somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বড়গল্পঃ ফ্রি বিয়ার ইফেক্ট

১৪ ই জুন, ২০২০ বিকাল ৪:৫৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



এক

এই হোটেলে থাকতে এসে তন্বী যে এভাবে বিপদে পড়ে যাবে সেটা ভাবতেও পারে নি । ও যে নিজে এমন একটা বোকামী করবে আর তার ফলশ্রুতিতে এমন কিছুর সম্মুখীন হতে হবে, সেটা তন্বীর মনে কোনদিন আসে নি । ছেলেটা তন্বীকে করিডোরের দেওয়ালের সাথে চেপে ধরেছে । তন্বী কিছুক্ষণ চেষ্টা করে দেখেছে নিজেকে ছাড়ানোর কিন্তু কিছুতেই পারে নি ।
ছেলেটা ওর চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,
-কি ব্যাপার কথা বলছো না কেন ? আমার রুমে কেন ঢুকেছিলে আর পালাচ্ছিলেই বা কেন ?
তন্বীর চোখ বেয়ে পানি নেমে আসতে চাইলো । খুব চেষ্টা করে কোনমতে সেটা আটকে রেখেছে । তন্বী কোনমতে বলল,
-বিশ্বাস করুন আমি ইচ্ছে করে ঢুকিনি । একটু আগে আমি একটু বিয়ার খেয়েছিলাম হোটেলের পাব থেকে । মাথাটা কেমন চক্কর দিতে শুরু করে । আমি আসলে আপনার রুমে ভুল করে ঢুকে পড়েছি ।
যুবক ছেলেটা এবার আরও কঠিন কন্ঠে কিছু বলতে যাবে তখনই একটা দরজা খোলার আওয়াজ হল । আশেপাশের কোন রুমের দরজা খুলে গেল । তন্বী আর যুবক - দুজনেই সেদিকেই তাকালো । দরজাতে একটা মেয়ের চেহারা দেখা গেল । সাথে সাথেই তন্বী অনুভব করলো যে ছেলেটার হাতের চাপ খানিকটা নরম হয়ে এসেছে । মেয়েটার চোখে খানিকটা বিস্ময় দেখা গেল । তারপর মুখ দিয়ে একটাই কথা বের হয়ে এল !
মেয়েটি বলল,
-ফারিজ ! তুমি এখানে ?
তন্বী খেয়াল করলো যুবকটা ওকে ছেড়ে দিয়ে একটু সোজা হয়ে দাঁড়ালো । সামনের যুবকের নাম তাহলে ফারিজ ! ফারিজ মেয়েটির দিকে তাকিয়ে বলল,
-তু-তুমি এখানে ?
মেয়েটি একটু হাসলো,
-আমি এসেছি এক বন্ধুর সাথে । তুমি ?
-আমি?
ফারিজ একটু ইতস্তত করলো । তারপর বলল,
-আমি আসলে আমার গার্লফ্রেন্ডের সাথে এসেছি !
মেয়েটি তারপর তন্বীর দিকে ফিরে তাকালো । একটু যেন অবাক হয়েছে । তারপর হাসলো । বলল,
-দ্যাটস গ্রেট । কি নাম তোমার গার্লফ্রেন্ডের ?

ফারিজ তখন তন্বীর দিকে ফিরে তাকালো । তন্বী মুহূর্তের ভেতরে বুঝে গেল ফারিজ নামের ছেলেটা আসলে কি করতে বলছে । তন্বী এখন কি করবে ? এখন ফারিজ ওর হাত ধরে নেই । চাইলেই ও পালিয়ে যেতে পারে । তবে ফারিজ তখন হয়তো আরও রেগে যাবে । এই কথা সত্য যে তন্বী ঠিকই ফারিজের রুমে ঢুকেছিলো । তারপর পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছে । হোটেলের সিসিটিভি ফুটেজে সেটা রয়েছে । সেখানে ঠিকই সব দেখা যাবে । ফারিজ নামের ছেলেটা চাইলে ওকে পুলিশে পর্যন্ত দিতে পারে । এর থেকে একটু সাহায্য করলে যদি এই ঝামেলা থেকে মুক্তি পাওয়া যায় !

তন্বী এবার নিজ থেকেই একটু সামনে এগিয়ে এল । বলল,
-আমার নাম তন্বী । তোমার নাম কি ?
মেয়েটি আবার হাসলো । মেয়েটি দেখতে সত্যিই সুন্দরী । দেখেই বোঝা যায় যে সম্ভ্রান্ত ঘরের মেয়ে । মেয়েটি বলল,
-আমি এলাইনা ! নাইস টু মিট ইউ তন্বী !

এই বলে এলাইনা ওদের সামনে দিয়ে হেঁটে চলে গেল । চোখের আড়ালে যেতেই তন্বী বলল,
-বিশ্বাস করুন আমি কিছু করি নি । ভুল করে কেবল আপনার রুমে ঢুকেছিলাম । আপনার রুমটা লক করা ছিল না । মাথা ঘুরছিলো বলে আমার রুমের বদলে আপনার রুমে ঢুকে পড়েছিলাম !
ফারিজের দিকে তাকিয়ে তন্বীর মনে হল ছেলেটা অন্য কি যেন ভাবছে । এখনও এলাইনার চলে যাওয়া পথের দিকে তাকিয়ে রয়েছে । তারপর তন্বীকে খানিকটা অবাক করে দিয়েই ফারিজ ওর সামনে থেকে চলে গেল । কোন কথা বলল না । তন্বী কিছুই বুঝলো না । তবে ফারিজ নামের ছেলেটা ওকে আর কিছু করছে না এটা বুঝতে পেরে ও খানিকটা হাফ ছেড়ে বাঁচলো । পাশের দরজাটা বন্ধ হয়ে যাওয়া পর্যন্ত তন্বী অপেক্ষা করলো । তারপর এক প্রকার দৌড়েই নিজের রুমের দিকে দৌড় দিল । আর একটু পরে ওকে চেক আউট করতে হবে । এই বড় হোটেলে ও কেন এসেছিলো কে জানে ! আর কেনই বা বারে গিয়ে বিয়ার খাওয়ার চেষ্টা করেছিলো । রাতে হোটেলের সকল গেস্টদের জন্য হোটেল কর্তৃপক্ষ ফ্রি ড্রিংসের ব্যবস্থা করেছিলো । ফ্রির জিনিস কখনই ভাল হয় না । তন্বী কোনদিনই বিয়ার নামের জিনিসটা মুখে নিয়ে দেখে নি । তাই একটু খেয়েই মাথাটা একটু ঘুরছিলো । কাজটা মোটেই ঠিক হয় নি ।

চেক আউটের আগ পর্যন্ত তন্বীর মনের ভেতরে একটা ভয় ঠিকই কাজ করলো । বারবারই মনে হচ্ছিলো এখনই বুঝি ফারিজ নামের ছেলেটা এসে হাজির হবে । তারপর আবারও ওর উপর হামলে পড়বে ! তবে শেষ পর্যন্ত এমন কিছুই হল না । তবে এয়ারপোর্টে গিয়ে আবারও এলাইনা নামের মেয়েটার সাথে দেখা হয়ে গেল । তন্বীকে দেখে সে নিজ থেকেই এগিয়ে এল ।
-হাই ! কি খবর ?
তন্বী খানিকটা অপ্রস্তুত হয়ে গেলেও সামলে নিল । মুখে যথাসম্ভব হাসি নিয়ে বলল,
-এই তো !
-চলে যাচ্ছো নাকি ?
-হ্যা । আসলে আমার একটু কাজ আছে !
-ফারিজ কোথায় ?
-ও আমাকে এই এয়ারপোর্টে ড্রপ করে দিয়ে গেল ।

তন্বীর মনে হল এলাইনা মেয়েটা ওকে কেমন চোখে দেখছে । খুব ভাল করে পর্যবেক্ষণ করছে । তন্বী ঠিক বুঝতে পারছে না যে এলাইনা কেন ওকে এতো ভাল করে লক্ষ্য করছে । আচ্ছা, এই মেয়েটাকে দেখে ফারিজ ছেলেটা অমন করলো কেন ? মেয়েটা আসার আগে ফারিজ কেমন কঠিন চোখে ওর দিকে তাকিয়ে ছিল অথচ মেয়েটাকে দেখার সাথে সাথে এমন করে নরম হয়ে গেল কেন ? ওকে কেনই বা নিজের গার্লফ্রেন্ড বলল ! তন্বী কিছুই বুঝতে পারছে না । তন্বী বলল,
-তুমিও ঢাকায় ফিরবে নাকি ?
-আরে না না ! আমি আমার বন্ধুকে সি-অফ করতে এসেছিলাম । আমাকে আরও কয়েকটা দিন থাকতে হবে !

-হাই লেডিস!

তন্বী আর এলাইনা দুইজনই একসাথে ডান দিকে ফিরে তাকালো । তাকিয়ে দেখলো সেখানে ফারিজ দাঁড়িয়ে আছে । করিডোরের সেই ইতঃস্তত ভাবটা আর ওর ভেতরে নেই । তার বদলে একটা আত্মবিশ্বাসের ভাব ফুটে উঠেছে । তন্বী কিছু বলতে যাবে তার আগেই এলাইনা বলল,
-কি ব্যাপার ! তুমিও চলে যাচ্ছো নাকি ?
ফারিজ একটু হাসলো । তারপর বলল,
-হ্যা । তন্বী চলে যাচ্ছে । একা একা থাকতে ভাল লাগবে না । তুমি তো জানোই প্রকৃতি কখনোই আমাকে টানে নি ।
এলাইনা হাসলো একটু । তবে সেই হাসিতে কেন যেন কোন প্রাণ নেই । ফারিজ আরও একটু এগিয়ে এল । তারপর তন্বীর কোমরে একটু হাত দিয়ে বলল,
-চল বেইবি । যাওয়া যাক !

তন্বী কি বলবে কিছুই বুঝতে পারলো না । একবার ফারিজ আর আরেকবার এলাইনার দিকে তাকালো । ফারিজ বলল,
-এলাইনাকে বাই বল ।
তন্বী রোবটের মত বলল,
-বাই !
-বাই ! হ্যাভ এ গুড জার্নি !
ফারিজ বলল,
-ডোন্ট ওয়ারি । উই উইল !
তন্বী নিজের কোমরে আবারও একটা টান অনুভব করলো । ফারিজ ওকে নিয়ে এয়ারপোর্টের ভেতরে রওয়ানা দিয়েছে । তন্বী এখনও ঠিকমতো কিছুই বুঝতে পারছে না । তবে এইটুকু বুঝতে পারছে যে সামনে ও বড় রকমের একটা ঝামেলাতে পড়তে যাচ্ছে । সব হয়েছে ঐ বিয়ারটুকু খাওয়ার জন্য । যদি লোভ করে ও সেই ফ্রি বিয়ারটুকু না খেত তাহলে এই আজকে ঝামেলাতে পড়তে হত না ।

ম্যাঙ্গাটুনস কমিকসে 'মাই ওয়াইফ ইজ কিউট' নামে একটা কমিকের কয়েকটা চ্যাপ্টার পড়েছিলাম । সেখানে ঘটনাটা আরেকটু অন্য রকম । নায়ক ঢুকে পড়ে নায়িকার রুমে । তারপর নায়কের এক্স গার্লফ্রেন্ড চলে আসে । তার সামনে নায়িকাকে পরিচয় করিয়ে দেয় নিজের গার্লফ্রেন্ড হিসাবে । সেখান থেকে অনুপ্রাণিত হয়েই এই গল্পের শুরুটুকু হল । এরপর কাহিনী নিজের মত করে সাজাবো । দেখা যাক ঘটনা কোনদিকে নেয়া যায় ।




দুই


তন্বীর জীবনটা আর কত খারাপ হতে পারে সেটা তন্বীর ধারণার বাইরে ছিল । বছর শুরু হতে না হতেই একটার পর একটা খারাপ সংবাদ আসতেই থাকলো । প্রথমত ওর তিন বছরের সম্পর্কে থাকা প্রেমিকের সাথে ছাড়াছাড়ি হয়ে গেল । ঠিক ছাড়াছাড়ি হয়ে গেল বলতে তন্বীর সামনে তার প্রতারণার ব্যাপারটা পরিস্কার হয়ে ধরা দিল । অনেক আগে থেকেই আবিদের ব্যাপারে ও নানান মানুষের কাছ থেকে নানারকম কথা শুনে আসছিলো কিন্তু কোনদিন ও এসব কথা বিশ্বাস করে নি । আবিদের উপর ওর বিশ্বাস ছিল অটুট । কিন্তু একদিন নিজের চোখে অন্য মেয়ের সাথে দেখার পর এবং পরেরদিন আবিদকে ওর ফ্ল্যাটে অন্য একটা মেয়ের সাথে হাতেনাতে ধরে ফেলার পর তন্বী আর বিশ্বাস না করে পারে নি । পরে অবশ্য আবিদ অনেকবারই ওর কাছে এসেছিলো ক্ষমা চাইতে কিন্তু তন্বী আর সেইদিকে যায় নি ।

প্রেমে ব্যর্থ হয়ে তন্বী ভেবেছিলো যে কাজকর্মে খুব ভাল করে মন দিবে । দিনরাত খেটে দুইটা প্রজেক্ট তৈরি করলো । কিন্তু পরপর দুইটা প্রজেক্টই ও ফেইল করে বসলো । কোম্পানীর ম্যানেজারের অভিযোগ যে ক্লাইন্ট নাকি ওর কাজ পছন্দ করে নি । চাকরী যায় যায় অবস্থা । চাকরি বাঁচাতে তন্বী ম্যানেজারের কাছে সাহায্য চাইলো । কিন্তু ধারণাও ছিল না যে লোকটা কি প্রস্তাব দিয়ে বসবে । ম্যানেজার তারপর ওকে একটা কু-প্রস্তাব দিয়ে বসলো । কিছু পেতে হলে কিছু দিতে হবে । এমন একটা কথা যে তন্বী শুনবে সেটা ও একদমই ভাবে নি । রেগে গিয়ে বসের গালে একটা চড় বসিয়ে দিল । তারপর চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে বাসায় চলে এল ।

বাসায় যদিও বলল না কিছুই তবে কদিনের মাঝেই সবকিছুই জেনে গেল তারা । তন্বীর বাবা মায়ের মনে হল মেয়ের এই অবস্থা থেকে মুক্তির জন্য সবথেকে ভাল উপায় হচ্ছে মেয়েকে এখন বিয়ে দিয়ে দেওয়া । পুরোদমে ছেলে দেখা শুরু হল । তন্বী আর টিকতে না পেরে বাড়ি ছেড়েই চলে গিয়েছিলো । এদিকে ওদিকে থেকে একদিনের জন্য গিয়েছিলো কক্সবাজারে । সেখানেই কক্সমিরান ফাইভ স্টার হোটেলে উঠেছিলো । রাতে বিয়ার খেয়ে ফারিজের ঘরে ঢুকে পড়েছিলো । নতুন আরেক ঝামেলা শুরু হল ওর জীবনে ।

ওরা দুজন একই প্লেনে ঢাকাতে ফিরে এলেও একসাথে বসে নি । ফারিজ ওর সাথে চেকিং এরিয়া পর্যন্ত ছিল । আরো ভাল করে বলতে, যতসময় পেছন থেকে এলাইনাকে দেখা যাচ্ছিলো ততসময়ই ওরা কাছাকাছি ছিল । একেবারে কোমরে হাত দিয়েই । তারপর যখনই একটা বাঁক ঘুরলো তখনই ফারিজ ওকে ছেড়ে দিল । এমন একটা ভাব করে চলে গেল যেন তন্বীকে সে চেনেই না ।
ফারিজের সিট ছিল ভিআইপি কর্নারে । এটা তন্বী দেখেছিলো । আর ও বসেছিলো সাধারণ সিটে । ফারিজকে দেখে তন্বীর অন্তত এইটুকু মনে হয়েছে যে ছেলেটা প্রচুর বদমেজাজী আর জেদি । নিজের যা ইচ্ছে হয় সেটাই করছে । তন্বী কি মনে করলো তার কিছুই সে কেয়ার করে নি । তন্বী সাহস করে কিছু বলতে পারে নি । কারণ ফারিজ ওকে ইচ্ছে করলে পুলিশে দিয়ে দিতো পারতো তার ঘরে ঢোকার অপরাধে। তাছাড়া ফারিজের পোশাক পরিচ্ছদ দেখে তন্বীর মনে হয়েছে ছেলেটা যথেষ্ট বড়লোকের ছেলে । বড়লোকের বখে যাওয়া ছেলে । ভয় পাওয়ার একটু কারণ তো ছিলই । তন্বী ঠিক মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়েই নিল যে এই ছেলের কাছ থেকে দূরে থাকতে হবে ।

প্লেন থেকে নেমেই যত দ্রুত সম্ভব তন্বী বাইরে চলে এল । সন্ধ্যা নেমেছে অনেক আগেই । বাইরে আবার টিপটিপ বৃষ্টি শুরু হয়েছে । তন্বী কিছুটা সময় এদিকওদিক তাকালো । এই সময়ে এই এয়ারপোর্ট থেকে সিএনজি কিংবা ক্যাব পাওয়া যাবে না । আর পেলেও সেগুলো আকাশছোঁয়া ভাড়া চাইবে । কিন্তু এছাড়া আর কোন উপায় আছে কি ?
উবার নেবে কি? বৃষ্টি না থাকলে পাঠাও করে যাওয়া যেত ।
উবার ভাড়া দেখেও ওর চোখ কপালে উঠলো । সত্যি বলতে কি, ঠিক এই মুহূর্তে ওর কাছে এতো টাকা নেইও । সাথে করে যা টাকা নিয়ে বের হয়েছিলো তার প্রায় সবটুকুই শেষ হয়ে গিয়েছে । সবচেয়ে বেশি খরচ হয়েছে ফাইভ স্টার হোটেলে থাকতে আর প্লেনে করে আসতে গিয়ে । তন্বী অনেকটা নিশ্চিতভাবেই জানে যে এইবার বাসায় গেলে ওকে জোর করে ধরে বিয়ে দিয়ে দেয়া হবে। কোনভাবেই আর আটকাতে পারবে না । তাই ভেবেছিলো বিয়ের আগে স্বাধীনভাবে নিজের মত করে কটাদিন ও ঘুরে বেড়াবে । কিন্তু সেটাও আর হল কোথায়!

তন্বী কি করবে ঠিক বুঝতে পারছিলো না । তবে এখানে বেশি সময় অপেক্ষা করা যাবে না । বাসায় যেতে হবে । রাত বেশি হলে বাসায় গেলে আবার মায়ের বকাঝকা শুনতে হবে । কি করবে ভাবতে পারছিলো না। উবার ডাক দিতে যাবে তার আগেই ওর ঠিক সামনে একটা কালো রংয়ের মার্সিটিজ বেঞ্জ এসে দাঁড়ালো । গাড়িটা থেমে যাওয়ায় একটু কেঁপে উঠলো যেন । পেছন থেকে আবার সেই পরিচিত শব্দটা শুনতে পেল ।
-গাড়িতে ওঠ । তোমাকে পৌঁছে দেই ।

তন্বী পেছন ফিরে তাকালো । দেখতে পেল ফারিজ দাঁড়িয়ে । কখন যে পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে ও টেরই পায় নি । দ্রুত বলল,
-না দরকার নেই। আমি যেতে পারবো ।
ফারিজ একটু বিরক্ত কন্ঠে বলল,
-এতো ঢং করতে হবে না ।
এরই মাঝে গাড়ি থকে ড্রাইভার নেমে এসেছে । পেছনের দরজাটা মেলে ধরেছে। ফারিজ এরপর তন্বী কথার কোন তোয়াক্কা না করে ওর কোমরে আবার হাত দিয়ে খুব স্বাভাবিকভাবে ওকে গাড়ির ভেতরে ঢুকিয়ে দিল । ফারিজ কোমরে হাত দেওয়ার সাথে সাথেই যেন তন্বীর খানিকটা ইলেক্ট্রিক শক খাওয়ার মত অবস্থা হল । কিছু যেন বলতে গিয়েও বলতে পারলো না । এমন কেন হল ? এয়ারপোর্টেও ঠিক এমনটা হয়েছিলো । ওর পুরো শরীরটা যেন কেঁপে উঠেছিল কেবল একটা স্পর্শে ।
তন্বীর আগের প্রেমিক আবিদের সাথে ওর বেশ লম্বা সময়ের জন্য সম্পর্ক ছিল । সেই সময়ে আবিদ ওর হাত ধরেছে অনেকবার । বেশ কিছুবার ওকে চুমুও খেয়েছে । কিন্তু তন্বী এর বেশি কিছুতে আবিদকে এগোতে দেয় নি । এটা নিয়ে আবিদের অভিযোগ থাকলেও সেটা খুব বেশি গা করে নি ও । তন্বীর বান্ধবীদের ধারণা যে তন্বী যদি একটু আধটু আবিদের আবদার রক্ষা করতো তাহলে আবিদ ওর সাথে এমন কিছু করতো না কখনই । তন্বীর এতে আপত্তি ছিল । ওর শরীর ওর কাছে খুব সেনসেটিভ একটা ব্যাপার । ভীড়ের মাঝে ও একদমই চলাচল করে না । এমন কি বাসেও উঠতে চায় না । একটু বেশি খরচ হলেও রিক্সা, সিএনজি কিংবা উবার ব্যবহার করে । কেউ ওর শরীরে হাত দিবে কিংবা ওর শরীরের সাথে কারো শরীরের স্পর্শ লাগবে এটা ও ভাবতেই পারেনা । আর এই বদমাইশ কিনা কত সহজেই কোমরে হাত দিয়ে ফেলছে । কিন্তু ও কিছু বলতে পারছে না কেন ? সেই ফ্রি বিয়ারের ইফেক্ট কি এখনও যায় নি নাকি ! তন্বী আরও একবার নিজেকে বকাঝকা করলো । কেন ও ফ্রি বিয়ার খেতে গিয়েছিলো ! যদি না খেতে যেত তাহলে এসব কিছুই হত না !
তবে গাড়ির ভেতরের দরজাটা বন্ধ হতেই বাইরের চিৎকার চেঁচামিচি আর বৈরি আবহাওয়া একেবারে গায়েব হয়ে গেল । সবকিছু যেন একদম শান্ত হয়ে এল । কখন যে গাড়িটা চলতে শুরু করলো সেটাও তন্বী বুঝতে পারলো না । তন্বীর রাগটাও একটু শান্ত হয়ে এল । মনে মনে বলল যে যাক, বাড়ি পর্যন্ত যাওয়া যাচ্ছে । চুপচাপ যাওয়া যাক । অন্যকিছু এখন না ভাবাই ভাল । আর ভেবে খুব একটা লাভও নেই । এই ফারিজ নামের ছেলেটার ভেতরে কিছু একটা আছে যেটা ও ঠিক বুঝতে পারছে না ।

-তোমার বাসা কোথায় ?
তন্বী বাইরের দিকে তাকিয়ে বৃষ্টি দেখছিলো । ফারিজের কথা শুনে ফিরে তাকালো । বলল,
-ধানমন্ডি ! এগারো নম্বর !
-আমার বাসাও ঐদিকে । দুই নম্বরে ।
তারপর ড্রাইভারের দিকে তাকিয়ে বলল,
-মনজুর গাড়ি আগে এগারো নম্বরের দিকে নিয়ে যাও !
ড্রাইভার মৃদু মাথা ঝাঁকিয়ে সম্মতি দিল । ফারিজ আবারও তন্বীর দিকে তাকিয়ে বলল,
-কি কর তুমি ? এখনও পড়ছো নাকি চাকরিবাকরি কিছু কর ?
-করতাম । এখন আর করি না !
-কেন, এখন করো না কেন ? বিয়ে করবে এইজন্য ! শ্বশুরবাড়ির লোকজন চাকরি পছন্দ করে না?
তন্বীর মনের মাঝে একটা বিরক্তি দেখা দিল । তবে সেটা আমলে নিল না । সেটা দাবিয়ে রেখে বলল,
-জি না, বিয়ে করবো না । বিয়ে না করতেই আমি বাড়ি থেকে পালিয়েছিলাম !
-আচ্ছা । তো আবার ফিরে যাচ্ছো কেন ?
-কারণ টাকাপয়সা শেষ । এইজন্য ! আর চাকরি আমি না ছাড়লে এমনিতেও চলে যেত ।
ফারিজ একটু কৌতূহল নিয়ে তন্বীর দিকে তাকালো । ওর চোখে স্পষ্ট প্রশ্ন দেখা দিয়েছে । তন্বী বলল,
-অফিসের ম্যানেজার আমাকে খারাপ প্রস্তাব দিয়েছিলো । আমি তাকে কষে একটা চড় মেরেছিলাম !
-রিয়েলি ?
-হ্যা । ওখানে থাকলে যদি চাকরি নাও যেত তাহলে ম্যানেজার আমার জীবন অতিষ্ঠ করে দিতো । এইজন্য চাকরি ছেড়ে দিয়েছি । এখন নতুন চাকরি খুঁজছি !
-কোথায় চাকরি করতে ?
-ফিজ সোশ্যাল লিমিটেড ! মার্কেটিং ডিপার্টমেন্টে !

ফারিজ আর কিছু জানতে চাইলো না । চুপ করে কি যেন ভাবতে লাগলো । তন্বী আবারও বাইরের দিকে তাকালো । বাইরে তুমুল বৃষ্টি শুরু হয়েছে । এই সময়ে ঢাকা শহরে খুব জ্যাম বাঁধে । তবে আজকে ওদের গাড়িটা খুব দ্রুতই এগিয়ে চলছে । আশেপাশে যেন গাড়িঘোড়া একদমই নেই । তন্বী এর আগে কোনদিন মার্সিটিজে ওঠে নিয়ে । গাড়িটার চারিদিকে তাকিয়ে দেখতে লাগলো । সিটের সামনে একটা ছোট টিভি দেখা যাচ্ছে । পাওয়ার অন সুইটটা রয়েছে সামনেই । তন্বীর কি মনে হল, সেটাতে চাপ দিল । সাথে সাথেই টিভি চালু হয়ে গেল । একটা নিউজ চ্যানেল । তন্বী একের পর এক চ্যানেল বদলাতে শুরু করলো । দেখতে দেখতে গান বাংলাতে এসে হাজির । "এই বৃষ্টি ভেজা রাতে তুমি নেই বলে" গান চলছে । তন্বীর কি মনে হল গানটা আরও একটু জোরে দিয়ে দিল । পাশে তাকিয়ে দেখলো ফারিজ ওর দিকে খানিকটা অবাক চোখে তাকিয়ে আছে । তন্বীর আচরণে হাসবে নাকি কাঁদবে সেটা বোঝার চেষ্টা করছে । অবশ্য তন্বী সেদিকে খুব একটা মনোযোগ দিল না । গানটা শুনতে শুরু করলো ।



তিন



তন্বী জীবনেও ভাবতে পারে নি যে একটা ফ্রি বিয়ার খাওয়ার পরবর্তী প্রভাব এইরকম হতে পারে ! জীবনে সম্ভবত এই প্রথম কেউ বিয়ার খাওয়ার কারণে এতো ভাল একটা ফল পেল ! তন্বীর আসলে এখন কি করা উচিৎ সেটা ও কিছুতেই বুঝতে পারছে না । তবে ম্যানেজারের সিটে বসে থাকতে ওর খুব একটা খারাপ লাগছে না । ঠিক সকাল এগারোটার সময়ে এসে এই সিটে বসেছে ও । ঘন্টাখানেস সময় পার হয়ে গিয়েছে । একে একে অফিসের অনেকেই এসে ওকে অভিনন্দন জানিয়েছে । সবার চোখেই একটা বিস্ময় ছিল, আর ছিল ঈর্ষা । তন্বীর বেশ মজাই লাগছে ! সেই সাথে এখনও ঠিক বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে যে এই অসম্ভব কাজটা হয়েছে ! চাকরিটা ছাড়ার সময় ও ভাবতেই পারে নি যে আবারও এই অফিসে এসে কাজ করতে পারবে । ও কেবল অফিসেই ফিরে আসে নি, আগের থেকেও আরও ভাল একটা পজিশন নিয়ে ফিরে এসেছে ।

তন্বী কক্সবাজার থেকে ঢাকাতে ফিরে এসেছে প্রায় এক সপ্তাহ পার হয়ে গেছে । এই কদিন বাসায় থেকে তন্বী উপরে যে কি চাপ গেছে সেটা কেবল তন্বীই জানে । ওর মা কেবল ওর গায়ে হাত তোলাই বাকি রেখেছে । তারা ঘোষণা দিয়েই দিয়েছে যে কোনভাবেই আর এই মেয়েকে ঘরে রাখা যাবে না । বাড়ি থেকে চলে যাওয়ার পুরোটুকু সময়ই তন্বী নিজের ফোন অফ করে রেখেছিলো । তাই তারা কোনরকম খোঁজখবর নিতে পারে নি । এই কটাদিন তারা খুবই ভয়ে ভয়ে ছিল । তাই তারা এবার খুব রেগে গিয়েছে । তন্বী নিজেও জানতো যে এমন কিছুই হবে । তাই মনে মনে ও খানিকটা প্রস্তুতি নিয়েই নিয়েছিলো । এতোদিন চাকরি ছিল বলেই একটা জোর ছিল বুকে । কিন্তু এখন আবার নতুন একটা চাকরি জোগাড় করা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে । সেটা আদৌও হবে কিনা সেই ব্যাপারে তন্বীর সন্দেহ ছিল । তাই আর কোন কথা না বলে মা বাবার কথামত বিয়ের পিঁড়িতে বসতে ওর কোন আপত্তি ছিল না । বলেছিলো ছেলে দেখতে ।

এই কটা দিন তন্বী মন খারাপ করেই বাসায় বসেছিল । কিছুই যেন করার নেই ওর । আজকে সকালটাও শুরু হয়েছিলো অন্য দিনগুলোর মতই । সকাল ঠিক নয়টার দিকে ওর বাসার কলিংবেলটা বেজে ওঠে । ও তখন সবে নাস্তা খেতে বসবে । বাবা মা বসে রয়েছে টেবিলে । তাই নিজেই উঠে গেল দরজা খুলতে । দরজা খুলেই দেখতে পেল একজন কুরিয়ারম্যান এসেছে । ওর নামেই একটা চিঠি এসেছে । খামটা হাতে নিয়ে আবারও খাবার টেবিলে বসলো ও। খেতে খেতে খামটা খুলেই ওর চোখ কপালে উঠলো ।

তন্বীর মা ওর দিকে তাকিয়ে বলল,
-কি হয়েছে ? কিসের চিঠি ?
তন্বী একবার মায়ের দিকে, আরেকবার হাতের চিঠিটার দিকে তাকালো । কিছু বলার আগেই ওর ফোনটা বেজে উঠলো । নম্বরটা দেখে তন্বী আরেকবার চমকে উঠলো । ফিজ সোশ্যাল লিমিটেডে ও চাকরি করছে প্রায় দুই বছর । এই দুই বছর ধরেই এই নম্বরটা ওর মোবাইলে সেভ করা রয়েছে । কিন্তু কোনদিন এই নম্বরটা থেকে ফোন আসে নি । আর আজকে এই সকালবেলাই ফোন ! ফোনটা হাতে নিয়ে ও টেবিল থেকে উঠে একটু দূরে চলে গেল।
-হ্যালো স্যার ! গুড মর্নিং !
-গুড মর্নিং মাই ডিয়ার ! কেমন আছো তুমি ?
-জি স্যার ভাল আছ.
-লেটার পেয়েছো নিশ্চয়ই?
-জি স্যার।
-তাহলে আজ থেকেই জয়েন করে ফেল । ঠিক আছে ? আমি চাই না আমার কোম্পানীতে নাজিমউদ্দিনের মত কোন লোক থাকুক ।
-থেঙ্কিউ স্যার ।
-ডোন্ট থ্যাঙ্ক মি । মন দিয়ে কাজ কর তাহলেই হবে ! আর ফারিজকে আমার হ্যালো বল ।
-জি আচ্ছা !

ফোন কেটে গেল।
ফারিজ !
ফারিজ !

ওর এই চাকরীটা ফেরৎ পাওয়ার পেছনে যে ফারিজের হাত রয়েছে সেই বিষয়ে ওর কোন সন্দেহ রইলো না । এই ছেলেটা ওর জীবনে আর কি কি নিয়ে আসবে কে জানে ! তবে আপাতত ভাল কিছু যে নিয়ে এসেছে এটাই সব থেকে বড় কথা ।

ফোনটা কেটে যাওয়ার পরে তন্বী খুব জোরে একটা চিৎকার দিল । ওর মা ওর দিকে তাকিয়ে বলল,
-কি হয়েছে?
তন্বী কোন কথা না বলে কেবল কাগজটা মায়ের দিকে বাড়িয়ে দিল । তারপর দ্রুত নাস্তা খেতে শুরু করলো । এখনই গোসল করে রেডি হতে হবে । আজকে বেটা নাজিমউদ্দিনকে বোঝাবে মজা !

অফিসে পৌঁছালো ঠিক এগারোটার সময়ে । ম্যানেজার নাজিমউদ্দিনের কেবিনে ঢুকতেই তন্বীর মুখটা কেমন শক্ত হয়ে গেল । তখন তার সামনে অফিসের আরও একটা মেয়ে বসে ছিল । মেয়েটাকে সে ভাল করেই চেনে । ম্যানেজারের পেছন পেছন লেগে থাকে সবসময় ! ওকে দেখেই নাজিমউদ্দিন বলল,
-কি ব্যাপার তুমি এখানে ? আর অনুমতি না নিয়ে কেবিনে ঢুকলে কিভাবে ?

তন্বী একটু কৌতুকের হাসি হেসে বলল,
-নিজের কেবিনে ঢুকতে আবার অনুমতি !
-মানে ?
-মানে আপনি এখনো জানেন না ?

এই বলে তন্বী খামটা তার সামনে এগিয়ে দিল । নাজিমউদ্দিন বলল,
-কি এটা ?
-পড়েই দেখুন ।
নাজিমউদ্দিন সেটা হাতে নিয়ে খুলল । কয়েক লাইন পড়েই তার চোখ কলাপে উঠলো । তীব্র বিস্ময় নিয়ে একবার লেটারটার দিকে আরেকবার তন্বীর দিকে তাকাতে লাগলো । তন্বীর ব্যাপারটা মজাই লাগলো । তারপর বলল,
-আপনার মেইলে তো মেইল চলে আসার কথা । একবার চেক করে দেখুন তো !

নাজিমউদ্দিন এই এসি রুমের ভেতরেও ঘামতে শুরু করলো । তারপর নিজের ইমেল চেক করে দেখে আরও একটু ঘাবড়ে গেলো । পকেট থেকে ফোন বের করে একটা নাম্বারে ফোন দিল সে ।
-জি স্যার । স্লামুআলাইকুম স্যার !
কিছু সময় নিরবতা ।
-এটা কি শুনছি স্যার ?
আবারও কিছু সময় নিরবতা ।
-কিন্তু স্যার ..... আমি ..... স্যার স্যার প্লিজ .....

ওপাশ থেকে ফোন কেটে গিয়েছে সেটা বুঝতে কষ্ট হল না । তন্বীর দিকে প্রথমে সে যে দৃষ্টিতে তাকিয়েছিলো সেটা এখন পুরোপুরি বদলে গিয়েছে ।
-তোমাকে আমি দেখে নিবো !
-হা হা হা ! অবশ্যই দেখে নিবেন ! একবার চড় খেয়ে চাকরি চলে গেল আবার ভাবুন পরে দেখলে কি কি হতে পারে ! এখন নিজের জিনিসপত্র নিয়ে বিদায় হোউন এখনই । যাওয়ার আগে সব হিসাবপত্র আপনার সেক্রেটারি... সরি আমার সেক্রেটারিকে বুঝিয়ে দিয়ে যাবেন !

সামনে বসা মেয়েটি কেবল অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিল তন্বীর দিকে । ঠিক যেন বিশ্বাস করতে পারছিলো না যে কি হচ্ছে ! পুরো অফিসে খবর পৌঁছাতে খুব বেশি সময় লাগলো না । একের পর এক কর্মী আসতে লাগলো ওর ক্যাবিনে । ওকে অভিনন্দন জানাতে লাগলো।

পুরো দিনটা আজকে আনন্দেই কাটলো ওর । ফারিজের কথা প্রায় ভুলেই গিয়েছিলো, এমন সময়ে একটা অপরিচিত নম্বর থেকে ফোন এসে হাজির ।
ফোনটা ধরতেই ওপাশ থেকে কেউ বলে উঠলো,
-নতুন অফিস কেমন লাগছে ?
কন্ঠস্বরটা চিনতে তন্বীর মোটেই কষ্ট হল না । তন্বী বলল,
-অফিস মোটেও নতুন না ।
-কিন্তু পোস্ট তো নতুন ।
-তা নতুন । আমি জানি এটার পেছনে আপনার হাত আছে ! এমন একটা সুযোগ আমার খুব বেশি দরকার ছিল । থেঙ্কিউ !
ফারিজ কিছু সময় চুপ করে রইলো । তারপর বলল,
-আমাকে ধন্যবাদ দেওয়ার কোন দরকার নেই । আমি নিজের দরকারে তোমাকে সাহায্য করেছি ।
-মানে ?
-মানে বুঝতে পারবে । অফিস থেকে বের হয়েই দেখবে তোমার জন্য আমার গাড়ি অপেক্ষা করছে ।
-কোথায় যেতে হবে আমাকে ?
-আমার বাসায় ! সেখান থেকে আমরা একটা পার্টিতে যাবো !

তন্বী দেখলো ফারিজ ওকে অনুরোধ করছে না । কেবল বলে দিচ্ছে ওকে কি করতে হবে । তন্বীর মনে হল একবার বলে দেই যে আমি কেন শুনবো আর কেনই বা যাবো কিন্তু সেটা বলতে পারলো না । কেন জানি সেই কথাটা বলার মত শক্তি ও অর্জন করতে পালরো না । ফারিজ আর কিছু না বলে ফোনটা রেখে দিয়েছে ততক্ষণে । এতো সময় ধরে যে আনন্দ ও অনুভব করছিলো সেটা উবে গেল । সবকিছুরই একটা মূল্য আছে ! ফারিজ ওকে দিয়ে এখন কি করাতে চাচ্ছে ?

অফিস থেকে বের হয়ে ফারিজের গাড়িটা দেখতে পেল তন্বী । সেদিনের সেই ড্রাইভারটাই গাড়ির ঠিক সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে । তন্বী সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই সে ওর দিকে তাকিয়ে একটু হাসলো । তারপর মাথাটা কাত করে সম্ভাষণ জানালো । তন্বী কি করবে ঠিক বুঝতে পারলো না । বিপরীতে ওর হাসা দরকার । সেটাই করলো । মাথাটা একটু কাত করে তন্বীও হাসলো । ড্রাইভার দরজা খুলে দিলো সেদিনের মত করেই ।

তন্বী গাড়িতে ওঠার আগে একবার কি মনে করে পেছনে ফিরে তাকালো । অফিস ছুটির সময় এখন । অনেকেই অফিসের সিঁড়ির উপরে এসে দাঁড়িয়েছে । ওর দিকে খানিকটা অবাক চোখেই তাকিয়ে রয়েছে । তাদের চোখে খানিকটা বিস্ময় দেখা যাচ্ছে । তন্বী আর কিছু ভাবলো না । গাড়িতে উঠে পড়লো । মনের ভেতরে এখন একটা ভয় কাজ করছে ওর । ফারিজ ওকে কোথায় যেতে বলছে আর কেন ? কি এমন দরকার আছে ওর !

গাড়িটা আরও ঘন্টাখানেক চলার পরে একটা সুদৃশ্য ডুপ্লেক্স বাড়ির সামনে এসে থামলো । বাড়িটা ঠিক শহরের ভেতরে নয় । বেড়িবাঁধের দিকে । সন্ধ্যা হয়ে গেছে । তবে আলো এখনো নিভে যায় নি । বাড়িটার দিকে তন্বী কিছু সময় মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে রইলো । কোন সন্দেহ নেই যে ফারিজ সত্যিই অনেক ধনাঢ্য পরিবারের ছেলে । এই কারণেই ওর ভয় একটু বেশি লাগলো । কারণ যার যত টাকা আছে সে তত বেশি বেপরোয়া হতে পারে ।
বাড়ির ভেতরে ঢুকতেই ও ড্রয়িং রুমে ফারিজকে দেখতে পেল । আজকে ফারিজকে দেখে তন্বী একটু চমকালো । গতদিন হোটেল আর এয়ারপোর্টে যখন ফারিজকে দেখেছিলো সেই সময়ে সে ক্যাজুয়াল পোশাক পরেছিলো । তখনও তাকে দেখতে সুদর্শন মনে হচ্ছিলো । কিন্তু আজকে ফারিজকে দেখে তন্বীর বুকের মাঝে একটা হার্টবিট মিস হয়ে গেল । কালো স্যুট পরে আছে সে । গলায় কালো টাই । পায়ে পলিশ করা জুতা । চুলগুলো মাঝারি আকারে ছাটা । একটু যেন বেশি ঘন লাগছে আজকে !
তন্বী মনে মনে কেবল একটা কথাই বলল যে এই ছেলে এতো সুদর্শন কেন !
ও সামনে এসে দাঁড়াতেই ফারিজ বলল,
-অফিস ঠিক ছিল ?
-হ্যা হ্যা ঠিক ছিল অনেক ! ধন্যবাদ !
-এখানে বস ।
এই বলে পাশের সোফার দিকে ইঙ্গিত করলো । তন্বী বিনা বাক্যব্যয়ে সেখানে বসলো । ফারিজ বলল,
-এবার কাজের কথায় আসা যাক ।
-বলুন । আমি আসলে ....
-বেশি কিছু বুঝতে হবে না । ঠিক আছে । আমি যা বলবো কেবল সেটা মেনে চললেই হবে । আজকে আমার দাদু আর দিম্মার বিবাহ বার্ষিকী । আমরা একটু পরে সেখানে যাবো !
-আমি ?
-ইয়েস । তুমি ! আমার সাথে । আমার গার্লফ্রেন্ড হয়ে !
-গার্লফ্রেন্ড !

তন্বী কি বলবে খুঁজে পেল না ! চোখ বড় বড় করে ফারিজের দিকে তাকিয়ে রইলো । এই ছেলে কি বলছে আর কেনই বা বলছে ?
সেদিনের সেই মেয়েটার সামনে ওকে গার্লফ্রেন্ড হিসাবে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলো সেটা ঠিক ছিল । তন্বী ভেবেছিলো সেটা বুঝি সেখানেই শেষ । কিন্তু এখন পরিবারের সামনে !
ও মাই গড ! কি বলছে এই ছেলে ।

তন্বীকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে ফারিজ উঠে দাঁড়ালো । তারপর গলা উঁচু করে ডাক দিল,
-রেহেনা !

তন্বী দেখতে পেল ওর বয়সীই একটা মেয়ে বের হয়ে এল পাশের ঘর থেকে ।
-জি স্যার !
-ম্যাডামকে তৈরি কর । আমি একটু কাজ সেরে আসছি !

আর কাউকে কিছু বলার যুযোগ না দিয়েই ফারিজ বের হয়ে গেল রুম থেকে । একটু পরে গাড়ির আওয়াজ শোনা গেল । গাড়িটা কম্পাউন্ড থেকে বের হয়ে যাচ্ছে ।



চার


আয়নায় নিজেকে দেখে তন্বী খানিকটা সময় কেবল অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো। নিজেকে ও সুন্দরী মনে করে । কিন্তু এমন সুন্দরীও মনে করে না যে যাকে দেখে ছেলেরা একেবারে পাগল হয়ে যাবে । কিন্তু এখন নিজেকে আয়নাতে দেখে ও সত্যিই অবাক হয়ে গেছে । রেহেনা নামের মেয়েটি একজন বিউটিশিয়ান । তার সাথে আরও একজন এসিস্ট্যান্ট রয়েছে । এই দুইজন মিলে গত দুই ঘন্টা ধরে ওকে সাজিয়েছে । ফারিজ ওর জন্য তিন সেট পোশাক আনিয়ে রেখেছিলো । তিনটাই ট্রায়াল দেওয়া হয়েছে । তারপর তার ভেতর থেকে একটা নির্বাচন করা হয়েছে । রংটা যে কেমন সেটা তন্বী পরিস্কারভাবে বুঝতে পারছে না । কদিন আগে ফ্রোজেন নামের একটা এনিমেশন মুভি দেখেছিলো ও । সেখানকার এলসা যে ড্রেসটা পরেছিল অনেকটা সেরকমই । তবে এই ড্রেসে নীলের একটা কাজ রয়েছে বেশ । এমন চমৎকার ড্রেস আগে বাস্তবে দেখেছে কি না তন্বীর মনে পরছে না । পরার কথাটা তো দূরেই থাকলো !
শেষ আরেকবার রেহেনা ওকে দেখলো । মনে মনে সন্তুষ্ট হয়ে বলল,
-ম্যাডাম, আপনি রেডি ! আপনার কি আর কিছু লাগবে ?
তন্বী কোন কথা বলল না । আয়নাতে নিজেকে আরও ভাল দেখতে লাগলো । কয়েকটা ছবি তুলে রাখতে হবে । অন্তত নিজের ফেসবুকে তো দেওয়া যাবে ।

ফারিজ ঘরে ঢুকলো একটু পরে । ঘরে ঢুকতেই তন্বীর দিকে তাকিয়ে কিছুটা সময়ের জন্য থেমে গেল । তন্বীর মতই ফারিজ নিজেও খানিকটা অবাক হয়েছে ওকে দেখে । সত্যিই তন্বীকে অন্যরকম লাগছে । রেহেনা বলল,
-স্যার আমাদের কাজ শেষ ।
ফারিজ বলল,
-আচ্ছা ।

দুইজনই রুম থেকে বের হয়ে গেল । ফারিজ আরও কিছুটা সময় তাকিয়ে রইলো তন্বীর দিকে । তারপর আস্তে আস্তে এগিয়ে এল । ঠিক ওর সামনে দাঁড়ালো । এরপর ওকে ধরে আয়নার দিকে ঘুরিয়ে দিল । ফারিজ দাঁড়ালো ওর পেছনে । ফারিজ লম্বায় অন্তত ছয় ফুটের কাছাকাছি হবে । সাধারণ বাঙালী মেয়ে হিসাবে তন্বীর উচ্চতাও একটু বেশি । পাঁচ ফুট ছয় । ফারিজের পাশে ওকে আসলেই চমৎকার মানিয়েছে । তন্বী আয়নার দিকে কিছু সময় তাকিয়ে রইলো । মনের ভেতরে একটা অদ্ভুত চিন্তা কাজ করছে । কি থেকে কি হয়ে গেল বুঝতে পারছে না । মন থেকে চিন্তাটা দূর করে দেওয়ার চেষ্টা করলো ।

তারপরই অনুভব করলো ফারিজ ওর একদম কাছে চলে এসেছে । ওর পুরো শরীরটা যেন কেঁপে উঠল । ছেলেটা কি করতে যাচ্ছে ?
ও জানে না । ওর পুরো শরীর যেন অবশ হয়ে এল । এমন কেন হচ্ছে সেটা তন্বী বুঝতে পারছে না । ফারিজের সামনে এমন শক্তিহীন কেন মনে হচ্ছে নিজেকে !
তারপর অনুভব করলো ফারিজ ওর গলাতে কিছু একটা পরিয়ে দিল । তন্বীর চোখ বন্ধ হয়ে গিয়েছিলো । চোখ খুলে দেখতে পেল গলায় একটা চমৎকার নেকলেস ! দেখেই মনে হচ্ছে জিনিসটা খুব দামী ! তন্বী বলল,
-এটা ?
-তোমার গলা খালি ছিল । ভাল দেখাচ্ছিলো না !
তন্বী নিজের গলার নেকলেসটা হাত দিয়ে একটু ছুঁয়ে দেখলো । সত্যিই জিনিসটা যে খুব বেশি দামী সেটা বুঝতে ওর কষ্ট হল না ।

ফারিজ বলল,
-চল তাহলে যাওয়া যাক !
তন্বী মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো কেবল ।
গাড়িতে যেতে যেতে ফারিজ ওকে নানা বিষয় শিখিয়ে দিতে শুরু করলো । বিশেষ করে ওদের কবে দেখা হয়েছে । কতদিনের পরিচয় ! আজকে গাড়িটা ফারিজ নিজে চালাচ্ছে । পাশের সিটে তন্বী বসে তাকিয়ে রয়েছে সামনের দিকে।

গাড়িটা এসে থামলো ধানমন্ডি দুই এর একটা বাড়ির গেটের সামনে । এই বাড়িটা দুই তলা । তন্বী বাড়িটা আগেও দেখেছে । নিউমার্কেটে যাওয়ার সময় প্রায়ই বাড়িটার দিকে চোখ পড়তো ওর । মনে মনে ভাবতো এমন একটা স্থানে দুইতলা বাড়িটা কার ? এখানকার প্রায় প্রতিটি বাড়িই এপার্টমেন্ট বিল্ডিং । এক ইঞ্চি জায়গায়ও যেখানে সবাই বহুতল ভবন বানিয়ে ফেলছে সেখানে এরা দুইতলা বিশাল বাড়ি বানিয়েছে । সামনে ফুলের বাগান, গাছগাছালিতে ভর্তি । বুঝতে কষ্ট হয় না যে এদের আসলে টাকা পয়সার কোন অভাব নেই ।

একটু পরেই গেটটা খুলে গেল । বাড়ির সামনে বেশ বড় একটা লন । কয়েকটা গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে সেখানে । গেস্টদের গাড়ি । ফারিজ নিজেই গাড়ি থেকে নেমে তন্বীকে নামতে সাহায্য করলো । ওর হাত ধরলো খুব স্বাভাবিকভাবে । তারপর ধীরে ধীরে মূল বাড়িটার দিকে হাঁটতে শুরু করলো । তন্বী যতই বাড়ির দিকে যেতে শুরু করলো ততই ওর মনে একটা ভয়ের অনুভূতি দানা বাঁধতে শুরু করলো ।

দরজাটা খানিকটা খোলাই বলা চলে । ভেতর থেকে আওয়াজ ভেসে আসছে । মানুষজন কথা বলছে, হাসাহাসি করছে । মৃদু গান বাজার আওয়াজ হচ্ছে । তন্বীর সত্যিই মনে হল যেন ও নিজের বয়ফ্রেন্ডের পরিবারের সাথে দেখা করতে যাচ্ছে ।

দরজার ঠিক পরেই ছোট একটা রুম । এই রুমটা প্রায় ফাঁকা বলতে গেলে । কয়েকটা চেয়ার আর সোফা রয়েছে । এই ঘরটা পার হতেই বড় একটা ড্রয়িং রুম । সেখানেই অনুষ্ঠানটা হচ্ছে । সব মানুষজন সেখানে রয়েছে । তন্বী দেখলো ওরা ঘরে ঢুকতেই সবার চোখ ওদের দিকে ঘুরে গেল । বিশেষ করে তন্বীর দিকে । কারো চোখে খানিকটা বিস্ময় আবার কারো চোখে খানিকটা কৌতূহল । তন্বীর গালটা আরও একটু লাল হয়ে গেল । একটু যেন লজ্জা পাচ্ছে । এরকম পার্টিতে ও এর আগে আসে নি । এমনি বন্ধুদের জন্মদিন, বিয়ে কিংবা তাদের কারো আত্মীয়ের বিবাহবার্ষিকীতে গিয়েছে ঠিকই তবে সেসব একরকম ছিল । এই পার্টিটা একেবারেই অন্যরকম । অন্তত ওর পরিচিত নয় । তাই অস্বস্তিটা লাগছে ।
ফারিজ ওর হাতটা তখনও ধরেই আছে । ফারিজ জানে সবাই তার দিকেই তাকিয়ে আছে । তবে সেটা নিয়ে সে খুব একটা চিন্তিত না ।
তন্বীর বুঝতে কষ্ট হল না যে ফারিজ এরকম আচরণ পেয়ে অভ্যস্ত। তবে তন্বী মোটেই এমন আচরণ পেয়ে অভ্যস্ত না । ওর অস্বস্তিটা যাচ্ছে না মোটেও । বিশেষ করে সবার সামনে ফারিজ ওর হাত এভাবে ধরে আছে এই ব্যাপারটা ওর একটু অস্বস্তি লাগছে । হঠাৎ তন্বী নিজের হাতে একটু টান অনুভব করলো । ফারিজ ওকে নিয়ে কোনদিকে যাচ্ছে । তন্বী হাঁটতে লাগলো আস্তে আস্তে । একটু পরেই দেখতে পেল তাদের । কাউকে বলে দিতে হল না যে এরাই ফারিজের দাদু আর দিম্মা । ওদের দিকে তাকিয়ে আছে হাসিমুখে । ফারিজ কাছে গিয়ে তার দাদুকে জড়িয়ে ধরলো । তারপর দিম্মাকেও । বলল,
-হ্যাপি এনিভার্সারি!

তন্বী কি বলবে খুঁজে পেল না । চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল । একসময় ফারিজ তন্বীকে দেখিয়ে বলল,
-দিম্মা এই যে, যার কথা বলেছিলাম !

তন্বী দেখতে পেল বৃদ্ধা খুব মিষ্টি করে হেসে ওর কাছে এল । তন্বী কি করবে ঠিক বুঝতে পারলোনা । এই সময়ে আসলে ওর কি করা উচিৎ ! প্রেমিকের পরিবারের সাথে দেখা করতে গেলে মেয়েদের কী করা উচিৎ ?
তন্বী কিছু বুঝতে পারলো না । ওর মনে হল যে এখন বৃদ্ধাকে সম্মান জানানো দরকার । ও যখন ঈদে গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে যায় দাদুকে প্রতিবারই সালাম করে । ফারিজের দিম্মার বেলাতেও ঠিক একই কাজটা করতে গেল । একটু নিচু হয়ে সালাম করতে যাওয়ার আগেই দিম্মা ওকে ধরে ফেললেন । তারপর বললেন,
-আরে বোকা মেয়ে করে কি ! তুমি আমার বুকে এসো ।
এই বলেই তিনি তন্বীকে জড়িয়ে ধরলেন । তন্বী ভীষণ লজ্জা পেল । তবে যখন দিম্মা ওকে ছেড়ে দিল তখন কেন যেন ভাল লাগলো । দিম্মা তখন ফারিজের দিকে তাকিয়ে বললেন,
-বাহ আমার নাতি তো দেখি খুব ভদ্র মেয়ে খুঁজে এনেছে । তোর মত বেয়াদবের কপালে এই মেয়ে কিভাবে জুটলো শুনি ?
ফারিজ হাসলো একটু কেবল !
দিম্মা আবারও বললেন,
-আগেরটা তো ছিল তোর মতই আদব-কায়দাবিহিন !

'আগেরটা' - এই কথাটা কানে আসতেই যেন তন্বীর চোখ পড়লো এলাইনার উপরে । ঠিক ওদের দিকেই তাকিয়ে আছে ।
এই মেয়েকেও দাওয়াত দিয়েছে ?
তন্বী ঠিক খুঁজে পেল না । তবে তন্বীর সাথে চোখে চোখ পড়তেই এলাইনা চোখ সরিয়ে দিল । যতটুকু চোখ পড়েছিলো তাতেই তন্বী দেখতে পেল যে এলাইনা কেমন আগুন চোখে তাকিয়ে ছিল ওর দিকে । তন্বীকে সেদিন হোটেলে দেখে মেয়েটা প্রথমে বিস্মিত হয়েছিলো । ঠিক যেন বিশ্বাস করতে পারছিলো না । তারপর যখন এয়ারপোর্টে আবারও দেখলো ফারিজের সাথে, তখনই মেয়েটার চোখ দেখে মনে হয়েছিলো যে তন্বীকে সে মোটেই পছন্দ করছে না । আর এখন ওর এই চোখ দেখে মনে হল যে এলাইনা মেয়েটা তন্বীকে ঘৃণা করছে ।

ফারিজ ওকে দিম্মার কাছে রেখে অন্যদিকে চলে গেল । দিম্মা ওর সাথে কথা বলতে লাগলেন । মাঝে মাঝে দাদুও এসে গল্পগুজব করতে শুরু করলেন । কিছু সময় পরে তন্বী হঠাৎ একা হয়ে গেল । দিম্মা ওকে রেখে আর কার সাথে যেন কথা বলছেন । এমন সময় হঠাৎ ওর কাধে কারো হাতের স্পর্শ পেল । ফিরে তাকাতেই দেখলো খুবই সুন্দরী একজন মহিলা ওর পাশে দাঁড়িয়ে রয়েছে । মহিলা তন্বীর দিকে তাকিয়ে আছে হাসিমুখে ।
তন্বী কি বলবে খুঁজে পেল না । মহিলা খুবই পরিচিত ভঙ্গিতে বলল,
-বোর হচ্ছো?
তন্বী একটু লজ্জার হাসি হাসলো । তারপর বলল,
-আসলে এখানে কাউকে চিনি না ।
-এসো আমার সাথে ।
এই বলে সে তন্বীর হাত ধরে ওকে ড্রয়িং রুম থেকে একটু বাইরে নিয়ে এল । ড্রয়িং রুমের সাথে একটা বারান্দা রয়েছে । সেখানে নিয়ে এসে দাঁড় করালো ।
তারপর তন্বীর দিকে বেশ কিছু সময় তাকিয়ে রইলো । এক সময়ে বলল,
-তো, তোমাকে নিয়ে এসেছে আমার ছেলে ?
-আপনি ফারিজের আম্মু ? আসসালামু আলাইকুম আন্টি !
-আরে আরে, আমার সাথে এতো ফর্মালিটির দরকার নেই । তা তোমার সাথে ফারিজের কি ডিল হয়েছে ?
-ডিল ?
তন্বী ঠিক কি বলবে বুঝলো না । ফারিজের আম্মু কি তাহলে সবকিছু জানে ? তন্বী চুপ করে থাকলো কিছু সময় । ফারিজের আম্মু বলল,
-দেখি তো, তোমাকে আরও একটু ভাল করে দেখি !
এই বলে তন্বীর দিকে আরও বেশ কিছু সময় তাকিয়ে রইলো । তারপর বলল,
-তুমি আসলেই বেশ সুন্দরী তো ! তোমাকে আমার বেশ পছন্দ হয়েছে !
তন্বী এবার একটু হেসে লজ্জায় মাথা নোয়ালো । ফারিজের মা বলল,
-শোনো মেয়ে, এতো লজ্জা পেতে হবে না বুঝেছো ! এখন থেকে তুমি এই বাড়িরই সদস্য । যখনই ইচ্ছে হবে চলে আসবে । মনে থাকবে !
-জি মনে থাকবে !
-ফারিজের আগের গার্লফ্রেন্ডকে চেনো ?
-এলাইনা ?
-হ্যা । আযাদ সাহেবের মেয়ে । আযাদ সাহেব ফারিজের বাবার এক সময়কার বন্ধু । তাই ওদের ভেতরে চেনা পরিচয় হয়েছিলো বেশ ভালই । মেয়েটাকে আমার কখনই ঠিক পছন্দ হয় নি । কেন হয় নি তাও আমি ঠিক জান না । তবে হয় নি । এলাইনা মেয়ে হিসাবে ভাল বেশ । কিন্তু আমার মনে হত যে ফারিজের সাথে ও ঠিক যায় না !
-ওদের ভেতরে কেন ব্রেকআপ হয়েছিলো?
-কি জানি ! আমাকে কি কিছু বলে নাকি ! দুইটারই ইগো খুব বেশি ! সম্পর্কে যদি ছাড় দেওয়ার মানসিকতা না থাকে তাহলে সম্পর্ক টেকে !
তন্বী কি বলবে ঠিক বুঝলো না । তন্বীর দিকে তাকিয়ে ফারিজের আম্মু বলল,
-শোনে মেয়ে, আগে থেকেই বলছি । যদি তোমাদের মাঝে কোন ঝামেলা হয় তাহলে আগে আমার কাছে আসবে । মনে থাকবে ? হুট করে কিন্তু কিছু করবে না । মনে থাকবে তো !
তন্বী বলার মত কোন কথাই খুঁজে পেল না । কেবল হাসিহাসি মুখ করে তাকিয়ে রইলো । ফারিজের সাথে ওর কিছু শুরুই হল না আর ওর আম্মু ওকে বলছে যে ঝগড়া হলে কি করতে হবে ।

রাতে সব গেস্ট চলে যাওয়ার পরেও তন্বী রয়ে গেল । তখন কেবল পরিবারের লোকজন ছিল । তন্বীর সাথে এবার ফারিজের পরিবার আরও ভালভাবে পরিচিত হল । অনেক কথা হল । তন্বীর মনে হল, এমন আন্তিরক মানুষ ও অনেকদিন দেখে নি । ওর মনটা এমনিতেই ভাল হয়ে গেল খুব বেশি । রাতে ফারিজের দায়িত্ব পড়লো তন্বীকে বাসায় রেখে আসার ।
গাড়ি নিয়ে বের হতে যাবে, হঠাৎ তন্বী বলল,
-শুনুন গাড়িতে যাবো না ,
ফারিজ খানিকটা অবাক হয়ে বলল,
-মানে ? তো কিসে যাবে ?
-রিক্সাতে যাবো!
ফারিজ তন্বীর দিকে এমনভাবে তাকালো যেন এর থেকে অদ্ভুত কথা সে আর কোনদিন শুনে নি । তন্বী সেদিকে খুব একটা খেয়াল দিল না । বলল,
-শুনো আমি এখন রিক্সাতে করে যাবো । গাড়িতে যাবো না ।
ফারিজ বলল,
-আমি জীবনে রিক্সাতে চড়ি নি । আর তুমি এই ড্রেস নিয়ে কিভাবে রিক্সাতে উঠবে শুনি !
-ওটা নিয়ে তোমাকে চিন্তা করতে হবে না । তুমি না আসতে চাইলে না আসো ! আমি গেলাম !

তন্বী আর দেরি না করে গেটের দিকে হাঁটা দিল । গেট থেকে বের হয়ে কিছু সময় দাঁড়িয়ে রইলো । ঘড়িতে সময় রাত সাড়ে এগারোটা ! গাড়ি চলাচল কমে গেলেও কিছু গাড়ি আর রিক্সা এখনও আছে । আর তন্বীদের বাড়িটাও খুব বেশি দূরে না । রিক্সা করে যাওয়া যাবে । বাইরে চমৎকার বাতাস দিচ্ছে । এই সময়ে গাড়িতে করে যাওয়ার প্রশ্নই আসে না ।
রিক্সাকে ডাক দিতে হল না । ও গেটের বাইরে এসে দাঁড়াতেই একটা রিক্সা এসে হাজির হল । রিক্সাতে উঠতে গিয়ে একটু ঝামেলাতে পড়তে হল ওকে । ওর পোশাকটা নিয়ে রিক্সাতে কিভাব উঠবে সেটা বুঝতে পারছিলো না ।

রিক্সাটা যেন একটু বেশি উঁচু । ওর আগে কোনদিন রিক্সাতে উঠতে কষ্ট হয় নি । কিন্তু এই পোশাকটা ওকে বেশি দূর পা তুলতে দিচ্ছে নয় । কি করবে তাই ভাবছে এমন সময় রিক্সাওয়ালা একটা ইট এনে দিল । বলল,
-আফা এইটার উপরে পা দিয়ে উঠেন ।
পা টা উঁচু করে তুলতেই বাঁধলো বিপত্তি । ইটটা নড়ে উঠলো । তন্বী ব্যালেন্স হারিয়ে পড়ে যাচ্ছিলো কিন্তু পড়লো না । ফারিজ ওকে পেছন থেকে ধরেছে ।
চোখে মুখে খানিকটা বিরক্তি নিয়ে বলল,
-এসবের কি দরকার ছিল ?
তন্বীর কেন জানি হাসি আসলো । বলল,
-খুব ছিল ।

ফারিজই তন্বীকে রিক্সাতে উঠতে সাহায্য করলো । তারপর সে জীবনের প্রথমবারের মত রিক্সাতে উঠে সবলো । বলল,
-এই এতটুকু একটা বসার স্থানে দুইজন কিভাবে বসে ?
তন্বী খানিকটা হাসিহাসি মুখ নিয়ে বলল,
-আরে বসে বসে । বস তো চুপ করে ।
তন্বী তারপর দেখলো ফারিজ ওর পোশাকের একটা পাশ নিজ হাত দিয়ে ধরে রেখেছে ! মুখে যথারীতি বিরক্তি ভাব ফুটে রয়েছে ।
তন্বী বলল,
-তুমি আবার কিভাবে আসবে শুনি?
-পেছন পেছন গাড়ি আসছে !
-গুড !

তন্বীর সত্যিই খুব অবাক লাগছিলো । সেই সাথে অদ্ভুত একটা অনুভূতিও হচ্ছিলো । ফ্রি বিয়ারের ফলে আরও কত কিছু দেখার বাকি কে জানে !!



পাঁচ


রিক্সাটা তন্বীদের বাড়ির সামনে এসে থামলো । এতো সময় ধরে ফারিজ বিরক্তমুখেই বসে ছিল তন্বীর পাশে । পুরো পথ জুড়ে তার কেবল একটাই কথা ছিল যে এই এতো একটা ছোট স্থানে দুইজন মানুষ কিভাবে বসে যায় । এটা নিয়ে আবার মেয়েদের কত রোমান্টিকতা !
সত্যিই রিক্সাতে চড়া নিয়ে তন্বীর রোমান্টিকতার শেষ নেই । ওর সবসময় ইচ্ছে করে যে প্রিয় মানুষের সাথে করে রাতেরবেলা এইরকমভাবে রিক্সাতে চড়বে । সারারাত রিক্সাতে করে ঘুরে বেড়াবে । মাঝে মাঝে কোন টংয়ের দোকানে বসে চা খাবে তারা । তারপর আবারও রিক্সাতে চড়বে !

আবিদকে এই কথা বলেও ছিল ও । আবিদ খানিকটা বিরক্তমুখে বলেছিলো যে এইসব আদিখ্যেতা তাদের মত ছাপোষা মধ্যবিত্ত মানুষদের জন্য নয় । এসব বড়লোকদের মানায় । তাদের না । হয়তো কথাটা অন্যভাবেও বলা যেত তবে সেদিন আবিদের কন্ঠে যে ভৎর্সনা ছিল তাতে করে তন্বী আর দ্বিতীয়বার তাকে এই কথা বলে নি । তবে মনের মাঝে এই ইচ্ছেটা ছিল । এখনও আছে ।

ওর পাশে যে মানুষটা এতক্ষণ বসেছিল তার কাছ থেকে এমন আশা করাটা তন্বীর একদমই মানায় না । ফারিজ যে আসবে সেটাও ও ভাবতে পারে নি । যদিও বিরক্তমুখেই বসেছিল তবে ফারিজকে পাশে বসে থাকতে দেখে তন্বীর কেন জানি ভাল লাগছিলো বেশ ।
বাড়ির কাছে আসার পর তন্বী রিক্সা থেকে নামতে যাবে তার আগেই ফারিজ আবারও বিরক্তমুখে বলল,
-দাঁড়াও । তাড়াহুড়ো কর না । আবারও পড়ে যাবে ।

এই বলে সে নিজে আগে নামলো । তারপর তন্বীকে ধরে নামালো । নামানোর সময় ফারিজের হাতটা চলে গেল তন্বীর কোমরে । তন্বী সাথে সাথেই কেঁপে উঠলো । তবে ফারিজের দিকে তাকিয়ে দেখলো সে একইভাবে স্বাভাবিক মুখ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে । যেন একটা মেয়ের কোমরে হাত দেওয়াটা কোন ব্যাপারই না । খুবই স্বাভাবিক একটা কাজ ।

তন্বী আবারও খানিকটা আড়ষ্ট হয়ে গেল। সেই প্রথমদিনের মত হয়ে গেল খানিকটা । ফারিজ তন্বীর দিকে ফিরে তাকিয়ে বলল,
-বাসায় যাও । পরে দেখা হবে !
-ইয়ে মানে .....
-বল
-এই ড্রেস আর নেকলেসটা ?
ফারিজ যেন ঠিক বুঝতে পারলো না । বলল,
-কি ?
-মানে এগুলো কাল কোথায় ফেরৎ দিবো?
-ফেরৎ ? ফেরৎ কেন দিবে ?
-মানে ? ফেরৎ দিবো না !
-অবশ্যই না । এগুলো তোমার !
-আরে কি বলেন এইসব ! এতো দামী জিনিস !

তন্বী বুঝতেও পারে নি ও আবার ফারিজকে তুমি থেকে আপনি বলা শুরু করেছে । পার্টিতে আপনি থেকে তুমিতে চলে গিয়েছিলো । প্রেমিককে আপনি বলাটা কেমন দেখায় । তুমি করে বলেছিলো বেশ কিছু সময় । এখন আবার নিজের অজান্তেই আবার আপনিতে চলে গিয়েছে । ফারিজ ওর দিকে তাকিয়ে বলল,
-শুনো এসব নিয়ে এতো চিন্তা করতে হবে না । যা বলেছি তাই শুনো । আর ঐদুটো ড্রেসও তোমার জন্য । কাল মনজুর দিয়ে আসবে তোমার অফিসে ।

তন্বী কিছু বলতে গিয়েও বলতে পারলো না । তবে চলেও গেল না ।
দেখলো ফারিজ কাকে যেন ফোন দিচ্ছে । কয়েক মুহূর্ত পরে বলল,
-কোথায় তুমি ?
তন্বী তখনও দাঁড়িয়ে !
ফারিজ বললে,
-কি বললে ? বাসায় চলে গেছ ? তোমাকে কি বললাম যে রিক্সার পেছন পেছন আসতে ! আমি এখন বাসায় আসবো কিভাবে ? ইডিয়েট !
কিছু সময় নিরবতা !
ফারিজ বলল,
-থাক ! চলে গেছো আর কি করা ! আর আসতে হবে না !

ফোন রাখতেই তন্বী বলল,
-কি হয়েছে ?
ফারিজ খানিকটা বিরক্ত কন্ঠে বলল,
-কিছু না । তুমি বাসায় যাও ।
-মনজুর আসবে না ?
-না । গাধাটাকে বললাম রিক্সার পেছন পেছন আসতে কিন্তু সেটা নাকি সে শুনে নি । আমি রিক্সাতে উঠছি দেখে আর আসে নি ।
পেছন থেকে রিক্সাওয়ালা বলল,
-স্যার চলেন আমি আবার নিয়া যাই । ভাড়া কিছু কমায়ে রাখুম নে !

তন্বী হেসে ফেলল । তারপর ফারিজের দিকে তাকিয়ে বলল,
-যান, যান ডিসকাউন্ট পেয়ে গেলেন । এবার চলে যান । আর রিক্সা ভ্রমণটাকে এবার একটু উপভোগ করার চেষ্টা করবেন ! দেখবেন মজা লাগবে !

ফারিজ কিছু সময় তাকিয়ে রইলো । তবে কিছু বলল না । আপাতত ওর মাথা থেকে এর চেয়ে ভাল কোন উপায় বের হচ্ছে না । ফারিজ যখন রিক্সার উপর চড়ে বসলো তন্বীর মনে তখন অদ্ভুত একটা অনুভূতি হল । এটা কেমন অনুভূতি সেটা তন্বী নিজেও বলতে পারবে না । এই ছেলেটা এর আগে কোনদিন রিক্সাতে চড়ে নি । চড়তে পছন্দও করা না । অথচ ওর জন্য চড়েছে । কি অদ্ভুত ! তন্বী ফারিজের রিক্সা করে চলে যাওয়া পথের দিকে তাকিয়ে রইলো একভাবে । আস্তে আস্তে রিক্সাটা চোখের আড়ালে চলে গেল । তারপরেও তন্বী গেটের কাছে দাঁড়িয়েই রইলো !

পরেরদিন অফিসে বেশ চমৎকার কয়েকটা ঘটনা ঘটলো । আগের ম্যানেজার ওকে বলেছিলো যে ওর কাজ নাকি ক্লায়েন্ট একদমই পছন্দ করে নি । অথচ সেই একই কাজ যখন তন্বী নিজে তাদের দেখালো তারা সেটা খুবই পছন্দ করলো । এর মানে স্পষ্ট যে বেটা বদমাইশ ইচ্ছে করে ওর কাজটা ক্লায়েন্টকে দেখায় নি । ওর উপর বদ নজর আগে থেকেই ছিল । তন্বীর ইচ্ছে করলো যে বেটাকে আরও একটা চড় বসিয়ে দেয় গালে ।
দ্বিতীয় ঘটনাটা ঘটলো আরও বড় । লাঞ্চ আওয়ারে ওর অফিসে খুব বড় একটা কোম্পানীর প্রতিনিধি এসে হাজির হল । সেই সাথে ওর অফিসের বসও এসে হাজির হল ওর কেবিনে । বসের সামনে বসেই তন্বী তাদের সাথে কথাবার্তা বলল । বস ওকে খুব ভাল করে লক্ষ্য করছিলো । মোটামুটি কথাবার্তা ফাইনাল করে গেল তারা । আগামী এক বছরের জন্য তারা কোম্পানীর সাথে চুক্তিবদ্ধ হতে চায় । তাদের কোম্পানীর সব মার্কেটিং ক্যাম্পেইন করবে তন্বীরা । তবে তার আগে ওদের জন্য একটা প্রজেক্ট করতে হবে । সেটা যদি তাদের পছন্দ হয় তাহলে ডিল ফাইনাল হয়ে যাবে !
লোকগুলো চলে যেতেই তন্বী চিৎকার দিতে ইচ্ছে হল । কিন্তু বস সামনে রয়েছে বলে কিছু করতে পারলো না । বস ওর দিকে তাকিয়ে বলল,
-তুমি দেখছি আমার কোম্পানীর জন্য আসলেই লাকি !
-থ্যাঙ্কিউ স্যার !
-থ্যাঙ্কিউ দিতে হবে না । আগে প্রজেক্টটা তৈরি কর । ওদের পছন্দ হওয়া চাই ।
-অবশ্যই । আমার কেন জানি মনে হচ্ছে পছন্দ হবে !
-দ্যাটস দ্যা স্পিরিট ! গুড লাক !
-থ্যাঙ্কিউ স্যার !

অফিস থেকে বের হতে হতে সন্ধ্যা হয়ে গেল । তন্বী সবাইকে ব্রিফ করে দিয়েছে । একটা টিমও ঠিক করে ফেলেছে । সব কাজ শেষ করে বের হতে হতে সন্ধ্যা হয়ে গেল । কিন্তু যতটা আনন্দ নিয়ে ও অফিস থেকে বের হয়েছিলো একটু পরেই সেটা আর থাকলো না।

অফিস থেকে বের হওয়ার পরে মাঝে মাঝেই তন্বী কিছু সময় এদিকওদিক হাঁটাহাঁটি করে । শপিং সেন্টারে ঘোরাঘুরি করে । আজকে ওর হাতে ফারিজের দেওয়া বাকি দুটো ড্রেসের প্যাকেট । ফারিজের ড্রাইভার এসে দিয়ে গেছে । প্যাকেট দুটি হাতে নিয়েই ও হাঁটছিল । অফিস থেকে কিছুদূর যেতেই দেখতে পেল তাকে ।

মেয়েটিকে এখানে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখবে সেটা তন্বী মোটেই ভাবতে পারে নি । এবং মেয়েটি যে ওর জন্যই দাঁড়িয়ে আছে সেটাও বুঝতে অসুবিধা হল না ওর । কি চায় মেয়েটি? তন্বীর মনে হল যে মেয়েটিকে ও পাশ কাটিয়ে চলে যায় । কি দরকার এই মেয়েটির সাথে কথা বলার । আর মেয়েটি তাকে পছন্দ করে না সেটা ও তার চোখমুখের অঙ্গভঙ্গি দেখেই বুঝতে পেরেছে ।

তন্বী পাশ কাটিয়ে চলে যেতে যাবে তখনই এলাইনা বলল,
-তন্বী !
নাম ধরে ডেকেছে। দাঁড়াতেই হয় । তন্বী দাঁড়ালো । তারপর এলাইনার দিকে তকিয়ে বলল,
-বলুন !
-তোমার সাথে কয়েকটা কথা ছিল !
-বলুন আমি শুনছি !
-আমার গাড়ির ভেতরে এসে বসে বলি । এখানে অনেক গরম !

তন্বীর একবার মনে হল যে ও মানা করে দেয় । কিন্তু কি মনে করে সেটা করলো না । রাস্তার পাশেই গাড়িটা দাঁড় করানো ছিল । এলাইনা গাড়ির দরজা খুলে ঢুকলো ভেতরে । তন্বী দেখলো ওরা ঢুকতেই গাড়ির ড্রাইভার বের হয়ে গেল।
তন্বী এলাইনার মুখোমুখি বসলো । এলাইনা বেশ কিছু সময় তন্বীর মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,
-তুমি কি জানো ফারিজ এখনও আমাকে ভালবাসে !
তন্বী কিছু বলল না । চুপ করে রইলো । ফারিজ ওকে ভালবাসে কি বাসে না সেই তথ্য জেনে ওর কোন লাভ নেই । জানার ইচ্ছেও নেই । তন্বী কিছু বলছে না দেখে এলাইনা আবারও বলল,
-আমি জানি কেবলমাত্র আমাকে জ্বালানোর জন্যই ফারিজ তোমাকে ভাড়া করেছে । এর আগেও করেছিলো একজনকে !
তন্বী এবার বলল,
-এক্সকিউজ মি ! কথাবার্তা একটু ভাল করে বল ।
তন্বী দেখতে পেল এলাইনার চোখ জ্বলে উঠলো । তবে সেটা সে সামলে নিল । এলাইনা বলল,
-ফারিজ তোমাকে কত টাকা দিয়েছে ওর গার্লফ্রেন্ড হওয়ার জন্য ? আমি তার থেকে বেশি দেব !

তন্বী অনুভব করলো ওর মেজাজটা খারাপ হতে শুরু করেছে । গাড়ির দরজা খুলে ফেলল । বের হয়ে যাচ্ছে দেখে এলাইনা ওর হাত ধরতে গেল । তবে তন্বী সেটা ছাড়িয়ে নিল । তন্বীর মত একটা সাধারণ ঘরের মেয়ে এলাইনাকে ইগ্নোর করে চলে যাচ্ছে, এটা দেখেই সম্ভবত এলাইনা আর সহ্য করতে পারলো না । সে খানিকটা চিৎকার করে বলল,
-তোমার মধ্যে কিচ্ছু নেই ফারিজের পাশে দাঁড়ানোর মত । বুঝতে পেরেছো ? কত রাত শুয়েছো ওর সাথে ? ও তোমাকে ইউজ করবে, তারপর ছুঁড়ে ফেলে দিবে ।

তন্বীর ইচ্ছে করলো ঘুরে গিয়ে কষে একটা চড় মারে । কিন্তু সেটা করলো না । ওর মাথা দপদপ করতে শুরু করলো ! খানিকটা অন্ধের মত হাটতে লাগলো কেবল । কত সময় যে তন্বী হেটেছে সেটা ও নিজেও বলতে পারবে না । বারবার কেবল এলাইনার কথাটাই মনে আসছে । 'ফারিজ তোমাকে ভাড়া করেছে, উইজ করে ছুড়ে ফেলে দিবে !' এই কথাগুলো মাথা থেকে বের করতে পারছে না ।


তন্বী একটা সময়ে লক্ষ্য করলো যে ও একটা বারের সামনে চলে এসেছে । বারটা ও আগেও দেখেছে । কোনদিন ভেতরে ঢোকা হয় নি । আজকে কি মনে করে ভেতরে ঢুকে পড়লো । আবছায়া অন্ধকার পরিবেশ ।
অন্য সময় হলে হয়তো তন্বী এইখানে কোনদিন আসতো না। আসতে পারতো না কিন্তু আজকে ওর মাথা ঠি মত কাজ করছে না । কোনদিকে না তাকিয়ে একটা চেয়ার টেনে বসে পড়লো ।

ওয়েটারকে বিয়ার দিতে বলল । এই জিনিসটাই কেবল ও খেয়েছে এর আগে । এটার নামই ভাল করে জানে । ওয়েটার এক ক্যান বিয়ার দিয়ে গেল । সেটা কিভাবে শেষ করলো ও নিজেও জানে না । তারপর আরও কয়েক ক্যান শেষ করে ফেলল । হয়তো একটা ক্যানের পর আর খাওয়ার কথা ছিল না যদি তন্বী স্বাভাবিক থাকতো । কিন্তু আজকে ও স্বাভাবিক নেই । তাই অন্যকিছু ও ভাবছে না । অন্যকিছু চিন্তাও করছে না ।

ছয়টা ক্যান শেষ করে তন্বীর মনে হল যে ওর মাথা কাজ করা বন্ধ করা দিয়েছে । ও যখন ব্যাগ নিয়ে উঠে পড়লো । কেউ একজন ওকে কিছু বলল । তন্বী ঠিক বুঝতে পারলো না পরিষ্কারভাবে । সম্ভবত বিল দেওয়ার কথা বলছে । ব্যাগ থেকে কয়েকটা নোট বের করে দিল ও । তারপর খানিকটা দুলতে দুলতে বার থেকে বের হয়ে এল । রাস্তা দিয়ে ও কিভাবে হাঁটছিলো সেটা তন্বীর মনে রইলো না । কেবল একটা কথাই খানিকটা মনে পড়লো যে ও শুধু বমি করে ভাসিয়ে দিল । তারপর আর কিছু মনে নেই ওর !



চলবে



সর্বশেষ এডিট : ১৪ ই জুন, ২০২০ বিকাল ৪:৫৫
৬টি মন্তব্য ৬টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

৪৫ বছরের অপ-উন্নয়ন, ইহা ফিক্স করার মতো বাংগালী নেই

লিখেছেন চাঁদগাজী, ১০ ই আগস্ট, ২০২০ বিকাল ৫:০৫



প্রথমে দেখুন প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিগুলো; উইকিপেডিয়াতে দেখলাম, ১০৩ টি প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি আছে; ঢাকা ইউনিভার্সিটি যাঁরা যেই উদ্দেশ্যে করেছেন, নর্থ-সাউথ কি একই উদ্দেশ্যে করা হয়েছে? ষ্টেমফোর্ড ইউনিভার্সিটি কি চট্টগ্রাম... ...বাকিটুকু পড়ুন

ব্লগ মাতানো ব্লগাররা সবাই কোথায় হারিয়ে গেল ?

লিখেছেন ঢাবিয়ান, ১০ ই আগস্ট, ২০২০ সন্ধ্যা ৬:৩৪

ইদানিং সামু ব্লগ ব্লগার ও পোস্ট শূন্যতায় ভুগছে। ব্লগ মাতানো হেভিওয়েট ব্লগাররা কোথায় যেন হারিয়ে গেছেন।কাজের ব্যস্ততায় নাকি ব্লগিং সম্পর্কে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। আমি কিছু ব্লগারের... ...বাকিটুকু পড়ুন

আজকের ডায়েরী- ৬৪

লিখেছেন রাজীব নুর, ১০ ই আগস্ট, ২০২০ সন্ধ্যা ৭:২৫



সুরভি বাসায় নাই। সে তার বাবার বাড়ি গিয়েছে।
করোনা ভাইরাস তাকে আটকে রাখতে পারেনি। তবে এবার সে অনেকদিন পর গেছে। প্রায় পাঁচ মাস পর। আমি বলেছি, যতদিন ভালো... ...বাকিটুকু পড়ুন

কবিতাঃ অমঙ্গল প্রদীপ (পাঁচশততম পোস্ট)

লিখেছেন খায়রুল আহসান, ১০ ই আগস্ট, ২০২০ রাত ১১:১৪

প্রদীপের কাজ আলো জ্বালিয়ে রাখা।
কিন্তু টেকনাফের একটি ‘অমঙ্গল প্রদীপ’
ঘরে ঘরে গিয়ে আলো নিভিয়ে আসতো,
নারী শিশুর কান্না তাকে রুখতে পারতো না।

মাত্র বাইশ মাসে দুইশ চৌদ্দটি... ...বাকিটুকু পড়ুন

গণপ্রজাতন্ত্রী সোমালিয়া দেশে চাকরি সংকট

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ১১ ই আগস্ট, ২০২০ রাত ১২:২০



গণপ্রজাতন্ত্রী সোমালিয়া সরকার মন্ত্রী পরিষদে কতোজান বিসিএস অফিসার আছেন? তাছাড়া সততার সাথে সোমালিয়া সরকার চাইলেও সঠিক ও যোগ্য মন্ত্রীপদে কতোজন বিসিএস অফিসার দিতে পারবেন?

(ক) মন্ত্রী, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় - একজন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×