
সম্ভবত নিরানব্বুই এর মাঝামাঝি সময় ছিল সেটা। মাত্রই মুহসীন হলে উঠেছি। এক সকালে হঠাৎ দেখি হলের বড় ভাইয়েরা, মানে ছাত্রনেতাদের ভেতরে এক ধরনের দৌঁড়াদৌঁড়ি শুরু হয়েছে। একটা উত্তেজনা উত্তেজনা ভাব। পরে শুনলাম, গ্রামীন ফোন কি এক ‘সিম’ ছেড়েছে বাজারে, সেটা পাওয়ার জন্যই এই হুলুস্থুল ব্যস্ততা।
তখন পর্যন্ত সিম, প্রিপেইড-পোস্টপেইড, এইগুলো কিছুই বুঝি না; মোবাইল ফোনের সাথেই পরিচয়টাই ছিল সিনেমার মাধ্যমে। এরকম সময়ে গ্রামীন ফোনের এই ‘প্রিপেইড সিম’ মোবাইল ফোনকে মোটামুটি সহজলভ্য পর্যায়ে নিয়ে আসে, যদিও তার জন্য যে পরিমাণ টাকা দরকার, সেটা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে থাকা একজন সাধারণ ছাত্রের কাছে থাকার কথা না। কিন্তু ছাত্রনেতারা যেহেতু সাধারণের পর্যায়ে পড়ে না, তাই বাজারে আসার প্রথম দিনই একটা প্রিপেইড সিমের দখল পেতে তাদের দৌঁড় ঝাঁপ ছিল দেখার মত।
সন্ধ্যার দিকে, আমার ইয়ারমেট এবং খুবই কাছের বন্ধু বিপ্লবের (যে সেই প্রথম বর্ষেই রাজনীতিতে জড়িয়ে গিয়েছিল এবং পরবর্তীকালে ছাত্রলীগের সহসভাপতি হয়েছিল) রুমে গিয়ে দেখি, বিপ্লবও একটা প্রিপেইড সিমসহ মোবাইল ফোনের মালিক হয়েছে। সেই প্রথম এত কাছ থেকে মোবাইল ফোন দেখা এবং হাতে নেওয়ার সুযোগ হল। ওর ফোনসেটটা ছিল বোশ (BOSCH) ব্র্যান্ডের। সেট হিসেবে সেটা খুব একটা দামী এবং উন্নতমানের না হলেও ওই সময় বিপ্লবের ফোনটা আমাদের কাছে ছিল একটা ‘মহার্ঘ বস্তু’ বিশেষ। যার বদৌলতে বিপ্লবের অবস্থান কয়েক ধাপ উপরে উঠে গিয়েছিল।
বিপ্লবের ফোন ব্যবহার করার সুযোগ থাকলেও আমার কোন ক্ষেত্র ছিল না। মানে বলতে চাচ্ছি, মোবাইল ফোনে কল করব এমন পরিচিত ও প্রয়োজনীয় লোকই ছিলনা তখন। প্রয়োজনীয় কোথাও ফোন করতে গেলে হলের কয়েন বক্স বা কার্ড ফোন দিয়েই চলত, সবখানে তখনও টিএন্ডটি’র ল্যান্ডফোন এর রাজত্ব। আর যশোরে বা ঢাকার বাইরে ফোন করতে গেলে আমরা যেতাম আজিমপুর বা মৈত্রী হলের গেটের পাশের বিভিন্ন ফোন সেন্টারে, যেখান থেকে আমরা ২০ টাকায় ৫ মিনিট কথা বলতে পারতাম।
এরও বছর দেড়েক পর তিথি আমাদের বন্ধুবলয়ে প্রথম ফোন কেনে। বলাবাহুল্য, সেটাও গ্রামীন ফোনের এই প্রিপেইড সার্ভিসই। ওর সেটটা ছিল সিমেন্স সি-৩৫। ভাগ্যক্রমে এই ফোনটা মাঝে মাঝে আমার কাছেও থাকত। সে এক অন্যরকম অনুভূতি।
তারপর আস্তে আস্তে আরো অনেকেই ফোন কিনলো। রিন্টু, জুঁথি আর তানিয়া কিনলো সিটিসেল এর রিম এম্বেডেড সেট, আবু সাইদ কিনলো প্যানাসনিক, বিপ্লব সেট চেইঞ্জ করে ফিলিপস ডিগা নিলো, তিথিও নতুন আরেকটা সেট নিলো সনি-এরিকসন এর। আরো অনেকেই অনেকরকম সেট কিনলো। কিন্তু তখনও আমার নিজের ফোন হয়নি। প্রবল সাধ থাকলেও সাধ্য ছিলনা।
দু’হাজার এক এর মাঝামাঝি সময়ে আমি একটা অ্যাড ফার্মে পার্টটাইমার হিসেবে কাজ শুরু করি। ওখানে প্রায় সবার হাতেই মোবাইল ফোন। নোকিয়া, স্যামসাং, সাজেম, সিমেন্স, সনি, বিভিন্ন রকমের সেট। এত এত ফোনসেট চারদিকে, কিন্তু আমার কেন যেন নোকিয়ার প্রতি একটা আলাদা মুগ্ধতা ছিল।
অ্যাড ফার্মে ছয় মাস পার হয়ে গেলে একদিন সিওও (চিফ অপারেশন অফিসার) তানভীর ভাই বললেন, তোমাকেও ফোন দেওয়া হবে, কি নিতে চাও? আমার মুখ থেকে বেরিয়ে গেল, ‘নোকিয়া’। তানভীর ভাই বললেন, আরে আমি বলেছি কোন সার্ভিস নিতে চাও? আমি ফিউজ হয়ে গিয়ে বললাম, গ্রামীন। অবশেষে আমার একটা ফোন হলো। নোকিয়া ৩৩১০। তখনকার দিনের বস সেট। দু’হাজার সালে লঞ্চ করা এই সেটটি তখন চলন্ত ইতিহাস।
সে সময় চলতি পথে, মিটিংয়ে, ক্লাসে বা অন্য কোনখানে, ফোনসেট; তা যে পদেরই হোক না কেন, তা পকেটে না রেখে হাতে রাখতে হবে এবং বিকট শব্দে রিংটোন বাজবে, এই নিয়মই বলবৎ ছিল। আমিও এর ব্যতয় করিনি। ফলাফলটাও নগদে পেলাম। কয়েক মাস পরের ঘটনা, কলাবাগান থেকে এক সন্ধ্যায় রিকশা করে হাতিরপুল-পরিবাগ হয়ে মগবাজার যাচ্ছি, পরিবাগের কোণায় মসজিদটা পার হয়ে ছিনতাইকারী আমাকে ঠেকিয়ে আমার সাধের ফোনটা নিয়ে গেল... ...
পরবর্তী সেট নোকিয়া ৩৩১৫ কেনার আগ পর্যন্ত অল্প কয়েকদিন অফিসের একটা স্পেয়ার ফোনসেট সাজেম এবং এই গত ডিসেম্বরে জীবনের প্রথম স্মার্টফোন স্যামসাং গ্যালাক্সি এস সেভেন নেয়ার আগ পর্যন্ত বিভিন্ন মডেলের নোকিয়াই আমার ফোন ছিল।
এত কথা মনে পড়ল প্রথম আলোর এক নিউজ দেখে। ফেরত আসছে নোকিয়া। আনন্দবাজার লিখেছে ‘মেদ ঝরিয়ে নস্টালজিয়া নিযে ফিরল ৩৩১০’। আসলেই তাই, নোকিয়া শুধু ফোন নয়, একটা নস্টালজিয়া। এন্ড্রয়েড অপারেটিং সিস্টেমের স্মার্টফোনও আনছে নোকিয়া। আহ, আর কিছুদিন আগে আসলে এই স্যামসাং কেনা লাগতো না।
সর্বশেষ এডিট : ২৮ শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ বিকাল ৩:০৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


