বিজয়ের এ দিনে মুক্তিযুদ্ধের কথা হবে, মুক্তির কথা, যুদ্ধের কথা, বিজয়ের উল্লসিত আনন্দের কথা, সেটাই স্বাভাবিক এবং প্রত্যাশিত। আমরা সেরকমই বলি এবং বলার চেষ্টাও করে থাকি। তবুও মাঝে অপ্রত্যাশিত কিছু থেকেই যায়। যেমন আজও রয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধের অতীত এবং বর্তমান- একটি প্রধান ইস্যু “রাজাকার” – আমাদের জন্য সুখকর ছিলনা, লজ্জার এবং অপমানের। তবুও আলোচনা – সমালোচনায় এ শব্দটিই আমাদের অর্থবহ “স্বাধীনতা” শব্দের পাশে, আজও বলতে হয় স্বাধীনতার ৩৭ টি বছর পরেও কারণে অকারণে বিচরণ করছে, ব্যর্থতা, আমরা মুছে ফেলতে পারিনি চিরতরে – এ শব্দটিকে। লক্ষ সহস্র শহীদের রক্তে যেমন অর্জিত হয়েছে স্বাধীনতা, পেয়েছি বিজয়, একটি দিন-বিজয় দিবস, কিন্তু অনেক কথা বলতে হয়, তবুও বলি- অন্তত এমন কোন দিন তো নেই “রাজাকার মুক্ত দিবস” বা “রাজাকার পতন দিবস” আফসোস !
“রাজাকার” প্রসঙ্গে কিছুটা বাড়তি সময ব্যয় করি, যদিও আজকের এ দিনে তা অনাকাঙ্খিত ।
মুক্তিযুদ্ধের কথা শুনেছি মুক্তিযোদ্ধাদের কাছ থেকে, প্রত্যক্ষদর্শীদের মাধ্যমে – রাজাকারদের ব্যপারটিও তাই। মুক্তিযোদ্ধা বাবা, ভাই, কিংবা বন্ধু তাঁদের মুখেই সেই আগুন ঝরা দিনগুলোর কথাতেই এই নরপশুদের বিভৎস ইতিহাস জানা হয়। কিন্তু কখনো কি এমন হয়েছে যে, আমরা শুনেছি রাজাকারের মুখে রাজাকারেরই কথা। এক কথায় “রাজাকার আত্মবিশ্লেষণ”। কেমন হতে পারে একজন রাজাকারের মুখে শোনা তাদের নরতান্ডবের বর্ণনা … সে বর্ণনাটি-ই এখানে লেখা হবে।
বিস্তারিত যাবার পূর্বে লেখকের লেখার সূত্রতা জেনে রাখা ভাল। লেখকের বাস শহরেই। পৈতৃক সূত্রে গ্রামের বাড়ী যশোর। অনেক বছর পর এ বছরের শুরুতে সেখানে যাওয়ার সৌভাগ্য হয়। অনুসন্ধান সূত্রতা থেকে একজন রাজাকারের সঙ্গে পরিচয় ঘটে। আসলে রাজাকার অনুসন্ধান করতে যাওয়াটাই সেখানে তার মুখ্য নয়, যদিও দেখা হয় অত:পর কথা হয় মুখোমুখি …. সে বর্ণনারই কিছু লেখক এখানে তুলে দেবার চেষ্টা করেছেন।
……………………………………………………………………………………………………………………………..
তারিখটা মনে পড়ছেনা ঠিক, সময়টা ছিল ৬৫ সালের দিকে। ভারত থেকে মাত্র ছেলে পুলে নিয়ে এদেশে এসেছি, দেশ বলতে তখন পূর্ব পাকিস্তান আর পশ্চিম। আমরা তো এই পূর্বেই এলাম। প্রথম দিকটাই পরিস্থিতি খুব একটা ভাল ছিলনা, এমনিতেই যখন ভারত ত্যগ হল, অন্যদের মত বিনিময়-টাও করতে পারিনি, নতুন দেশে এসে বেশ কিছুদিন অভাবেই গেল।
আসলে ভারতে ওদের অত্যাচার সহ্য হতনা, মুসলমানদের ওপর নানাভাবে অত্যাচার চালাত, এদিকে ছেলে পুলে গুলো বড় হচ্ছিল, তাছাড়া ভাই – ভগ্গররাও দেশ ছাড়ার কথা বলছিল, সেই তখন থেকে পৃতিপুরুষের ভিটে ছেড়ে এদেশে চলে এলাম।
মনে পড়ে সেই ৭১’র আগের সময়টাতে, পরিস্থিতি তখন খারাপ যাচ্ছিল, এই ভাল তো আবার দুদিন খারাপ। যৌথ সংসার ছিল সবাইকে নিয়ে একসাথে পেরে ওঠাও যেতনা। শহরে মোকদ্দমায় কাজ হত, ওখানেই এক উকিল বাবুর সাথে কাজ। যা আসত, মন্দ না।
ঘটনার সেই ৭১’ এ ভাবতেও পারিনি অল্প সময়ে এতটা ক্ষমতা পেয়ে যাব। আসলে মুজীব সাহেব যখন ৭ই মার্চের ভাষণ দিলেন তখনই বুঝতে পারছিলাম কিছু একটা এবার ঘটে যাবে। যেদিন ২৫শে মার্চ এল, সেদিনের রাতের সে কথা তো সবাই জানে, আসলে মুজীব সাহেব আওয়ামী লীগ করতেন আর ভারতের সাথে তার যে সম্পর্ক ছিল, সব সময় ভয় থাকত তাকে সমর্থন করলে বুঝি এ দেশ আর ভারত এক হয়ে যাবে, এমনিতেই ভারত থেকে ধাক্কা খেয়ে এসেছি, তাই মুজীব সাহেবকে সমর্থন করতে পারলাম না। দেশ যেন ভাগ না হয়ে যায় সেটাই চাইছিলাম।
ততদিনে যে যার মত যুদ্ধে যেতে শুরু করেছে, আমি নিজের চোখেই দেখেছি গ্রামের কিছু ছেলে বর্ডার পার হয়ে চলে গেল। বাপ-মা গুলো কানত। শরনার্থী হয়ে আরও অনেকে চলে গেল। তবুও যারা নিজের মাটি ছাড়তে চাইলনা, তাদের সংখ্যাও কম না।
৭১’এর মাঝামাঝি সময়, আগষ্ট মাস তখন, শেষের দিকে প্রায়। তখনও পাকিস্তানীরা আসেনি এ এলাকায়। প্রায় শেষ তারিখ কি সেপ্টেম্বরের শুরুতে এল। গ্রামের রাস্তা ঘাট ভাল ছিলনা। ওদের জিপগুলো আসতে পারলেও বড় বড় ট্রাকগুলো ঠিকমত ঢুকতে পারতনা। কোন মতে এল, তখন নদীর মত পানি ছিল, যাকে এখন বেতনা বলে, ওর পাশেই ক্যাম্প করল। ওরা বেশিরভাগই সাতার জানতনা তাই ওপারে যেতে পারলনা।
প্রথম পাকিস্তানীর ক্যাম্পে গেলাম যেদিন, মেজর সাহেব ব্যস্ত ছিলেন, দেখা করতে পারিনাই। দুদিন পর দেখা হয়েছিল। অনেক কথাও হয়েছিল।জানতে চাইছিল কে কোথায় আছে। কি অবস্থা। প্রথম দিকটাতে আমাকে নিয়ে প্রায় বের হতেন, গঞ্জের বাজার, স্কুল, চেয়ারম্যান বাড়ী। একদিন এলাকার মুক্তিযোদ্ধাদের লিষ্ট দিতে বললেন।
কয়েকটা ঘটনার কথা বলি,
....……শালার বাচ্চারা মানুষ ছিলনা, নারমাংস লোভী। গ্রামের উঠতি বয়সের মেয়ে কোন বাড়ীতে আছে ঠিকানা নিয়ে হামলা। হয় বাপ, ভাই না হয়ত মেয়ের অন্য কাউকে ধরে আনত। পরে আনত মেয়ে নয়ত বাড়ীতেই যেত তারা। আমি তো আর একা ছিলামনা, আরও বেশ কয়েকজন ছিল- ওরাই ঠিকানা যোগাড় করে দিত।
....…… একদিন কয়েকটা ছেলেকে ধরে নিয়ে আসল, সন্ধ্যার দিকে তখন, মুক্তি বাহিনীতে মাত্র নাম লিখিয়েছিল, কলেজ পড়ুয়া, গামছা দিয়ে চোখদুটো আচ্ছা করে আটকে হাত পা রশি দিয়ে বেধে নদীর ধারে নিয়ে গিয়ে সোজা গুলি, মনে পড়ে রক্তে নদীর পানিও লাল হয়ে গিয়েছিল। আমার নিজের চোখের সামনে দেখা।
....……গ্রামের মাতব্বর যে ছিল ও মুক্তি করত, বউ-ছেলে মেয়েকে আগেই ভারতে পাঠিয়ে দিয়েছিল।খবর এল যেদিন সে মুক্তিদের খাবার-দাবার, পয়সা-কড়ি দেয়, সেদিনই ধরে আনল।ইচ্ছামত পিটাইল লোকটাকে, দু:খ হয় বাড়ীতে ফিরে দেখে বাড়ীটাও জ্বালায়ে দিছে।
শেষের দিকের কথা বলি, মুক্তি বাহিনীর সাথে ভারতীয় সেনাবাহিনী তখন যোগ দিয়ে ফেলেছে, চারিদিক থেকে খবর আসছিল মুক্তি বাহিনীদের দখলে দেশ চলে যাচ্ছে, পাকিস্তানীরাও তখন মোটামুটি কোণঠাসা। আমাদের এ এলাকায় যে মেজর ছিল উনি ক্যাম্প সরিয়ে নিলেন, অন্য জায়গা থেকে
এর মাঝে হয়েছে কি এক রাতে মুক্তি সেনারা এই এলাকায় অবস্থান নেয়, খবর পেয়ে দ্রুত ক্যম্পে যাওয়ার চেষ্টা করছিলাম, তার আগেই শুরু হয়ে গেল যুদ্ধ, যেতে পারলামনা আত্মগোপন করে ছিলাম। ৫ডিসেম্বর রাতে প্রচন্ড যুদ্ধ হল সেই রাতে। সরা রাতই গোলবষর্ন ছিল।মুক্তিরা চালাকী করে এলাকার প্রধান যে ব্রিজটা ছিল ওটা উড়িয়ে দিল। পাকিস্তানীরা প্রায় কোণঠাসা। অনেকেই মারা পড়ল বাকীরা পিছু হটে পাশের গ্রামে চলে গেল। সে রাতেই মোটামুটি এ এলাকা মুক্তিরা দখল নিয়েছিল।
অবশেষে খবর এল ৭ডিসেম্বর যশোর মুক্ত ।
পরেরদিন আমার বাড়ীতে বেশ কয়েকবার হামলা হল, পালিয়ে ছিলাম। পালিয়ে থাকাটা নিয়ে একটা স্মৃতি আছে।স্বাধীনতার পর এক দুপুরে মুক্তিরা হামলা করল কোনমতে বাড়ী ছেড়ে পালালাম, প্রায় ধরে ফেলছিল, পালাতে গিয়ে একজনের রান্না ঘরে ঢুকে পড়ি, ওই গেরস্থের বউ রান্না ঘরেই ছিল, কোনমতে দরজার পাশে লুকিয়ে থাকলাম, বাঁচার মিনতি চাইলাম।মুক্তিরা যখন এল, জিজ্ঞেস করল, মিথ্যে বলে পাশ কাটিয়ে দিলেন। পরে জেনেছি ওই মহিলার ছেলে, স্বামী আর এক আত্মীয়কে পাকিস্তানীরা গুলি করে মেরেছিল।
দেশ স্বাধীন হবার পর ছিল মুক্তিদের দিন, ওরা খুজে খুজে রাজাকারদের ধরেছে আর মেরেছে। আমার দু’ভাই পশ্চিম পাকিস্তানে চাকুরী করত, ওই সময় দেশে এসেছিল, আমার কারণে ওরাও পালিয়ে বেড়াল কত দিন। মাস ছয়েক পর যখন পরিস্থিতি একটু শান্ত হলে গ্রামে ফিরলাম।
তারপরেও অনেক তান্ডব ছিল অনেক দিন, সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা হওয়ার পর কিছুটা স্বস্তি পাওয়া গেল।
আজ তো অনেক বছর হল। আমার নাতি সেদিন ওদের স্কুলে বিজয় দিবসের অনুষ্ঠানে গিয়েছিল, পরে কাদঁতে কাদঁতে বাড়ী ফিরে এল, জানতে পারলাম, স্কুলের বন্ধুরা ওকে “রাজাকারের বাচ্চা” বলে গালমন্দ করেছে।
আমার ছেলে, ও এসে খুব রাগ করল। ছেলের বউ-ও খুব রাগ করে,
আজ আর এগুলো ভাল লাগেনা, ছেলে রাগ করে, নাতি কাদেঁ – শুধু আমি রাজাকার ছিলাম বলে। রাজাকার এখন একটা গালি হয়ে গেছে, লোকে দেখলে বলে “শালা রাজাকারের বাচ্চা”
……………………………………………………………………………………………………………………………..
লেখকের নোটে আরো অনেক লেখাই ছিল, কিছু পৃষ্ঠা হারিয়ে যায়, কিছু অরক্ষিত থেকে নষ্ট হয়ে যায়।
“রাজাকার” – শব্দটি বিশ্বাসঘাতক সমগ্রোত্রীয় সমর্থক শ্রেনীর একটি শব্দ, কোন মাহাত্ম নেই এতে, বরং জড়িয়ে আছে ঘৃণা, লজ্জা এবং অপমান। যে অপমান আমাদের জাতির, আমাদের এবং আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্মদের।
আমরা চাইনা এ শব্দটি আর দ্বিতীয়বার উচ্চারিত হোক, বিজয়ের এমন দিনে এমন কোন কলংক আমাদেরকে আর না স্পর্শ করুক, সেটাই মনে প্রাণে কামনা এবং প্রার্থনা।
বিজয়ের এ দিনে সেই সব মুক্তিযোদ্ধা বীর সেনাদের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি, এতটা বছর তোমাদের কাছে এ দিনে যেভাবে ক্ষমা চেয়েছি এবারও ক্ষমা করে দিও,
দেখ - এ দেশ একদিন রাজাকার মুক্ত করে ছাড়বই, ছাড়ব।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

