somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

দরজিবাড়ি (শেষ)

২০ শে ফেব্রুয়ারি, ২০১০ সকাল ৯:০০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

(শেষ)
কক্সবাজার বেড়াতে যাওয়ার জন্য সবাই একটা টুরের আয়োজন করেছে। ছেলে আর ছোটজামাই উদোক্তা। ফ্যামিলি ট্যুর। স্ত্রীর চাপাচাপিতে আলমারিতে থাকা প্যান্টের পিস বের করে দরজিবাড়িতে গেলেন। কারণ কাছে পিঠে পরিচিত আর দরজির দোকান ছিল না।
আজ ওই লোকটা ছিল না। শামছু নামের আরেকজন কারিগর। এর কাছে নিশ্চয় ওইটার অভিযোগ তোলা যায় না। আর অভিযোগও তো নয়। হাফ হাতা শার্ট বানিয়ে উপকারই করেছে দরজি।
মাপ দেয়া শেষ হলে সামছু মিয়াও একই কথা জানাল। ডেলিভারী তারাই দিয়ে আসবে। ফুল পেমেন্ট দিতে হবে।
এবারে ডেলিভারী তিনি নিজ হাতে গ্রহণ করলেন। ডেলিভারীর ছেলেটা চলে গেলে তিনি প্যাকেট খুলে হতভম্ব হয়ে গেলেন। একি! প্যান্ট তো মনে হয় পুরোপুরি বানানো হয়নি। ডানপাটা পুরোটা বানানো হলেও বামপায়ের হাটুর কাছ থেকে আর কিছু নেই। কাটা। যেন দেড়খান প্যান্ট বানিয়েছে। রাগ তার মাথা চক্কর দিয়ে উঠল। ভাগ্যিস সুরমা আশেপাশে নেই। না হলে এরকম দেখলে তুলকালাম কান্ড বাধিয়ে দিত।
তিনি কাউকে কিছু না বলে প্যান্ট পাকেটে ঢুকিয়ে হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে এলেন। আজ দরজিবাড়ির দরজির একদিন কি তার একদিন। এ কি ধরণের ফাজলামো।
তিনি দরজি বাড়ি পর্যন্ত পৌছাতে পারলেন না। রাস্তা পার হতে গিয়ে বাসের সাথে এক্সিডেন্ট করলেন। জ্ঞান হারালেন তিনি। সেই প্যাকেটটা তখনও তার হাতে ধরা।
জেগে উঠলেন হাসপাতালের বেডে। প্রচন্ড যন্ত্রণা নিয়ে। তার বেডের চারপাশে উৎকণ্ঠিত প্রিয়মুখ। স্ত্রী-পুত্র-কন্যা-পরিজন। কিন্তু তিনি তাদের দেখলেন না। দেখলেন তার বামপায়ের হাটুর কাছ থেকে নেই হয়ে গেছে। এ্যাম্পুটেশন না কি করে কেটে বাদ দিয়েছে বাম পায়ের হাটুর নিচ থেকে।
তিনি আবার জ্ঞান হারালেন।
দরজিবাড়ির প্যান্ট এবারো ফেরত পাঠানো হলো না। ক্রাচে ভর দিয়ে হাটতে অভ্যস্ত হওয়ার পরে তিনি সেই দেড়খান প্যান্ট গলিয়ে দিনাতিপাত করতে থাকেন।
সেবারে কক্সবাজার যাওয়ার টুর বাতিল হয়ে গেল।

বছরখানেক পরের কথা। বিদেশ থাকা বড় মেয়ে নাতি নাতনী নিয়ে দেশে এসেছে। দেশ ঘুরে আবার চলে যাবে। বাবার জন্য অনেক কিছু এনেছে। ততদিনে মোবারক সাহেব পাঞ্জাবী পরতে অভ্যস্থ হয়ে গেছেন। বড় মেয়ে বাবার জন্য খুব দামী সাদা ছিট কাপড় কিনে এনেছে।
‘বাবা এটা খুবই দামী কাপড়। পিওর জিনিস। একদম ফরেন জিনিস।
‘এটা দিয়ে কি করব?’
‘তোমার পাঞ্জাবীর জন্য এনেছি। মাপ জানিনা তো একারণেই ছিট এনেছি। আর ওই খ্রীষ্টান দেশে পাঞ্জাবী জিনিসটা ভাল পাওয়া যায় না। তুমি কোন একটা টেইলার্স থেকে মাপ দিয়ে বানিয়ে নিও।’
টেইলার্সের কথা শুনে তিনি চমকে উঠলেন। কিন্তু কাউকে কিছু বললেন না।
মেয়ের আবদারের কারণেই পরদিন তিনি দরজিবাড়ি গেলেন।
দরজি দোকানে সেই টাকমাথার ভুরু কামানো লোকটা আছে। ক্রাচে ভর দেয়া তাকে দেখে কাষ্ট হেসে বলল, ‘আপনার কাটা পায়ের জন্য দুঃখিত। কিন্তু এছাড়া আর কিছুই করার ছিল না।’
তিনি দরজির কথা বুঝতে না পেরে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে বললেন, ‘না মানে দুর্ঘটনা দুর্ঘটনাই। আমি একটা পাঞ্জাবী বানানোর জন্য...বড় মেয়ে বিদেশ থেকে শখ করে এনেছে... খুব নামী দামী কাপড়। দেখবেন ফিনিশিংটা যাতে ভাল হয়।
‘ও কথা বলতে হবে না চাচা। এখনও আমার ডেলিভারীর কেউ কোন খুঁত বের করতে পারিনি। যেরকম চেয়েছে, যেরকম দরকার, হুবুহু সেরকমই ডেলিভারী দিয়েছি। আপনারটাও সময়মত ঠিক জিনিসই ডেলিভারী পাবেন।
কি বলবেন বুঝতে না পেরে মাথা ঝাকিয়ে বললেন, ‘ও আচ্ছা।’

বড়মেয়ে দেশ থেকে চলে যাবে। সবাই গাড়ি নিয়ে এয়ারপোর্টে যাবে। ছেলে ও জামাই বন্ধুর কাছ থেকে একটা প্রাইভেট কার ও মাইক্রো জোগাড় করেছে। সবাই এয়ার পোর্টে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত।
তিনি মনে মনে আফসোস করছেন। এখন পাঞ্জাবীটা ডেলিভারী দেয়নি। এবারই প্রথম সপ্তাহ পার করেছে। কোনবার ডেলিভারীতে এত দেরী হয়নি। আজক্ওে যদি দিয়ে যেত তিনি মেয়ের সামনে পাঞ্জাবীটা পরে এয়ারপোর্টে যেতে পারতেন।’
গেট খুলে প্যাকেট হাতে ডেলিভারীর ছেলেটাকে দেখতে পেলেন। ছেলেটা এলে তিনি ইঙ্গিতে বারান্দার মোড়ার উপর প্যাকেটটা রেখে দিতে বললেন। রিসিভ কপিতে সই করলেন।
ছেলেটা চলে গেলে তিনি সুরমাকে ডাকলেন, ‘সুরমা, দেখ পাঞ্জাবীটা পাঠিয়েছে। তুমি খুলে ওটা আমাকে দাও তো।’
পা কাটার পর থেকে সুরমা বেগম অনেক নরোম হয়েছেন। আগে হয়তো খিচিয়ে উঠতেন, ‘তোমারও তো হাত ছয়রাত আছে।’ এখন বললেন, ‘তুমি একটু বস। আমি আসছি। আচ্ছা রেনুকে না হয় পাঠিয়ে দিচ্ছি। চলে যাচ্ছে, যাওয়ার আগে একটু বাপের খেদমত করুক।
রেনু এসে বলল, ‘যাক শেষ মুহুর্তে তোমার পাঞ্জাবীটা এলো বাবা। নাও তাড়াতাড়ি পরে নাও। বাচ্চু এলেই আমরা বেরিয়ে পড়ব।’ বলে সে আর
দেরী না করে প্যাকেট খুলে ফেলল।
তারপর সাদা পাঞ্জাবীটা খুলেই চিৎকার দিল ‘এটা কি বাবা? মা, ও মা দেখে যাও। মা!’
মা ছুটে এলেন, ‘কি হয়েছে রে? কি হয়েছে?’
রেনু কিছু না বলে সাদা কাপড়টা মায়ের দিকে এগিয়ে দিল।
মা কাপড়টা ধরে থরথর করে কাপতে কাপতে বললেন,‘এটা কে পাঠিয়েছে? কে?’
তিনি নির্বিকার মুখে স্ত্রীর কাছ থেকে সাদা কাপড়টা নিয়ে শান্ত স্বরে বললেন, ‘দরজিবাড়ি থেকে পাঠিয়েছে। এটা কাফনের কাপড়। আমার কাফনের কাপড়। আগে ওরা হাফ হাতা জামা, দেড়খান প্যান্ট পাঠিয়েছিল। কাজে লেগেছে। এবার কাফনের কাপড় পাঠিয়েছে। ওরা কখনও ভুল করে না। আগেও করেনি। এবারও না। দাও দেখি মাপটা ঠিক হলো কিনা।
তিনি সবাইকে হতভম্ব করে দিয়ে কাফনের কাপড় পরতে শুরু করলেন...






২টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

'ট্রিট' বা 'উদযাপন' মানে স্রেফ খাওয়া-দাওয়াই মূখ্য কেন??

লিখেছেন শেহজাদ আমান, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ বিকাল ৪:৩৭



আমাদের উদযাপনটা হয়ে গেছে অনেকটা খাওয়া-দাওয়া কেন্দ্রিক? 'ট্রিট' বা 'সেলিব্রেশন' বলতে আমরা কেবল খাওয়া-দাওয়াকেই বুঝি...কিন্তু এটা কিন্তু ভিন্নরকমভাবেও করা যায় নিঃসন্দেহে!

প্রিয় কেউ ভালো কোনোকিছু করলে, সফলতা পেলে বা... ...বাকিটুকু পড়ুন

মাওলার দায়িত্ব পেয়ে সেই দায়িত্ব পালন না করায় হযরত আলীকে (রা.) মাওলা বলা ঠিক না

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৮



সূরাঃ ৬ আনআম, ১৫৩ নং আয়াতের অনুবাদ-
১৫৩। আর এপথই আমার সিরাতিম মুসতাকিম (সরল পথ)। সুতরাং তোমরা এর অনুসরন করবে, এবং বিভিন্ন পথ অনুসরন করবে না, করলে তা’ তোমাদেরকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের নিজেদের না পাওয়া গুলো অন্যদের পেতে সাহায্য করা উচিত।

লিখেছেন নূর আলম হিরণ, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ৯:৪২


আমরা মানুষেরা সবসময় ভালো থাকতে চাই। ভালো খেতে চাই, ভালো পড়তে চাই, ভালো চাকুরী/ব্যবসা করতে চাই। কিন্তু বেশিরভাগ সময়ই আমাদের চাওয়ার সাথে পাওয়ার মিল থাকেনা। এই চাওয়ার সাথে পাওয়ার মিল... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধান ভানতে শীবের গীত : প্রজা বলে শীত ! শীত!!

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ১১:২২

ধান ভানতে শীবের গীত : প্রজা বলে শীত ! শীত!!


সমুদ্রে বড় জাহাজ যখন ডুবতে থাকে, তখন কে ধনী বা কে গরীব প্রকৃতি তার বাছ-বিচার করেনা ।
বা বলা চলে, কে পাপী... ...বাকিটুকু পড়ুন

এতো সুর আর এতো গান - আমার কণ্ঠে

লিখেছেন সাড়ে চুয়াত্তর, ০১ লা এপ্রিল, ২০২৬ রাত ২:০০

একটা হারানো দিনের গান গাওয়ার চেষ্টা করেছি (Cover Song)। আশা করি সবাই উপভোগ করবেন।

গান - এতো সুর আর এতো গান
মূল গায়ক - সুবীর সেন
গীতিকার এবং সুরকার - সুধিন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×