যোগাযোগের ক্ষেত্রে ফেইসবুক একটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে সামাজিক ও ব্যক্তি জীবনে...ছাত্রজীবনের কোন বন্ধু যার সাথে দীর্ঘদিন কোন যোগাযোগ নেই, তার কোন মোবাইল নাম্বারও নেই যে নতুন করে যোগাযোগ করা যাবে, এমনকি কোন ঠিকানা নেই যে চৌচাক্কায় চড়ে যাওয়া যাবে...সেক্ষেত্রে যদি ঐ বন্ধুটির ফেইসবুক আইডি থাকে...কিংবা বন্ধু সার্কেলের কারো সাথে তার আইডি যুক্ত থাকে তথা যোগাযোগ থাকে তবে তাকে খুব সহজেই খুঁজে পাওয়া যায়...তার সাথে তাৎক্ষনিক চ্যাট করা যায়...ফোন করা যায়...দিনক্ষন ঠিক করে ফিজিক্যাল সাক্ষাতও করা যায়।
যাইহোক এই তো গেল ফেইসবুকে বন্ধু যোগাযোগের আলোচনা কিন্তু ভাবুন তো ঠিক এমনটি যদি হয় বাস্তব জীবনে যে বহুদিন যোগাযোগ নেই এমন একজন প্রিয় বন্ধুর সাথে যোগাযোগ হয় ঠিক ফেইসবুক পদ্ধতিতে...এমনটিই ঘটেছিল এবারের ঈদের ছুটিতে প্রবাসে...আমার কাছে তো খুবই অবাক লেগেছে যে প্রবাসেও কাকতাতালীয় ভাবে বন্ধুর বন্ধু হবে আমার বন্ধু...আসুন কথা না বাড়িয়ে মূল আলোচনায় আসি...
প্রথমেই প্রিয় বন্ধুটি সম্পর্কে বলি, অত্যন্ত মেধাবী একটি মেয়ে...পড়াশোনার প্রতি প্রবল ঝোঁক...বিয়ের সময় একটাই শর্ত ছিল তার পড়ালেখা করতে দিতে হবে...তার স্বামীও বিয়ের পরে সেই সুযোগ দিয়েছিল...আমার সাথে পরিচয় অনার্সে পড়ার সময়...ওর স্বামীর নাম কাকতাতালীয় ভাবে আমার নামের সাথে মিল...প্রায়ই মজা করে ডাকতাম আশরাফের বউ কই...ক্ষ্যাপাতে চেষ্টা করতাম কিন্তু পারতাম না...স্বভাবসুলভ হাসিতে সব কিছু মানিয়ে নিত...ওর বাসায় যখনই যেতাম মনে হতো আমার বোনের বাসায় এসেছি...বন্ধুত্বের কোন বালাই নেই তুই-তুকারি করছে, নে, খা, পড়, অংক কর...এই ধরনের আবেগ জড়ানো সম্পর্ক...মনে আছে যেদিন প্রবাসের পথে পাড়ি জমাবো তার আগের দিন স্বামী-সন্তান দিয়ে আমার বাড়িতে হাজির...বন্ধুটির শেষ কথা এখনো কানে বাজে,"তুই ক্যান বিদেশ যাইতাছস? বিদেশই যদি যাইবি তাইলে এত্তো পড়ালেহা করলি ক্যান?" ওহ! আজ ওর কথা মর্মে মর্মে উপলব্ধি করছি প্রবাসে আমার অর্থ এসেছে ঠিকই মানসিক সুখ আসেনি এখনো...প্রবাসে থাকার অপরাধে বন্ধুটির সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন।
এবার আসুন আপনাদের বলি কেন আমি শিরোনামে ফিজিক্যাল ফেইসবুক শব্দটি ব্যবাহার করলাম তার রহস্য...ঈদের ছুটি পাঁচ দিন...সময় কাটানোর জন্য প্রবাসী বন্ধুরা মিলে প্রায়ই আড্ডা দেই...প্রবাসে কাজ করতে গিয়ে পরিচয় ও ক্লোজ বন্ধু হিসাবে পাই দুলাল ভাইকে...সে বয়সে আমার চাইতে বড় হলেও মনমানসিকতার দিক থেকে ঠিক আমার মতো...অফিসের সময়+ঘুমানোর সময় বাদ দিলে মোট সময়ের ৯০% সময়ই কাটে তার সাথে...দু:খ সুখের গল্প করেই কাটে প্রতিটি দিন...এই ঈদে রিয়াদ থেকে তার এক ক্লোজ বন্ধু আসছে বেড়াতে...তার সম্পর্কে শুনে আমি হতভম্ভ...উপস্থিত মনে হচ্ছিল তার মতো দু:খী মানুষ বোধ করি বর্তমানে আর কেউ নাই...মাত্র মাস খানেক আগে নব্য বিবাহিতা বউ রেখে প্রবাসে এসেছিল...তার স্ত্রীকে জোড় করে তুলে নিয়ে যায় তার শশুড়বাড়ী এলকার প্রভাবশালী এক রাজনৈতিক নেতার ছেলে...যতটুকু যেনেছি সেই ছেলেছি নাকি তার স্ত্রীকে একতরফা ভালবাসতো...বহুবার প্রেমের প্রস্তাব দিয়েছিল মেয়ে রাজি হয়নি কখনো...তার উপরে প্রবাসী ছেলের সাথে বিয়ে হযে যাওয়াতে ভেতরে ভেতরে ফুঁসে ছিল...যেই স্বামী প্রবাসে পাড়ি জমিয়েছে অমনি রাস্তা থেকে জোড় করে তুলে নিয়ে যায় তাদের বাড়িতে...অবস্থা এমন দাড়িয়েছে যে যে কোন অঘটন ঘটে যেতে পারে...হতে পারে ছেলে আত্যহত্যা করতে পারে/হতে পারে মেয়ের গায়ে এসিড ছুঁড়ে মারবে/এমনকি খুনাখুনি ও হতে পারে...এই বিষয়গুলো বিবেচনা করে এলাকার মুরব্বীরা সিদ্ধান্ত দিল তালাকের...সম্প্রতি তালাক সম্পূর্ন হয়েছে...(এই গল্পের বিস্তারিত অন্য কোন দিন লিখবো) সদ্য বউ হারানোর সেই কষ্ট বুকে নিয়ে মানসিক ভাবে কিছুটা হালকা হতে রিয়াদ থেকে ছুটে আসছে প্রিয় বন্ধুর কাছে।
ঈদের দ্বিতীয় দিন সন্ধায় দু:খী বন্ধুটিকে রিসিভ করে নিয়ে আসলাম...অল্প সময়ের মধ্যেই আমার সাথে পরিচয় ও আন্তরিকতার সম্পর্ক হয়ে গেল...তার কষ্টের কথাগুলো যতই শুনছিলাম ততই কষ্ট পাচ্ছিলাম...কিন্তু কি করবো প্রবাসে আমরা অনেকটাই অসহায় অনেক কিছু চাইলেও করতে পারিনা...আমার কাছে সবচেয়ে বেশি যেটা কষ্ট লেগেছে যে, বাধ্য হয়ে তালাক দেবার পরও যখন মেয়েটি বলে আমি তোমাকেই ভালবাসি...আমাকে এই নরক থেকে নিয়ে যাও...তখন ব্যর্থ স্বামী হিসাবে তার কেমন লাগে উপলব্ধি করা আমার পক্ষে সম্ভ্যব নয় তবে থার্ড পারসন শ্রোতা হিসাবে আমি অত্যন্ত কষ্ট অনুভব করেছি...
পরের দিন দুলাল ভাই আমার উপর দায়িত্ব দিল তার সাথে কাউনসিলিং করার জন্য...একটু বুঝ-পরামর্শ দেবার জন্য...দু:খী বন্ধুটিকে নিয়ে আমার ঘরে একান্তে বসলাম...কথার এক পর্যায়ে যখন জিজ্ঞাস করলাম আপনাদের বাড়ি কোথায়? উত্তরে চমকে উঠলাম...আরে আপনাদের এলাকায় তো আমি ঘুরে এসেছি...কোথায়? বলতেই উত্তর দিলাম আপনাদের এলাকার কমিশনারের মেয়ে আমার বন্ধু...একগাল হেসে দিয়ে বলে আরে ঐ মেয়ে তো আমারও বন্ধূ...অবাকে ভুড়ো কপালে কুঁচকে শোধালাম, কিভাবে?...আরে ও তো আমার বাল্যকালের বন্ধু...ওদের বাড়ির পাশেই তো আমাদের বাড়ি...একসাথে বড় হয়েছি, একসাথে খেলেছি, একসাথে স্কুলে গিয়েছি ইত্যাদি ইত্যাদি...ওর বিয়ে হয়ে যাবার পর আর আস্তে আস্তে দূরত্ব বেড়ে যায়...একসময় আমিও বিদেশ চলে আসি...তারপর থেকে তার সাথে আর কোন যোগাযোগ নাই...তাহলে কি দাঁড়ালো যে তোমার বাল্য কালের প্রিয় বন্ধু সেই আমার বুইড়া কালের প্রিয় বন্ধু...হাহাহাহা...দুইজনের অট্টহাসিতে যেন আনন্দে ঘর কাঁপছে...আলোচনার এক পর্যায়ে লক্ষ্য করলাম, একটু আগেও মন খারাপ করে থাকা দু:খী বন্ধুটির মরা মুখটি কেমন আনন্দে ঝকঝক করছে...তার আনন্দ মুহৃর্তটায় ভাটা দিলাম না...আলোচনা চালিয়ে যেতে থাকলাম...বিভিন্ন মজাদার স্মৃতি আলোচনা করতে থাকলাম...
কাকতাতালীয় ভাবে কিভাবে প্রবাসী বন্ধুর বন্ধুর সাথে পরিচয় আবার সেই বন্ধুর সাথে আর এক প্রিয় বন্ধুর সাথে যোগাযোগ এ যেন বাস্তব জীবনে ফেইজবুকে বিচরন করলাম।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



