ভবনের আটতলার কাটিং এলাকার একটি টেবিলের নিচে ছিল আর্বজনার বাক্স। হঠাৎ করে কিভাবে যেন সেখানে আগুন লেগে যায়। প্রথমে শ্রমিকরা চেস্টা করে পানি ঢেলে আগুন নেবানোর জন্য। কিন্তু আশেপাশের আরও কিছু আর্বজনায় আগুন ইতিমধ্যে ছড়িয়ে পরে। সবচেয়ে বড় সমস্যা, উপর থেকে কিছু ঝুলন্ত স্টি্রং - এ আগুন লেগে দ্রুত উপরে উঠে যায়। কিছুক্ষনের মধ্যে আগুন শ্রমিকদের নিয়ন্ত্রনের বাইরে চলে যায়। আগুন এতই দ্রুত ছড়িয়ে পরে যে, মুহুর্তেই ৮ তলা, ৯তলা, ১০ তলাসহ সারা আসচ্ ভবনেই (Asch Building) ছড়িয়ে পরে। পুর্ব ওয়াশিংটন স্কয়ার পার্ক থেকে মাত্র আধা ব্লক দুরের এই ভবনটি মুহুর্তেই পরিনত হয় জলন্ত নরকে।
অগ্নিকান্ডে মারা যায় ১৪৬ জন পোশাক শ্রমিক। এদের সবাই মারা যায় আগুনে পুড়ে, ধোয়ায় দম বন্ধ হয়ে এবং আগুন থেকে রক্ষা পেতে উপর হতে লাফিয়ে পড়ে। যারা মারা যান তাদের বেশির ভাগই ছিল ইহুদি এবং ইটালিয়ান অভিবাসি মহিলা শ্রমিক। অধিকাংশেরই বয়স ছিল ১৬ থেকে ২৬ বছরের মধ্যে। তবে অগ্নিকান্ডে নিহত সবচেয়ে বয়স্ক শ্রমিকের নাম ছিল প্রভিডিনজা পান্নো যার বয়স ছিল ৪৬ এবং সবচেয়ে কম বয়স্ক ছিল ১১ বছর বয়সি মেরি গোল্ডস্টেইন।
এত অধিক সংখ্যক শ্রমিকের মৃত্যূর প্রধান কারণ ছিল ভবন হতে বের হওয়ার দরজাগুলো তালা বদ্ধ ছিল। কারখানা কতৃপক্ষ সবসময়ই প্রধান প্রধান বের হওয়ার দরজাগুলো বন্ধ করে রাখত চুরির ভয়ে। আগুন লাগার পরেও খুলে দেয়নি। যার ফলে অনেকেই জীবন বাচাতে লাফিয়ে পড়ে মারা যান।
১৪৬ জনের মধ্যে ৬ জনের পরিচয় শনাক্ত করা যায়নি সেসময়। তাদের কে বেওয়ারিশ হিসাবে বাকী ১৪০ জনের সাথে সমাহিত করা হয় নিউ ইয়র্কের এভারগ্রীন সমাধিস্থলে। হাজার হাজার নিউ ইয়র্কবাসী শেষকৃতান্নুষ্টানে সামিল হন। তবে স¤প্রতি, ১শত বছর পরে, ২০১১ সালে মাইকেল হিরিসচ্ নামে একজন গবেষক ৬ জনের পরিচয় বের করেন। আর তালিকায় তাদের নাম সংযুক্ত করেন।
ট্রাইএঙেল ওয়েস্ট পোশাক কারখানার অগ্নিকান্ডটি ছিল নিউ ইয়র্কের ইতিহাসে সবচেয়ে সাংঘাতিক শিল্প দুর্যোগ। আর আমেরিকার ইতিহাসে শিল্প দুর্যোগে ৪র্থ সর্ব্বোচ্চ প্রাণহানীর ঘটনা।
এই বিয়োগান্তক ঘটনায় সারাদেশ অনুতাপ ও দুঃখে ঢাকা পড়ে যায়। তবে তারা ঘটনাটিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হিসাবে নেয়। অনুপ্রানিত হয় ব্যাপক পরিবর্তনের। পাল্টে ফেলে সকল কারখানা আইন, কারখানা ও বাড়ীঘর নিরাপত্তা আইন, শ্রমিক অধিকার আইন এবং এ সর্ম্পকিত সকল আইন। যাতে এরকম বিয়োগান্তক ঘটনা আর না ঘটে। প্রথমে নিউ ইর্য়ক এবং পর্যায়ক্রমে সারাদেশ এ আইনগুলোর আওতায় আনা হয়। বাস্তবায়নও করা হয়। এই আইনগুলোকে আমেরিকার শিল্প ও শ্রমিক উন্নয়নের মাইল ফলক হিসাবে দেখা হয়। এ ঘটনা থেকেই জন্ম হয় আর্ন্তজাতিক মহিলা র্গামেন্টস শ্রমিক ইউনিয়নের।
এই একটি অগ্নিকান্ডকে কেন্দ্র করে কত যে পরিবর্তন সাধিত হয়েছে তার তালিকা অনেক বিশাল। আমি আর সেদিকে যাচ্ছি না। যারা আরও জানতে আগ্রহী তারা ইন্টারনেট সার্চ করে পড়ে নিতে পারেন।
সেদিনও ছিল শনিবার। যেদিন ঢাকার অদূরে আশুলিয়ায় তাজরীন ফ্যাশনস নামক পোশাক কারখানায় অগ্নিকান্ড ঘটে। একশত বছর পরে ঠিক একই ভাবে মারা যান ১১১ জন র্গামেন্টস শ্রমিক । যারা আমাদেরই ভাইবোন। কতই না মিল দুটি ঘটনার। শুধু মিল নেই বিবেকের। শুধু মিল নেই বিক্রি হয়ে যাওয়াতে। আমরা আমাদের সত্ত্বাকে বিক্রি করে দিয়েছি টাকার কাছে। আইন আমাদের দেশেও আছে কিন্তু তা শুধু শোকেসে সাজিয়ে রাখার জন্য। লোক দেখানোর জন্য। বিদেশী ক্রেতাদেরকে দেখানোর জন্য। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের জন্য। মানার জন্য নয়।
কৃষক, র্গামেন্টস শ্রমিক আর প্রবাসী শ্রমিকরা নাকি দেশের অর্থনীতির প্রাণ। তো এই প্রাণেরই যখন মৃত্যূ হচ্ছে প্রতিনিয়ত। আমরা আত্মহত্যা করছি। নয় কি ?
সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই এপ্রিল, ২০১৩ সকাল ৮:৩৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




