somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

উড়িরচর: নদীভাঙন, লড়াই ও বাথানের গল্প | Urir Char Documentary

০৭ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



বাড়ি নদীর চরে, স্থায়ী বাড়ি নাই,
অতি বৃষ্টি বন্যা হলে, বানে ভেসে যাই।
খুঁজে ফিরি নতুন চর, যেদিক দিয়ে জাগে,
মাথা গৌঁজার ঠাই করি, ঘর বানাই আগে।

ভাবুন তো, এমন একটি দ্বীপ…

যেখানে মাটি দু’ভাগ হয় জেলাভেদে,
কিন্তু হৃদয়ে থাকে একটাই গল্প।
খোলা আকাশ,
দিগন্ত ছোঁয়া মাঠ, আর নদীর কূলে বয়ে চলা জীবন...

এ যেন শহরের কোলাহল থেকে বহু দূরের এক শান্ত পৃথিবী।

বাংলাদেশের একমাত্র এমন দ্বীপ,
যেখানে চট্টগ্রাম আর নোয়াখালীর সীমান্ত জুড়ে আছে এক অদ্ভুত সহাবস্থান—



একটানা, নীরব,
অথচ গভীর।
একদিকে নদী কেড়ে নেয়,
অন্যদিকে মানুষ গড়ে তোলে জীবন।
কাদা-মাটি, সবুজ ঘাস আর অসীম আকাশের নিচে
মানুষগুলো লড়াই করে যায় নীরবে, নিরলস।
এই দ্বীপ কোনো নিছক মানচিত্রের অংশ নয়—
এ এক জীবনযাত্রার প্রতিচ্ছবি।
একটি পরিচয়,
একটি গল্প—
উড়িরচর।
দ্বীপ কথা বলে...
নদীর ভাষায়, বাতাসের ছোঁয়ায়—
জীবনের গভীরতা আর মায়া বয়ে চলে প্রতিটি ধূলিকণায়।
১৯৭০-এর দশকে মেঘনার মোহনায় জেগে উঠেছিল
এক নতুন চর—
সেটিই আজকের উড়িরচর।

ভিডিওটি দেখতে


মাত্র ৪০ বর্গমাইলের ছোট এই দ্বীপটি
চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ আর নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জের মাঝখানে।
শুরুর দিকে জন্মাত এক বিশেষ ধরনের ঘাস,
যা স্থানীয়রা বলত ‘উড়ি’—
সেই নামেই চিরপরিচিত হয়ে ওঠে
এই চর, ‘উড়িরচর’।
এখানে জীবন সাদাসিধে,
সহজ আর প্রকৃতির ছায়ায় গড়া।
শহরের ব্যস্ততা নেই,
নেই পাকা রাস্তার আধিক্য।
বেশিরভাগ ঘর টিনের,
হাতে গোনা কিছু পাকা ঘর।
মানুষ কৃষি আর গবাদিপশুর ওপর নির্ভর করে বেঁচে থাকে।
কিন্তু এই বেঁচে থাকাটা সহজ নয়।
বেড়িবাঁধ নেই,
তাই বর্ষায় জোয়ারের পানিতে তলিয়ে যায় ফসলের মাঠ।
জমির বনভূমিও কমে আসছে দিনে দিনে।



নদীভাঙন, জলবায়ুর চাপ, আর মানুষের চাহিদা—
সব মিলিয়ে বদলে যাচ্ছে দ্বীপের চেহারা।

উড়িরচরে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন হয়নি বহু বছর।
পথঘাট অবহেলায় পড়ে আছে।
মাত্র দুটি প্রধান সড়ক ছাড়া বাকি রাস্তাগুলো বর্ষায় ডুবে যায় পানিতে।
যাতায়াতের ভরসা—
মোটরবাইক, কিছু জিপ, রিকশা, সাইকেল আর ট্রলি।
দ্বীপের জনসংখ্যা প্রায় ৪০ হাজার।
তবে সে অনুপাতে নাগরিক সুবিধা প্রায় অনুপস্থিত।
প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি থাকলেও
নেই পর্যাপ্ত সরকারি প্রস্তুতি।
মাত্র কিছু সাইক্লোন সেন্টার,
নেই যথাযথ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

নেটওয়ার্ক সমস্যার কারণে যোগাযোগে ঘটে বাধা।
বাইরের জগতের সঙ্গে যোগাযোগ বলতে নদীপথেই ট্রলারই ভরসা।
দক্ষিণে মূলঘাট, যেখানে সন্দ্বীপ থেকে আসা ট্রলার ভিড়ে।
পশ্চিমে চর এলাহী ঘাট দিয়ে সংযোগ কোম্পানীগঞ্জের সঙ্গে।
কিন্তু নেই কোনো স্থায়ী জেটি।
যতক্ষণ খালে জোয়ারের পানি না আসে, ততক্ষণ পর্যন্ত ট্রলার ছাড়ে না।
মাঝেমধ্যে একটা ট্রলার ছাড়ার জন্য এক দুই ঘণ্টাও অপেক্ষা করতে হয়।
ট্রলার করে সন্দ্বীপ যেতে প্রায় এক থেকে দেড় ঘণ্টা সময় লাগে,
আর নোয়াখালী যেতে মাত্র ২০ মিনিটের মতো সময় লাগে।
তবে নোয়াখালী স্পিড বোটে গেলে প্রায় 1০ মিনিটেই পৌঁছে যাওয়া যায়।
জোয়ার-ভাটার সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলতে হয় প্রতিদিন।
ঝুঁকি বাড়ে বর্ষাকালে।
তবুও জীবন চলে…
দ্বীপজুড়ে চোখে পড়ে রাখালদের ব্যস্ততা—
স্থানীয়ভাবে যাদের বলা হয় ‘বাতান’।
তারা গবাদিপশু পালনে নিয়োজিত, মাসিক বেতনে কাজ করে।
গরু-মহিষ পালনের জন্য বাতানদের বছরের চুক্তিতে নিয়োগ দেওয়া হয়।
তাদের বেতন নির্ধারিত হয় পশুর সংখ্যার ওপর ভিত্তি করে।



উদাহরণস্বরূপ, কেউ যদি ৩০টি মহিষের দায়িত্ব নেন,
তবে মালিকের বার্ষিক খরচ প্রায় ৮০,০০০ থেকে ১,০০,০০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে।
তবে কোনো গরু-মহিষ মারা গেলে বা হারিয়ে গেলে
সেই ক্ষতি মালিকেরই হয়।
বাতানদের মাসিক সর্বনিম্ন বেতন প্রায় ১০,০০০ টাকা।
খাওয়া-দাওয়ার জন্য আলাদা টাকা দেওয়া হয়, কখনো বাজার থেকে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনে সরবরাহ করা হয়।
গরু-মহিষ চিনতে তাদের কানে ফুটো করে সাংকেতিক চিহ্ন দেওয়া হয়।
এই চিহ্ন দেখে মালিকরা সহজেই নিজের পশু শনাক্ত করতে পারেন।
বাতানদের জীবনের সঙ্গে এই কাজটি শুধু পেশা নয়, বরং এটি চরাঞ্চলের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির অংশ।
একাধিক বাতান দলবদ্ধভাবে গবাদিপশু চরায়, পানির ব্যবস্থা করে এবং সন্ধ্যায় পশুগুলো নির্দিষ্ট জায়গায় নিয়ে আসে।
গরু-মহিষ বেঁধে রাখার জায়গাটিকে স্থানীয়ভাবে “টং” বলা হয়।
তানরা এই টং-এ খাওয়া-দাওয়া করে এবং রাতের বেলা সেখানেই ঘুমায়।
বর্ষা শুরু হওয়ার আগে বাতানরা গরু-মহিষ নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নেয়,
যেন বন্যা বা নদীর ঢলে কোনো দুর্ঘটনা না ঘটে।
পশুপালন শুধু জীবিকা নয়, বরং উড়িরচরের মানুষের জীবনের সঙ্গে মিশে থাকা এক নিখাদ গ্রামীণ ঐতিহ্য।
উড়িরচরের প্রতিটি দিন এক নতুন লড়াইয়ের নাম।
নদীর সঙ্গে,
প্রকৃতির সঙ্গে,
জীবনের কঠিন বাস্তবতার সঙ্গে—
তবুও এখানকার মানুষ থেমে থাকে না।
সরলতা আর সাহস নিয়ে তারা এগিয়ে চলে।
নদীর মতই বহমান,
বয়ে চলে নিরবিচারে—
জীবনের জয়গান গেয়ে যায় উড়িরচরের আকাশ-বাতাস।
উড়িরচরের নাম কেবল একটি স্থান নয়—
এ এক জীবন, এক সংগ্রাম, আর এক আশার গল্প।
মানুষের জীবন বয়ে চলে আশা-সম্ভাবনা নিয়ে বাঁধা পেরিয়ে।
দ্বীপ জীবন যেন তারই প্রতিচ্ছবি।
সরলতা নিয়ে দিন পার করা মানুষগুলো নদীর মতই বহতা।
বাঁধা পেরিয়ে বয়ে চলা,
জীবনের জয়গান আমরা শুনি
উড়িরচরের প্রকৃতিতে।


চরের মাঝে পড়ে থাকি, বড় আশা নেই,
নিজের কাজ নিজে করে, খেয়ে দেয়ে যাই।
সারাটা দিন কাজ করে, রাত কাটে ঘুমে,
সকাল হলেই ডাকাডাকি, সবার নামে নামে।
খেটেখুটেও অনেক শান্তি, চরের মাঝে পাই,
পানির ধারে ঠাণ্ডা হাওয়ায়, খুশিতে গান গাই।


কৃতজ্ঞতা স্বীকার:এই আর্টিকেলে ব্যবহৃত কবিতার চরণগুলো কবি মোঃ সিরাজুল হক ভূঞা-এর মূল কবিতা "চরের জীবন" থেকে সংগৃহীত। লাইনগুলোর সম্পূর্ণ স্বত্ব কবির নিজস্ব।
সর্বশেষ এডিট : ০৭ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৭
১টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মুভি রিভিউ - ম্যায় ওয়াপাস আউঙ্গা : দেশ ভাগের ট্র্যাজেডি আর হারিয়ে ফেলা প্রেমের অসাধারণ এক মেলবন্ধন 

লিখেছেন আলভী রহমান শোভন, ০৬ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



একটা সময় হিন্দি মুভির বেশ ভক্ত ছিলাম। ভালো কোন হিন্দি মুভি রিলিজ পেলেই দেখে ফেলার চেষ্টা করতাম। কিন্তু বিগত কয়েক বছর ধরে হিন্দি মুভি তেমন দেখা হয়ে ওঠে না। বছরে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ছায়াঘর: কেস ফাইল #১৯৯৬ (দ্য লাস্ট রিল)

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৬ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:২২


লেখকের নোট:
এই গল্পটি ৯০-এর দশকের জনপ্রিয় চিত্রনায়ক সালমান শাহর রহস্যজনক মৃত্যুকে ঘিরে জনমনে দীর্ঘদিনের স্মৃতি, নস্টালজিয়া ও আলোচনার ওপর ভিত্তি করে নির্মিত একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ইনভেস্টিগেটিভ থ্রিলার । গল্পে উল্লেখিত... ...বাকিটুকু পড়ুন

কারখানা বাঁচাতে পারিনি, তাই মানুষকে অটো চালাতে হচ্ছে

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৭ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ২:৩৪


বাংলাদেশে এখন এমন এক অদ্ভুত অর্থনৈতিক সংকট চলছে, যেখানে একজন শ্রমিক কারখানায় বিদ্যুৎ না পেয়ে চাকরি হারিয়ে অটো রিকশা চালাচ্ছেন। সেই অটো আবার চার্জ দিতে বিদ্যুৎ খাচ্ছে। যে বিদ্যুৎ... ...বাকিটুকু পড়ুন

হাসিনা কে রাখলে এমনি হবে...দাদা, যতদিন পারেন রাখেন

লিখেছেন অপলক , ০৭ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১০:৩২



২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মুখে পদত্যাগ করে বাংলাদেশ ছাড়ার পর শেখ হাসিনাকে বহনকারী বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর বিশেষ বিমানটি ভারতের দিল্লির উপকণ্ঠে উত্তর প্রদেশের গাজিয়াবাদের হিন্ডন বিমানঘাঁটিতে (Hindon Air... ...বাকিটুকু পড়ুন

খারাপটা কোথায়

লিখেছেন আলমগীর সরকার লিটন, ০৭ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১১:৩৪


বিশ্বখাতায় নাম লিখিলাম পাগল
কবিতারা হেসেই মাঠে হয়ে যায় ছাগল;
ঘাস খাওয়া আনন্দটা অন্যরকম
তবু পাগল বলে কথা, পূর্ণিমায় যুগল;
আজ কাল হাঁটবাজারে হিংসাটা
কম মূ্ল্যেই বিক্রয় হচ্ছে! যোগোপযোগি
সময়টা পাগল ছাড়া চলেই না
লেখার খাতার দামটাও... ...বাকিটুকু পড়ুন

×