বুঝলাম না ।

এবারও আবন্তি কোন কথার জবাব দিল না । আমাকে যেন আরও একটু জোরে জড়িয়ে ধরলো । আমি আস্তে আস্তে ওর গলার স্টিলের কলারটা হাত দিয়ে স্পর্শ করতে লাগলাম । সেখানে লেখা গুলো যেন আরও ষ্পষ্ট হয়ে উঠেছে । আমি কি আর বলব ঠিক বুঝতে পারলাম না । তবে মনের ভেতরে রাইনাল চাচার চেহারাটা ঘুরপাক খেতে লাগলো । এই কয়দিনে একটা ব্যাপার আমি বুঝতে পেরেছি সেটা হল গ্রামের মানুষজন এই বাড়িটাকে ভয় পায় । আর সব থেকে ভয় পাচ্ছে আবন্তিকে । কেন ভয় পাচ্ছে সেটা আমি ঠিক জানি না তবে পাচ্ছে । এক মাত্র রাইনাল চাচাকে দেখলাম আমাদের ব্যাপারে অন্য ধারনা পেষণ করে । সে আমাদের কে নিয়ে চিন্তিত । আমাদের নিরাপত্তা নিয়ে সে চিন্তিত ।

আর কিছু ভাবার সময় পেলাম না । বাইরে হট্টগোলের আওয়াজ পেলাম । মনে হল যেন অনেক লোক বাড়ির সামনে চলে এসেছে । হাক ডাক দিচ্ছে । এতো ডাকের মাঝে আমি রাইনাল চাচার গলার আওয়াজ শুনতে পেলাম । রাগত স্ব রে কাউকা বাসার ভেতরে ঢুকতে মানা করছে । আমি উঠতে যেতে দেখি আবন্তি আমাকে চেপে ধরে রেখেছে । ওর শরীর একটু একটু যেন কাঁপছে ।

ও কি ভয় পাচ্ছে ?
আমি বললাম
-দেখে আসি কি হয়েছে ?
কাঁপা কাঁপা কন্ঠে আবন্তি বলল
-না যেতে হবে না ।
-কেন ? ওরা কি চায় সেটা জানতে হবে তো !
-আমি বলছি না যেতে হবে না !

তখনই বাইরে রাইনাল চাচার চিৎকারের আওয়াজ পেলাম । কেউ মনে হল তাকে আঘাত করেছে । আমি আর চুপ করে বসে থাকতে পারলাম না । এক প্রকার জোর করেই খাট থেকে উঠে পড়লাম । তারপর দরজা খুলে বের হতেই সামনে উঠানের দিকে চোখ গেল । গোটা চল্লিশের মত মানুষ । বড় সিড়ির কাছে চলে এসেছে । সবার হাতে লাঠি ইট, কারো কারো হাতে রড দেখতে পেলাম । ছুরিও দেখা যাচ্ছে কারো কারো হাতে ।
একেবারে নিচের সিড়ির কাছে রাইনাল চাচা পড়ে আছে !

আমাকে এভাবে বের হয়ে আসতে দেখে সবাই একটু যেন চুপ করে গেল । তবে সেটা খানিক সময়ের জন্য । আবারও তারা কথা বলতে যাবে তার আগেই আমি বললাম
-কি চাই আপনাদের ? এভাবে বাড়ির ভেতরে ঢুকে পড়েছেন কেন ? আর ওনাকে মেরেছেন কেন ?
সামনের দাড়ানো লোকটার নাম আজগর আলী । সে এই এলাকার চেয়ারম্যান এটা আমি আগেই জানি ! আমার দিকে তাকিয়ে বলল
-মাইয়াডা কই ? সেই পিশাচিনী কই ?

আমি বললাম
-কথা বার্তা ভাল করে বলেন ! এখনই চলে যান এখান থেকে । নয়তো পুলিশ ডাকবো কিন্তু !
-ডাকো তোমার পুলিশ । আজকা ঐ পিশাচরে আমি ছাড়ুম না । আমার পোলারে মারছে !
আমি খানিকটা বিরক্ত হয়েই বললাম
-কি সব যা তা বলছেন । বলেই পকেট থেকে ফোন বের করলাম । এখানকার থানার নাম্বার আমার আগে থেকেই জানা ছিল । কেন জানি আসার আগেই বের করে রেখেছিলাম । যদি দরকার পড়ে । একে ফোন করে কেবল বড় মামার কথা বলতে হবে । তাহলেই হবে ।

কিন্তু হঠাৎই একটা কাজ হল আজগর আলী খুব দ্রুত এসে আমার হাতে একটা আঘাত করলো তার হাতের লাঠি দিয়ে । আমার হাত ছিটকে পরে গেল মোবাইলটা ! লোকটা এমন কাজ করবে আমি ভাবতেই পারি নি । তাকিয়ে দেখি সে লাঠি উঠিয়ে এবার আমার মাথায় মারতে উদ্ধত হয়েছে । কিন্তু সেটা থেমে গেল মাঝ পথেই ।

আমি কেবল অবাক হয়ে দেখলাম তাকে যেন কেউ এসে ধাক্কা মেরেছে । আমার পেছন থেকে এসেছে । লোকটা উল্টে সিড়ির উপর পড়েছে । তাকিয়ে দেখি আবন্তি চলে এসেছে । ওর শরীর এতো শক্তি আছে আমি জানতামই না ! আবন্তির চোখের দিকে তাকিয়ে দেখি ওখানে আগুন জ্বলছে । তীব্র চোখে তাকিয়ে আছে আজগর আলীর দিকে ! আবন্তী তীব্র কন্ঠে বলল
-তোর এতো বড় সাহস আমার অপুর গায়ে হাত দিয়েছিস তুই !

সাথে সাথেই কুট করে একটা আওয়াজ হল ! আমি তাকিয়ে দেখি ওর গলার স্টিলের কলারটা খুলে পড়ে গেল ওর পাশে । হাত থেকে রিমোট জাতীয় কিছু একটা পরে গেল । তারপরেই অবিশ্বাস্য এক ঘটনা ঘটতে লাগলো । আমি কেবল চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইলাম । আবন্তি আস্তে আস্তে বড় হতে লাগলাম । ওর শরীরের কাপড় ফাঁটার আওয়াজ পেলাম । ওর মসৃণ স্বকে ধূসর রংয়ের লোম গজাতে আরাম্ভম করলো । মুখটাও আস্তে আস্তে লম্বা হতে শুরু করলো । কয়েক মুহুর্ত লাগলো ওর মানুষ হতে নেকড়ে হতে । কিন্তু আমার কাছে মনে হল যেন আমি দীর্ঘ সময় ধরে এই রূপান্তরের দিকে তাকিয়ে আছি ।

সম্পূর্ণ রূপান্তর শেষ হতেই ও তীব্র একটা চিৎকার দিল । আমার পুরো শরীর যেন কেঁপে উঠলো সাথে সাথে । তাকিয়ে দেখি যে গ্রাম লোকজন এসেছিল তারা তীব্র আতংক নিয়ে তাকিয়ে আছে নেকড়ের দিকে । আজগর আলী তখনই সিড়ির উপরেই পড়ে আছে । নেকড়ে দাঁত বের করে এক লাফে আজগর আলীর বুকের উপর গিয়ে দাড়ালো । দাঁত বের করে রাগে গজরাতে লাগলো । আজগর আলী যেন চোখের পলক ফেলতেও ভুলে গেছে । তাকিয়ে দেখি আজগর আলী প্রোসাব করে দিয়েছে ভয়ে !

আমি তত সময়ে নিজেকে সামনে নিয়েছি ! দ্রুত চলে গেলাম ওদের কাছে ।
-আবন্তি ! আবন্তি ! শুনছো আমার কথা !

নেকড়েটা আমার চোখের দিকে তাকালো । আমার কাছে নেকড়ের চোখ দুটো কেন যেন খুব পরিচিত মনে হল । আমি আবার বললাম
-প্লিজ ছেড়ে দাও । তুমি বলেছিলে তুমি কারো ক্ষতি কর নি । আমি বিশ্বাস করেছিলাম । প্লিজ ছেড়ে দাও ।

নেকড়েটা আরেকবার তাকালো আজগর আলীর দিকে । আরেকটু দাঁত খিচিয়ে নেমে এল বুকের উপর থেকে । তারপর আস্তে আস্তে ঘুরে দাড়ালো । আরও একবার হুংকার দিল । তারপর আরেক লাফে চলে গেল ঘরের দরজার কাছে । তারপর দরজার আড়ালে চলে গেল !

আমি এবার গ্রামের লোকেদের দিকে তাকালম না । তখনও আবন্তির গলার কলার টা নিচে পড়ে আছে । আমি সেটা তুলে ধরলাম । যদিও আমার ঠিক ধারনা নাই তবুও কিছুতো বলতে হবে ! বললাম
-এটা দেখেছেন আপনারা ? এটা যত সময় ওর শরীরে থাকে ও মানুষ থাকে । এটা রিমোট আমার কাছে থাকে । এখানে আসার পর থেকে একটা মুহুর্তও আমি আবন্তির সঙ্গ ছাড়ে নি । তাহলে কিভাবে বললেন যে সেদিনের গরুটা ও মেরেছে কিংবা গত কালকের হামলাটা ও করেছে ? কে করেছে আমরা জানি না তবে ও করে নি । ও কাউকে কোন আঘাত করে নি !

আমি খানিকটা বিরতি নিলাম । তাকিয়ে দেখি রাইনাল চাচাও উঠে দাড়িয়েছে । আমার দিকে তাকিয়ে বলল
-হ ! মা মনি কাউরে মারতে পারে না । আমি মামনিরে চিনি !

আমি আবার বললাম
-আমি আবার বলছি আবন্তি কারো কোন ক্ষতি করে নি । তারপরও যদি আপনারা আমাদের ক্ষতি করতে আবারও আসেন তাহলে এর ফল ভাল হবে না । এইবার ও আমার কথা শুনেছে পরের বার শুনবে কি না আমি জানি না ! ভালই ভালই বলছি চলে যান এখান থেকে ।

তত সময়ে আজগর আলী উঠে দাড়িয়েছে । আমার দিকে কেমন ভীত চোখে তাকিয়ে আছে । রাইনাল চাচা বলল
-কি আজগর মিয়া কি ভাবছিলাম ? ভাবছিলা যে মা মনিও ঐ জমিদার বাবুর মত হবে । দিনের বেলা তারা কিছু করতে পারবে না ? তাই না ? তারে একলা পাইয়া তুমি আর তোমার বাপেরা তারে মাইরা ফেলছো এটা জানি না বুঝি ! মাম মনিরে তেমনটা ভাইবো না । এইবার তো মুইতা দিছো সামনের বার এই মুতার সুযোগও পাইবা না ! যাও ভাগো !

ভীড় আর থাকলো না বেশি সময় । কয়েকজন দাড়িয়ে থাকলেও প্রায়ই সবাই চলে গেল ! আমি রাইনাল চাচাকে এক পাশে ডেকে সব কিছু জানতে চাইলাম । এতো দিন আমার কাছে এসব একদঐ অবিশ্বাস্য ছিল কিন্তু এখন চোখের সামনে যা দেখলাম তার পরেও অবসিশ্বাস করার কোন কারন দেখি না । রাইনাল চাচা আমার কাছে যে বলল তার সারমর্ম হচ্ছে এই জমিদারির শুরু থেকে এই অভিশাত বহন করে আসছে । যদিও অনেকের মতে এটা ঠিক অভিশাপ না আশির্বাদ । অর্ধ মানব আর অর্ধ নেকড়ে । নিজেদের জমিদাড়ি শক্ত ভাবে দেখা শুনা করার জন্যই নাকি আবন্তির পূর্ব পুরুষ এই অভিশাপ বরণ করে নিয়েছিলো স্ব-ইচ্ছায় । তবে তারা মানুষের ক্ষতি করতো না । কেবল মাত্র যারা তাদের ক্ষতি করতে চাইতো তাদেরকেই শায়েস্তা করতো । তখন থেকে অনেকে শত্রু লেগেছিলো তাদের । গ্রামের লোকে জমিদারদের ভয় পেত ঠিকই তবে তাদের কে সম্মানও করতো । তারা জানতো যে তারা মানুষের ক্ষতি করে না ঠিক ।

কিন্তু এই আজগর আলীর বাবা একটা আর চাচারা মিলে একটা অদ্ভুদ শয়তানী কাজ কাজ করলো । তখন আবন্তির বাবার বয়স ছিল কম । সব কিছু ঠিক সামলে উঠতে পারছে না । বিয়ে করেছে । দুটো ফুটফুটে বাচ্চাও হয়েছে । একদিন আবন্তির বড় ভাই কোথায় যেন হারিয়ে গেল । জমিদার সাহেব যেন পাগল প্রায় । তাকে আর খুজেই পাওয়া গেল না । এরপরই গ্রামে গবাদী পশু মরতে লাগলো । দেখে মনে হতে লাগলো যেন কোন ভয়ংকর হিংস্র জানোয়ার তাদের মেরেছে । তারপর দুজন মানুষও মারা গেল । আজগর আলীর বাবা চাচারা মিলে সবাইকে এই বোঝাতে সক্ষম হল যে এটা করছে জমিদার নিজে । ছেলে হারিয়ে গেছে সেটার প্রতিশোধ নিচ্ছে ।

গ্রামেরই কিছু জোয়ান মিলে তারা ঠিক করলো যে জমিদারকে আর বাচিয়ে রাখা যাবে না । রাতের বেলা আক্রমন করা যাবে না কারন সেই সময় তারা কোন ভাবেই পেরে উঠবে জমিদারের সাথে । দিনের বেলা আক্রমন করতে হবে । হলও তাই । একদিন দুপুর বেলা তাকে একলা পেয়ে তাকে মেরে ফেলল তারা । তারপর সেই লাশ ইট বেধে ফেলে দিলো নদীতে ।


হাতের স্টিলের কলার আর রিমোর্ট নিয়ে আমি ঘরের দিকে রওনা দিলাম । মনের ভেতরে কেমন একটা অদ্ভুদ অনুভুতি হচ্ছে । দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকলাম । ভেবেছিলাম হয়তো সেই নেকড়েটাকেই দেখতে পাবো কিন্তু তার বদলে আবন্তিকেই দেখতে পেলাম । খাটের এক পাশে জড়সর হয়ে বসে আছে । ওর পুরো শরীরটাই আমার সামনে উন্মুক্ত । রূপান্তর হওয়ার সময় ওর শরীরের কাপড় ছিড়ে গেছিলো । আমি ওর পাশে গিয়ে বসলাম । মুখটা কেমন গম্ভির হয়ে রয়েছে ! আমার হাতের কলারটা দেখে ওর নিজের গলটা বাড়িয়ে দিল । পরিয়ে দিতে বলছে । আমি নিজ হাতেই পরিয়ে দিলাম । তারপর রিমোর্টে চাপ দিতেই সেটা আটকে গেল ।

আমি ওর মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে আডর করতে লাগলাম । অনেকটা সময় পরে আবন্তি বলল
-আমি তোমাকে এই চেহারাটা দেখাতে চাই নি । সত্যি বলছি চাই নি ।
আমি কি বলব খুজে পেলাম না । তার মানে ওদের হলে যা হয়েছে সেটা আসলেই সত্যি ছিল । একটা নেকড়ে ছিল ওদের হলে ! লিসাকে কি তাহলে আবন্তিই মেরেছে ?
আমার মনের কথাই যেন আবন্তি বুঝতে পারলো । তারপর বলল
-বিশ্বাস কর আমি লিসাকে মারিনি । আমি কারো উপর কোন দিন হামলা করি নি । কোন দিন না !
-আমি বিশ্বাস করলাম তোমার কথা !
-তবে হ্যা আমি হলে মাঝে মাঝে ঘুরে বেড়াতাম আমার এই রূপ নিয়ে । একটা আদিম ইচ্ছা থেকেই কাজটা করতাম কিন্তু আমি কোন দিন কারো ক্ষতি করি নি অপু ! বিশ্বাস কর !
-আহ ! আমি বললাম তো আমি তোমার কথা বিশ্বাস করলাম ! আমি সত্যিই তোমার কথা বিশ্বাস করছি । আমি জানি তুমি কারো ক্ষতি কর নি।
আবন্তি বলল
-আম্মু কোন দিন আমাকে বিশ্বাস করে নি । বাবার সত্যটা জানার পরে সে কেবল বাবাকে ঘৃণাই করে এসেছে । আমাকেও তাই করে এসেছে আজীবন ! আমি ....।

এই টুকু বলেই ও ফোঁফাতে লাগলো । আমি ওকে এবার শক্ত করেই জড়িয়ে ধরলাম ।



ছয়

সারাটা বিকাল আবন্তি বিছানাতেই কাটালো । আমি ওর পাশেই ছিলাম । সন্ধ্যার দিকে রাইনাল চাচা আমাকে ডাকতে এল । কি যেন দরকার বলছিলো । আমি ওকে রেখে বাইরে চলে এলাম । চাচা বলল যে আমার সাথে নাকি গ্রামের কয়েকজন কথা বলতে চায় । কিন্তু এই বাড়ির কাছে আসতে সাহস পাচ্ছে না । ওরা একজনকে পাঠিয়েছে আমাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য । গেটের বাইরে দাড়িয়ে আছে ।

আমি চাচাকে বললাম আবন্তিকে দেখে রাখার জন্য । আমি কথা বলে আসি !

গেট দিয়ে বের হতেই একটা ছেলেকে দেখতে পেলাম । আমি বের হয়ে আসতেই আমার সামনে সামনে হাটতে লাগলো । তখন বাইরে বেশ অন্ধকারই হয়ে গেছে । আরও পনের মিনির হাটার পরে আমরা একটা বাড়ির সামনে এসে পড়লাম । গেরস্ত বাড়ি । বেশ কয়েকজন লোক সেখানে বসে আছে । বুঝতে পারলাম আমার জন্যই অপেক্ষা করছে । আমি সেখানে গিয়ে হাজির হতেই সবাই কেমন উঠে দাড়ালো ।

আমি চেয়ারে বসতেই একজন বলল
-আমরা আসলে খুব ভয়ে আছি । ছোট জমিদারও এমন ছিল !
আমি বললাম
-আমি আগেই বলেছি আবন্তি কারো ক্ষতি করে নি কোন দিন । তাহলে আপনারা কেন বিশ্বাস করছেন না ?
-তাহলে এই যে গরু ছাগল গুলো কে মারছে ? আজগর আলীর ছেলের উপর কে হামলা করছে ? আপনারা যেদিন থেকে গ্রামে এসেছেন সেদিন থেকেই এসব শুরু হয়েছে !

আমি এই প্রশ্নের কি জবাব দেব ঠিক বুঝতে পারলাম না। আমি নিজেও এটা নিয়ে ভেবেছি খানিকটা সময় । কিন্তু এর কোন উত্তর খুজে পাই নি । অন্য আরেকজন মুরুব্বী বলল
-দেখও বাবা তোমরা এখান থেকে চলে যাও । দয়া কর আমাদের উপর । আমরা তোমাদের উপর জোর খাটাতে পারবো না । তোমার যা জায়গা সম্পত্তি আছে সব তোমাদের বুঝায়া দিবে আজগর আলী । আর যে যে দখল করছে সেটাও ফিরিয়া দিবে । জমি থেকে যা টাকা আসে সব শহরে গিয়া তোমাদের দিয়া আসবে তবুও তোমরা থাইকো না এইখানে ! দয়া কর বাবা !


আমি কি বলব খুজে পেলাম না । কিন্তু এদের ভীত মুখ দেখে আমার খানিকটা মায়াই লাগলো ।হয়তো আবন্তি এদের কোন ক্ষতি করে নি কিন্তু এদের সেটা বলে বোঝানো সম্ভব হবে না । এরা এখন তীব্র ভয়ে আছে । আর ভীত মানুষ অনেক কিছু করে ফেলতে পারে । তার থেকে আমাদের এখান থেকে চলে যাওয়াই ভাল । বললাম
-আচ্ছা তাই হবে । আমরা দুএকদিনের ভেতরেই চলে যাবো । ঠিক আছে !

আর বেশি কথা হল না । আর এদিকে রাত হয়ে যাচ্ছে । আমি উঠে দাড়ালাম । তবে আমার সাথে যে এসেছিলো পথ দেখিয়ে তাকে কোথাও দেখতে পেলাম না । একটু বিপদে পড়লাম । কারন এদিককার পথঘাট আমি খুব একটা চিনি না তার উপরে এখন আবার রাতের বেলা । তবে সেই ছেলের মনভাবে বুঝলাম যে সে আমাকে একা একা রেখে আসতে ভয় পাচ্ছে । কারন তাকে আবার ফেরৎ আসতে হবে একা একা । শেষে মুরব্বীর কথা শুনে কয়েকজন এগিয়ে এল । আমি তাদের কে বললাম যে কেবল কিছু দুর এগিয়ে দিলেই হবে । সোজ পথ চিনতে পারলেই আর আসার দরকার নেই ।


হাটা শুরুর পর থেকেই আমার নিজেরও কেন জানি খানিকটা ভয় ভয় করতে লাগলো । মনে হতে লাগলো যে একটা খারাপ কিছু হতে চলেছে । আমার সামনেই ওরা হাটতে লাগলো । সবার হাতেই টর্চ । ওরা সামনে এগিয়ে যাচ্ছে আমি পেছন পেছন । কিছুটা সময় হাটার পরেই আমি রাস্তা চিনতে পারলাম । ওদের বললাম যে এবার ওরা চলে যেতে পারে । আমি একা একা চলে যেতে পারবো । আমার কথা শুনে যেন ওর দম ছেড়ে বাঁচলো । কোন কথা না বলে আবার দ্রুত পেছন ফিরেচাটা দিল । আমি সামনে হাটতে লাগলাম আস্তে আস্তে ।

চারিদিকে চাঁদের আলো ভালই রয়েছে । পথ চলতে ঠিক সমস্যা হচ্ছে না । কিন্তু তবুও মনে হচ্ছে কি যেন ঠিক নেই । চারিদিকের রাতের নিস্তব্ধতা । তবে সেটার মাঝেও যেন একটা অস্বাভাবিক্ব আছে । আমি ঠিক বুঝতে পারলাম না এমনটা মনে হওয়ার পেছনের কারনটা কি থাকতে পারে । যে ভয়টা গ্রামবাসীরা পাচ্ছে সেটাই কি হতে চলেছে । কিন্তু আবন্তি তো আমাকে কোন ক্ষতি করতে পারে না ।

ঠিক সেই সময় আমি সামনের প্রাণীটাকে দেখতে পেলাম । বুকের মাঝে একটা শীতল অনুভুতি বয়ে গেল । আমার থেকে হাত বিশেক দুরে নেকড়ে টা দাড়িয়ে আছে । চোখ দুটো জ্বলজ্বল করছে । সেখানে আমার জন্য কোন মায়া দয়া দেখতে পেলাম না আমি । বরং সেখানে একটা তীব্র একটা আক্রোশ দেখতে পেলাম ।

আমি কি করবো ঠিক বুঝতে পারলাম না । পাশে একটা গাছ দেখা যাচ্ছে । তবে এক লাফে সেখানে উঠতে পারবো বলে মনে হয় না । সেই সময় নেকড়েটা আমার কাছে চলে আসবে । ঠিক ঠিক আমাকে ধরে ফেলবে । আর শরীরের একটা কামড়ই যথেষ্ঠ আমাকে উপরে পাঠানোর জন্য ! আমি আরেকবার তাকালাম নেকড়টার দিকে ।

তখনই একটা ব্যাপার আমি বুঝতে পারলাম । এটা কোন ভাবেই আবন্তি নয় । আবন্তির গায়ে ধূসর রংয়ের লোম ছিল কিন্তু এটার গায়ে কালো লোম । যদিও চাঁদের আলোতে সেটা পরিস্কার বুঝার কোন উপায় নেই তবে আমি নিশ্চিত এটা আবন্তি নয় ।
তাহলে কি লিসাকেও এই নেকড়েটাই মেরেছে কিংবা গ্রামে যত পশু আক্রমন করা হয়েছে আজগর আলীর ছেলেকে কি এই নেকড়েটাই মেরেছে ? কিন্তু কেন ? এটা কেই বা হতে পারে ?
কিন্তু সেসব এখন ভেবে কি লাভ ! এখন কথা হচ্ছে আমি এই নেকড়ের হাতে মারা পরতে যাচ্ছি ।

আমার মনের কথাই যেন নেকড়ে বুঝতে পারলো । হঠাৎ তীব্র কন্ঠে ডেকে উঠলো । তারপরই আমি অবাক হয়ে দেখলাম নেকড়েটার মাঝে একটা পরিবর্তন শুরু হয়েছে , দেখতে দেখতে চার পেও জন্তুটা দুপেও মানুষে পরিনত হয়ে গেল । চাঁদের আলোতে আমি একটা উলঙ্গ মানুষকে সামনে দাড়িয়ে থাকতে দেখলাম ! খানিকটা কাঁপা কাঁপা কন্ঠেই জানতে চাইলাম
-তুমি কে ? আমার কাছে কি চাও ?

আমি যেন কোন কৌতুক বলেছি এমন একটা ভাব করে সামনের মানুষটা খানিকটা বিদ্রুপের হাসি হাসলো । বলল
-অনেক দিন থেকেই আমি তোকে খুজছি । আজকে একা পেয়েছি । শহরের তোকে কতবার মারতে চেয়েছি । কিন্তু পারি নি । আর তুই নি কি না আমার গ্রামেই এসে হাজির হলি মরতে !
-তোমার গ্রাম মানে ?
-আরে গাধা এখনও বুঝিস নাই আমি কে ? আমি হচ্ছি জমিদারের ছেলে !
আবন্তির সেই হারিয়ে যাওয়া ভাই । ও এখানে কি করছে ? কেমন করে এল এখানে ? আর আমাকেই বা মারতে চায় কেন ?
আমি বললাম
-আমাকে কেন মারতে চাও ?
এই কথা শুনে সে যেন আরও একটি ক্ষেপে গেল । বলল
-তোর কারনে আমার বোন আমার কাছ থেকে দুরে চলে গেছে । আমরা চাইলে কি না করতে পারতাম । আবারও এই সব কিছুর উপরে আমাদের ক্ষমতা আসতো । যা ইচ্ছে তাই করতে পারতাম । কিন্তু তোর কারনে সব নষ্ট হয়ে গেল । তোকে ভাল বেসে ও এসবের থেকে নিজেকে দুরে রেখেছে । আমি ক্ষমতা হীন হয়ে গেছি ।
-লিসাকে কেন মারলে ?
-মারবো না ? এতো বড় সাহস ও আমার বোনকে অপমান করে ! আর এবার তোর পালা । তোকে এমন ভাবে মারবো যেন মনে তোকে এই গ্রাম বাসি মেরেছে । আর সেইটা যখন আমার বোন জানতে পারবে তখন সে পাগল হয়ে যাবে । সবাই শায়েস্তা করবে !

আমার মনে হল আর এখানে দাড়িয়ে কথা শোনার কোন মানে হয় না । ঘুরে এখনই দৌড় দিতে হবে । এখনও আবন্তির ভাই নেকড়ে রূপ ধারন করে নি তাই আমি হয়তো দৌড়ে খানিকটা পার পেয়ে যেতেও পারি । আমি তাই করলাম । পেছন ঘুরে দৌড় দিলাম যেদিক থেকে এসেছিলাম । তবে আমার ভুল ভাঙ্গলো কিছু সময় পেরে । মানুষ রূপেও সে খুবই দ্রুত আমার দিকে এগিয়ে আসতে লাগলো । কয়েক মুহুর্তের ব্যবধানে আমাকে ধরে ফেলল । তারপর পেছন থেকেই আমাকে ধাক্কা দিল । আমি যেন উড়ে গিয়ে পড়লাম আরও ছয় সাত হাত দুরে !

অনুভব করলাম পিঠে বেশ আঘাত লেগেছে । কোন রকম উঠে বসতেই দেখলাম আবন্তির ভাই হাতে একটা বড় পাথর খন্ড নিয়ে আমার দিকে আস্তে আস্তে এগিয়ে আসছে। ওটা যদি আমার মাথার উপর পরে আমি সাথে সাথে উপরে চলে যাবো কোন সন্দেহ নেই । সে বলল
-তোর দিন এখানেই শেষ ।
এই বলে পাথড়টা আরও একটু উচু করে ধরলো । আমার দিকে ছুড়ে মারবে । আমি মনে মনে উপরওয়ালার নাম নিলাম । আমার দিন এখানেই শেষ হয়ে এসেছে । মায়ের মুখটা মনে পড়লো । তারপরই আবন্তির ঘুমন্ত চেহারাটা । যেটা আসার আগে দেখে এসেছে । আর ওটা দেখা হবে না । আমি চোখ বন্ধ করলাম ।

এক সেকেন্ড , দুই সেকেন্ড করে সময় এগিয়ে গেল । বারবার মনে এই বুঝি আমার মাথার উপর এসে পড়লো পাথরটা । কিন্তু তেমন কিছু হল না । তারপর বদলে ধুপ করে পাথরটা মাটিতে পড়ার আওয়াজ পেলাম !

চোখ খুলে দেখি আমার থেকে কিছু দুর সামনে পাথর টা পড়ে আছে । তার তার থেকে কয়েক ধাপ দুরে পড়ে আছে আবন্তির ভাই । আর আমার চোখের সামনে দাড়িয়ে আছে আমার ধূসর রংয়ের নেকড়ে বাঘিনী । নেকড়ে রূপ ধারন অবস্থা যখন ওকে প্রথম দেখেছিলাম তখন আমার যেন একটু ভয়ই লেগেছিলো ওকে । কিন্তু এখন ওকে দেখে আমার মনের সকল ভয় দুর হয়ে গেল । কয়েক মুহুর্ত আমার চোখের দিকে তাকিয়ে রইলো । সেই চোখের দৃষ্টি বলছে যে ভয় নেই কোন ভয় নেই । আমি থাকতে তোমার কোন ক্ষতি হবে না !

আবন্তির ভাই ততক্ষনে আবারও সেই নেকড়ে রূপ ধারন করে ফেলেছে । এরপর দুই ভাই বোনের সেই লড়াই শুরু হয়ে গেল । এতোটা ভয়ংকর লড়াই আমি এর আগে কোন দিন দেখেনি । ডিসকভারিতে কিছু কিছু দেখেছি তবে সেগুলো এর কাছে কিছুই নয় । প্রথমে ভেবেছিলাম আবন্তি মেয়ে বলেই হয়তো ওর ভাইয়ের সাথে পেরে উঠবে না কিন্তু ব্যাপারটা বরং উল্টো হল । আবন্তির ভাই টিকতেই পারলো না । একটা পর্যায়ে আমি দেখলাম আবন্তি ওর ভাইয়ের একটা পা কামড়ে ধরে ছিড়ে ফেলল । একেবারে আলাদা হয়ে গেল শরীর থেকে । সেটা করেই ক্ষান্ত হল না । আরই হামলা করতে যাবো তখনই আমি ওকে ডাক দিলাম ।

ভেবেছিলাম শুনবে কিন্তু ও শুনলো । আক্রমন থেমে গেল । উঠে গিয়ে দেখি আবন্তির ভাই আস্তে আস্তে আবারও মানুষের রূপে ফিরে আসছে । যখন পুরোপুরি ফিরে এল তখন ওর ডান পায়ের অবস্থা আসলেই খুব খারাপ । হাটুর নিচ থেকে নেই বললেই চলে । আবন্তির চোখের দিকে তাকিয়ে দেখি সে নিশ্চুপ হয়ে তাকিয়ে আছে । এভাবে যদি ওকে ফেলে চলে যাই তাহলে নিশ্চিত মারা পরবে ।

আমি আশে পাশে তাকিয়ে দেখি গ্রামের অনেকে আশে পাশে চলে এসেছে । তারা দুর থেকে এই ভয়ংকর লড়াই দেখছে । আমি আবন্তির ভাইকে দু হাতে তুলে ধরার চেষ্টা করলাম । আবন্তি তখন ওর মুখ দিয়ে নিজের পিঠটা নির্দেশ করলো । আমার বুঝতে কষ্ট হল না আসলে ও কি বলতে চাইছে । আবন্তির ভাইকে পিঠের উপর তুলে দিতে বলছে । তাই করলাম আমি ।

তারপর ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলাম জমিদার বাড়ির দিকে !

গ্রাম বাসীর অনেকেই দেখেছে । তাদের মনের সন্দেহ দুর হয়েছে যে আবন্তি ওদের উপর হামলা করে নি । যে করেছিলো সেই নেকড়েকে জখম করেছে । সেই হিসাবে আবন্তি ওদের শত্রু নয় !



পরিশিষ্টঃ

ডাক্তার মারুফ মাংসের টুকরো টুকু মুখে নিতে নিতে আমার দিকে তাকিয়ে বলল
-আপনি কি নেকড়ে পুসেন ?

আমি চট করে আবন্তির দিকে তাকালাম ! তারপর ডাক্তারের দিকে তাকিয়ে বলল
-কেন বলুন তো ?
-না মানে আমার স্ত্রী সেদিন বলছিলো ও নাকি মাঝে মাঝে একটা নেড়কে দেখে আপনাদের বাড়ি মধ্যে ঘোরাফেরা করছে ! মাঝে মাঝে নাকি ডাকও শুনেছে !
আমি হেসে বললাম
-আরে না । বড় কুকুর আছে কিছু পাহারা দেওয়া জন্য । সেগুলোর সাথে মিলিয়ে ফেলেছে সম্ভবত !
তাকিয়ে দেখি আবন্তি মাছের বাটি এগিয়ে দিতে দিতে আমার দিকে তাকিয়ে হাসলো মুখ টিপে ! আমিও হাসলাম । তবে সেটা ডাক্তার সাহেব দেখতে পেলো না ।


আবন্তি আর আমি এখন এই গ্রামেই থাকে । পড়ালেখা শেষ করে এখানেই ফিরে এসেছি । জমিদার বাড়িটা নতুন করে সংস্কার করে সেখানেই থাকি । ওদের যে সব জমিজমা অন্যেরা দখল করে নিয়েছিলো সেটা আবার ফেরৎ এসেছে কোন রকম ঝামেলা ঝাড়াই । এখন এগুলো দেখা শুনা করি আমরা দুজন মিলে । তাছাড়া গ্রামের স্কুলে আমরা দুজনেই পড়াই । প্রথম প্রথম সবাই আবন্তিকে খুব ভয় পেলেও আস্তে আস্তে সবার সেই ভয়টা কেটে গেছে । এখানে একটা সরকারি হাসপাতালও হয়েছে । বলতে গেলে আমাদের প্রচেষ্টাতেই । একটা হাইস্কুল বসানোর চেষ্টা চলছে । সেই হাসপাতালের ডাক্তারকেই আমরা দাওয়াত দিয়েছিলাম খেতে । আবন্তি মাঝে মাঝে নিজের ঐ রূপে ফিরে যায় । আমার সাথে খেলা করে । বাড়ির ভেতরে ঘুরাফেরা করে । মাঝে মাঝে ডাকও দেয় ! তখন হয়তো ডাক্তার সাহেবের স্ত্রী দেখে থাকতে পারে !

আমাদের সাথে এখনও রাইনাল চাচা থাকে । তবে আর আগের মত কাজ করতে পারে না । কাজের জন্য আরও লোক রাখা হয়েছে । তিনি তাদের উপর ছড়ি ঘোরান । কোনটা কি কখন কোথায় কিভাবে করা লাগবে সেটা ঠিক করেন । বলতে গেলে আবার আগের জমিদারি ফিরে এসেছে ।

আমাদের সাথে আরও একজন থাকে । আবন্তির ভাই অনিক । সেই লড়াইয়ের পর তার পা নষ্ট হয়ে গেছে । তবে মন মানষিকতেও অনেক পরিবর্তন এসেছে ।

আবন্তির আর গলাতে সেই স্টিলের কলারটা পরে না । এখন তার নিজের উপর পুরিপুরি নিরন্ত্রন। একদিন সাধুবাবার কাছে গিয়েছিলাম । তিনি সবই জানতেন । আমাকে বললেন নেকড়ে মানবেরা রাত না হলে কিছুতেই নিজের নেকড়ে রূপে ফেরৎ যেতে পারে না । বিশেষ করে চাঁদের আলো দরকার । কিন্তু আবন্তির ব্যাপারটা একেবারেই ভিন্ন । এমনটা নাকি দেখাই যায় না । আবন্তি নাকি খুবই শক্তিশালী একটা নেকড়ে । বলা চলে সে হচ্ছে এই নেকড়ে মানবদের রাণী ! হয়তো কোন একদিন তারা আসতে পারে নিজেদের রানীকে ফিরিয়ে নিতে । নিজেদের জগতে !

কিন্তু আবন্তির মাঝে এসবের কোন চিন্তা নেই । সে এখনও আমার কোলেই মাথা রেখে ঘুমায় । রাতের বেলা চাঁদের আলো যখন তার মুখে উপরে পরে আমি কেবল মন্ত্রমুগ্ধের মত ওর দিকে তাকিয়ে থাকি । এতো নিঃপাপ চেহারার দিকে না তাকিয়ে থেকে কি পারা যায় !


সর্বশেষ এডিট : ২০ শে সেপ্টেম্বর, ২০১৭ দুপুর ১:১৯
১৩টি মন্তব্য ১২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ভালোবাসিতে লজ্জা পেতে নাই ...

লিখেছেন সেলিম আনোয়ার, ১৫ ই অক্টোবর, ২০১৯ সকাল ১১:৩১

অপেক্ষা— সেতো নিষ্ঠুরতম এক উপখ্যান
যদি না হয় সাক্ষাৎ চিরো কাঙ্ক্ষিত
সেই ক্ষণের —প্রেমের বৃন্দাবনের
এ সবই মিছে অথবা ভ্রম;
ক্ষণিকের অহমিকা শেষ হয়ে যায়
মিশে যায় হাওয়ায়—... ...বাকিটুকু পড়ুন

গল্পঃ স্বৈরাচারিণী

লিখেছেন নীল আকাশ, ১৫ ই অক্টোবর, ২০১৯ দুপুর ১:৪৬



সঙ্গদোষে নাকি লোহাও ভাসে! চরমতম এই সত্যটা আর কেউ না হোক ফাহিবের বাবা মা দৃঢ়ভাবেই বিশ্বাস করেন। তা না হলে, যেই ছেলে বুয়েট থেকে এত ভালো রেজাল্ট নিয়ে পাশ... ...বাকিটুকু পড়ুন

=মহান আল্লাহ সব কিছু দেখেন=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ১৫ ই অক্টোবর, ২০১৯ বিকাল ৫:৩৩



©কাজী ফাতেমা ছবি

সিসি ক্যামেরা দেখলেই নড়ে চড়ে উঠো
হয়ে যাও সাবধানী,
পাপগুলো দূরে ঠেলে হেঁটে যাও আপন গন্তব্যে,
ভয় পাও, তোমরা সিসি ক্যামেরা ভয় পাও
তাই না?

কিছু লুকোচুরি খেলা যখন খেলো বা খেলতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইন্টারভিউ

লিখেছেন রাজীব নুর, ১৫ ই অক্টোবর, ২০১৯ সন্ধ্যা ৭:৩৯



শাহেদ জামাল সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে।
সে বাকি জীবনে কোনো কাজকর্ম করবে না। জীবনের অর্ধেক সে পার করে ফেলেছে। তার বয়স এখন পঁয়ত্রিশ। আগামী পঁয়ত্রিশ বছর কি সে বাঁচবে? সম্ভবনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন ভালো করা কিছু খবর

লিখেছেন মা.হাসান, ১৫ ই অক্টোবর, ২০১৯ রাত ১০:৩২

তাহাজজুদ পড়িস ব্যাটা?



ও ছার, ঝাড়ুদার পদে লিয়োগ পাইতে কত দিতে হবে?



আবার মারধোরের কি দরকার ছিল



আপনারা মন মতো মন্তব্য বসাইয়া নিন, আমি গলায় ফুলের মালা না... ...বাকিটুকু পড়ুন

×