গত মাসের প্রায় মাঝামাঝি সময় থেকে পরীক্ষা শুরু হয়েছে, তাই অফিসের ব্যস্ততাকে কিছুটা পাশ কাটিয়ে বইয়ের পাতায় মুখ গুজে চোখ, মাথাকে ব্যস্ত রাখাই প্রথম ও প্রধান কর্তব্য হয়ে দাড়িয়েছে আজ এ ক’দিন। অফিস করে পড়াশোনা, স্বাভাবিক থেকে একটু তো ব্যতিক্রম বটেই, তার উপর তো আর পার্ট টাইম জব নয়, এক্কেবারে ফুল টাইম, শুধু ফুল টাইমও নয় ওভার টাইমও বলা যায়।
যে প্রসঙ্গে বলতে চাচ্ছি তা হল আমার এ পরীক্ষা কেন্দ্রিক। ৬টি পরীক্ষা হবে তার ভিতর ৪টি শেষ। পরীক্ষার কেন্দ্র পড়েছে ইডেন কলেজে [মহিলা কলেজ]। স্বভাবতই রাশি রাশি, সারি সারি, গোণা - অগোণায় মেয়ে আর মেয়ে।
পরীক্ষার সকালটা এমনিতেই অন্যরকম, স্বাভাবিক চিন্তা থেকে একটু বেশী টেনশন থাকে বলে মাথা ভন ভন করে তার উপর যখন ইডেনে ওই মেয়ে সম্প্রদায়ের মধ্যে পড়ে পরীক্ষার হল খুজতে ব্যস্ত এই আমি, তখন নিজেকে অনেকটা বিচ্ছিন্ন দ্বীপের বাসিন্দা মনে হয়।
যাই হোক, পরীক্ষার হলও পাওয়া যায় কিংবা পরীক্ষা, সবই দেয়া হয়, তার মাঝে জমা হয় কিছু নতুন অভিজ্ঞতা আর স্মৃতি।
যে হলটাতে আমার সিট পড়েছে সেখানে বেশীরভাগই মেয়ে পরীক্ষার্থী, হাতে গোনা কয়েকটা ছেলে আমরা। আমার সিটের সামনে-পিছনে-ডানে-বামে সব মেয়ে। প্রথম পরীক্ষার ঘটনাটাই বলি :
পরীক্ষা শুরুর দিন, পাশের পাশে যে ছেলেটি বসেছে সে পরীক্ষাই দিতে এসেছে ২০ মিনিট পর। তার ভাবটাই অন্যরকম, সানগ্লাস-কানে এয়ার ফোন। শুরুতেই কলম আনেনি, নিল একটা কলম, অনেকক্ষন পর দেখি কিছু না লিখে বসে আছে, জিজ্ঞেস করলাম কি ভাই লিখছেন না কেন ? সপ্রতিভ উত্তর “ আজ মুড অফ” - এর কি উত্তর দিব ভেবে পেলাম না।
২য় পরীক্ষার দিন, পাশে একটা মেয়ে বসেছে, দেখতেই একটু রাগী, দজ্জাল টাইপের মনে হল। শারীরিক গঠনগত দিক থেকেও বেশ। পরীক্ষা শুরু হয়েছে, এমনভাবে লিখছে পুরো বেঞ্চি কাপিয়ে ফেলছে। স্বভাবতই বললাম, আপা একটু আস্তে আস্তে লিখবেন, আমার তো ................. শেষ করার আগেই চোখ দুটো এমন মোটা করে রাগত্ব স্বরে “কি হইছে, কি বললেন ?” আমি তখন “ সরি আপা, আপা আপনে কি কোন দলের নেত্রী নি, কিছু মনে কইরেন না, আমি কিছু কইনাই, আপনে লেখেন - বেঞ্চী কাপায়ে লেখেন, কোন সমস্যা নাই, বেঞ্চী কাপায়ে লেখলে আমার কোন সমস্যা হইতেছেনা” এক উপুসে কথাগুলো বলে ফেললাম। মেয়ে তখনও আমার দিকে তাকিয়ে। অফিস পিয়নকে বললাম “ভাই এক গ্লাস পানি দাও তাড়াতাড়ি”
তার পরের দিন, মাঝখানে একটা গ্যাপ, তার পাশাপাশি দুটি বেঞ্চ, এদিকে আমি ওদিকে একটা মেয়ে বসেছে। ঘন্টা ২পরে মেয়েটি ডাকছে, আমি শুনছিলাম কিন্তু তাকাচ্ছিলামনা, নিজের লেখাই লিখছিলাম। “এই ভাইয়া, এই, এইইইইই, এক্সকিউজ মি ভাইয়া, ভাইয়া শুনতে পাচ্ছেন, এই যে .. শালায় কি কানে কম শোনে ” এ কথা শোনার পর আমি হাসতে হাসতে শেষ, বলে কি আমি নাকি তার ‘শালা’ আবার কানেও কম শুনি।
৪র্থ পরীক্ষার দিন, এদিন আগের দিনের মত লোমহর্ষক কোন পরিস্থিতির সম্মূখীন হতে হয়নি। ৩ঘন্টার পরীক্ষা শেষ করে যখন বের হয়েছি, সিটের পাশে রাখা প্রবেশ পত্র, রেজিষ্ট্রেশন কার্ড সব রেখেই চলে গিয়েছে। যখন বাসায় পৌছেছি খেয়াল হল কাগজগুলো তো কিছুই আনেনি, আবার দৌড় দিলাম ইডেনে। পরীক্ষার হলে গিয়ে দেখি ফাকা। মাথা পুরো গরম, আরো ৩টা পরীক্ষা বাকী, কি দিয়ে দিব -ইত্যাদি এসব হাবিজাবি চিন্তা করতে করতে যখন দোতলা থেকে নীচে নামছি তখন একটা মেয়ে “এক্সকিউজ মি, ভাইয়া, আপনি বোধ হয় আপনার এই কাগজগুলো ফেলে গিয়েছিলেন, আপনি চলে যাওয়ার পর দেখি ওখানেই পড়ে ছিল, তাই কাছে রেখেছিলাম, নীচে নেমে আপনাকে খুজেছি কিন্তু পাইনি, ভাবলাম নিশ্চয় আবার হয়ত খুজতে আসবেন” - মেয়েটির কথা যখন শেষ হল আমি নির্বাক “থ্যাংকস, আপনাকে যে কি বলে ধন্যবাদ দিব .......” আসি বলে মেয়েটা চলে গেল, আর কিছু বলার সুযোগই দিলনা, চেয়ে থাকলাম, যতদূর তার যাওয়াটা দৃষ্টি সীমায় থাকে।
পরীক্ষা এখনও চলছে, বাকী আছে আরো ২টা, হয়ত অভিজ্ঞতার ভান্ডারে জমা হতে পারে আরো কিছু নতুন অভিজ্ঞতা। বিচিত্র এ পৃথিবীতে নিত্য নতুন চলার পথে প্রতিদিনকার এ সঞ্চয়টুকুই একদিনের জন্য স্মৃতি ছাড়া আর কিছুই না।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

