somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

রস রচনা ০ হুদা ছালুনে ব্যাক্কেল

২৭ শে অক্টোবর, ২০১৫ রাত ৮:১২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


শহীদুল ইসলাম প্রামানিক

কয়েক বছর আগের ঘটনা। বিকালে অফিস থেকে হেঁটে বাসায় ফিরছি। গুলিস্থানের কাছে আসতেই আমাদের পাশের গ্রামের এক মুরুব্বীর সাথে দেখা। বয়স্ক মানুষ। গ্রামের ছোট খাটো মাতব্বরও বটে। তার সাথে আরো একজন বয়স্ক লোক, হয়তো আত্মীয়-স্বজন হবে। সামনে পড়তেই সালাম দিলাম। সালামের জাবাব দিয়ে আমাকে দেখেই মুরুব্বী খুশিতে আটখানা হয়ে গেল। আমাকে পেয়ে যেন তার আনন্দের সীমা নেই। ঢাকা শহরে এভাবে আমাকে গুলিস্থানের রাস্তায় পাবে এটা যেন তার কল্পনাতেই ছিল না।
হাসি দিয়ে বললাম, চাচা কেমন আছেন?
চাচা আমার চেয়েও দ্বিগুন হাসি দিয়ে বললেন, বাজান, খুব ভাল আছি।
তার ভাল আছি উত্তর শুনে বললাম, চাচা কোথায় যাচ্ছেন?
তিনি খুশি খুশিভাবে বললেন, মুºা পাড়া মেয়ের বাসায় বেড়াইতে আইছি। বিকাল বেলা ঢাকা শহরটা একটু ঘুইরা ঘুইরা দেখতেছি। তা বাজান তুমি কেমুন আছো?
মুখের হাসি হাসি ভাবটা বজায় রেখেই বললাম, ভাল আছি। বলেই গ্রামের কিছু কুশলাদি জিজ্ঞেস করে চা পানি খাওয়ানোর জন্য দুইজনকে সাথে নিয়ে হোটেলের দিকে গেলাম। মনে মনে ভাবলাম, গ্রামের মানুষ, ভাল কিছু খাওয়ানো দরকার, যাতে গ্রামে গিয়ে প্রশংসা করে, সেই মানসিকতায় গুলিস্থানের রাজধানী হোটেলে নিয়ে বসালাম। ওনারাও খুশি হয়ে বসল। জিজ্ঞেস করলাম, চাচা কি খাবেন?
মুরুব্বী বললেন, বাজান, যে হাইফাই হোটেলে নিয়া আইলা, খাইতে না জানি কত ট্যাকা লাগে! হুদাহুদি ট্যাকা খরচ করার দরকার কি? অল্প স্বল্পের মধ্যে কিছু খাইলেই হইবো।
পাশের টেবিলে একজন হালিম খাচ্ছিল। তাই দেখে মুরুব্বীকে বললাম, চাচা শাহী হালিম খান?
শাহী হালিমের নাম শুনে মুরুব্বী আমার দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। তার তাকানো দেখে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলাম। দু’মিনিট পরে বললেন, বাজান, শাহী হালিম নামডা তো খুব সুন্দর, খাইতে নিশ্চয় খুব সুস্বাদু হইবো। তা বাজান, খাইতে আবার অনেক ট্যাকা লাগবো না তো?
আমি হেসে বললাম, চাচা টাকার চিন্তা করেন কেন? আপনারা খাবেন কিনা সেইটা বলেন?
মুরুব্বী খুব খুশি হয়ে বললেন, ঠিক আছে চাচা, তাইলে এইডাই খাওয়াও। অনেক নাম শুনছি, কুনদিন খাই নাই। আইজকা খাইলে গ্রামে গিয়া তাও গল্প করবার পারমু, ভাতিজা আমাগো ঢাকা শহরে গুলিস্থানের বড় হোটেলে শাহী হালিম খাওয়াইছে।
মুরুব্বীর কথা শুনে খুব খুশিই হলাম। অনেক টাকা পয়সা খরচ করেও মানুষের প্রশংসা পাওয়া যায় না। সামান্য হালিম খাইয়ে যদি গ্রামে সুনাম অর্জন করতে পারি তা মন্দ কি! আনন্দে বিগলিত হয়েই তিন বাটি হালিমের অর্ডার দিলাম। মনে মনে ভাবলাম, কিছু টাকা খরচ হয় হোক, তবু লোকগুলো হালিম খেয়ে তৃপ্তিবোধ করলে তাতে আমারো আত্মতৃপ্তি।
বয় তিন বাটি হালিম নিয়ে এলো। তাদের সামনে দুই বাটি দিয়ে আমার সামনে একবাটি দিল। আমি চামুচ হাতে নিয়ে আদা কুচি, পিয়াজ ভাজা আর ধনিয়ার পাতা কুচিগুলো একত্রে মিশিয়ে বাটিতে হালিম ঘাটতে ঘাটতে বললাম, নেন চাচা খান।
মুরুব্বী খুব খুশি হয়ে হাতে চামুচ নিয়ে আমাকে ফলো করতে ছিল। অর্থাৎ শাহী হালিম কিভাবে খেতে হয় সেটা তার ধারনা না থাকায় আমার দেখাদেখি আমার মত করেই হালিম ঘেটে পিয়াজ ভাজা, আদা কুচি, ধনিয়ার পাতা হালিমের সাথে মিশিয়ে নিল। আমার সাথে সাথে অল্প অল্প করে চামুচে তুলে মুখে দিতে লাগল। আমি তার মুখের দিকে তাকিয়ে জীবনের প্রথম হালিম খাওয়ার পরিতৃপ্তির চিহ্ণ খুঁজতে ছিলাম। কিন্তু হালিম খেয়ে মুরুব্বির মুখে তৃপ্তির লক্ষণ তো দূরের কথা কিছুটা অতৃপ্তির ছাপই লক্ষ্য করলাম। কয়েক চামুচ খেয়ে বলল, ভাতিজা এইডা কি আসলেই শাহী হালিম?
বললাম, জি চাচা, এইটা ঢাকা শহরের নামকরা শাহী হালিম।
মুরুব্বী চামুচ পিরিচের উপর রেখে বলল, ভাতিজা আমারে কি বোকা বানাইলা নাকি?
বললাম, কেন চাচা?
মুখটা ব্যাজার করে বলল, দুই টুকরা মাংসের মধ্যে এক খাবলা গমের আটা মিশাল কইরা পাক করা পিঠালী মার্কা হুদা ছালুন খাইতে দিয়া কইতেছো শাহী হালিম।
চাচার কথা শুনে কিছুটা বোকা বোনে গেলাম। বললাম, না চাচা, এটা হুদা ছালুন না। এটা ঢাকার বিখ্যাত শাহী হালিম। এইটা নবাব বাদশারা আগে খেত। এইজন্য এইটার নাম হয়েছে শাহী হালিম।
চাচা ছোট্ট একটা ধমক দিয়ে বলল, ধুর ভাতিজা, আমারে কি ব্যাক্কল পাইলা নাকি!
আমি মুরুব্বীর এরকম ধমকের কোন অর্থ খুঁজে পেলাম না। মুরুব্বীকে স্বাভাবিক করার জন্য বললাম, চাচা বলেন কি, আপনারে ব্যাক্কল পাবো কেন? আপনার বিশ্বাস না হলে পাশের টেবিলে খাচ্ছে তাকে জিজ্ঞেস করেন?
মুরুব্বী মুখ বাঁকা করে বলল, আরে বাবা গ্রাম থিকা আইছি দেইখা আমি এত ব্যাক্কল না। এরকম ছালুন আমরা গ্রামের মজলিশে ভাত দিয়া কত খাই। আমাগো গ্রামের মুসলিম বাবুর্চির আটার পিঠালীও এর চায়া অনেক স্বাদ। ছালুনে নুন হয় নাই, ঝাল হয় নাই, হেই হুদা ছালুন খাইতে দিয়া কইতেছো শাহী হালিম। ধুর! ভাতিজা ধুর!! আমারে পুরাই ব্যাক্কল বানাইলা।
মুরুব্বীর কথা শুনে নিজের খাওয়াও বন্ধ হয়ে গেল। তিন বাটি হালিম এমনি এমনিই পড়ে থাকল। উপায়ন্তর না দেখে হালিম রেখে চায়ের অর্ডার দিয়ে চা খেয়ে হোটেলের বিল পরিশোধ করে বাইরে চলে এলাম। তাদের দুইজনকে বিদায় দিয়ে মনে মনে বললাম, শাহী হালিমের গুষ্টি কিলাই, টাকাও গেল, মানসম্মানও গেল, হুদা ছালুনের বদনামও হলো। জীবনে বেঁচে থাকতে গ্রামের কোন বুড়াধুরা মানুষকে শাহী হালিম খাওয়ানো তো দূরের কথা হালিমের কথা মুখেও আনবো না।
০০০ সমাপ্ত ০০০
সর্বশেষ এডিট : ২৭ শে অক্টোবর, ২০১৫ রাত ৮:১২
৩৭টি মন্তব্য ৩৭টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

Ripe Age দুই প্রান্তের দুই মানুষঃ সামু শব্দের সেতু প্রজন্মের বন্ধন

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ১৪ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৮:২৪


একজন দাঁড়িয়ে জীবনের শুরুতে
চোখে তার অগণিত স্বপ্ন
আগামীর পথে কত প্রশ্ন
কত না-জানা, কত বিস্ময়
কত দূরের নীল আকাশ
ডাকে তাকে প্রতিদিন।

অন্যজন বসে জীবনের শেষে নয়
বরং দীর্ঘ পথ পেরিয়ে আসা এক প্রান্তে
প্রায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ও তার যতসব অপরাধ।।

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ১৪ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৯:১৫



আজ ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে বলতে গেলে সব মিডিয়াতে আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ উঠেছে। উহা দুবাইয়ে ৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, সিঙ্গাপুরে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ট্রেন টু কক্সবাজার: টিকিট পেলাম না, পেলাম বিকল্প পথের সন্ধান

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ১৪ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১১:০৭

কক্সবাজার যাওয়ার ইচ্ছে ছিল অনেক দিনের। তবে এবার লক্ষ্য ছিল একটু আলাদা—বাসে নয়, বিমানে নয়; ট্রেনের জানালায় চোখ রেখে সমুদ্রের শহরের পথে যাত্রা। কিন্তু সেই সহজ পরিকল্পনার প্রথম বাধাই হয়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

জিন্নাহ কি বাঙালি মুসলমানের শত্রু?

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ১৪ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:২৪


মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ পাকিস্তানের স্বপ্নদ্রষ্টা বা পাকিস্তানের জাতির জনক। একজন বাংলাদেশী হয়ে পাকিস্তানের জাতির জনককে নিয়ে আলোচনা করলে কি গুনাহ হতে পারে কিংবা বড় ক্ষতি হতে পারে? বাংলাদেশে জিন্নাহর... ...বাকিটুকু পড়ুন

শেয়ার বাজারকে গতিশীল করতে স্টক ব্রোকারদের নিয়ে বৈঠকে বসছে ডিএসই আজ ১৪-০৯-২০২৬

লিখেছেন কাজী আবু ইউসুফ (রিফাত), ১৪ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:৫৭



বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে মন্দার কারণ ও প্রতিকার

ভূমিকা

একটি দেশের অর্থনীতিকে যদি একটি জীবন্ত দেহ হিসেবে কল্পনা করা হয়, তবে তার শেয়ারবাজার অনেকটা হৃদস্পন্দন ও তাপমাত্রা মাপার যন্ত্রের মতো। অর্থনীতির কোথায় প্রাণশক্তি... ...বাকিটুকু পড়ুন

×