somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

দিনে দিনে তবে কি আমরা মনুষ্যত্বহীন হয়ে পড়ছি?

১২ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৭ দুপুর ২:৩৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


আটানব্বুইয়ের রোজার মধ্যে একবার ‘খ্যাপে’ ক্রিকেট খেলতে গেলাম নরসিংদীর বেলাবো বা রায়পুরাতে। শীতকাল ছিল সে সময়। দশ বারোজনের এক টিম নিয়ে মাইক্রোবাসে করে সকাল সকাল ঢাকা থেকে যাত্রা শুরু করলাম এবং ম্যাচ হেরে আমরা আবার বিকেলের দিকে ঢাকার পথে রওনা হলাম। মাঝামাঝি রাস্তায় আসার পর এক বিরান এলাকায় আমাদের মাইক্রোবাসের চাকা পাংচার হয়ে গেল। বিপদের উপর বিপদ, মাইক্রোতে স্পেয়ার চাকাও ছিলনা। এমন এক যায়গা, আশে পাশে কোন বাড়ি ঘর দেখা যাচ্ছে না। এদিকে সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছে, মাগরিবের আজান দিয়ে ফেলেছে।

আমরা পুরো দিশেহারা হয়ে পড়লাম। একেতো রোজা, তার উপর ম্যাচ হেরে বিধ্বস্ত। একটু যে কোথাও থেকে পানি খাবো, সে সুযোগও নেই। বেশ দুরে একটা বাড়ি মত দেখা যাচ্ছে। দল বেঁধে আমরা সেদিকেই হাটছি।

আমরা এতগুলো মানুষ। এইভাবে হঠাৎ করে অপরিচিত বাড়িতে ঢুকতে খুবই সংকোচ হচ্ছে, আবার এদিকে পানি তৃঞ্চায় কাতর হয়ে আছি। অগত্যা সবাই মিলে ঢুকে পড়লাম। হতদরিদ্র না হলেও নিতান্তই দরিদ্র পরিবার। তারাও হয়ত মাত্র ইফতার নিয়ে বসেছেন। আমরা আমাদের অবস্থা জানিয়ে খুব সংকোচ নিয়ে বললাম- আমরা জাস্ট একটু পানি খাব।
ওই ভদ্রলোক আমাদেরকে জোর করে বসিয়ে রাখলেন এবং অল্প সময়ের মধ্যেই সবার জন্য পানির সাথে সেমাই আর মুড়ির ব্যবস্থা করলেন। ভদ্র মহিলা বেড়ার আড়াল থেকে খুব জোরাজুরি করতে লাগলেন যেন আমরা রাতে খেয়ে যাই...

খুবই সামান্য উপকরণ, খুবই সামান্য ব্যবস্থা। কিন্তু এই দরিদ্র পরিবারটি আমাদের এই বিরাট বাহিনীকে আপ্যায়নের সাহস দেখিয়ে মানবিকতার যে উদাহরণ সৃষ্টি করলেন, সেটার পরিধি অতি বিশাল। অপরিসীম।

আমি জানি, এ রকম ঘটনা আমাদের সবার জীবনেই আছে। হয়ত আরো বেশি হৃদয়স্পর্শী। মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবিক বিপর্যয় এবং প্রতিবেশি দেশের সহযোগিতার ইতিহাসতো আমরা জানিই। কিন্তু তার বিপরীতে আজ মানবতার করুণ পরিস্থিতিতে আমরা কি প্রতিদান দিচ্ছি?

আজকে পাশ্ববর্তী দেশে যখন এক জঘন্যতম গণহত্যা চলছে, নিরপরাধ নারী, শিশুরা নিরুপায় হয়ে নিতান্তই বাঁচার তাগিদে এ দেশে আশ্রয় নিতে চাচ্ছে, তখন দেশের সুবিধাবাদি একটা ক্ষুদ্রাংশের সাথে কিছু ব্লগারও স্বার্থপরতার চুড়ান্ত রুপ দেখিয়ে দিচ্ছেন। এর স্বপক্ষে বিভিন্ন যুক্তিও তুলে ধরছেন। আমরা ভুলেই গেছি যে একাত্তরে আমরা ঠিক এভাবেই প্রাণ বাঁচাতে দেশ ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়েছিলাম। আর তখনও ভারতীয় জনতার একটা স্বার্থপর অংশ এভাবেই বিভিন্ন যুক্তি দিয়ে বিতর্ক করেছে। বাংলাদেশিদের গ্রহণ না করার ব্যাপারে জনমত সৃষ্টি করেছে।

আজকে যারা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন মত দিচ্ছেন, খোঁজ নিলে দেখা যাবে, হয়ত এই শ্রেণীর বড় একটা অংশের পূর্বপুরুষগণ ভারতে শরণার্থী হিসেবে ছিলেন, হয়ত তারা নিজেরা এখন বিভিন্ন সুবিধা নিয়ে দেশে বিদেশে বৈধ বা অবৈধভাবে আশ্রয় নিয়ে নিরাপদে থেকে দেশ উদ্ধার করছেন। সেই হীনমন্যতা থেকেই হয়ত এমনটা করছেন। অথচ রোহিঙ্গা শরণার্থী সমস্যার যারা প্রত্যক্ষ ভুক্তভোগী, সেই পার্বত্য এলাকার মানুষের ভেতরে কোন নেতিবাচক মনোভাব দেখা যাচ্ছে না।

আসলে রোহিঙ্গা সমস্যাটি আমাদের কাছে এক ধরণের ‘ছাঁকুনি’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। দেশে বিদেশে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ইস্যুতে আমাদের যে সকল সুশীল/সমাজকর্মী/মানবাধিকারকর্মী/নারী অধিকারকর্মীদেরকে সর্বদায় অতিমাত্রায় উচ্চকিত থাকতে দেখেছি, আজ দেখা যাচ্ছে, তাদের মুখে কোন রা নেই। নিরপেক্ষতার যে মুখোশ তারা পরে থাকতেন, এই রোহিঙ্গা ছাঁকুনিতে পড়ে তা ভেঙে খানখান হয়ে গেছে। ব্যক্তিস্বার্থ, দেশীয় ও আঞ্চলিক রাজনীতি আর বস্তুবাদের পাল্লায় পড়ে তারা গণমাধ্যমে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সমানে তারা রোহিঙ্গাদের বিপক্ষে বিষোদগার করে যাচ্ছেন। অন্যায় করছেন। খুবই দুঃখজনক যে, এরকম পরিস্থিতিতে যখন বিদেশ থেকে সহযোগিতা আসছে, তখন তারও সমালোচনা এরা করছেন

শুধু রোহিঙ্গা ইস্যু নয়, খেয়াল করলে দেখবেন, তুচ্ছাতিতুচ্ছ বিষয়েও নিজস্বার্থে কেউ এখন আর বিন্দুমাত্র ছাড় দিতে রাজী নয়। রাস্তায় একটা মানুষ বিপদে পড়লে কেউ এগিয়ে আসে না, উল্টো এই বিপদ থেকে কিভাবে স্বার্থ উদ্ধার করা য়ায়, সে উপায় খুঁজতে থাকে।

আচ্ছা, আমরা কি দিনে দিনে মানবিকতা হারিয়ে, মনুষ্যত্বহীন হয়ে অমানুষ হয়ে পড়ছি? আমাদের সুকুমার বৃত্তিগুলোকি দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে? না হলে কিভাবে আমরা মানুষের বিপদের সুযোগ নিতে পারি? আমরা ভুলেই গেছি যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই অসহায়দের কথা বলে গিয়েছেন কত সুন্দর করে-

সকাতরে ওই কাঁদিছে সকলে, শোনো শোনো পিতা
কহো কানে কানে, শুনাও প্রাাণে প্রাণে মঙ্গলবারতা।
ক্ষুদ্র আশা নিয়ে রয়েছে বাঁচিয়ে, সদাই ভাবনা
যা-কিছু পায় হারায়ে যায়, না মানে সান্তনা।।

সুখ-আশে দিশে দিশে বেড়ায় কাতরে
মরীচিকা ধরিতে চায় এ মরু প্রান্তরে।
ফুরায় বেলা, ফুরায় খেলা, সন্ধ্যা হয়ে আসে
কাঁদে তখন আকুল-মন, কাঁপে তরাসে।
কী হবে গতি, বিশ্বপতি, শান্তি কোথা আছে
তোমারে দাও, আশা পূরাও, তুমি এসো কাছে।।

এ অবস্থায় আমরা যদি কাউকে সাহায্য না-ই করতে পারি, অন্ততপক্ষে বিরুদ্ধাচারণ না করে নিশ্চুপ থাকলেও তো পারি। কিন্তু অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, আমাদের সে বোধটুকুও লোপ পেয়েছে। তবে আশার কথা হলো, ব্যক্তিস্বার্থের এই অমানিশা শহরাঞ্চলকে গ্রাস করলেও সারা দেশকে গ্রাস করতে পারেনি এখনো।

ছবিসূত্র
সর্বশেষ এডিট : ১২ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৭ দুপুর ২:৩৩
৬টি মন্তব্য ৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বাংলাদেশের আদি জনগোষ্ঠী কারা

লিখেছেন কিরকুট, ১১ ই আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৩:৫৬


বাংলাদেশের আদি জনগোষ্ঠী নিয়ে আলোচনা হলেই আমাদের সামনে সাধারণত পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা কিংবা অন্যান্য পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর কথা আসে। কিন্তু একটি প্রশ্ন প্রায়ই এড়িয়ে যাওয়া হয় বাংলাদেশের আদি জনগোষ্ঠী... ...বাকিটুকু পড়ুন

দেবী!

লিখেছেন করুণাধারা, ১১ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ৯:৩৩



১)
দেবী খুবই বুদ্ধিমতী এবং সুন্দরী। এক উচ্চাভিলাষী পরিবারে দেবীর জন্ম, এমনই উচ্চাভিলাষী যে তাদের একমাত্র ভাবনা কীভাবে সবাইকে ছাড়িয়ে উপরে ওঠা যায়! দেবীর যখন জন্ম হলো তখন তার ভাইয়ের... ...বাকিটুকু পড়ুন

ছোট গল্পঃ সুখ

লিখেছেন সামিয়া, ১১ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ৯:৩৬



পরীক্ষার রেজাল্ট বেরিয়েছে সুমনের, জিপিএ ৫ পেয়েছে জানার পর পুরো দিনটিই বদলে গিয়েছে ওর আনন্দে।যেন পৃথিবীর সব খুশির দরজা একসঙ্গে খুলে গেছে ওর জীবনে।
ছেলেটা ওর বাবা মায়ের কাছে... ...বাকিটুকু পড়ুন

র-প্রধানের ঢাকা সফর: খবর শুনেই হাসপাতালে ভর্তি পাকিস্তানের হাইকমিশনার !

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১২ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ১২:১৭


রসিকতা বাদ দিয়ে বলি, দুটি ঘটনাই সত্যি। বাংলাদেশে RAW এর প্রধান পরাগ জৈন এসেছেন এবং পাকিস্তানের হাইকমিশনার এখন হাসপাতালে আছেন। দুটি ঘটনা আসলে পরস্পরবিচ্ছিন্ন, একটার সঙ্গে আরেকটার কোনো... ...বাকিটুকু পড়ুন

ভেষজ চায়ের সঙ্গে আমার অব্যাহত প্রেম!

লিখেছেন জুল ভার্ন, ১২ ই আগস্ট, ২০২৬ সকাল ১১:৫৩



ভেষজ চায়ের সঙ্গে আমার অব্যাহত প্রেম!

জীবনে অনেক কিছুই শেষ করেছি- কিন্তু ভেষজ চায়ের পরীক্ষা-নিরীক্ষা এখনও শেষ হয়নি!
সবুজ চা, লেবু-আদা-তেজপাতা, দারুচিনি, এলাচ-লবঙ্গ, গোলমরিচ, পুদিনা-রোজেলা, জাফরান, জেসমিন থেকে শুরু... ...বাকিটুকু পড়ুন

×