somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

অতিপ্রাকৃত গল্পঃ বিনিময়

০১ লা মে, ২০১৯ রাত ১১:২৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

জয়িতার সন্ধ্যার সময়টা কেমন যেন বিষণ্ণ মনে হয় । পুরো দিনের ভেতরে এই সময়টা এলেই ওর মন আপনা আপনিই উদাস হয়ে ওঠে। সারা দিনের সব কথা মনে পড়তে থাকে আস্তে । তারপর কোন কারন ছাড়াই মনটা খারাপ হতে থাকে । ওর কাছে এই রাতের শুরুটা মোটেই ভাল লাগে না । বারবার মনে হয় এই রাতই পুরো দিনের জন্য অশুভ কিছু বসে আনে ।

অবশ্য এমন একটা মনভাব গড়ে ওঠার পেছনে যুক্তিযুক্ত কারন আছে । জয়িতার জীবনের সব খারাপ ঘটনা গুলো এই বিকেল আর রাতের সংযোগ সময়ের মধ্যেই হয়েছে । এই সময়টার মধ্যে যখনই কিছু ঘটতে যায় জয়িতার মনে কু ডেকে ওঠে । ও প্রায় নিশ্চিত হয়ে যায় যে খারাপ কিছু হতে চলেছে ।

আজ সন্ধ্যা বেলা যখন জায়েদের হাক ডাক শুনতে পেল তখনই মনে আবার খারাপ কিছু হতে চলেছে । কয়েক সেকেন্ড পরেই জায়েদকে ঘরে ঢুকতে দেখলো । ওর মুখের ভাব দেখেই মনে হল খারাপ কিছু একটা হয়েছে কিংবা হতে চলেছে ।
জায়েদ ঘরে ঢুকেই বলল
-আপু শুনেছিস ঐ ব্যাটার কথা । সলিমের কাছে বলে নাকি সে এখানে আসতে পারবে না । আমাদের নাকি ওখানে যেতে হবে । সাহস কত বড় একবার ভেবে দেখ ! ঐ ব্যাটাকে যদি আমি ....

জয়িতা নিজের ভেতরে একটু স্বস্তি অনুভব করলো । এমন কোন ঘটনা ঘটে নি । অন্তত এখনও পর্যন্ত তো ঘটে নি । জয়িতা বলল
-এভাবে চিৎকার করছিস কেন ?
-চিৎকার করবো না ? তাকে এখানে ডাকা হয়েছে আর সে আসবে না ?
-সে আমাদের বেতন ভুক্ত কর্মচারি না যে ডাকলেই তাকে ছুটে আসতে হবে !

জায়েদ খানিকটা সময় অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো জয়িতার দিকে । নিজের আপন বড় বোনের কথা যেন ও ঠিক বিশ্বাস করতে পারছে না । আরও কিছু সময় অবাক হয়ে তাকিয়ে থেকে জায়েদ ঘর থেকে বের হয়ে গেল । ওর মুখের ভাব জয়িতার ভাল লাগলো না । জায়েদ ঠিক তার বাবার মতই বদ মেজাজী । অল্পতেই মাথা গরম হয়ে ওঠে । পদে পদে কেবলই ঝামেলা বাঁধায় । বাবার প্রভাব প্রতিপত্তির কারনে অবশ্য সেই ঝামেলা থেকে সহজেই বেরিয়ে আসতে পারে । কিন্তু যদি বাবা না থাকে !

জয়িতার এই কথাটা ভাবতেই মাথাটা ঝিমঝিম করে উঠলো । ওর বাবার অনেক দোষ আছে, জয়িতা জানে তবে বাবাকে ছাড়া নিজের অস্তিত্ব একটা মুহুর্ত ভাবতে পারে না । ওর বয়স যখন তিন বছর তখন জায়েদকে জন্ম দিতে গিয়ে জয়িতার মা মারা যায় । তারপর জয়িতা দেখেছে ওর বাবা কিভাবে ওদের দু ভাইবোন কে একা হাতে মানুষ করেছে । বাইরের মানুষজনের কাছে ওর বাবা জাফর আহমেদ একজন বদমেজাজী মানুষ হলেও জয়িতা আর জয়েদের কাছে পৃথিবীর সেটা মানুষ । জন্মের পর থেকে আজ পর্যন্ত ওদের দুই ভাই বোনের সাথে কখনও কড়া কন্ঠে কথা বলেছে কি না জয়িতা বলতে পারবে না । আজ সেই বাবা মরতে বসেছে । ওদের কে ছেড়ে চলে যাবে । ডাক্তারেরা জবাব দিয়ে দিয়েছে । তারা বলেছে যে ক্যান্সারের এই পর্যায়ে এসে তাদের আসলে কিছুই করার নেই । কেমো থেরাপী হয়তো দেওয়া যাবে তবে সেটাতে খুব একটা কাজ হবে না । এর থেকে শেষ কটা দিন পরিবারেরর সাথেই থাকা ভাল ।

তাই শেষ কটা দিন শান্তিতে কাটানোর জন্য নিজের গ্রামে এসে হাজির হয়েছে । যদিও সাথে একটু ছোটখাটো হাসপাতাল বয়ে নিয়ে এসেছে । একজন ডাক্তার আর দুজন নার্সকে সাথে করে নিয়ে আসা হয়েছে সাথে করে । তারা সব সময় তার বাবার দেখা শুনা করছে । তবে এই গ্রামে আসার পেছনে আরও একটা কারণ আছে ।

জয়িতা নিজের ঘর ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে এল । সামনের উঠানে এখনও আলো জ্বালানো হয় নি । সেই অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে রইলো কিছুটা সময় । দুপুর থেকেই ওর শরীরটা কেমন খারাপ লাগছে । কাল সন্ধ্যার পর থেকেই ও একেবারে নিশ্চিত হয়ে গেছে । এটা নিয়ে ওর চিন্তার শেষ নেই । বাবা কে কিভাবে বলবে ব্যাপারটা সেই চিন্তাও ঘুরপাক খাচ্ছে ।
খবর টা শোনার পর ওর বাবা মনের ভাবটা কেমন হবে সেটাও ভাবার চেষ্টা করছে । ছোট বেলা থেকেই ওর আর জায়েদের সকল অপরাধ জাফর আহমেদ ক্ষমা করে দিয়ে এসেছে । এমন একটা ভাব করেছে যেন কিছুই করে নি ওরা কিংবা যা করেছে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু জয়িতার এই কাজটাকে তিনি কিভাবে নিবেন সেটা জয়িতা জানে না ।

এমন সময় জয়িতার ফোন বেজে উঠলো । নম্বরটা দেখার সাথে সাথেই ওর মেজাজ টা একটু খারাপ হয়ে উঠলো । একবার মনে হল ফোনটা রিসিভ করবে না । কিন্তু জানে যতক্ষন না ফোন রিসিভ হবে ততক্ষন ফোন আসতেই থাকবে । ফোন রিসিভ করেই জয়িতা বলল
-তোমাকে না বলেছি এখানে ফোন না দিতে !
ওপাশের মানুষটা কিছু সময় নিরবতা পালন করলো । জয়িতা বলল
-কি ব্যাপার কথা বলছো না কেন ?
সে বলল
-তুমি কি নিশ্চিত ব্যাপারটা নিয়ে ?
-নাহ ! আমি নিশ্চিত হব কেন ? আমি তো ঢং করছি ।
-আরে বাবা রেগে যাচ্ছো কেন ?
-না রাগবো না কেন ? আমার তো সুখের দিন !
ওপাশের মানুষটা আরও কিছু সময় চুপ করে রইলো । তারপর বলল
-আচ্ছা কি করবে ঠিক করেছো ?

জয়িতা কিছু বলতে গিয়েও বলল না । নিজের রাগটাকে দমন করে বলল
-জানি না । শোন এখন আমি কিছু ভাবতে পারছি না । বাবাকে নিয়ে গ্রামে এসেছি । এখানে সব সময় বাবার সাথেই থাকছি সব সময় । তুমি দয়া করে এখন ফোন দিও না । সুযোগ পেলে আমিই ফোন দেব ।

জয়িতা আরও কিছু বলতে যাচ্ছিলো তার আগেই বাবার কন্ঠস্বর শুনতে পেল । আর কিছু না বলেই ফোনটা কেটে দিল । তারপর বাবার ঘরের দিকে রওনা দিল । মনের ভেতর থেকে দুঃচিন্তা কিছুতেই যাচ্ছে না । বাবাকে কিভাবে সব কিছু বলবে সেটা বুঝতে পারছে না । যদি ওর বাবা অন্য কোন ভাবে ব্যাপারটা জানতে পারে তাহলে ব্যাপারটা কোন ভাবেই ভাল হবে না ।

বাবার রুমে গিয়ে দেখলো জায়েদ আগে থেকেই সেখানে বসে আছে । বাবার দিকে তাকিয়ে আছে । ওর মুখে থমথমে । জয়িতা গিয়ে বাবার পাশে বসলো । জাফর আহমেদ বলল
-কি হয়েছে তোর ? মুখ এমন কেন ?
-কিছু না বাবা । তোমার কেমন লাগছে ?

জাফর আহমেদ হঠাৎ করেই কোথায় যেন হারিয়ে গেল । এই কদিনেই তার চেহারা কেমন যেন হয়ে গেছে । মাথার চুল গুলো অনেকটাই ঝড়ে পড়েছে কেমো দেওয়ার সময় । তার আগের সুস্থ সবল আর দাম্ভিক জাফর আহমেদকে কোথাও দেখা যাচ্ছে না । জাফর আহমেদ বলল
-ঐ ছেলেটা নাকি আসবে না বলে দিয়েছে !

জয়িতা বাবার দিকে তাকালো । বাবার চোখে মৃত্যু ভয় সে দেখতে পাচ্ছে । বাবার হাতটা ধরে জয়িতা বলল
-বাবা তুমি কি সত্যিই বিশ্বাস কর এসবে কিছু হবে ? মানে সত্যিই কিছু হয় ?
-জানি না রে মা । কিন্তু তোদের ছেড়ে যেতে ইচ্ছে করছে না রে । আর কটাদিন তোদের সাথে থাকতে ইচ্ছে করছে ।

কথাটা শুনে জয়িতার বুকটা হুহু করে উঠলো । বাবাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলল
-বাবা তুমি চিন্তা করো না । আমি তাকে নিয়ে আসবো । যে কোন ভাবেই । তুমি মোটেই চিন্তা কর না ।

জয়িতা আর বসলো না বাবার পাশে । এখন বাবার পাশে বসলেই তার মন খারাপ হবে । উঠানে বেরিয়ে এসেই সে সলিমকে ডাক দিল । ততক্ষনে উঠানে আলো জ্বালানো হয়েছে । সলিম দৌড়ে এসেই তার সামনে দাড়ালো ।
-জে আফা !
-ঐ কবিরাজের বাসায় নিয়ে চল আমাকে !
-এক্ষন ?
-হ্যা । এখনই ।
পেছন থেকে জায়েদের কন্ঠস্বর শোনা গেল । জায়েদ বলল
-আপু আমি আসবো তোর সাথে ?
জয়িতা বলল
-না । তুই বাবার কাছে থাক । তাকে একা রেখে যেতে হবে না ।

জয়িতা একটা পাতলা চাদর জড়িয়ে নিল শরীরে । তারপর হাটতে আরাম্ভ করলো । সলিম আসতে লাগলো তার পেছন পেছন ।



জাফর আহমেদ সব সময় নিজের কাজ কর্ম থেকে ওদের দুই ভাই বোন কে দুরে রেখেছে । তিনি যখন অফিস থেকে বাসায় আসতো তখন তিনি হয়ে যেতে একেবারে অন্য মানুষ । জয়িতা ওর নিজের জীবনে অফিসের কোন কাজ কিংবা কর্মচারিকে ওদের বাসাতে আসতে দেখেনি । ঠিক তেমন ভাবেনিজের রোগটাতেও ওদের কাছ থেকে লুকিয়েই রেখেছিলো । যখন সত্যিটা তারা জানতে পারলো তখন অনেকটাই দেরি হয়ে গেছে । কিছুই আর করার নেই । তবুও জয়িতা সব চেষ্টা করে দেখেছে । ছুটে গেছে দেশ বিদেশের সব জায়গাতে । কিন্তু আর কোন লাভ হয় নি । তখনই ওর কাছে এই কবিরাজের কথা কানে আসে । মানুষটা নাকি অদ্ভুদ ভাবে অন্যের রোগ সারিয়ে তোলে ।

কথাটা ও মোটেই পাত্তা দেয় নি কিন্তু জায়েদের কি মনে হয়েছে যে ওদের এই লোকের কাছেও গিয়ে দেখানো উচিৎ । এমন কি ওর বাবাও একই মনভাব । বিশেষ করে যখন লোকটা ওদের নিজেদের গ্রামেই থাকে । আর সবাই যখন আশা ছেড়েই দিয়েছে তখন আর কিছু করারও নেই । ডাক্তারেরা বলে দিয়েছে যে এখন পরিবারের সাথে কিছু সময় কাটানো উচিৎ । তাই এখানে আসা । নিজের গ্রামে কিছু শান্তির সময় কাটানো যাবে সেই সাথে সেই লোকটার সাথেও দেখা করা যাবে !

-সলিম !
-জে আফা !
-আর কতদুর !
-মাস্টর সাব গ্রামের শ্যাষ মাথায় থাকে !

জয়িতা এখানে আসার পর থেকে এই লোকটা সম্পর্কে নানান কথা শুনছে । শেষ বার যখন গ্রামে আসে তখন ও অনেক ছোট । তখন এই গ্রামে এমন কেউ ছিল না । লোকটার নাম সাহিব আহসন । এই নামটাই শুনে এসেছে । স্থানীয় সরকারি স্কুলের শিক্ষক । একা মানুষ । গ্রামের শেষ মাথায় একটা এক তলা বাসা নিয়ে থাকেন । স্কুলের সময়টা বাদ দিয়ে সারা দিন নাকি বই পড়ে সময় কাটান । মাঝে মাঝে রাস্তায় হেটে বেড়ান । তবে সবার ধারনা উনি রাস্তায় বের হয় মানুষের খোজ খবর নেওয়ার । একটা নির্দিষ্ট বাড়ির সামনে গিয়ে হাজির হন। এবং নিশ্চিত ভাবেই সেই বাড়ির কেউ না কেউ সেদিন অসুস্থ থাকবে । সেই বাড়িতে কিছু সময় থেকে সে চলে আসে । সন্ধ্যা কিংবা রাতের বেলা দেখা যায় সেই বাড়ির লোকজন সেই অসুস্থ মানুষটাকে নিয়ে গ্রামের শেষ প্রান্তে যাচ্ছে ।

এই কথা যখন প্রচার হওয়ার পরপরই নাকি দুর দুরান্ত থেকে অনেকে আসে তার কাছে চিকিৎসার জন্য । কিন্তু তাদের দিকে ফিরেও তাকায় না । তাদের এমন কি বাড়ির ভেতরেও ঢুকতে দেয় না । মানুষ দাড়িয়ে থাকতে থাকতে চলে যায় । কেউ কেউ অনেক রাত পর্যন্ত অপেক্ষা করে । কিন্তু দরজা আর খোলে না ।

জয়িতার যে ব্যাপারটা জানার পর থেকে কৌতুহল হচ্ছে না সেটা বলবে না । মানুষটাকে সে ভন্ড বলে ধরে নিত কিন্তু সেটাও পারছে না কারন এখানে টাকা পয়সার কোন ব্যাপার জড়িত নেই । সাহিব আহসান কারো কাছ থেকে কোন টাকা পয়সা নেন না । নিজে অতি সাধারন জীবন যাপন করে ।

একতলা বাসাটার সামনে এসে জয়িতা দাড়িয়ে রইলো কিছু সময় । বাড়ির গেটের কাছে একটা ৪০ পাওয়ারের বাল্ব জ্বলছে । সেই আলোতে চারিদিকটা আরও বেশি অন্ধকার লাগছে । সলিম কয়েকবার ডাক দিল কিন্তু কোন সারা শব্দ পাওয়া গেল না । এমন কি দরজা খুললোও না । জয়িতার যখন মনে হল এখানে আসাটা একেবারে বৃথাই গেল তখনই দেখলো দরজা খুলে যেতে । দরজা খুলে যে মানুষটা বের হয়ে এল তাকে দেখে জয়িতা সত্যিই অবাক হয়ে গেল । ও ভেবেছিলো সাহিব আহসান একজন বয়স্ক লোক হবেন । অন্তত মধ্য বয়স্ক কেউ হবে । কিন্তু দেখা গেল সাহিব আহসান একেবারেই যুবক একজন মানুষ । ওর সমানই হবে কিংবা ওর থেকে দু এক বছরের বড় কিংবা ছোট হবে ।

সাহিব সরাসরি জয়িতার দিকে তাকিয়ে বলল
-আসুন ভেতরে ! এতো রাতে আসবেন ভাবি নি ।
জয়িতা বলল
-গরমের দিনে রাত আটটা এমন কোন রাত নয় ।
সাহিব আহসান হাসলো ।
-শহুরে মানুষের জন্য নয় কিন্তু গ্রামে অনেক রাত । আসুন ভেতরে আসুন ।

তার সলিমের দিকে তাকিয়ে বলল
-সলিম যাও তো রমিজের দোকানে গিয়ে আমার জন্য আধা কেজি চিনি নিয়ে এসো, আমার কথা বললেই হবে । আমার চিনি শেষ হয়ে গেছে ।
জয়িতা বলল
-আপনার ব্যস্ত হতে হবে না । আসলে ....

সলিমের দিকে তাকিয়ে দেখলো ভেতরে ঢুকতে হবে না দেখে সলিমের মুখে যেন একটা স্বস্তির ছাপ । এলাকার মানুষ জন নাকি এই বাড়ির ভেতরে ঢুকতে ভয় পায় কোন কারনে । কেউ কেউ আবার মনে করে সাহিব আহসান নাকি কোন মানুষই না । সে হয়তো জ্বীন ।
-সমস্যা নেই । আসুন ভেতরে ।


জয়িতা মনের ভেতরে খানিকটা অস্বস্তি নিয়েই ভেতরে ঢুকলো । কিন্তু ভেতরে ঢুকে খানিকটা অবাক হয়ে গেল । ড্রয়িং রুমের পুরো দেওয়াল জুড়েই কেবল বুক সেলফ আর তাতে বই ভর্তি । দেশী বিদেশী অনেক বই রয়েছে সেখানে । সাহিব যে অনেক বই পড়ে সেটা বুঝতে কষ্ট হল না । জয়িতাকে বইয়ের দিকে তাকিয়ে থাকতেই সাহিব বলল
-এখানে আসলে আর কিছু করার নেই । স্কুলের সময় বাদ দিয়ে আমি বই পড়ে কাটাই । বসুন !

জয়িতা একটা সোফাতে বসলো । কিভাবে কথাটা বলবে সেটা ও জানেও না । যখন এখানে আসছিলো তখন সাহিব আহসানের এক টা চিত্র মনের ভেতরে যে চিত্রটা ছিল এখানে এসে দেখে সাহিব আহসান একেবারেই অন্য রকম । জয়িতার এখন মনে হচ্ছে যা শুনে এসেছে তা সবই কেবল গল্প । আর কিছু নয় ।
সাহিব আহসান বলল
-আমি কি জানতে পারি আপনি হঠাৎ এখানে ?

জয়িতা কি বলবে খুজে পেল না । একবার বলল যে এমনি এসেছে কথা বলতে । তার ব্যাপারে অনেক শুনেছে তাই এসেছে কিন্তু চিন্তাটা নিজের কাছেই কেমন হাস্যকর শোনালো । তাই বাদ দিয়ে দিল । বই গুলোর দিকে তাকিয়ে রইলো বেশ কিছুটা সময় । তারপর বলল
-আপনি কি জানেন আমি এখানে কি জন্য এসেছি ? আই মিন এর আগে একবার আপনাকে ডাকা হয়েছে । বুঝতে পারার কথা !

সাহিব হাসলো । তারপর বলল
-হ্যা আমি কিছুটা তো অনুমান করতেই পারছি । ব্যাপারটা আসলেই আপনার কাছে সত্য মনে হয় বলুন ! এমন কি সম্ভব ?
জয়িতা মাথা নাড়ালো । তারপর বলল
-আমার আসলে নিজের কাছেই লজ্জা লাগছে এখন ! কি জন্য যে এলাম আমি নিজেই বলতে পারবো না । আমি এখন আসি !

এই বলেই উঠে দাড়ালো । সাহিব তখনই বলল
-আরে আরে একা একা কেন যাবেন । সলিম আসুক তারপর যাবেন । যদি চিনি ছাড়া চা খান তাহলে চা হতে পারে !

জয়িতা বসে পড়লো আবার । সাহিব উঠে চলে গেল ঘরের ভেতরে । তারপর হাতে দুটো কাপ দিয়ে ফিরে এল সাথে সাথেই । চা যেন তৈরি করাই ছিল । জয়িতার মুখের ভাব দেখে সাহিব বলল
-আসলে আমি সব সময় চা খাই । ফ্ল্যাস্কে চা তৈরি থাকে সব সময় ।
-আচ্ছা ।

চায়ে চুমুক দিতে দিতে জয়িতার হঠাৎ কি হল ওর মনে হল সামনে বসা মানুষটাকে কথা গুলো বলেই ফেলে । মানুষটা নিশ্চয়ই এসব সব শুনে অভ্যস্ত । ওর এই ধরনের কথা শুনে খুব একটা অবাক হবে না ।

-আসলে আমাদের জীবনে বাবা ছাড়া আর কেউ নেই । বাবাকে ছাড়া আমরা কিছু ভাবতেই পারি না দুভাই বোন । বুঝতেই পারছেন । এই অবস্থায় আমরা কি করতে পারি । ডুবন্ত মানুষ যেমন খড় কুটো যা পায় তাই ধরেই বেঁচে থাকতে চায় আমাদের অবস্থা । তাই এই শেষ পর্যায়ে এসে আমরা যা শুনছি তাই একবার চেষ্টা করছি ।

সাহিব চুপ করে রইলো । জয়িতা আবার বলল
-আমি জানি আপনার কাছে এই কথাটা বলা ঠিক হবে না, এমন কি অনুরোধ করাটাও না । তারপরেও আপনি কি একবার আমাদের বাসায় আসবেন ? আমার বাবার সাথে একটু কথা বলে যাবেন । আর কিছু না । প্লিজ !

সাহিব আহসান বলল
-এতে কি কাজ হবে ? কোন লাভ ? আপনার বাবার লিউকোমিয়া ঠিক হয়ে যাবে ?
-তা হয়তো ঠিক হবে না কিন্তু আমার বাবা আমার ভাই কিংব আমি নিজেও একটা শান্তি পাবো । আর কিছু না ।

সাহিব বেশ কিছুটা সময় চুপ করে রইলো । চুপচাপ চা শেষ করে উঠে দাড়ালো । বইয়ের শেলফের কাছে গিয়ে একটা বই বের করে হাতে নিয়ে আবার জয়িতার সামনে এসে বসলো । তারপর বলল
-জাফর আহমেদ একজন অসাধারন বাবা ! এটা আমাকে মানতেই হবে । কিন্তু মানুষ হিসাবে তিনি কেমন সেটা কি আপনি জানেন ?
জয়িতা জানে তার বাবা মানুষ হিসাবে কেমন ! খানিকটা চুপ করে থেকে বলল
-হ্যা জানি ।
-তারপরেও আপনি আপনার বাবাকে রক্ষা করতে চান ?
-হ্যা । চাই ।
-বিনিময়ে কি দিতে পারবেন ?
-মানে ?

জয়িতার এবার একটু অস্বস্থি লাগলো । সে সাহিব আহসানের দিকে তাকিয়ে বলল
-আপনি কি বলতে চান ?
সাহিব কোন প্রকার ভনিতা না করে বলল
-বললাম আপনি বিনিময়ে কি দিতে পারবেন ?
-আপনি কত টাকা চান ?
খুব একটা মজার কথা শুনেছে এমন একটা ভাব করে সাহিব আহসান হেসে ফেলল । তারপর সে জয়িতার পেটের দিকে তাকিয়ে রইলো কিছুটা সময় । জয়িতা তীব্র বিস্ময় নিয়ে বলল
-হাউ ডু ইউ নো ? কিভাবে জানেন আপনি ?

জয়িতা তখনই সাহিব আহসানের চোখ দেখতে পেল । সাথে সাথে একটা তীব্র ভয় ওকে জেকে বসলো । সাহিব আহসানের চোখে কোন সাধারন মানুষের চোখের মত নেই আর । কালো মনির বদলে পুরো চোখ দুটো কেমন তীব্র হলুদ রং ধারন করতে শুরু করেছে । মুখে লেগে থাকা হাসিটাতে সেই চেহারা আরও যেন বেশি ভয়ংকর মনে হচ্ছে ।
জয়িতা বুকের ভেতরে একটা তীব্র আতংক কাজ করছে । বার বার মনে হচ্ছে মানুষের মুখে যা শুনে সেটা সব সত্যি । তার সামনে বসা এই মানুষটা কোন ভাবেই স্বাভাবিক কোন মানুষ হতে পারে না । কোন ভাবেই না ।

কিন্তু ও এখন কি করবে ? দৌড়ে পালাবে ?
পালাতে কি পারবে ? জয়িতা আর স হ্য করতে পারছে না । ওকে পালাতে হবে কেবল এই কথাটাই মনে হল । এখানে থাকা যাবে না ।

জয়িতা ঝট করে উঠে দাড়ালো । তারপর আর কিছু না ভেবেই দরজার দিকে দৌড়ে দিলো । ঘরের দরজা পেরিয়ে যখন বাইরের দেওয়ালের গেটটা চোখের সামনে আসলো তখন যেন আরও একটা তীব্র ধাক্কা খেল । সেখানে দেখতে পেল সাহিব আহসান দাড়িয়ে আছে । গেট খুলছে । সালিমকেও একটা প্যাকেট হাতে দেখা যাচ্ছে । সলিম যে চিনি কিনতে গিয়েছিলো, ফিরে এসেছে !
কিন্তু সাহিব আহসান কখন বের হত । জয়িতা যখন ভয় পেয়ে দৌড়ে বের হয়ে এল তখন সাহিব আহসান শোফাতেই বসে ছিল । যদি সে দ্রুত দৌড়ে যায়ও তবুও জয়িতাকে পাশ কাটিয়েই তাকে যেতে হবে ।

জয়িতা ভয়ে জড় হয়ে দাড়িয়ে রইলো দরজাতেি । ওর মাথার ভেতরে কিছুই ঢুকলো না । তারপর সলিমের আওয়াজ শুনতে পেল ।
-আফা মনি চলেন । যাইবেন না ?

সলিমের সাথে সাথে সাহিব আহসানও জয়িতার দিকে তাকালো । একেবারে স্বাভাবিকই লাগছে । কিন্তু তারপরেও জয়িতার পুরো শরীরে একটা শিরশিরে অনুভুতি হতে লাগলো । আর এক মুহুর্তও থাকতে প্রস্তুত নয় এখানে । সে এক প্রকার দৌড়েই বাড়ি থেকে বের হয়ে এল । পুরো রাস্তা ধরে মাথার ভেতরে সাহিব আহসানের সেই চোখ দুটো মনে হচ্ছিলো । কিছুতেই সেটা মন থেকে দুর করতে পারছিলো না ।


দুই

জয়িতা অনুভর করলো ওর পেটের উপরে কেউ যেন আলতো করে হাত দিয়ে আদর করছে । চোখ মেলে বুঝতে পারলো না কোথায় আছে । ওর ঘরটা পুরোপুরি অন্ধকার । ওর যতদুর মনে আছে ওর ঘর কখনই পুরোপুরি অন্ধকার হয় না । ঘরে একটা ডিম লাইট জ্বলতে থাকে যখন ঘুমাতে যায় । জানালা খুলেই ও ঘুমায় । বাইরে জ্বলতে থাকা আলো এসে আলোকিত করে ঘরটা ।

তাহলে কি বিদ্যুৎ চলে গেছে ? এই জন্য ?
তাহলে জেনারেটরও চালু হওয়ার কথা !
কি হচ্ছে এসব ?

জয়িতা নড়ার চেষ্টা করলো । কিন্তু অবাক হয়ে দেখলো ও মোটেই নড়তে পারছে না । হাত পা গুলো যেন অবস হয়ে আছে । জয়িতা এবার চিৎকার দিতে গেল । কিন্তু গলা থেকে কেবল একটা গোঙানীর মত একটা আওয়াজ ছাড়া আর কিছু বের হল না । জয়িতার অন্ধকারের ভেতরে অস হায় বোধ করতে লাগলো । একটু মাথাটা উচু করার চেষ্টা করলো । চারিদিকে অন্ধকার তবুও ওর দেখার ইচ্ছে যে ওর পেটের কাছে কি রয়েছে সেটা নড়াচড়া করছে । অনেক কষ্ট করে যখন ও মাথাটাটা একটু তুলে নিজের পেটের দিকে তাকাতে পারলো তখন সেখানে ঘন অন্ধকার ছাড়া কিছুই নেই । কিন্তু যখনই নিজের মাথাটা আবার নিচে নামাতে যাবো তখনই ঘন অন্ধকারের ভেতরে দুটো হলুদ চোখ দপ করে জ্বলে উঠলো ।

জয়িতার কিছু বলে দিতে হল না ।ওর বুঝতেো কষ্ট না কে এসেছে ওর ঘরে ! জয়িতা নিজেকে মুক্ত করার চেষ্টা করতে লাগলো কিন্তু একটা পর্যায়ে এসে মনে হল আর কোন উপায় নেই । এই অশরীরির কাছ থেকে ওর কোন মুক্তি নেই । ও হয়তো এখনই মারা যাবে ! কেউ দেখার নেই ওকে । কেউ ওকে বাঁচাতে পারবে না !

ঠিক সেই সময়ে কোথা থেকে একটা প্রবল শব্দ শুনতে পেল জয়িতা । তারপরই ওর ঘুম ভেঙ্গে গেল । ধড়ফড় করে জেগে উঠলো । চারিদিকে তাকিয়ে দেখলো ও নিজের রুমের ঘুমিয়ে ছিল । ঘরে এখনও একটা ডিম লাইট জ্বলছে । সেটার আলো ছাড়াও বাইরে থেকে আলো । সব কিছু স্বাভাবিক মনে হলেও জয়িতার বুকের ভেতরে সেই ধুকধুকানি এখনও থামে নি !

একটু সুস্থির হতেই টের পেল দরজায় আঘাত করার শব্দটা এখনও আসছে ।

দ্রুত দরজা খুলে দিল । তাকিয়ে দেখি জায়েদ দাড়িয়ে । জায়েদের চেহারা দেখেই জয়িতার মনে হল কিছু একটা সমস্যা হয়েছে !
-কি হয়েছে ?
-আব্বু যেন কেমন করছে ?


জয়িতা যখন বাবার ঘরে গিয়ে হাজির হল তখন জাগর আহমেদ অনেকটাই নেতিয়ে পড়েছে । অবস্থা খুব বেসি ভাল মনে হচ্ছে না । ডাক্তার নার্স সব ছোটাছুটি করছে কিন্তু জয়িতার মনে হল এসবে কোন লাভই হবে না ।

জয়িতা আগে থেকেই জানতো এমন একটা দিন আসবে । সে হিসাবে নিজেকে প্রস্তুত করেছিলো কিন্তু এখন সেই প্রস্তুতি কোথায় হারিয়ে গেল নিমিষের । চোখে ফেটে কান্না বেরিয়ে এল । মানুষের জীবনে এসন সব পরিস্থিত আসে যেখানে মানুষের কোন কিছুই করার থাকে না !

কিন্তু এইখানে জয়িতার কিছু করার আছে । জয়িতা জায়েদের দিকে তাকিয়ে বলল
-তুই এখনই সলিম কে নিয়ে ঐ সাহিব আহসানের বাসায় যাবি । তাকে কেবল বলবি যে সে চায় তাই দিবো তাকে । এখনই যাবি ! বুঝেছিস ?

জায়েদ খানিকটা অবাক হয়ে বলল
-সে কি চায় ?
-সেটা তোর জানতে হবে না । যা বলছি শোন । দৌড়ে যা !

জায়েদ যখনই ঘর থেকে বের হতে যাবে তখনই সলিম ঘরে এসে ঢুকলো । ওদের দুজনকে অবাক করে দিয়ে বলল
-মাস্টার সাব আসছে ।

ওরা দুই ভাইবোন একে অন্যের দিকে তাকিয়ে রইলো কয়েক মুহুর্ত । সলিম আবার বলল
-মাস্টার সাব বলছে ঘর থেকে সবাইকে বের করে দিতে । তবে আপনারা দুইজন থাকতে পারেন । আর মোমবাতির ব্যবস্থা করতে বলেছে ।


ডাক্তার আর নার্স কিছুতেই বের হতে চাচ্ছিলো না । ওরা বলছে এই অবস্থা মারাত্মক যখন তখন যে কোন কিছু হতে পারে ! জায়েদ বলতে গেলে একেবারে জোর করেই তাদের ঘর থেকে বের করে দিল । তারপর যখনই সাহিব আহসান ঘরের ঢুকলো তখনই ঢুপ করে ঘরে জ্বলতে থাকা বাল্ব দুটো ফেটে গেল । কয়েক মুহুর্তের জন্য পুরো ঘরটা অন্ধকারে ডুবে গেল ।

জয়িতার কেন জানি মনে কেবল এই ঘরের বাল্বই নয় পুরো বাসার বাল্ব নষ্ট হয়ে গেছে । তবে সেদিকে জয়িতা ভাবার সময় পেল না খুব একটা সময় । সলিম তার পরপরই মোমের আলো নিয়ে ঘরে ঢুকলো । জয়িতা তাকিয়ে দেখলো সাহিব আহসান ওর বাবার খাটের পাশে বসেছে । ওর বাবা শান্ত হয়ে গেছে । মোমের আলোতেই দেখা যাচ্ছে তার চোখ দুটো আস্তে আস্তে বুজে আসছে ।

সাহিদ আহসান বলল
-যাই কিছু দেখেন না কেন আপনারা কোন ভাবেই আমার কিংবা আপনার বাবার শরীরে হাত দিবেন না । কোন ভাবেই না । মনে রাখবেন !
জায়েদ যে কখন জয়িতার পাশে চলে এসেছে জয়িতা লক্ষ্য করে নি । ওর হাত ধরে চুপ করে দাড়িয়ে রইলো । জয়িতার বুঝতে কষ্ট হল না যে ওর ছোট ভাইটা ভয় পেয়েছে । একটু আগে বাবার অবস্থা দেখে ঘাবড়ে গিয়েছিলো এখন সেখানে ভয় এসে জমা হচ্ছে । জয়িতার নিজেরও একটু একটু ভয় করতে লাগলো ।

জয়িতা দেখতে পেল সাহিদ আহসান ওর বাবার হাত দুটো চেপে ধরছে শক্ত ভাবে । তারপর চোখ বন্ধ করে কি যেন পড়তে শুরু করলো । মৃদু মৃদু কাঁপছে তার শরীর । একটা সময় সেই কাঁপনটা আস্তে আস্তে বাড়ছেই । দুজনেই অবাক হয়ে কেবল সেদিকে তাকিয়ে রইলো ।

তারপরই ওর বাবার শরীরটা আরও জোড়ে কাঁপতে লাগলো । ওর বাবা যেন সাহিদ আহসানের হাত থেকে নিজেকে ছাড়াতে চাইছে । জয়িতা আর জায়েদ কেবল অবাক হয়ে দেখলো সাহিদ আহসানের হাতটার থেকে নানা শিকড় বেরিয়ে এসেছে ওর বাবার বাসার হাতের সাথে জড়িয়ে যাচ্ছে । এবং সেই শিকড় গুলো আস্তে আস্তে ওর বাবার পুরো শরীরে ছড়িয়ে যাচ্ছে ।

জয়েদ ওর আপুর হাতটা যেন আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরছে । চাপ বাড়ছেই । নিজের চোখে যা দেখছে তা কোন ভাবেই বিশ্বাস করতে পারছে না ।
-আব্বু !

জয়িতা জায়েদকে শক্ত করে চেপে ধরলো । জায়েদ নিজেকে ধরে রাখতে পারছে না । যে কোন ভাবেই ওর বাবাকে ধরতে চাচ্ছে ।

তারপরই ওর বাবার মুখ থেকে একটা তীব্র চিৎকার বেরিয়ে এল । সেই সাথে সাথে ওর মোম বাতি গুলোও নিভে গেল । পুরো ঘরটা আবারও অন্ধকারে ঢেকে গেল । তখনই জয়িতা আর জায়েদ দুজনই একটা অনুভব করলো ওদের ঘরের ভেতরে ভারী কেউ নিঃশ্বাস নিচ্ছে । এই নিঃশ্বাসের আওয়াজ কোন মানুষের হতে পারে না । জয়িতা কিংবা জায়েদ কি করবে কিছু খুজে পেল না । নিজের চোখে সামনে তারা অন্ধকার ছাড়া আর কিছুই দেখতে পাচ্ছে না কেবল সেই নিঃশ্বাসের আওয়াজটা ছাড়া । নিঃশ্বাসটা পুরো ঘোর জুরে ঘুরে বেড়াচ্ছে ।
এমন সময় জয়িতা অনুভব করলো জায়েদ ওর কাছ থেকে দুরে চলে গেল । কিংবা আরও ভাল করে বললে কেউ যেন ওকে ডুরে সরিয়ে নিয়ে গেল । জয়িতা কি করবে বুঝতে পারলো না । একবার মনে হল ও চিৎকরে কিন্তু সেটা করতে পারলো না ।

জয়িতা একটা সময় অনুভব করলো সেই নিঃশ্বাসের আওয়াজটা যেন খুব কাছে চলে এসেছে । তারপর নিঃশ্বাস যেন ওর শরীর উপরের কাছে ঘুরে বেড়াচ্ছে । তারপর সেটা ওর তলপেটের কাছে এসে থামলো যেন ! কিছু সময় আগে স্বপ্নে জয়িতার যে অনুভুতিটা হচ্ছিলো এখনও ঠিক সেই অনুভুতি হতে লাগলো । কেউ যেন ওর তলপেটে আলতো করে আদর করছে ।
সময় যেন থেমে গেছে । জয়িটার মনে হল ওর তলপেটের আলতো আদরটা করাটা হঠাৎ করে তীব্র একটা ব্যাথার দিকে মোড় নিল । তারপর সেটা ধীরে ধীরে এতোই তীব্র হতে লাগলো যে জয়িতার সহ্যের বাইরে চলে এল । তারপরই সে জ্ঞান হারিয়ে পড়লো ।



পরিশিষ্টঃ

জয়িতা বিরক্ত নিয়ে আবার আবার
-তোমাকে না বলেছি এখানে ফোন না দিতে ।
ফোনের ওপাশ থেকে বলল
-এমন কেন করছো ? আমি তো চিন্তিত নাকি ? একটা কিছু তো করতে হবে ?
জয়িতা নিজের রাগটা দমন করে বলল
-তোমাকে কিছু চিন্তা করতে হবে না । আমি যা করার করবো !
-তোমার বাবা যদি জেনে যায় ! মানে আমি বলতে চাচ্ছি তার যা শরীরের অবস্থা এটা জানলে ?

জয়িতা খুব ভাল করেই জানে ওপাশের মানুষটা এই কথাটা কেন বলছেন । জাফর আহমেদ যদি এই কথাটা জানতে পারে তাহলে ওপাশের মানুষটার জন্য সেটা মোটেই কোন সুখের সংবাদ হবে না । জয়িতা বলল
-আমার বাবাকে নিয়ে তোমার এতো চিন্তার কিছু নেই ।
-না মানে ! তার শরীর .....
-তার শরীর এখন অনেকটা ভাল । মিথ্যা বলছি না সত্যিই অনেকটাই ভাল ।
-মানে !
-মানে হচ্ছে তিনি মরছেন না । এই টকু নিশ্চিত করেই বলতে পারি ।

ফোনের ওপাশ থেকে কোন আওয়াজ পাওয়া গেল না । এই নিরবতার কারন জয়িতা খুব ভাল করেই জানে । জয়িতা আবার বলল
-তবে তোমার ভয় পাওয়ার কারন নেই । যে ভয়টা তোমার ছিল সেটা কাল রাতেই আমাকে ছেড়ে চলে গেছে ।
-মানে ? আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না ।
-তোমার কিছু বুঝতে হবে না ।

আর কিছু না বলেই জয়িতা ফোনটা কেটে দিল । তীব্র একটা মন খারাপ ওকে পেয়ে বসলো । যে প্রাণটা ছিল অনাকাঙ্খিত সেই প্রাণটার জন্য এতো মন খারাপ লাগবে জয়িতা কোন দিন ভাবতেও পারে নি । মানুষের মন কি অদ্ভুদ !


(সমাপ্ত)



আইডিয়া ফ্রম হরর স্টোরি প্রমটস
সর্বশেষ এডিট : ০১ লা মে, ২০১৯ রাত ১১:২৮
২টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

একদিন ভালো লাগার দিন.....

লিখেছেন আহমেদ জী এস, ২০ শে আগস্ট, ২০১৯ রাত ১:১৭



সময়ের অনেক আগেই পৌঁছে গেছি। রোববার বলেই সম্ভবত রাস্তাটা ফাঁকা। সকাল সাড়ে ন’টায় জামাত শুরু হবার কথা। লোক আসতে শুরু করেছে। মেয়েকে বললুম, মসযিদের কোথায় তোরা নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

ডেঙ্গু ব্যাবসা - মানুষের মৃত্যুও একটি ব্যাবসা কর্ম হতে পারে !!!

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ২০ শে আগস্ট, ২০১৯ ভোর ৬:২৪



আমি লেখক বা সাহিত্যিক নই, কথা সাহিত্যিক আনিসুল হক সাহেব ও নই যে, দোকান - রেষ্টুরেন্ট - পার্লার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মডেল মেয়ে - মহিলা নিয়ে লাল ফিতা কেটে কেক খাবো... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাগলী’র মা

লিখেছেন খায়রুল আহসান, ২০ শে আগস্ট, ২০১৯ দুপুর ১২:০৯

তাঁরও একটা নাম ছিল,
সে নামেই তাঁর বিয়ে হয়েছিল,
যদিও তখন কোন জন্ম সনদপত্র রাখা হতো না।
তিনি কখনো বিদ্যালয়ে যান নি, তাই তাঁর কাছে
কোন বিদ্যালয়ের একটাও সনদপত্র ছিল না।
তবুও,... ...বাকিটুকু পড়ুন

‘গোলমাল’ না হলে ফুটবল খেলা কঠিন হত। =p~ =p~

লিখেছেন গিয়াস উদ্দিন লিটন, ২০ শে আগস্ট, ২০১৯ দুপুর ১:৫৪


রঙ্গ ভরা অঙ্গনে মোর – ৬



লিখাটা যখন ‘রঙ্গ ভরা অঙ্গনে মোর’ সিরিজে লিখছি তাই শুরতেই ফুটবল নিয়ে একটা কৌতুক-
প্রেমিকার বাড়িতে বসে নতুন কেনা থ্রিডি টিভিতে ফুটবল... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিবর্ণ জীবন

লিখেছেন মুক্তা নীল, ২০ শে আগস্ট, ২০১৯ বিকাল ৫:০৮



কেস স্টাডি ১ : কণা ও আবিরের সাত বছরের সম্পর্কের সমাপ্তি ঘটে দুই পরিবারের বিয়ের সম্মতিতে।আবির চাকরি করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে আর কনা বেসরকারি ব্যাংকে। বিয়ের চার... ...বাকিটুকু পড়ুন

×