পরিচয়টা কর্মসুত্রে। বেশ ক’বার এসেছে এর আগে, কথা হয়েছে, কাজের কিংবা কাজের বাইরেও। অনেকদিন ধরেই এ অফিসে তার যাতায়াত, আর আমি যখন থেকে তাকে দেখে আসছি তাও প্রায় বছর চারেকের উপর হবে।
মানুষটাকে এক নজর দেখেই যতটুকু বোঝা যায় বেশ আমুদে। বয়স কত হবে, অনুমান পঞ্চান্ন'র উপর ছাড়া কম নয়। গল্প করতে কিংবা জমাতে দুটোতেই বেশ উপভোগ করে। তাই যতবারই এসেছে ঠিক ততবারই কাজের কথার চেয়ে তার পারিবারিক, সাংসারিক বা দেশ, রাজনীতি ধর্ম কোন বিষয়ই উপেক্ষিত হতনা। এতে যে বিরক্ত হতাম না তাও নয়, তবুও কর্পোরেট ক্লায়েন্ট সার্পোট বলে কথা, হাসি মুখে হ্যা, হু, আহা, কি অবস্থা ইত্যাদি বিষ্ময়বোধক বা প্রশ্নবোধক শব্দ জুড়ে দিয়ে বাক্যের সমাপ্তি টানতে চাইলেও খুব বেশী সফল হয়ে উঠতনা।
ইদানিং, মানুষটা আগের তুলনায় অফিসে বেশ আসে, আর সাথে বেড়েছে আমার ঝক্কিও। কিছু প্রশ্নের তো উত্তর দিতেই হয়, এইতো সেদিন এল কোন কাজ নিয়ে নয়, স্রেফ কিছু সময় পার করা। আমিও কিছুটা এড়িয়ে চলার চেষ্টা করতাম, আর কতইবা।
রীতিমত বিরক্তির কারণ হয়ে দাড়াল। কিছুতেই এড়ানো যায়না, আমিও যথাসম্ভব তার কাছ থেকে নিজেকে লুকিয়ে রাখার চেষ্টাই করতাম। এই যেমন সেদিন সে অফিসে এল, ডেস্ক থেকে উঠে বাহিরে অনেকক্ষন কাটিয়ে তারপর ফিরলাম। স্টেশন বাসে উঠেছি মাত্র, পেছনে ফিরে দেখি তিনি, আস্তে আস্তে নেমে এলাম - গন্তব্যের অনেক আগেই। বাসায় ফিরছি, হাটার গতিও বেশ ছিল আমার, হঠাৎ দেখি তিনি সামনে, পিছিয়ে এলাম, তিনি রাস্তা পার হলে তারপর এগিয়ে গেলাম। রেস্টুরেন্টে তখন বন্ধুদের সাথে, হঠাত দেখি তিনি ঢুকছেন, তাড়াতাড়ি করে ওদেরকে বসতে বলে বেরিয়ে এলাম, আর ঢোকা হয়নি। এভাবেই যতটা সম্ভব।
কিছুদিন কি হয়েছে, মনটা বড্ড বিক্ষিপ্ত, না পারছি কাজে কিংবা পড়াশোনায়ও মন দিতে। সংসারের বড় ছেলে, এমনিতেই হাল টানতে কষ্ট, তারউপর দু-ভাইয়ের পড়াশোনার খরচ। সবমিলিয়ে হিমশিম খাবার যোগাড়। অফিসের পরিস্থিিিতও ভাল না। কিছু দেনায় জর্জরিত, বেশ কিছু টাকা প্রয়োজন এ মুহূর্তে কিন্তু কিভাবে ? এক প্রকার নিজের কাছে নিজেই অসহায়।
সেদিন আকাশ জুড়ে ঘন মেঘ ছিল, মাত্র বৃষ্টি নামবে বলতেই বৃষ্টি নেমে এল, আমি আর সেই মানুষটি একই রাস্তায়। উনার কাছে মাত্র একটি ছাতা, মেলে ধরলেন, মাঝে আমরা দুজন, ছাতার প্রশস্তটুকু মেলে রাখলেন আমার উপর, তিনি ভিজতে থাকলেন, কিছু বলতে মন চাইছিল না। চুপ রইলাম। হঠাত সম্বিৎ ফিরে পেলাম যখন তার ঠান্ডা হাতের স্পর্শে জিজ্ঞেস করলেন “কি হয়েছে, কোন সমস্যা? তুমি কিন্তু আমাকে বলতে পার” তার চোখের দিকে তাকিয়ে আজ আর কোন রাগ বা ক্ষোভ কিছুই ছিলনা, বললাম, নিজের জীবনের কথা, কষ্টের কথা, প্রতিদিনের এক টুকরো ব্যাথাতুর সময়ের কথা। যে অনুভূতি কোন আবেগের নয়। সত্য তা ধ্র“ব।
অফিসে পৌছেই তাকে আমার টেবিলে পাই, কিছুটা বিস্মিত, এত সকালে। কুশলদি জানার পর একটি খাম হাতে দিয়ে বিদায় নেবার আগে শুধু বলে গেলেন -
“বাবা তুমি কি মনে কর আমি জানিনা, তবে শুধু কাজের জন্যই নয়, তোমাকে অন্যভাবে দেখি, নিজের ছেলের চেয়ে কোন অংশে কম নয়, যখনই আসি তুমি সুন্দর হাসিতে কথা বল, আপ্যায়ন কর, কতই না ভাল লাগে। হয়ত সম্পর্কে কিছুনা, তারপরেও কি কিছু থাকেনা ? আমি আসলে কোনদিন সাহস করিনি, কিন্তু বোধহয় ভুল হয়েছে, তুমি কিন্তু কিছু মনে করবেনা”
- তিনি চলে গেলেন। দৃষ্টিটুকু আটকে থাকে-যতদূর তাকে দেখা যায়।
টেবিলের স্বচ্ছ কাচের গ্লাসে আকাশটাকে দেখা যায়, মুখ ফিরিয়ে আকাশের দিকে তাকাই “হে বিধাতা, তুমি আমাকে ক্ষমা করে দিও, যে মানুষটাকে নিয়ে যা কিছু ভেবেছি তা মুছে দিও, তিনি তো সাধারণ নন অসাধারণ ”
হ্যালো, চাচা কখন আসছেন, সেই কখন থেকে অপেক্ষা করছি
- আসছি বাবা, এই তো মাত্র আর মিনিট পাচ দুরে
তারপরও তিনি এসেছিলেন প্রায় ২৫ মিনিট পর
আকাশটা বেশ শান্ত, সূর্যটাও হেলে পড়েছে, কাচের দেয়ালে সূর্যটাকে এখন অস্পষ্ট লাগেনা
- কখন বেরুবে
এই তো আর কিছুক্ষন, কেন কোন কাজ ?
- না তোমাকে নিয়ে এক জায়াগায় যাওয়ার ইচ্ছে ছিল
সত্যি, তাহলে চলেন, বলেই দুজনে বেরিয়ে পড়ি কোন এক গন্তব্যে
চলি, আমি ও আমার পাশের সেই খুব সাধারণ কিন্তু অসাধারণ মানুষটিকে সঙ্গি করে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

