somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ফ্রেমে বাঁধা এক ছবি

১২ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৫ বিকাল ৪:২২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

পূর্ব পাকিস্তান ক্রিকেটে তিনি যেন ছিলেন চিত্রকর লিওনার্দো দ্যা ভিঞ্চি। ভিঞ্চি যেমন তুলির আচড়ে শৈল্পিক সব ছবি আঁকতেন তেমনি মাঠের সবুজ ঘাসের ২২ গজের পিচে ব্যাট হাতে তিনি দক্ষ শিল্পীর মত অপূর্ব সব শটের পসরা সাজাতেন। সে সময় তার মত ভাল “স্লগ সুইপ” আর কে খেলতে পারত ? ডানহাতি
স্টাইলিশ ওপেনার আর উইকেটকিপার হিসেবে আজাদ বয়েজ, মোহামেডান স্পোটিং ক্লাব এবং ইস্ট পাকিস্তান প্রভেনসিয়াল দল এর হয়ে আক্রমনাত্মক ব্যাটিংয়ে
নিয়মিত মাঠ মাতিয়েছেন।
কায়েদে আযম ট্রফিতে জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক রকিবুল হাসান আর তিনি থাকতেন নিয়মিত রুমমেট। ক্রিকেট রোমান্টিকরা তার ব্যাটিং জাদুতে মুদ্ধ হয়ে
বলতেন ‘পাড়ার ক্রিকেটের জন্য নয়, বরং জাতীয় দলে খেলার জন্য এই ছেলের জন্ম হয়েছে।’ তিনি শহীদ আব্দুল হালিম চৌধুরী জুয়েল- বীর বিক্রম। সবার কাছে যিনি জুয়েল নামেই বেশি পরিচিত।
১৯৫০ সালের ১৮ জানুয়ারি মুন্সিগঞ্জ জেলার ওয়াজেদ চৌধুরী-ফিরোজা বেগম এর কোল এর জুড়ে এলেন জুয়েল। তিন ভাই আর চার বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন দ্বিতীয়। ক্রিকেট আর জুয়েল যেন ছিলেন সমর্থক শব্দ । ১৯৬৭ সালে জগন্নাথ কলেজ থেকে পড়াশোনা শেষ করে ক্রিকেট খেলার পাশাপাশি একটি ক্যামিকাল কোম্পানীতে চাকরী নেন তিনি। দেশের হয়ে সর্বেচ্চ পর্যায়ে খেলার যোগ্যতা থাকা সত্বেও সেই সময় পূর্ব পাকিস্তান আর পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যকার বৈষম্যের স্বীকার হন তিনি, যা তার মনে গভীর দাগ কাটে।
পূর্ব পাকিস্তান এর ক্রিকেট অঙ্গনে একটি প্রিয় নাম ছিল আজাদ বয়েজ ক্লাব। এই ক্লাব প্রতিষ্ঠা হয়েছিল ক্রিকেটে নিবেদিত প্রাণ মুশতাক আহমেদ এর হাতে। আর্থিক অনটনে থাকা সত্বেও প্রবল ইচ্ছা শক্তি ও অন্যান্যদের সহযোগিতায় তিনি এই ক্লাবটি প্রতিষ্ঠা করেন। দিনরাত ক্লাবেই পড়ে থাকতেন, বন্ধুদের কাছে তিনি ছিলেন ‘সংসার বিবাগী মানুষ।’ নিজ পরিবার বলতে তিনি আজাদ বয়েজকেই বুঝতেন। একজন সংগঠক হিসেবে ক্লাবকে ঘিরেই তার সব ধ্যান জ্ঞান ছিল। “ক্রিকেট-সন্ন্যাসী ” কথাটা তাই মুশতাক আহমেদের নামের পাশে বেশ মানিয়ে যায় । আজাদ বয়েজের হয়ে খেলার কারণে মুশতাক আহমেদের প্রতি জুয়েল এর ছিল প্রগাঢ় ভালবাসা ও শ্রদ্ধাবোধ।
এসে যায় উত্তাল ৭১। ২৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকা টেস্টে রকিবুল হাসান তার ব্যাট এ “জয় বাংলা” লিখা স্টীকার লাগিয়ে ক্রিকেট ময়দানে প্রতিবাদের ঝড় তোলেন। ২৫ মার্চের কালরাতে পাকিস্থানি হানাদাররা এদেশে শুরু করে ইতিহাসের জঘন্যতম গণহত্যা। এই গণহত্যা থেকে রেহাই পাননি ক্রিকেট সংগঠক মুশতাক আহমেদও।
পাকিস্তানিদের বুলেট ঝাঝড়া করে দেয় তার শরীর। ক্লাব অন্ত:প্রান মানুষটির মৃত দেহ পড়ে থাকতে দেখা যায় ঢাকা ডিভিশন স্পোর্টস এসোসিয়েশন এর প্যাভিলিয়নের একটি ঘরে। দুদিন এভাবেই অবহেলায় হয়ে পড়ে ছিল তার ক্ষতবিক্ষত শরীরটা।
২৭ শে মার্চ জুয়েল, সৈয়দ আশরাফুল হক (বর্তমানে এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিল এর চীফ এক্সিকিউটিভ) কে সাথে নিয়ে সনাক্ত করেন সদাহাস্যজ্জ্বল শহীদ মুশতাক আহমেদের লাশ। প্রিয় মানুষের ক্ষতবিক্ষত লাশ তাতিয়ে দেয় জুয়েলকে। তার মনে দ্রোহের আগুন জ্বলে ওঠে, মাথায় খুন চাপে, রক্তে ধ্বংস নাচে, বুকের ভিতর অনুভূত হয় দেশের জন্য লড়ার তাগিদ । চটজলদি ব্যাট-প্যাড তুলে রেখে দেশকে শত্রুমুক্ত করতে হাতে স্টেনগান তুলে নেয়ার সিদ্ধান্ত নেন জুয়েল। ভারতে ট্রেনিং নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।
বাঁধা হয়ে দাঁড়ায় মায়ের “মাতৃসুলভ স্নেহ”। মা যে বুকের ধন কে কিছুতেই হাত ছাড়া করতে চাননা। কিন্তু রক্তে যার দেশ কে স্বাধীন করার নেশা তাকে থামায়, সাধ্য কার? ডানপিটে জুয়েল কে তাই কোন মায়ার বাঁধনেই বেঁধে রাখা যায়নি, বাউন্ডুলে জীবনে গাঁটছড়া বাঁধেননি কারো সাথেই। উত্তাল ৭১ এ গৃহত্যাগী হয়ে প্রশিক্ষনের জন্য ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের মেলাঘরে পাড়ি জমালেন জুয়েল। ৩১ মে, কাউকে কিছু না বলে চুপি চুপি ঘর ছাড়ার বেশ কিছু দিন আগে মা কে ফ্রেমে বাঁধানো নিজের ছবি দিয়ে বলে ছিলেন ‘আমি যখন থাকব না, এই ছবিটাতে তুমি আমাকে দেখতে পাবে ।’
ভারতে সেক্টর কমান্ডার খালেদ মোশাররফের তত্ত্বাবধায়নে ২ নম্বর সেক্টরে ট্রেনিং শেষে দেশে ফিরলেন তিনি। প্রশিক্ষন প্রাপ্ত ভারত ফেরত জুয়েল তখন আর বোলারদের পিটিয়ে নাকের জল চোখের জল এক করে দেয়া ব্যাটসম্যান নন বরং গেরিলা যোদ্ধা। বদিউজ্জামান, আলম, পুলু, সামাদ সহ অনান্যদের সাথে তিনিও
যোগ দিলেন মুক্তিবাহিনীর ক্র্যাক প্লাটুনে। শুরু হয় তাদের গেরিলা অপারেশন। আক্রমনাত্মক ব্যাটসম্যান জুয়েল যেন যুদ্ধের ময়দানে আরো আক্রমনাত্মক। ক্রিকেট ব্যাটের মত অস্ত্র ও সমান দক্ষতায় চালাতে পারতেন।
ঢাকার ফার্মগেট, এলিফ্যান্ট রোডের পাওয়ার স্টেশন, যাত্রাবাড়ী সহ একাধিক এলাকায় অতর্কিত হামলায় দিশেহারা করে দেন পাক সেনাদের। একটি গেরিলা অপারেশন থেকে নৌপথে ফেরার সময় রাজাকার ও পাকবাহিনীর অতর্কিত বুলেটের আঘাতে জুয়েলের হাতের তিনটি আঙ্গুলে মারাত্মক জখম হয়েছিল।
ক্রিকেটার জুয়েলের মনে তখন আতংক ‘এই হাত দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশে ক্রিকেট
খেলতে পারব তো?’
আহত হয়ে জুয়েল, বড় মগবাজারে আজাদ এর বাসায় চিকিৎসাধীন ছিলেন। রাজাকার মারফত এই খবর পৌঁছে যায় পাকিস্তান হানাদারদের কাছে। ২৯ আগষ্ট ঐ বাসায় হানা দিয়ে পাকিস্তানি সেনারা আটক করে জুয়েল, আজাদসহ আরও অনেকে। জুয়েলের মুখ থেকে কথা বের করার জন্য ব্যান্ডেজে বাধা ভাঙ্গা আঙ্গুল মোচড়াতে থাকে পাক সেনারা। জুয়েলের বুক ফাটা আর্তনাদে ভারী হতে থাকে ঢাকার আকাশ, সেই আর্তনাদে মিলিয়ে যেতে থাকে স্বাধীন বাংলাদেশে ক্রিকেট খেলতে চাওয়া এক ক্রিকেটারের স্বপ্ন।
৩১ আগষ্টের পর আর কোন খোঁজ পাওয়া যায়নি জুয়েলের। ধারণা করা হয় ৩১ আগষ্টেই তাকে মেরে ফেলা হয়। ১৬ ই ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হলো। একটি লাল-সবুজ পতাকা পাওয়া গেল। যে লাল রংয়ের ভিতর মিশে ছিল জুয়েলেরও লাল টকটকে তাজা রক্ত ।এক সময়ের টিমমেট রকিবুল হাসান বাংলাদেশ দলের অধিনায়ক হলেন, শুধু জুয়েল আর ফিরলেন না মাঠের ২২ গজের পিচে। স্বাধীন বাংলাদেশে ক্রিকেট খেলার স্বপ্নটা তার কর্পূরের মতোই মিলিয়ে গেল। ক্রিকেট রোমান্টিকদের কাছে তিনি তখন ‘ফ্রেমে বাঁধা এক ছবি।’
তবে বাংলাদেশ যখন খেলে অদৃশ্য থেকে দুজনে নিশ্চয়ই উপস্থিত থাকেন গ্যালারীতে।হয়ত মুগ্ধ নয়নে উত্তরসূরী মাশরাফি, মুশফিক, সাকিব, তামিম-দের
এগিয়ে যাওয়া দেখেন। হয়ত না ফেরার দেশ থেকেই বলেন ‘আমরা যে স্বপ্নগুলো পূরণ করতে পারিনি, তোমরা সেগুলো পূরণ করবে নিশ্চয়ই । তোমাদের দিকে যে বুকভরা আশা নিয়ে তাকিয়ে আছি আমরা।’ এই স্বপ্নের পথ ধরেই এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ টিম, শহীদ জুয়েল -মুশতাক আর কোটি কোটি বাঙ্গালির স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যে ।

সর্বশেষ এডিট : ১২ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৫ বিকাল ৪:২৩
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মতামত পোস্ট: বাহাদুর পাকিদের আসল চেহারা (রিপোস্ট)

লিখেছেন অর্ক, ১৮ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১০:৩৩



‘খুব ভালো জঙ্গ চলছে। একের পর এক নাপাক হিন্দু সেনা হালাক (মৃত্যু) হচ্ছে। রাজাকার আলবদরদের নিয়ে পাকিস্তানের বীর সেনা যুদ্ধ জয়ের দ্বারপ্রান্তে। দুয়েক দিনের মধ্যেই হিন্দুস্থান হাঁটু গেড়ে বসে... ...বাকিটুকু পড়ুন

অধরা বালিকা

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ১৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ভোর ৬:১৮




লোভনিয়া তুমি এক অধরা বালিকা
ঘুমগুলো কেড়ে নাও ধুম করে তুমি
অথচ আমার জন্য তুমি মরুভূমি
পর ঘরে মহারানি হয়ে থাক চাই।
পরের হৃদয় রাজ্যে থাকবে মালিকা
তেমনটা আশাকরি। তাতেই যে আমি
অনেক প্রশান্তি... ...বাকিটুকু পড়ুন

যেখানে খোদা নেই; সেই ঠিকানার সন্ধানে( একটি দীর্ঘ সুফি দার্শনিক আত্মজিজ্ঞাসা)

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ১৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৮:১৮


প্রথমেই জানাই আমার এই লেখাটি ব্লগার মরুভুমির জলদস্যুর লেখা “শরাব পিনে দে”
হতে উৎসারিত, তাই তাঁর প্রতি জানাই কৃতজ্ঞতা ।

সেই লেখাটিতে তিনি মির্জা গালিব এর বিখ্যাত শেরটি... ...বাকিটুকু পড়ুন

২৮ বছর পর ঋণের খোঁজে সন্তান বনাম হাজার কোটি টাকার খেলাপি: আমাদের ব্যাংকিং ও শেয়ারবাজারের ট্র্যাজেডি

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ১৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১:৫৯

সংবাদের পাতার দুটি বিপরীতমুখী ছবি সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের চরম এক সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈপরীত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়।

একদিকে আমরা দেখি, ২৮ বছর আগে বাবার নেওয়া মাত্র ১০ হাজার টাকার দাদন... ...বাকিটুকু পড়ুন

এই ধরণের মানুষগুলোই বি,এন,পি-কে আবারও ডোবাবে!

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ৮:০১



পড়ালেখার পিছনে টাকা খরচ করা 'টাকা পাচার'?
যারা বিদেশে পড়ালেখা করতে যান, তাঁরা কি দেশের টাকা লুট করে নিয়ে যান, নাকি নিজের বাপের টাকায় পড়ালেখা করেন?

পড়ালেখার... ...বাকিটুকু পড়ুন

×