
শহীদুল ইসলাম প্রামানিক
(সৌজন্যে কামরুন্নাহার আপা)
গত ১৩ই ফেব্রুয়ারী পহেলা ফাল্গুন ব্লগার কামাল ভাইয়ের শুক্রবারের আড্ডায় গোলাম মোস্তফা ভাইয়ের মন্তব্যে কামরুন্নাহার আপা লালমোহনের ছবি দিয়ে বলেছিলেন বাসন্তী শুভেচ্ছায় বাসন্তী রঙের মিষ্টি খান। লালমোহনের চেহারা দেখেই জিহ্বায় জল এসে গিয়েছিল। মিষ্টির চেহারা খুবই সুন্দর লাল লাল। কামরুন্নাহার আপাকে জিজ্ঞেস করলাম এটা কি আপনার হাতে বানানো? তিনি বললেন, না বাজার থেকে কিনে আনা।
লালমোহনের নাম ভুলেই গিয়েছিলাম। কামরুন্নাহার আপার দেয়া লালমোহনের ছবি দেখে পাকিস্থান আমলে প্রথম যেদিন লালমোহন খেয়েছিলাম সেই কথা মনে পড়ে গেল। সম্ভাবত আটষট্টি বা ঊনসত্তর সাল হবে। বাবার সাথে ফুলছড়ি থানা শহরে বেড়াতে গিয়েছি। বাবার উদ্দেশ্য হলো সিও অফিসে জমি সংক্রান্ত কিছু অফিসিয়াল কাজ করা, আর আমার উদ্দেশ্য হলো ময়রার দোকানের কিছু মিষ্টি ভক্ষণ করা। সেই সময়ে ফুলছড়ি বাজারে কয়েকটি মিষ্টির দোকান ছিল। তার মধ্যে ছতিশ ঘোষের মিষ্টির দোকাটি ছিল বড় এবং নানান পদের মিষ্টি তৈরী করতো। ছতিশ ঘোষ এই এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা নন। অন্য জেলা থেকে এসে এখানে মিস্টির দোকান দিয়েছিলেন। সম্ভাবত এই ঘোষকে একাত্তর সালে মেরে ফেলা হয়েছে অথবা ব্যাবসা গুটিয়ে অন্য এলাকায় চলে গেছেন। কারণ দেশ স্বাধীনের পরে ওই মিষ্টির দোকান আর চালু হয় নাই। সেখানে সন্তোষ আর কালিয়ার হাঁড়ি পাতিলের দোকন হয়েছিল।
বাবা সবসময় আমাকে ছতিশ ঘোষের মিষ্টির দোকানে মিষ্টি খাওয়াতেন। সেদিনও তার দোকানে গিয়ে মিষ্টি খাওয়ার জন্য বসেছি। ছতিশ ঘোষের পরনে এক বস্ত্র। ধুতির এক আঁচল পরেছে আরেক আঁচল গায়ে জড়িয়ে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে আছে। হোটেল বয় কাকরু এসে বলল, কিরে কি খাবি? আমি বললাম, রসগোল্লা খাবো। কাকরু বলল, না, আজকে তোকে রসগোল্লা নয়, লালমোহন খাওয়াবো। কাকরু আমার চেয়ে বযসে অনেক বড়। আমি বললাম, দাদা লালমোহনের দাম কত? কাকরু বলল, বেশি না চারানা করে। সেই সময় ভাল রসগোল্লা দেড় টাকা সের বিক্রি হতো। প্রতি পিচ দুই আনা ছিল। সেইখানে চারানা দাম বেশি বেশি মনে হলো। কিন্তু লালমোহন খাওয়ার লোভটাও সামাল দিতে পারছিলাম না। আমি কোন কথা না বলে চুপ করে থাকলাম। কাকরু লোহার বড় কড়াই থেকে লালচে রংয়ের হাঁসের ডিমের সমান দু’টি মিস্টি এনে দিল। চামুচ দিয়ে কেটে দেখি উপরে লাল ভিতরে সাদা। খেয়ে খুব মজা পেলাম। বাবা এসে মিষ্টির দাম দিলেন। সেই মিষ্টির স্বাদ যেন আজো মুখে লেগে আছে।

কাকরুর দুখের কথা কিছু বলা দরকার। কাকরুর ভাল নাম দীন বন্ধু। বুকের হাড্ডি বেরোনো শুকনা চেহারার কারণে সবাই তাকে ইয়ার্কী করে কাকরু নামে ডাকে। কাকরুর বাড়ি আমাদের গ্রামে। বাবা দীনেশ চন্দ্র সরকার আধা পাগোল। জমিজমা আছে, তবে আধাপাগোল হওয়ায় ঠিক মত চাষাবাদ করতে না পারায় পেটের ভাত জোটে না। সবসময় অভাব লেগেই থাকে। কাকরু ক্লাস নাইনে ভর্তি হয়েছে। পাঁচ ভাইবোনসহ সাত জনের সংসার। অভাব এমনভাবে জেঁকে বসেছে যে এক বেলাও ভাত জুটছে না। দু’দিন হলো সবাই না খাওয়া। ক্ষুধায় কুলাতে না পেরে বাধ্য হয়ে কাকরু এই মিষ্টির দোকানে এসে খাওয়াসহ মাসিক দশ টাকা বেতনে চাকরী নিয়েছে।
দেশ স্বাধীনের কয়েক বছর পরে কাকরু অনেক পয়সাওয়ালা হয়েছিল। আমাদের এলাকায় প্রথম সৌদি চাকুরী করতে যায় এই কাকরু। কোম্পানীর খরচে যাওয়া আসা করায় কাকরুর চারানা পয়সাও খরচ করতে হয় নাই। তখন আমাদের এলাকার লোকজন জানতই না যে বিদেশে চাকরী করা যায়। কাকরুই প্রথম সৌদী তিন বছর থেকে এসে সবার নজর খুলে দেয়। বিদেশ ফিরে অনেক পয়সার মালিক হয়ে জমিজমা কিনে সংসারের সচ্ছল অবস্থা ফিরিয়ে আনে। কিন্তু ততদিনে তার বাবা অনাহারে অর্ধাহারে চুয়াত্তুরের অভাবে না খাওয়া অবস্থায় মারা যায়। কাকরুর সেই সুখ বাবা দীনেশ চন্দ্র সরকারের ভাগ্যে জোটে নাই।

যাই হোক কামরুন্নাহার আপার দেয়া ছবিতে লালমোহনের চেহারা দেখে ছতিশ ঘোষের দোকানের সেই লালমোহনের কথা মনে পড়ে যায়। তৃপ্তিসহকারে লালমোহন খাওয়ার জন্য ঘরেই তৈরী করার প্রস্তুতি গ্রহণ করি। তবে ছতিশ ঘোষের তৈরী সেই স্বাদ কখনই পাবো না। কারণ সেই লালমোহন ছিল খাঁটি দুধের তৈরী ছানা ও মাওয়া দিয়ে তৈরী। আর আমি আজকে যে লালমোহন তৈরী করে দেখাবো সেটা হলো দুধের স্বাদ ঘোলে মিটানোর মত বিকল্পভাবে তৈরী। তবে যেভাবেই তৈরী করি না কেন, এই লালমোহনও অনেক মজাদার।
যাই হোক লালমোহন তৈরী করতে যে সব উপকরণ লাগবে তা নিচে দেয়া হলো ঃ
১। চিনি দুই কাপ
২। পানি দুই কাপ
৩। ময়দা আধা কাপ
৪। বেকিং পাউডার দুই চা চামচ
৫। ফুল ক্রিম গুড়া দুধ পৌনে এক কাপ বা একাপের চার ভাগের তিন ভাগ
৬। ডিম একটি
৭। তেল বা ঘি আড়াই টেবিল চামচ
৮। ভাজার জন্য পরিমাণ মত তেল
৯। ময়ান করার জন্য আরো এক বা দুই চা চামচ চিনি এবং এক বা দুই টেবিল চামচ পানি লাগবে অথবা পরিমান অনুযায়ী।

প্রথমেই চিনি দুই কাপ এবং পানি দুই কাপ দিয়ে সিরা তৈরী করে নিন। সিরা তৈরী করার জন্য বলে রাখি যতটুকু চিনি নিবেন সেই পরিমাণ পানি দিবেন। যদি সিরা বেশি করতে চান তাহলে যত কাপ চিনি দিবেন তত কাপ পানি দিয়ে জাল দিবেন। সিরার পানি ফুটলে নামিয়ে রাখবেন।

এবার ডিম ভেঙে ভাল করে ফেটে নিন, এর পর এক বা দুই চা চামচ চিনি এবং আড়াই টেবিল চামচ ঘি বা তেল ডিমের সাথে ভাল করে মিশিয়ে নিন। ফুল ক্রিম গুড়ো দুধ, ময়দা এবং বেকিং পাউডার একত্রে করে ভাল করে মিশিয়ে নিন। মনে রাখবেন বেকিং পাউডার যেন দানা দানা বা দলা দলা না থাকে। ভাল করে ডলে দলা ভেঙে প্রয়োজনে ছাকনি দিয়ে ছেকে নিবেন। এরপর ময়ান করার জন্য ডিম দুধ ময়দাসহ সব উপকরণ একত্রে করে হাত দিয়ে ভাল করে মাখতে থাকুন। সব মিশিয়ে শক্ত শক্ত কিছুটা নরম লেইয়ের মত হলে। হাতে তেল নিয়ে ছোট ছোট গোল গোল করে দেশি মাঝারি বড়ইয়ের আকার করে পাত্রে রাখুন। যে পাত্রে রাখবেন তাতে কিছুটা তেল মাখিয়ে নিবেন, তা না হলে পাত্রের গায়ে লেগে যেতে পারে। মনে রাখবেন বড়ইয়ের আকার তৈরী করলেও রসে ভিজানোর পর চারগুণ বড় হয়ে মুরগীর ডিমের সমান হবে।

এবার ডুবো তেলে ভাজার জন্য কড়াইয়ে পরিমান মত তেল ঢালুন। কড়াই চুলায় দিয়ে তেল গরম করে বানানো গোল গোল ময়ানগুলো ছেড়ে দিন। এইখানে একটি কথা মনে রাখবেন। আমি প্রথম যেদিন লালমোহন তৈরী করেছিলাম গরম তেলে তাড়াতাড়ি ভাজার জন্য মাঝখানে বিচির মত শক্ত হয়েছিল। চাপার দাঁত দিয়ে কামড়িয়ে খেতে হয়েছে। আমার মেয়ে ইয়ার্কী করে বলল, আব্বু এরকম মিস্টি তো কোনদিন খাইনি, গাবের বিচির মত চিবাতে হয়। সেই সমস্যার সমাধান পরে পেয়েছি। ডুবো তেলে যখন ভাজবেন তখন খুব কম জ্বালে আস্তে আস্তে অনেক সময় নিয়ে ভাজবেন এবং ঘন ঘন উল্টিয়ে পাল্টিয়ে ভাজবেন। তহলে পুরোটা উপর-নিচ-ভিতরসহ এক সমানে সিদ্ধ হবে। তবে বেশি কড়া ভাজবেন না তহেল সিরা ভিতরে নাও ঢুকতে পারে।

এবার ভাজতে ভাজতে লাল লাল হয়ে গেলে সিরায় ছেড়ে দিন এবং সিরার পাত্র চুলায় দিয়ে মাঝারির চেয়ে একটু বেশি আঁচে জাল দিতে থাকুন। দেখবেন লালমোহন ফুলে ফেঁপে চারগুণ হয়েছে। বড়ইয়ের আকার থেকে ডিমের আকার ধারন করেছে। যখন জ্বাল হয়ে ফুলে ফেঁপে বড় হয়ে যাবে তখন চুলা থেকে নামিয়ে রেখে দিন এবং কমপক্ষে সাত ঘন্টা অপেক্ষা করুন। কারণ লালমোহন গরম গরম মজা পাবেন না। ভাল হয় আগের দিন রাতে তৈরী করলেন পরের দিন সকালে খাবেন, তবে ফ্রিজে রাখবেন না, তাহলে মজা পাবেন না।

ধন্যবাদ সবাইকে, আমি নিজহাতে তৈরী করে খেয়েছি আপনারাও বাসায় ভাবিরা ভাইকে নিয়ে এবং বোনেরা দুলাভাইকে সাথে নিয়ে তৈরী করে খান এবং পারলে আমাকেও দাওয়াত করেন। আমি খাওয়ার জন্য হাজির হয়ে যাবো। তবে খেয়াল রাখবেন, কাউকে বাদ দিয়ে কেউ চুরি করে খাবেন না, তাহলে ভাই, ভাবী, দুলাভাই যে কেউ ঠকে যেতে পারে।
সর্বশেষ এডিট : ২১ শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৫ রাত ১:১৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


