চৈতি প্রথম যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে পা দেয় তখন মনে হয়েছিল আজ হঠাৎ করে বুঝি সে অনেক বড় হয়ে গেল। বিশাল ক্যাম্পাস, অনেক বন্ধু, অনেক স্বপ্ন পূরনের সুযোগ, অনেক স্বাধীনতা। এই প্রথম তাকে নস্টালজিক হয়ে উঠার কাব্যিক বিলাসিতায় পেয়ে বসল। বন্ধুদের নিয়ে টিএসসিতে নিয়মিত জম্পেস আড্ডা, শৈশব কৈশর নিয়ে স্মৃতিচারণ- বিশেষ করে শৈশবের সেই বৈশাখী মেলা-এসবই ওদের নিত্যদিনের কাসুন্দি। মেলায় প্রথম নাগর দোলায় চড়ার কথা মনে হলে এখনও চৈতির গা শিউরে ওঠে। ও তখন খুব ছোট, বাবার সাথে চড়েছিল নাগর দোলায়। বিশাল চক্র যখন সাঁ করে ওদেরকে নিয়ে নিচের দিকে নামছিল, আকস্মিক পতনে ভয় পেয়ে চিৎকার করে বাবাকে জড়িয়ে ধরেছিল চৈতি। কী শিহরন! মেলার গরম গরম জিলাপির স্বাদ এখনও জিভে লেগে আছে। ঢাকায় এসে অনেক জিলাপি খেয়েছে কিন্তু ওইটার মতো কখনও মনে হয় নি। বাবা কতো সুন্দর সুন্দর খেলনা কিনে দিতেন- বেলুন, মাটির পুতুল, কাচের চুড়ি কতো কি! পুতুল নাচের কথা তো কোন দিনও ভুলবে না। ছোট্ট কোটরের ফাঁক দিয়ে একটা বাক্সের ভিতরে গান্ধী, মুজিব, সিনেমার নায়ক-নায়িকার ছবি দেখা। এটাকে ওরা বলত টকি। বইয়ে পড়েছে ওটা বায়োস্কপ। আহ! সেই সব দিন আর ফিরে আসবেনা রে। একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে চৈতির ফুসফুস নিংড়ে। ওর মর্মস্পর্শী স্মৃতিচারণ বন্ধুদেরকেও নস্টালজিক করে তোলে। তাই ওরা সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিল এবার পহেলা বৈশাখ সারাদিন ক্যাম্পাসে থেকে মজা করবে। অবশ্য ক্যাম্পাসে এসে চৈতির কাছে মনে হয়েছে মজা আর আড্ডার সংজ্ঞাটা বুঝি অনেকখানি বদলে গেছে। ওদের আড্ডা আর অন্যদের আড্ডার মধ্যে অনেক তফাত। এখানে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ছেলে মেয়েদের আড্ডা শেষ পর্যন্ত ডেটিং এ গড়ায়। তারপর বন্ধুদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া, সকাল বিকাল নিয়ম করে পার্কে, রাস্তার মোড়ে অথবা টিএসসির চিপায় যতোটা সম্ভব জড়াজড়ি করে বসে থাকা। মোবাইলে ঘন্টার পর ঘন্টা অর্থহীন কথা বলা। এসব চৈতির কাছে খুব বিরক্তিকর আর হাস্যকরও মনে হয়। ওরা এতো সময় ধরে কী কথা বলে। ও ভেবে পায়না। ওরা বন্ধুরা যখন কথা বলে তখন কতো বিষয় নিয়েই না কথা উঠে।একেক জন একেক বিষয় উত্থাপন করবে আর তা নিয়ে চলবে বারোয়ারি বিতর্ক- সেও তো এক সময় শেষ হয়। আর মাত্র দুটো মানুষ এতো কী কথা বলা যায় যে ঘন্টার পর ঘন্টা বিরতিহীন ভাবে বলেও শেষ হয় না। আজব চিজ!
চৈতির বন্ধু ভাগ্যটা ভালই বলতে হবে। ওরা কেউই ওসব পছন্দ করে না। কাজেই পহেলা বৈশাখে খুব মজা হবে তাতে সন্দেহ নেই।
চৈত্র সংক্রান্তির রাতে উত্তেজনায় চৈতির ভাল মতো ঘুমও হল না। খুব সকালে ঘুম থেকে উঠে নতুন কেনা শাড়িটা পরল। কপালে টিপ, পায়ে আলতা তারমানে চেহারায় ষোলয়ানা বাঙ্গালীয়ানা ফুটিয়ে তুলতে যা যা করা দরকার তার কোনটাতে কমতি করল না সে। সাজুগুজু করে ক্যাম্পাসে পৌঁছতে পৌঁছতে পৌনে আটটা বেজে গেল। মঙ্গল শোভাযাত্রা শুরু হতে আর মাত্র পনেরো মিনিট বাকি। চারুকলার দিকে হেঁটে যেতেই বন্ধুদের দেখতে পেল ও। সবাই ওর মতোই সেজেছে-চুল বেনী করা, সাদা জমিন লাল পাড় শাড়ি। ইস্ রে নুপূরটা পরতে একদম ভুলে গেছি। একটা ঘাটতি থেকেই গেল। আক্ষেপ করে চৈতি। ছেলেরাও কম কিসে। পাজামা, পাঞ্জাবি, ঘাড়ে উত্তরিয় ঝোলানো, কেউ আবার ধুতিও পরেছে। চৈতি ভাবে বছরে এই একটা দিন বলেই কি এতো আড়ম্বর? যাক সে সব বিচার বিশ্লেষণের দিন আজ নয়। তবুও তো এই একটা দিন আমাদেরকে এবং অনাগত প্রজন্মকে আমাদের সংস্কৃতির কথা বছরে অন্ততঃ একবার মনে করিয়ে দিবে। তাই সব ভুলে আজ অনন্দ করার দিন। বছরের প্রথম দিন আনন্দ করে কাটালে নাকি বাকি দিনগুলোও হাসি আনন্দেই কেটে যায়। আর এই দিনে কাঁদলে সারা বছর কাঁদতে হয়। চৈতি অবশ্য এসব কুসংস্কারে কখনই বিশ্বাস করেনা।
এই যাহ- মঙ্গল শোভাযাত্রা বুঝি শুরু হয়ে গেল। দলে দলে লোকজন এসে জমায়েত হতে শুরু করেছে। দেশের অনেক সুনামধন্য সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বকেও দেখা গেল। সবাই হাতে রঙ্গিন ব্যানার, প্ল্যাকার্ড, ফেস্টুন, বিভিন্ন পশু পাখির মুখোশ, কেউ কেউ আবার ভয়ঙ্কর কিছু মানুষের মুখোশও বহন করছে। নিজের অজান্তেই চৈতিও একটা মুখোশ উঁচিয়ে ধরে লাঠির আগায়। যদিও এসবের অর্থ আজও ওর কাছে স্পষ্ট নয়। হোক, সবকিছুর অর্থ বুঝতে নেই। অর্থহীন কাজের মধ্যেও তো আনন্দ থাকে। চারুকলার ছাত্রদের আবার কাণ্ড দেখ। ময়ুর, হাতি, ঘোড়ার বিশাল বিশাল সব মূর্তি বানিয়ে চড়িয়ে দিয়েছে ঠেলা গাড়িতে। এই একটা দিনের জন্য ওরা কী খাটুনিটা যে খাটে! সত্যিই ওদের প্রশংসা না করে পারা যায় না। বর্নিল একটা মিছিল এগিয়ে যাচ্ছে। ভাবতেই ভাল লাগছে, আজকে কারো মধ্যে কোন ভেদাভেদ নেই । সকল রাজনৈতিক ও ধর্মীয় বিভেদ ভুলে সব মানুষ এক কাতারে। সবার উপরে এটাই সত্য যে আমরা সবাই বাঙ্গালী আমাদের সংস্কৃতি এক। এটাই হতে পারে জাতীয় ঐক্যের মূলমন্ত্র। তা যেন বছরের শুরুতেই মনে করিয়ে দিল এই উৎসব।
শোভাযাত্রা শেষে ওরা ছুটল পান্তা খেতে। ভাজা শুকনো মরিচ, ইলিশ ভাজা আর নানান পদের ভর্তা সহযোগে মাটির সানকিতে সাজানো পান্তা লোভনীয়ই মনে হচ্ছিল। আবার দ্বিধাও হচ্ছিল হঠাৎ পান্তা খেয়ে পেট খারাপ করবে না তো? করলে করুক বছরে মাত্র একটা দিন তো ওটা সহ্য করতেই হবে। পান্তা পর্ব শেষে গোটা ক্যাম্পাস দাপিয়ে বেড়ানো, বন্ধুদের সাথে দেখা সাক্ষাত, নববর্ষের শুভেচ্ছা বিনিময় এসব করতেই অনেক বেলা হয়ে গেল। দুপুর হতে না হতেই একটু যেন ঝিমিয়ে পড়ল সবাই। এবার বিশ্রাম চাই। বিকেলে আবার কনসার্টে আসতে হবে। বিশ্রামের পর ক্যাম্পাসে ফিরতে ফিরতে এদিকে বৈশাখী মেলা জমে উঠেছে। মেলায় একটা চক্কর দিয়েই ওরা সিদ্ধান্ত নিল কনসার্টে গিয়ে বসবে। দেরি করলে আর বসার জায়গা পাওয়া যাবে না। তবুও গিয়ে দেখে সামনের সিটগুলো ইতিমধ্যে দখল হয়ে গেছে। বাধ্য হয়ে পিছনে এক কোণায় কোন রকম বসে পড়ল ওরা। কিন্তু কনসার্ট শুরু হতেই চৈতির আশাভঙ্গ হল। পরিবেশনাগুলো মোটেই আকর্ষন করল না ওকে। কোন লিরিক নেই শুধু যন্ত্রের কান ফাটানো তীক্ষè আওয়াজ আর মঞ্চের সামনে এক দল পছেলের উদ্দাম নৃ এটা কনসার্ট হয় কি করে? এতো রীতিমতো ডিজে পার্টি। আজ আমরা পোশাকে বাঙ্গালী, চেতনায় বাঙ্গালীয়ানা কোথায়। কোথায় বাংলার গান। ইংরেজি গানের সুরে বাংলা গান! আমাদের কি কখনো মৌলিক সুর ছিল না, নেই?
যন্ত্রের অত্যাচার সহ্য করেও চৈতি বসে রইল। দেখতে দেখতে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামল। কনসার্ট চলছে আগের মতোই। মঞ্চের সামনের ছেলেগুলো প্রচণ্ড গরমে ঘেমে একাকার। কেউ কেউ শার্ট খুলে ফেলেছে। উদোম গায়ে উদ্দাম নৃত্য। সিনেমায় দেখা জংলিদের কথা মনে করিয়ে দেয়। হঠাৎ কনসার্টের সব আলো নিভে গেল। আকস্মিক অন্ধকারে কিছু দেখা যাচ্ছিল না। লাউডস্পিকারে ফুল ভলিউমে বাজানো গানের শব্দ ছাপিয়ে মেয়েদের তীব্র আর্তচিৎকার চৈতির কানে ভেসে আসে। ও ভয় পেয়ে ভিড় ঢেলে বাইরে যাবার মূহুর্তেই বুকে পিঠে প্রচণ্ড চাপ অনুভব করল। হিতাহিত জ্ঞান শূন্য হয়ে চৈতি প্রচণ্ড জোরে একটা কামড় বসিয়ে দিল আর শুনতে পেল কে যেন চাপা আর্তনাদ করে উঠল, আবছা আলোয় দেখতে পেল একটা বিকৃত মুখ ওর সামনে থেকে সরে গেল। অমনি দৌড়ে গিয়ে দাঁড়াল রোকেয়া হলের গেটে। ভিতরে না গিয়ে বাইরে দাঁড়িয়ে ব্যপারটা আঁচ করার চেষ্টা করল ও। আচ্ছা একটু আগে যার কবল থেকে ও রক্ষা পেল ওই মুখটা কোথায় যেন দেখেছে বলে মনে হয়। হ্যাঁ, সকালে মঙ্গল শোভাযাত্রার একেবারে প্রথম সারিতে ধবধবে ধুতি পাঞ্জাবি পরা ঘাড়ে উত্তরিয়।
একটু পরেই সবগুলো বাতি জ্বলে উঠল। পুলিশ প্রশাসন কনসার্ট বন্ধ করে দিয়েছে। মঞ্চের সামনে ছড়ানো ছিটানো চেয়ার, আলুথালু বেশে মেয়েদের ছুটাছুটি। সবার চোখে আতঙ্ক। চৈতি ওর এক বান্ধবিকে দেখল মাথা নিচু করে দৌড়ে হলে ঢুকছে। এলোমেলো উসকোখুসকো চুল, ছেড়া ব্লাউজ, প্রানপনে বুকে জড়ানো শাড়ি। ও আতঙ্কিত হল ওর বন্ধুদের কথা ভেবে। তাড়াতাড়ি একজনকে ফোন দিল ও। ওপাশ থেকে শুধু কান্নার আওয়াজ শুনতে পেল চৈতি। আর কিছু বলার প্রয়োজন নেই, যা বুঝার তা বুঝে নিয়েছে সে। নাহ্, কুসংস্কারের মধ্যেও সত্য আছে। আগামী দিনগুলো কোন মেয়েরই ভাল যাবে না।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


