আজ দুপুরের আকাশটা বেশ গম্ভীর। বাতাসের অপারগতায় গাছের পাতা গুলো নড়ছে না। তুহিন তার পড়ার রুমের ঘুণে ধরা জানালাটায় দাঁড়িয়ে গত তিনটি বছরের কথা ভাবছে। তিনটি বছরে তার জীবনে কি হয়ে গেল?
এখনো মনে হয় চোখের সামনে ভাসছে দিনটি। তুহিন আর তার বাবা রফিক আহমেদ দুপুরের খাবার খাচ্ছেন। খুব গরম পরেছে, যেন মাথার উপরের সিলিং ফ্যানটাও আর জোরে ঘুরতে পারছে না। পাশে রুমে তুহিনের মা ছোট বোনকে হাত পাখা দিয়ে বাতাস করছে। কি মনে করে তুহিন আজ প্রথমবারের মত তার বাবার প্লেটে ডিম ভাজি তুলে দিল। ডিম ভাজির সাথে মসুর ডাল তুহিনের বাবার খুব পছন্দের খাবার।
হটাৎ করে রফিক আহমেদ আনমনে বলে উঠলেন- "আমি আর পারছি না"।
তুহিন বাবার দিকে তাকিয়ে দেখলেন বাবা নিস্তব্ধে কাঁদছেন।
কি হয়েছে বাবা?
রফিক আহমেদ চুপ করে খাচ্ছেন।
তুহিন আবার জানতে চায়- "বাবা তোমার কি শরীর খারাপ"?
রফিক আহমেদ আবার বলে ওঠেন- "বাবা আমি আর পারছি না। আমি..."।
রফিক আহমেদ আর বেশি কিছু বলতে পারেনি সেদিন। তবে তুহিন বুঝেছে বাবার অবস্থা। গত এক বছর ধরে তাদের একটার পর একটা সমস্যা লেগেই আছে। বড় বোনের বিয়ের সময় দোকানের উপর লোণ করা হয়েছিল। এদিকে রফিক আহমেদের ব্যবসার আবস্থা এমন যে দু'বেলা খাবার জোটাতেও হিমশিম।
তুহিন পলিটেকনিকে ২য় বর্ষের ছাত্র। বাবার হাত শক্ত করে ধরতে সে বেছে নেয় উপার্জনের পথ। বাবা-মাকে না জানিয়ে একটা ইলেকট্রিক দোকানে কাজ শুরু করে। প্রথম দুইমাস দিনে ৪ ঘণ্টা কাজ করে পকেট খরচ চালায়। এক সময় কলেজে যাওয়া অফ করে দেয় তুহিন, সারা দিন সময় দেয় ইলেকট্রিক দোকানে। রফিক আহমেদ সব বুঝতে পারলেও কিছু করার থাকে না তার।
দিন রাত দোকানে কাজ করায় বিভিন্ন জঠিলতা সৃষ্টি হয় তুহিনের আর স্বর্ণার মাঝে। স্বর্ণাকে ফোন দিতে গেলেও তুহিনের মনে বাঁধে, এই ১০ টাকাই হয়তো পরিবারের জন্য অনেক কিছু। কষ্টের মাঝে নতুন কষ্টের আঁচরে সে এখন আবেগহীন। সারা দিন পরিশ্রম করে তুহিন আর এখন স্বর্ণারকে নিয়ে ভাবার সময় পায় না। ক্লান্ত শরীরে রাতের ঘুমটাই যেন তার একটু সুখ।
লোনের টাকা শোধ করতে রফিক আহমেদ এক সময় তার দোকানের অর্ধেকটা বিক্রি করে দেয়। বাবা আর তুহিনের উপার্জনে এখন তাদের এক রকম দিন কেটে যাচ্ছে...।
আজ তুহিন তার জীবনের গত তিনটি বছরের পাওয়া আর না পাওয়ার হিসাব দেখছে।
- পড়ার টেবিল ফেলে এখন সে ইলেকট্রিক দোকানে, বাবার প্লেটে সেদিন ডিম ভাজি তুলে দিয়ে আর এক সাথে খাবার সময় হয়নি, জীবনের রং খুঁজতে কখনো বিকেলের ফাঁকা রাস্তায় হাঁটা হয়নি, স্বর্ণারা সাথে সম্পর্কের শেষটা মেলেনি, আজ সে এসে দাঁড়িয়েছে ঘুণে ধরা তার জানালায়।
... সব শেষেও এখন তারা হয়তো আগের থেকে কোন দিক দিয়ে ভালো আছে।
জীবনের কোন এক সময় 'জীবন' নিজেই তাকে পরিচালনা করতে শুরু করে। তখন তুহিন আর রফিক আহমেদের মতো সবাই পুতুল হয়ে যায়।
সর্বশেষ এডিট : ০১ লা সেপ্টেম্বর, ২০১৪ সন্ধ্যা ৬:০১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



