কাল ঘুম ভেংগে গিয়েছিলো অনেক ভোরে, বন্ধু রুমার ফোন পেয়ে। রিসিভ করতেই ওর কান্নাজড়ানো গলা, "দোস্ত আমার পাশের রুমের একটা মেয়ে গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করেছে!" আমি চমকে উঠে বসি, "কি বলিস?!" হঠাৎ ঘুম ভাঙ্গায় মাথায় সহজ করে কিছু ধরে না। ও আবার বলে, "দোস্ত আমার খুব ভয় করছে"। আমি ওকে আমাদের বাসায় চলে আসতে বলি তাড়াতাড়ি।
এখন পর্যন্ত সাড়ে পাঁচ বছরের ক্যাম্পাসজীবনের পাককা চার বছর কেটেছে এই রোকেয়া হলে, বাবা ঢাকায় ট্র্যান্সফার হবার আগে পর্যন্ত। কি আশ্চর্য রকম ভালোবাসার অনূভুতি জড়িয়ে আছে এই হলের সাথে, জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়টা ঘিরে। হলভর্তি এতগুলো মেয়ে--সারা দেশের কোথায় কোথায় থেকে তারা এসেছে-ঢাকার পাশের গাজীপুর থেকে শুরু করে সেই পঞ্চগড়। একেকজন একেক রকম, একটাই কেবল মিল প্রত্যেকের, তা হলো মেধা। এতবড় একটা হল, চারটা বিলডিং, প্রতিটিতে নানান বিভাগের নানান ইয়ারের ছাত্রী-- তবু হলে থাকা প্রত্যেকে প্রত্যেকের মুখ চেনে। রাস্তায় কখনও দেখা হলে জীবনে কথা না বলা একজনও আরেকজনের দিকে তাকিয়ে আন্তরিক হাসি বিনিময় করে--একটাই সূতো-রোকেয়া হল।
আমার বুকের ভেতরে এসে লাগে খবরটা। আমাদের হলের মেয়ে! এভাবে...! কোনমতে শুক্রবারটা পার করে আজ ক্যাম্পাসে গেলাম সকালে। রুমার রাতজাগা চোখের দিকে তাকিয়ে জানতে চাইলাম। "কে রে? আমি চিনি?" আমার বিলডিংয়ের না হওয়ায় আমার একটু সন্দেহ ছিলো যে চিনব কিনা।"চিনিস, বোরকা পরতো, হাতে-পায়ে মুজা, ইংলিশ, খুব খাড়া নাক..."। আমি চিনলাম।
একে একে রুমা বলে যায়। খুব ধার্মিক ছিলো মেয়েটা। নামাজ কখনও কাজা করতো না, রোজ সন্ধ্যায় নিয়ম করে কোরআন তেলাওয়াত করতো, এমনকি রাতে তাহাজ্জুদের নামাযও পড়তো। এক্সটেনশানের বিশাল গনবাথরুমের দরজায় বাথরুমে ঢোকা, বের হওয়া, গোসলের ইত্যাদি নানা রকম দোয়া বাংলা উচ্চারণে লাগানো দেখে একদিন বেশ বিরক্ত হয়েই রুমাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, এগুলো কে লিখেছে রে? আজ জানলাম, এই মেয়েটাই। খুব ভালো ছাত্রী ছিলো, এস.এস.সি এবং এইচ.এস.সি.তে স্ট্যান্ড করা, স্কলারশিপ পেতো।
মৃত্যু, সে যেমনই হোক, বেদনা বয়ে আনে জীবিতদের জন্য। কিন্তু সেই মৃত্যু যদি হয় আত্মহত্যা-নিজের জীবন নিজেই নাশ করে ফেলা...! মেনে নিতে বড় কষ্ট হয়। কেমন করে হয় এমন? কতখানি কষ্ট পেলে, জীবনের প্রতি কতখানি বিতৃষ্ণা জন্মালে একজন মানুষ নিজের জীবন শেষ করে দিতে চায়, দেয় !
জানি না। মাথার ভিতরে ভিড় করে হাজারো প্রশ্ন। মেয়েটার জন্য কষ্ট হচ্ছে খুব। আমাদের ধর্মীয় দৃষ্টিতে দেখলে এই মেয়ে মহাপাপী। তার এত দিনের এত ধর্মবিশ্বাস সব মূল্যহীন হয়ে তার শেষ সম্মান জানাজাটাও হয়তো হবে না। কিন্তু যে কারনে, যার কারনে সব ভুলে ক্ষণিকের মধ্যে সে এত বড় একটা সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হলো সে কি আরো বেশী পাপী না?
জানি না। আজ সব হিসাব কেমন এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। তোমার জন্য প্রার্থণা বোন....ভালো থেকো। জীবনে যে শান্তি পেলে না, মৃত্যুর ওপারে কি তোমার জন্য তা থাকবে না?
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



