
সকালের কুয়াশা, ট্রেনের ঝকঝক শব্দ আর চোখের সামনে দিগন্তজোড়া হলদে সরিষা ক্ষেতের মায়াবী রূপ—এই তিনের কম্বিনেশন কেমন হতে পারে বলুন তো? ঠিক এই অনুভূতিটাই বাস্তবে রূপ দিতে আমরা ক'জন মিলে হুট করেই প্ল্যান করে ফেললাম চলনবিল ভ্রমণের। উদ্দেশ্য একটাই, যান্ত্রিক ঢাকা থেকে দূরে কোথাও হারিয়ে যাওয়া এবং চলনবিলের বিখ্যাত সরিষা উৎসবের মুখোমুখি হওয়া।
ভোর ৬টার ট্রেন আর ভাঙ্গুড়া স্টেশনের কুয়াশা
আমাদের ট্যুর শুরু হয়েছিল ঠিক ভোর ৬টায়। কমলাপুর (বা এয়ারপোর্ট) স্টেশন থেকে উত্তরবঙ্গগামী ট্রেন যখন ছাড়লো, তখনো চারপাশ হালকা কুয়াশায় ঢাকা। ট্রেনের জানলা দিয়ে ভোরের মিষ্টি হাওয়া আর চেনা রুট পার হতে হতে আমরা যখন পাবনার ভাঙ্গুড়া স্টেশনে নামলাম, তখন সকাল প্রায় সাড়ে ১০টা। স্টেশন থেকে নামতেই শীতের আমেজ আর গ্রামীণ পরিবেশ মনটা ভালো করে দিল।
ভ্যান যাত্রা, নদী পারাপার এবং বিলের মাঝে ট্র্যাকিং
ভাঙ্গুড়া স্টেশন থেকে আমরা লোকাল ভ্যানে চেপে রওনা হলাম বড়াল নদীর পাড়ের উদ্দেশ্যে। নদী পার হতেই চোখের সামনে ভেসে উঠলো আসল ম্যাজিক! যতদূর চোখ যায়, শুধু হলুদ আর হলুদ। শুরু হলো আমাদের বিলের মাঝখান দিয়ে হাঁটা বা ট্র্যাকিং।
দুই পাশে সরিষা ফুলের মন মাতানো সুবাস আর মাঝে কাঁচা মাটির আইল। হাঁটতে হাঁটতে আমরা পৌঁছালাম দিলপাশার এলাকায়। সেখানে দুপুরের লাঞ্চ সেরে যখন আবার হাঁটা শুরু করলাম, মনে হচ্ছিল আমরা কোনো ছবির ভেতর দিয়ে হাঁটছি। চারপাশে মৌমাছির গুঞ্জন আর শান্ত বিলের রূপ সত্যিই চোখ জুড়িয়ে দেয়।
আমাদের চলনবিল ভ্রমণের সিনেমাটিক ভিডিওটি দেখতে এখানে ক্লিক করুন:
view this link
বিটিভি থিম সং-এর এআই ফিউশন: আমাদের ছোটবেলার নস্টালজিয়া জড়িয়ে থাকা বাংলাদেশ টেলিভিশনের সেই চিরচেনা সিগনেচার টিউনটিকে আধুনিক AI মিউজিক টেকনোলজির সাহায্যে একটি ফিউচারিস্টিক রিমিক্স রূপ দিয়েছি। ট্র্যাডিশনাল সুরের আবেগ ঠিক রেখে এই নতুন মিউজিকটি চলনবিলের ড্রোন শট আর চলন্ত ট্রেনের ভিজ্যুয়ালের সাথে এক অদ্ভুত মায়াবী পরিবেশ তৈরি করেছে!
চলনবিলে এত সরিষা কেন আর মধুর গল্প
হাঁটার ফাঁকে স্থানীয় কৃষকদের সাথে কথা বলে একটা দারুণ জিনিস জানলাম। বর্ষাকালে এই চলনবিল কিন্তু পুরো পানির নিচে ডুবে থাকে, ঠিক যেন একটা মিনি সমুদ্র! অক্টোবর-নভেম্বরের দিকে যখন এই পানি নেমে যায়, তখন মাটিতে উর্বর পলি আর নরম কাদার একটা মোটা স্তর জমে। কৃষকদের তখন বাড়তি জমি চাষ করতে হয় না; তারা সরাসরি এই কাদার ওপর সরিষার বীজ ছিটিয়ে দেন। বিনা চাষেই প্রাকৃতিকভাবে এখানে বাম্পার ফলন হয়
আর এই সরিষা ফুলকে কেন্দ্র করেই এখানে বসে মধুর মেলা! খামারিরা মাঠের পাশে সারিবদ্ধ কাঠের বাক্স বসিয়ে সম্পূর্ণ বৈজ্ঞানিক ও প্রাকৃতিক উপায়ে মৌমাছি দিয়ে ১০০% খাঁটি সরিষা ফুলের মধু সংগ্রহ করেন। এই হলুদ ফুলগুলোই মৌমাছিদের প্রধান চারণভূমি । (পরের সপ্তাহে এই মধু সংগ্রহের ওপর একটা স্পেশাল ভিডিও আসছে)
গোধূলি লগ্নে বড়াল ব্রিজ ও নীড়ে ফেরা
সময় কম থাকায় বিকালের দিকে আমরা ভ্যান নিয়ে চলে গেলাম ঐতিহাসিক চাটমোহর বা বড়াল ব্রিজের কাছে। যখন সূর্য ডুবুডুবু, আকাশজুড়ে সোনাঝরা আলো, ঠিক তখন বড়াল ব্রিজের ওপর দিয়ে একটা ট্রেন ধকধক শব্দে পার হয়ে গেল। মাথার ওপর দিয়ে পাখিদের ঝাঁক উড়ে যাচ্ছে তাদের নীড়ে। এই সিনেমাটিক দৃশ্যটা দেখার জন্যই যেন সারাদিনের ক্লান্তি এক নিমেষে উধাও হয়ে গেল! এরপর সন্ধ্যা ৬টার ফিরতি ট্রেনে চেপে আমরা আবার ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। টেনশন-ফ্রি হয়ে পথপ্রদর্শকের কথামতো কাটানো এই একটা দিন আমাদের স্মৃতির পাতায় চিরকাল জমা থাকবে।
আপনিও যদি এমন ডে-ট্যুর দিতে চান
• কখন যাবেন: চলনবিলের সরিষার এই রূপ দেখতে হলে আপনাকে ডিসেম্বরের মাঝামাঝি থেকে পুরো জানুয়ারি মাসের মধ্যে যেতে হবে।
• রুট: ঢাকা থেকে ভোর ৬টার ট্রেনে উঠে নামবেন ভাঙ্গুড়া স্টেশন। সেখান থেকে ভ্যানে নদীর পাড় হয়ে নৌকা পারাপার। দিলপাশার এলাকায় লাঞ্চ করে বিলের মাঝে ঘুরে বিকেল ৫টার মধ্যে চলে যান চাটমোহর বা বড়াল ব্রিজ। সেখান থেকে সন্ধ্যা ৬টার ফিরতি ট্রেনে ব্যাক টু ঢাকা!
সবুজের মাঝে হলুদের এই সমারোহ আর বিটিভি থিম সং-এর নস্টালজিক ফিল নিয়ে আমাদের সিনেমাটিক ট্রাভেল ডকুমেন্টারিটি দেখতে ভুলবেন না। আপনার চলনবিল ভ্রমণের কোনো স্মৃতি থাকলে কমেন্টে শেয়ার করতে পারেন!
#BeautifulBangladesh #ChalanBeel #LetsHike

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


