আমাদের পুরুষতান্ত্রিক সমাজে বহু আগে থেকেই মেয়েদের মতামতকে বরাবরের মতোই উপক্ষিত করা হতো...এখনো যে হচ্ছে না তা কিন্তু নয়...এখনো মেয়েদেরকে চারদেয়ালে বন্দি করে রাখা হয়...মেয়েদের মতামতের কোন মূল্যই দেয়া হয়না এমন সিংহ পুরুষ(?) চোখ ঘুরালেই চারপাশে পাওয়া যাবে...মেয়েদেরও যে বুদ্ধির উপাদান নিউরন সমৃদ্ধ একটা মাথা আছে তা অনেক পুরুষ মানতেই চায় না...খোটা দিয়ে বলেই ফেলে মেয়েদের বুদ্ধি হাঁটুর নীচে...যখন তাকে তার ভুল ধরিয়ে দিতে বলা হয়, "ভাই আপনার চারপাশটায় একটু দেখুন কত্ত মেয়ে ডাক্তার/ইন্জিনিয়ার/শিক্ষক হিসাবে দক্ষতার পরিচয় দিচ্ছে" তখনও তার ভূড়ো কুচকানো প্রতিত্তোর শুনতে হয়...সংখ্যালুঘু উদাহরন দেওয়া নাকি ঠিক নয়...আমিও থামবার পাত্র নই পাল্টা জবাবে বলি,"জোড় করে চারদেয়ালে বন্দি রাখলে কিংবা বাল্য বয়সে বিয়ে দিলে একটা মেয়ে তার মেধা যোগ্যতার কি প্রমান করতে পারবে বলেন"...তবুও তাকে তার খুঁড়া যুক্তি থেকে থামানো যায় না...তাদের মতো কাউকে বুঝানো যায়না যে সুযোগ পেলে মেয়েরাও পুরুষের মতো সমাজ গঠনে স্বাক্ষর রাখতে পারে।
ধ্যাৎত্যারি ছাই, কি বলতে গিয়া কি নিয়া আলোচনা করতাছি...পাঠক কিছু মনে লইয়েন না...বিক্ষিপ্ত মস্তিষ্কের চিন্তা-চেতনার বর্ননা একটু এলোপাথারিই হয়...ঐ যে একটা গল্প মনে আছে না? এক ছাত্র খুব ভালো করে নৌকা ভ্রমন রচনা পড়ে গেল আর পরীক্ষার হলে গিয়ে দেখে গরু রচনা এসেছে...তো সে গরু রচনা লেখা শুরু করলো এইভাবে, "গরু অত্যন্ত শান্ত প্রানী...এর দুইটি শিং, চারটি পা ও একটি লেজ আছে, এক রাখাল গরুটিকে নিয়ে নদীতে যাচ্ছে গোসল করাতে, গরুটিকে নদীতে নামানো হলো, এর পাশ দিয়েই নৌকা ভ্রমনের জন্য একটি যাত্রীবাহি নৌকা যাচ্ছিল...আর থামায় কে শুরু হয়ে গেল গরু রেখে নৌকা ভ্রমন নিয়ে লেখা"...হাহাহাহা...আমার আজকের লেখাটাও ঐ ছাত্রের মতোই তাই অনুগ্রহ করে নিজের ভালো গুনের দিকে তাকিয়ে আমার বদহজমের লেখাটি কষ্ট করে হজম করার জন্য অগ্রিম ধন্যবাদ জানিয়ে রাখছি...
একটা সময় ছিল যখন রক্ষনশীল পুরুষতান্তিক পরিবারের পুরুষেরা বিয়ের ক্ষেত্রে মেয়েদের কোন পছন্দ-অপছন্দের দিকটি বিবেচনা করতো না...মেয়ের অভিবাককের (বাবা/চাচা/বড়ভাই) পছন্দই চূড়ান্ত...এখনো এমন কিছু রক্ষনশীল পরিবার বিদ্যমান আছে যারা মেয়েদের মতামতকে কোন গুরুত্ব দেয়ই না বরং এই নিয়ে সমাজে একটা মজার গল্প প্রচলিত আছে, "এক মেয়ের বিয়ের সব ঠিকঠাক যা মেয়ে জানেই না...তো একদিন সকালে বাড়িতে ধূমধাম করে বিয়ের আয়োজন চলছে...মেয়ে তখনো ঘুমিয়ে...সখীরা সব দল বেঁধে মেয়েটির ঘরে যায় তাকে সাজাতে...সখীরা ছন্দের ছলে খুচা মেরে বলে,"উঠ ছেরি আইজ তোর বিয়া"...সখীর মসকরায় তেমন বিচলিত হয়না মেয়েটি...বালিশ বুকে জড়িয়ে আয়েশে হামি ছাড়তে ছাড়তে বলে, তোরা এতো সকালে দল বেঁধে আমার এখানে কি করছিস...কিছু বুঝে উঠার আগেই সখীরা কেউ হাতে মেহেদী, কেউ গাঁয়ে কাঁচা হলুদ মাখাতে থাকে আর অট্টহাসিতে দল বেঁধে বিয়ের গীত গাইতে শুরু করে...সখীদের এমন আচরনে অবাক হওয়ার স্তরের এমন লেবেলে পৌঁছায় যেখানে তার স্বাভাবিক উপলব্ধি বোধ লোপ পায়...সে কিছুই বুঝে উঠতে পারেনা কি হচ্ছে এসব...যাকে জিজ্ঞাস করে সেই বলে, ছেরি আইজ তোর বিয়া...অহন বেশি কতা কইছনা...চুপচাপ বাইয়া থাক...আমাগো কাম করতে দে...কিছুক্ষন পর ছোট বাচ্চাদের কন্ঠস্বর ভেসে আসে...বর এসেছে...বর এসেছে...বর এসেছে...ঘুমের ঘোর কাটতে না কাটতেই বাবা+কাজী সাহেব একসাথে ঘরে ঢুকে কি সব বলে বলেন, মা কবুল বল...বাবার চোখের দিকে চেয়ে ভয়ে বিড়বিড় করে বলতে বাধ্য হয়...কবুল।
আমার জীবনেও যে এই প্রবাদ বাক্যটি ঘাড়ে চেপে বসবে ভাবিনি কখনো...মাত্র ৩৪ দিনের ছুটিতে দেশে গিয়েছিলাম...(. ..কাইল দেশে যাইতাছি... ) উদ্দ্যেশ ছিল ভাইয়ের ব্যাটাদের দ্বিতীয় সাময়িক পরীক্ষার প্রস্তুতিতে সহায়তা করবো আর...পাশাপাশি তিনটা ফি সাবিলিল্লাহ প্রকল্প বাস্তবায়ন করবো...তো ছুটিতে গেলাম...যাচ্ছে দিন এক. দুই. তিন করে...মাঝ পথে হঠাৎ ব্রেক দিল দিন...একদিন রাতে ঘুমাচ্ছি এমন সময় ভাইয়ার ডাকে ঘুম থেকে জাগি...দেখি মেঝ ভাইও ছুটিতে...দেশে নয় আমার খাস কামড়ায়...কিছুই বুঝতাছিনা...স্বপ্ন নয় সত্যিই দেখছি ভাইকে...ভোরে চোখ কচলে যা শুনলাম তা হতভম্ব না হয়ে কোন উপায় ছিলনা...মা হাসি মুখে বলছে, "তোর ভাই এসেছে তোকে বিয়ে করাতে...বোধ শক্তির ব্যারোমিটারে তলানিতে ছিল মাপকাঠি...ভাবছি মা মসকরা করছে...
কিন্তু না, আমার বোধ শক্তি জিরো ঠেকিয়ে ভাইয়া বলছে, সে দশ দিনের ঝটিকা অভিজানে (ছুটিতে) এসেছে...আমাকে বিয়ে করিয়ে সে চলে যাবে...সে এমনি এমনি আসে নাই সব ঠিক-ঠাক করেই তবে ছুটিতে এসেছে...কোন এক ম্যারেজ মিডিয়ার কল্যানে শত-হাজার মেয়ে থেকে ৫/৬ টি মেয়ে বাছাই করে রেখেছে...এর মধ্যে থেকে একজনকে তড়িৎ পছন্দ করে বিয়ে করতে হবে...না বলে মোচড় দেওয়ার আগে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি ভাইয়া বাড়ির সবাইকে ম্যানেজ করে ফেলেছে আমাকে বিয়ে করানোর জন্য...মায়ের হাকে দশ হাত লম্বা রাম দা, বাবার হাতে বারো হাত সামুরাই আর বড় দোলাভাইয়ের হাতে দেখি একে৪৭...ভয়ে একটু ঢোক না গিলে কি উপায় আছে...বুঝতেই পারছি এইবার আমাকে মরতে (বিয়ে করা) হবে...রাম দা থেকে বাঁচলেও সামুরাই থেকে কি করে বাঁচি আর ঘাড়ের উপর ঠেকিয়ে রাখা একে৪৭ কি করে সরাই...সবাই যেখানে আদা জল খেয়ে নেমেছে সেখান না শব্দটির কোন আওয়াজ আসবেনা তা বুঝতেই পারছি...
কিন্তু আমি ভাবছি অন্য কথা...বিয়ে করবো কি করে...প্রবাসে বসে যে অর্থ উপার্জন করেছি তার কানাকড়ি পর্যন্ত ব্যায় হয়েছে জমি ক্রয়ে তার ধকল সামলাতে না সামলাতেই বাবা তিন ইউনিটের তিনতলা ফাউন্ডেশনের বাড়ির কাজে হাত দিয়েছেন...পকেট খরচার টাকা বাদ দিলে দুই ভাইয়ের সমস্ত উপার্জন ঐ বাড়ির পেছনেই খরচা হচ্ছে...বিয়ে করবো কি দিয়ে?...মোহরানা দিবো কি দিয়ে?...আর আমিই আমার পরিবারের শেষ বিয়ে...আমার বাঙালিদের সামাজিক ও পারিবারিক একটা ঐতিহ্য আছে...পরিবারের শেষ বিয়ে যার যার তৌফিক অনুযায়ী ঝাকজমক করে আয়োজন করে...নিদেন পক্ষে নিকট আত্বীয়-বন্ধুদের সাথে নিয়ে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা পালন করে...চিন্তার রেখা ভাঁজ পরে ভালে...টেনশনে টেনশনে নড়বড়ে নিউরনের পালপিটিশন...হোয়াট ক্যান আই ডু...হোয়াট ক্যান আই ডু।
বুদ্ধি একটা পেলাম...এক এক করে ধরতে হবে রাম দা ওয়লা, সামুরাই ওয়ালা ও একে৪৭ এর মালিকদের...বড় আপাকে প্রকৃত অবস্থা বুঝিয়ে বললাম...আমি মোহরানা বাকি রেখে কিংবা নিকট আত্বীয়-বন্ধুদের ছাড়া পালিয়ে বিয়ে করবোনা তুমি যে করেই হোক দোলাভাইকে ম্যানেজ করো...আম্মাকেও অনুনয়-বিনয় করে আর একটা বছর সময় চাইলাম...বুঝাতে চেষ্টা করলাম...আপনারা যে মেয়েকেই আমার জন্য পছন্দ করবেন আমি অমত করবো না তবে আমি মোহরানা বকেয়া রেখে কিংবা চুপিচুপি বিয়ে করবোনা...আরো অনুরোধ করলাম যেন এই ব্যাপারটা বাবাকেও যেন বুঝিয়ে বলে...আম্মা আমার কথায় সম্মত হয়ে উপর নিচে মাথা নাড়ে...বুঝাতে পারার খুশিতে লম্ফ দিতে ইচ্ছে করে...
কিন্তু বিধি বাম খুশি বেশি দূর এগুলোনা...মা আবারো ভাইয়ার কথায় পটে গেলো...চোখে গড়িয়ে পড়ার জল মুছতে মুছতে যা বলল তাকে আমি না পটে থাকতে পারলাম না, "বাবা আমারা দুইজনেই (বাবা-মা) বৃদ্ধ হয়েছি, কে কখন মরে যাই ঠিক নাই, তুমিই একমাত্র আমাদের জিম্মাদারে আছো, তোমাকে বিয়ে দিতে পারলে দায়িত্ব থেকে মুক্তি পাই..." কি আর করা মায়ের চোখের পানির কাছে হার মানতে বাধ্য হই...বলি ঠিক আছে বিয়ে না হয় করবো কিন্তু আমি তো যৌতুক (মোহরানা) না দিয়ে বিয়ে করবোনা পন করেছি তার কি হবে?...আর যৌতুক স্ত্রীর হক্ব...এটা আদায় না করা কিংবা বকেয়া রাখা কিংবা বিয়ের রাতেই স্ত্রীর কাছে মোহরানা থেকে মওকুফ চাওয়া আমার পক্ষে সম্ভ্যব না...
মা আনন্দে চকচক করতে করতে এসে শোধালো এ নিয়ে তোর চিন্তা করতে হবেনা...এর একটা ব্যবস্থা হয়েছে...যা শুনলাম তা আমার কাছে আরো খারাপ লাগলো...যে কাজটি আমার পক্ষে সম্ভ্যবনা...ভাইয়া তার বউকে দেয়া সব গয়না আমাকে অনুদান হিসাবে দিতে চাচ্ছে যা দিয়ে আমি নগদ মোহরানা পরিশোধ করতে পারি...এটা সত্যিই তার গভীর আবেগ ও ভালবাসার বর্হিপ্রকাশ...যাইহোক ধন্যবাদ জানাই ভাইয়ার আবেগকে...নিজেকে নিজে প্রশ্ন করি ভাই আমাকে অত্যন্ত ভালবাসে তাই বলে আমি কিনা ভাবীর কানের-গলার গহনা খুলে নিয়ে আমি বিয়ে করবো...তাছাড়া আমি তো অক্ষম নই...আল্লাহর রহমতে ভালোই উপার্জন করছি প্রতি মাসে...তাহলে কি আমি আমাকে সাহায্যে করতে পারবোনা?...আমি কি আমার বিয়ের আনুষাঙ্গিক সমস্ত খরচাখরচের যোগান দিতে পারবোনা?...নিজেকে নিজের প্রশ্নের উত্তরে মনবল চাঙা হয়...ভেতর থেকে কে যেন চিৎকার দিয়ে বলতে চাইছে...এখন বিয়ে করার চাইতে একটু অপেক্ষা করে সম্মানের সাথে বিয়ে করা অধিক শ্রেয়...
মাকে আবারো বুঝাতে চেষ্টা করি...এতটা বছর কেটে গেলো সংসারের গ্লানি টানতে টানতে...সেই পানতা ভাত-শুকনা মরিচের দরিদ্র সংসারটি এখন সচ্ছল...দুই ভাই দু'হাতে ধেঁই ধেঁই করে অর্থ উপার্জন করছি...জায়গা কিনেছি/বাড়ির কাজ চলছে...আমাদের কষ্টের দিন আর নেই মা...দয়া করে আমাকে আর একটা বছর সময় দিন...কথা দিচ্ছি আমি আমার বিয়ের মোহরানার টাকা ও আনষাঙ্গিক টাকা যোগড় করে আপনার হাতে দেব...আপনি আপনার পছন্দ মতো বিয়ের আয়োজন কইবেন...
মায়ের অশ্রুকে আর্শীবাদ হিসাবে নিয়ে পূনরায় বিদেশের পথে পাড়ি জমালাম...উঠ ছেরি আইজ তোর বিয়ে প্রবাদ বাক্যটি অতি কষ্টে ঘাড় থেকে ঝেড়ে ফেললাম...প্রবাসে এসে মনের শান্তি নেই...মায়ের চোখের পানি এখনো চোখের সামনে ভেসে আসে বারংবার...

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



