প্রাইমারিতে থাকার সময় পাঠ্য বইয়ে একটা গল্প পড়েছিলাম...এক সাহাবী অর্থ সংকটে খাবারের যোগার করতে পারছিলনা...অগত্য বাধ্য হয়ে সে রাসূল সা: এর দরবারে এসে কিছু সহযোগীতা চাইলেন...রাসূল সা: তার দিকে তাকিয়ে দেখলেন সে সুঠাম দেহের অধিকারী অথচ সাহয্য প্রার্থনা করছেন...আল্লাহর রাসূল সা: তাকে জিজ্ঞাসা করলেন তার ঘরে বিক্রয় করার মতো কি আছে নিয়ে এসো...সে একটি কম্বল ও একটি বাটি এনে আল্লাহর নবী সা: এর কাছে দিলেন...আল্লাহর রাসূল সা: ঐ কম্বল ও বাটি উপস্থিত সাহাবীদের নিকট নিলামে বিক্রি করে তার কিছু অর্থ ঐ সাহাবীর হাতে দিয়ে বললেন এই অর্থ দিয়ে খাবার কিনবে এবং বাকী অর্থ দিয়ে একটি কুঠার কিনবে...নবী সা: তাকে সহায্যের পরিবর্তে পরিশ্রম করে অর্থউপার্জনে উৎসাহিত করলেন...এই ঘটনাটি আমাদের জন্য একটি শিক্ষা...
এবার আসি সেদিন ঘটে যাওয়া আমার একটি ঘটনা...প্রবাস জীবন এমনিতেই সংগ্রামের জীবন, ত্যাগের জীবন...ত্যাগে তর্জে এক একজন প্রবাসী খাঁটি হীরা চাইতেও খাঁটি হয়ে উঠে দিনকে দিন...খাবারের ক্ষেত্রে ত্যাগ স্বীকার করতে হয় প্রায় প্রতিদিনই...ভারতীয় সংখ্যগরিষ্ঠ হওয়ায় রান্না করার পদ্ধতিটিও হয় তাদের স্টাইলে...তার উপর যদি কেরেলা/মাদ্রাজি স্টাইলে রান্না হয় তাহলেতো চোখ কপালে না উঠে উপায় নেই...তো কেন্টিনের খাবারের অবস্থা যখন শুচনীয় তখন চটজলদি কিছু একটা বানিয়ে ফেলি...গতপরশু রাতে খাবারের শুচনীয়তা দেখে দ্রুততম সময় তৈরি করা যায় আলুর ভর্তা বানানোর আয়োজন চলছে...এমন সময় একভাই পাশের রুমের সিনিয়র ভাইয়ের কাছ থেকে আচারের তেল চেয়ে নিয়ে আসলো আলুর ভর্তা মাখার জন্য...
বিষয়টা আমার কেন জানি পছন্দ হয়না...আমার মত প্রকাশের স্বাধীনতা ব্যবাহার করলাম...আমাদের কাছে যেহেতু খাঁটি সরিষার তেল আছে সেহেতু আর এক বাড়ি থেকে আচারের তেল চেয়ে আনার কি দরকার ছিল...তাতিয়ে উঠে ঐ ভাই...যেন আঁতে ঘা লেগে গেল আমার কথায়...কি এমন হয়েছে আচারের তেল চেয়ে আনাতে?...আমার আচারের তেল খেতে মন চাইলো বলেই তো চেয়ে আনলাম...আমি তাকে শান্ত করার জন্য বললাম ভাই আমি আপনার ইচ্ছাটাকে খাট করে দেখছিনা...আপনার ইচ্ছে হয়েছে এনেছেন ব্যাস...তবে আপনার জায়গায় আমি হলে আনতাম না...কারন আমার কাছে যতক্ষন পর্যন্ত চলার মতো কিছু একটা আছে ততক্ষন পর্যন্ত সহজে কারো কাছে সহায্যের হাত পাতবোনা...এই কথা শুনে সে আরো চটে যায় কিন্তু শান্ত ভাবেই কিছু উপদেশ দেয়...তার যা বলে তা আমার জীবনের জন্য হয়তো শিক্ষনীয়...দেখি আপনারা কি বলেন?
তার উপদেশগুলো নিম্নরূপ:-
=> কারো কাছে কিছু চাওয়া মানে তার কাছে শুধু সাহায্যে চাওয়া নয় বরং তার সাথে সম্পর্কের উন্নয়ন হয়...এটাই সামাজিকতা...
=> আপনার কাছে কিছু থাকলেও আপনার প্রতিবেশির কাছ থেকে চাইবেন...এতে প্রতিবেশির সাথে সৌহার্দ্যপূর্ন সম্পর্ক গড়ে উঠবে...এটাই সামাজিকতা...
=> আপনার চাহিদা না থাকলেও প্রতিবেশির কাছ থেকে সুবিধা আদায় করবেন এতে প্রতিবেশি খুশি হন....এটাই সামাজিকতা...
***আর যদি এগুলো করতে না পারেন তাহলে সমাজে আপনি অসামাজি থাকুন আপনার ইচ্ছে...উপদেশ শেষে একটু যেন কাটা ঘায়ে লবনের ছিটা দেওয়ার চেষ্টা দিল...
যাইহোক তার উপদেশ গুলো নিয়ে গত দুইদিন ধরে ভেবেই চলেছি...তাহলে কি এতদিন আমি অসামাজিক রয়ে গেলাম...একাকী নিজের অতীত মূল্যায়ন করতে থাকি...
=> বয়সের এতটা বছর পার করলাম...আমি কারো কাছ থেকে ধার করে চলিনি...আমার কোন পাওনাদার নেই...কারন আমার যা আছে তাতেই তুষ্ট থেকেছি সবসময়...এই যে আমি প্রয়োজনের সময়ও কারো কাছে সাহয্যের হাত পাতিনি....নিত্যান্তই কারো কাছ থেকে ধার করতে বাধ্য হলে জবান মতো তার টাকা ফেরত দিতে অস্থির হয়ে পরি...পরিশোধের সঠিক সময়ের আগেই তাকে খুঁজে বের করি ঋনমুক্ত হবার জন্য...আমার এই স্বভাবটা কি অসামাজিক?...কেমন যেন গুলিয়ে ফেলি উত্তর খুঁজতে...
=> আমার আর একটি স্বভাব ছিল কোন দোকানে বাকী না করা...যাই কিনতাম নগদ...পকেটে টাকা না থাকলে চাহিদাকে কবর দিবো তবু ধার করবোনা এমন স্বভাব আরকি...ধরুন আমার এই মূহুর্তে চা পান করতে ইচ্ছে করছে কিন্তু পকেটে ফুটো পয়সা নেই...আমি জানি চায়ের দোকানী আমাকে দেখলেই হাসিমুখে চায়ের কাপে চামচের আওয়াজ তুলবে তাই দোকানের পাশ কাটিয়ে যাবো তবু ধারে চা খাবোনা...আমার এই স্বভাবটা কি অসামাজিক?...কেমন যেন গুলিয়ে ফেলি উত্তর খুঁজতে...
***আমার স্মৃতির সবচেয়ে স্বরনীয় ঘটনার একটা বলি...আমি সেই ছোটবেলা থেকেই খেলাধূলায় টইটই করে বেড়াই...সেই সুবাধে এলাকার পোলাপাইন মিলে একটা ক্রীড়া সংঘ গড়ে তুলি সবুজ সংজ্ঞ স্পটিং ক্লাব...হঠাৎ মাথায় ভূত চাপলো সমাজ সেবার...এক রোজার ঈদের আগে আগে সবাই মিলে সীদ্ধান্ত নিলাম...এবারের ঈদে গরীব পরিবারদের জন্য ঈদের বাজার করে দিবো...যেই চিন্তা সেই কাজ...সকলের ঈদ বাজেটের একটা অংশ সংগ্রহ করলাম...এলাকার ধনীদের কাছ থেকে কিছু খসালাম...ঈদের আগের দিন রাতে একটা করে ঈদ পার্সেল অতি গোপনে পৌছে দিলাম অসহায় পরিবারদের মাঝে...বিনিময়ে যা পেয়েছি তা আজো ভুলতে পারিনা...আনন্দ অশ্রু...এটাকি সামাজিকতা নয়...?
***আমার শিক্ষকতা জীবনের একটা উল্লেখযোগ্য স্বভাবছিল...দরিদ্র ছাত্র/ছাত্রীদের সেচ্ছায় সহায়তা করা...আমি নিজে গরীব ছাত্র ছিলাম বলে তাদের কষ্টটা আমাকে ছুঁয়ে যেতো...বছর শেষে আমার বিভিন্ন সামর্থ্যবান ছাত্র/ছাত্রীদের কাছ থেকে পুরাতন বই সংগ্রহ করে তা বিনামূল্যে দরিদ্র ছাত্র/ছাত্রীদের মাঝে বিতরন করতাম...এটাকি তাহলে সামাজিকতা ছিলনা...?
ঐ ভাইয়ের পরামর্শের সাথে নিজেকে মূল্যায়নে কেমন যেন গুলিয়ে ফেলছি...কখনো মনে হচ্ছে আমি সঠিক পথেই আছি...আবার একটা বিষয় খেয়াল করেছি যে দাবা খেলে সে হয়তো তার ভুলটি ধরতে পারছেনা কিন্তু পাশে দাঁড়ানে যে দেখছে সে কিন্তু ঠিকই দেখতে পাচ্ছে কি ভুল করা হচ্ছে...তাই কখনো মনে হয় হয়তো আমার ভিতরে সামাজিকতার কিছু ঘাটতি আছে যা হয়তো আমার চোখে ধরা পরছেনা...তার কাছ থেকে আর কে বেশি উত্তম হতে পারে যে গঠনমূলক সমালোচনার মাধ্যেমে সঠিক পথ দেখায়...তাই সেই ভাইয়ের সাথে আর তর্কে না জড়িয়ে নিজেকে নিজে প্রশ্ন করেছি কেন নয় আমার স্বভাবে যে ঘাটতিগুলো আছে তার ইতিবাচক পরিবর্তন আনা...
মনের বিক্ষিপ্ত চিন্তাগুলো আপনাদের সাথে শেয়ার করলাম...যদি কেউ উপকৃত হয় কিংবা কারো কাছে আরো সুন্দর কোন পরামর্শ থাকে...

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



